
দেশের বিভিন্ন মহিলা মাদ্রাসায় সাম্প্রতিক সময়ে যে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ সামনে এসেছে, তা শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু অপরাধের ঘটনা নয়; বরং সমাজ, শিক্ষা ও ধর্মীয় কাঠামোর গভীরে লুকিয়ে থাকা এক অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে। নরসিংদী, কুষ্টিয়া, সাভার কিংবা নেত্রকোনার ঘটনাগুলো মানুষকে শুধু ব্যথিত করেনি, একই সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছে—মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা আসলে কতটা নিরাপদ? যারা পরিবার থেকে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার আশায় মেয়েদের আবাসিক মাদ্রাসায় পাঠান, তাঁদের বিশ্বাসের ভেতর কি অদৃশ্য কোনো ভয় জন্ম নিচ্ছে না?
বাংলাদেশের সমাজে মাদ্রাসা শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি বহু মানুষের কাছে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নিরাপত্তার প্রতীক। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য পরিচালিত মাদ্রাসাগুলোকে অনেক পরিবার তুলনামূলক নিরাপদ মনে করেন। কারণ সেখানে কঠোর পর্দাব্যবস্থা, বাইরের জগতের সীমিত যোগাযোগ এবং ধর্মীয় পরিবেশ থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই ‘নিরাপত্তা’ ও ‘গোপনীয়তা’ অনেক সময় উল্টো অপরাধ ঢাকার দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়। যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে সব ধরনের ক্ষমতা একজন বা কয়েকজন ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে এবং তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের মতো কার্যকর কোনো কাঠামো থাকে না, তখন ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি ভয়াবহভাবে বেড়ে যায়।
মহিলা মাদ্রাসাগুলোর একটি বড় বৈপরীত্য হলো—নামে মহিলা মাদ্রাসা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ থাকে পুরুষদের হাতে। পরিচালক, সুপার বা প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা সাধারণত পুরুষ। ছাত্রীরা তাদের কাছে শুধু শিক্ষার্থী নয়, বরং একধরনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর অংশ হয়ে যায়। সেখানে প্রশ্ন তোলা, প্রতিবাদ করা বা অভিযোগ জানানো অনেক সময় ‘অশ্রদ্ধা’ বা ‘ধর্মীয় অবাধ্যতা’ হিসেবে দেখা হয়। ফলে ভুক্তভোগীরা ভয়, লজ্জা ও সামাজিক চাপে নীরব হয়ে পড়ে।
এই নীরবতার সংস্কৃতি সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ অপরাধ যখন প্রকাশ পায় না, তখন অপরাধী আরও সাহসী হয়ে ওঠে। অনেক ঘটনায় দেখা গেছে, পরিবারগুলো সালিসের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করতে বাধ্য হয়েছে। কারণ মামলা করলে ‘ইজ্জত’ যাবে, মাদ্রাসার সুনাম নষ্ট হবে, সমাজে মুখ দেখানো কঠিন হবে—এমন ভয় তাদের তাড়া করে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, অনেক সময় ভুক্তভোগীকেই দায়ী করা হয়। মেয়েটির ভবিষ্যৎ, বিয়ে বা সামাজিক অবস্থান নিয়ে এমনভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয় যে পরিবার ন্যায়বিচারের পথ থেকে সরে আসে।
সমস্যাটি শুধু আইনশৃঙ্খলার নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট। যখন একজন শিক্ষক বা ধর্মীয় ব্যক্তিকে ‘পবিত্র’, ‘অতিমানবীয়’ বা ‘অপ্রশ্নযোগ্য’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন শিক্ষার্থীরা নিজের ওপর হওয়া অন্যায়কেও ভাগ্য বলে মেনে নিতে শুরু করে। বিশেষ করে কম বয়সী মেয়েরা অনেক সময় বুঝতেই পারে না যে তাদের সঙ্গে যা হচ্ছে, তা অপরাধ। তারা ভয়ে, বিভ্রান্তিতে বা মানসিক চাপে কাউকে কিছু বলতে পারে না। এই অবস্থাকে সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন “স্ট্রাকচারাল সাইলেন্স” বা কাঠামোগত নীরবতা—যেখানে পুরো ব্যবস্থাই এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকে যে ভুক্তভোগীর কণ্ঠস্বর বের হওয়ার পথ পায় না।
তবে এই বাস্তবতা মানেই যে ধর্মীয় শিক্ষা বা মহিলা মাদ্রাসা ব্যবস্থা ব্যর্থ, তা নয়। বরং এটি প্রমাণ করে যে যেকোনো প্রতিষ্ঠান—ধর্মীয় হোক বা আধুনিক—জবাবদিহিহীন হয়ে গেলে সেখানে অপরাধের ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটে। কিন্তু পার্থক্য হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অনেক সময় প্রতিবাদে নামতে পারে, আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে, সংবাদমাধ্যমের সামনে কথা বলতে পারে। মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সেই সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। তাদের জীবন এতটাই নিয়ন্ত্রিত যে অনেক সময় বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগও সীমিত থাকে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারীশিক্ষা নিয়ে ধর্মীয় সমাজের অভ্যন্তরীণ বিতর্ক। কিছু রক্ষণশীল গোষ্ঠী এখনো মনে করে, নারীদের উচ্চশিক্ষা সীমিত হওয়া উচিত। ফলে যখন কোনো মহিলা মাদ্রাসায় নিপীড়নের ঘটনা ঘটে, তখন তারা এটিকে নারীশিক্ষার বিরুদ্ধে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ পায়। তারা বলতে শুরু করে, “মেয়েদের বাইরে পাঠানোই সমস্যা।” অথচ ইসলামের ইতিহাস বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। ইতিহাসজুড়ে অসংখ্য মুসলিম নারী হাদিসশাস্ত্র, ফিকহ, সাহিত্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও সমাজসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। অনেক নারী ছিলেন শিক্ষক, গবেষক, বিচারক ও জ্ঞানচর্চার অগ্রদূত।
আজকের পৃথিবীতেও মুসলিম নারীরা শিক্ষা ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। মধ্যপ্রাচ্যের নারী শরিয়াহ বিচারপতি থেকে শুরু করে সিরিয়ার মহিলা শিক্ষা আন্দোলন—সবখানেই দেখা গেছে, নারীদের ক্ষমতায়ন ও নিরাপদ শিক্ষাব্যবস্থা একে অপরের পরিপূরক। তাই কয়েকজন অপরাধীর কারণে নারীশিক্ষার পথ সংকুচিত করা নয়, বরং নিরাপদ ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশ তৈরি করাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।
এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র, ধর্মীয় নেতৃত্ব, পরিবার এবং সমাজ—সবারই দায়িত্ব রয়েছে। শুধু সরকার বা আইন দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, আবার শুধু ধর্মীয় বক্তব্য দিয়েও হবে না। মাদ্রাসাগুলোতে শক্তিশালী গভর্নিং বডি গঠন, নারী শিক্ষকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত করা, নিয়মিত তদারকি, অভিযোগ গ্রহণের স্বাধীন ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বৃদ্ধি—এসব জরুরি পদক্ষেপ। বিশেষ করে আবাসিক মহিলা মাদ্রাসাগুলোতে শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আলেম সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অপরাধ হলে সেটিকে ধামাচাপা দেওয়া ধর্ম রক্ষা নয়; বরং অপরাধীকে রক্ষা করা। ইসলামের নামে যারা দুর্বলদের ওপর অত্যাচার করে, তারা ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করে না। বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, দুর্বলদের সুরক্ষা এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াই ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা।
আজ যে শিশুটি ভয় পেয়ে চুপ করে আছে, যে কিশোরীটি সমাজের লজ্জার ভয়ে নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখছে, তাদের পাশে দাঁড়ানো শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়; এটি সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্বও। কারণ একটি সমাজ তখনই সভ্য হয়ে ওঠে, যখন সে তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাই শুধু একটি শিক্ষাব্যবস্থার প্রশ্ন নয়; এটি পুরো সমাজের বিবেকের পরীক্ষা।
আপনার মতামত জানানঃ