ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্ভাব্য নতুন সমঝোতা চুক্তিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিনের বৈরিতা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সামরিক উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর এমন একটি সময় এসেছে যখন দুই দেশই আলোচনার টেবিলে ফিরে এসেছে। তবে এই চুক্তিকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আগ্রহের বিষয় হলো—ইরান কেন এটিকে একটি বিজয় হিসেবে তুলে ধরছে। যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে দাঁড়িয়ে তেহরানের নেতৃত্ব এই সমঝোতাকে শুধু একটি কূটনৈতিক চুক্তি নয়, বরং প্রতিরোধের সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে।
ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি শুধুমাত্র একটি আন্তর্জাতিক চুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির নেতৃত্বের মতে, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিকভাবে চাপে রাখার চেষ্টা করেছে। কঠোর নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যেও ইসলামি প্রজাতন্ত্র টিকে আছে। ফলে তাদের দাবি, এই চুক্তি প্রমাণ করছে যে চাপ প্রয়োগ করে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যায়নি। বরং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকেই আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথে আসতে হয়েছে।
ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব চুক্তিটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করছে যেন এটি তাদের প্রতিরোধ নীতির যৌক্তিক পরিণতি। পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান পর্যন্ত অনেকেই এটিকে একটি কৌশলগত সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের মতে, দেশটি যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ফলে চুক্তি কোনো পরাজয়ের প্রতীক নয়, বরং দীর্ঘ সংগ্রামের পর অর্জিত একটি রাজনৈতিক অর্জন।
তবে বাস্তবতা আরও জটিল। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে ইরানের অবকাঠামো, অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু পরিবার মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে চরম চাপের মধ্যে রয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে বৈদেশিক বিনিয়োগ কমে গেছে, তেল রপ্তানি সীমিত হয়েছে এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থাও নানা বাধার মুখে পড়েছে। এই অবস্থায় সরকার জানে যে জনগণের সামনে কোনো না কোনো ইতিবাচক বার্তা তুলে ধরা প্রয়োজন। তাই চুক্তিটিকে ‘বিজয়’ হিসেবে উপস্থাপন করা রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানের সাধারণ মানুষের কাছে অবশ্য ‘বিজয়’ শব্দটির অর্থ ভিন্ন। তাদের অনেকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমবে কি না, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে কি না এবং নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা কমবে কি না। সাধারণ নাগরিকদের একটি বড় অংশ বিশ্বাস করে, যদি চুক্তির ফলে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয় এবং অর্থনীতি কিছুটা স্বস্তি পায়, তবে সেটিই হবে প্রকৃত সাফল্য। রাজনৈতিক স্লোগান বা কূটনৈতিক ভাষণের চেয়ে তাদের কাছে বাস্তব জীবনের পরিবর্তন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
চুক্তিকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সম্ভাবনা। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, ইরান চুক্তির শর্ত পূরণ করলে দেশটি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা সম্পদ, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার এবং বিনিয়োগের নতুন সুযোগ ইরানের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। তেহরান এই সম্ভাবনাকে জনগণের সামনে তুলে ধরছে এবং বলছে, এটি কোনো দয়া নয়; বরং ইরানের দৃঢ় অবস্থানের ফল।
একই সঙ্গে ইরান দাবি করছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের প্রধান কৌশলগত লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে পারেনি। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটেনি, পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এবং আঞ্চলিক প্রভাবও সম্পূর্ণভাবে কমে যায়নি। এই যুক্তিগুলো ব্যবহার করে সরকার জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে, যুদ্ধ ও চাপ সত্ত্বেও দেশটি তার মৌলিক অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
তবে দেশের ভেতরে সবাই এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নয়। কট্টরপন্থি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর একটি অংশ মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো ধরনের সমঝোতা আদর্শগতভাবে ভুল। তারা দীর্ঘদিন ধরে বলে এসেছে যে ওয়াশিংটনকে বিশ্বাস করা যায় না। তাদের মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র অনেক সময় কূটনৈতিক আলোচনা ব্যবহার করে রাজনৈতিক ও সামরিক সুবিধা অর্জনের চেষ্টা করে। ফলে নতুন চুক্তির ক্ষেত্রেও তাদের মধ্যে সন্দেহ রয়ে গেছে।
অন্যদিকে সরকারবিরোধী কিছু গোষ্ঠী মনে করে, এই সংকটের মাধ্যমে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারত। তাদের যুক্তি, যদি চুক্তির ফলে শুধু বর্তমান কাঠামো টিকে থাকে কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কার না আসে, তবে জনগণের দীর্ঘমেয়াদি প্রত্যাশা পূরণ হবে না। তাই তারা চুক্তিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সমঝোতা শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বিষয় নয়; এর প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্যে পড়তে পারে। হরমুজ প্রণালি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, তেলবাজার, লেবানন, সিরিয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজনৈতিক ভারসাম্য—সবকিছুর সঙ্গে এই আলোচনার সম্পর্ক রয়েছে। ফলে চুক্তি সফল হলে তা কেবল দুই দেশের জন্য নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে সামনে এখনো অনেক অনিশ্চয়তা রয়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সময়সূচি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো—এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত আলোচনা বাকি রয়েছে। যেকোনো একটি বিষয়ে মতপার্থক্য পুরো প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে।
ইসরায়েলের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। তেল আবিব যদি আঞ্চলিক সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রাখে, তাহলে ইরানের ওপর প্রতিক্রিয়া দেখানোর চাপ বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে বর্তমান সমঝোতার ভিত্তি দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তাই চুক্তির ভবিষ্যৎ শুধু ওয়াশিংটন ও তেহরানের ওপর নির্ভর করছে না; বরং মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
সবকিছু বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, ইরান এই চুক্তিকে বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করছে মূলত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত কারণে। সরকারের জন্য এটি জনগণের কাছে আশা তৈরির একটি সুযোগ, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী দেখানোর একটি মাধ্যম এবং দীর্ঘদিনের চাপ মোকাবিলার একটি ইতিবাচক বর্ণনা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই ‘বিজয়’ কতটা বাস্তব, তা নির্ভর করবে চুক্তির বাস্তবায়ন, অর্থনৈতিক উন্নতি, নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়া এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে সাধারণ মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসার ওপর। কারণ ইতিহাস দেখিয়েছে, কোনো চুক্তির প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় কাগজে লেখা প্রতিশ্রুতিতে নয়, বরং মানুষের জীবনে তার বাস্তব প্রভাবের মাধ্যমে।
আপনার মতামত জানানঃ