দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন এক জটিল সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র আবারও পুরোনো কৌশলকে নতুন মোড়কে ব্যবহার করছে। সাম্প্রতিক সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর পদক্ষেপগুলো দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, তিনি একদিকে নরেন্দ্র মোদি–এর সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত রাখতে চান, অন্যদিকে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব—বিশেষ করে আসিম মুনির—কে সামনে এনে একটি ভারসাম্য রক্ষার রাজনীতি খেলছেন। এই নতুন ‘ব্যালান্সিং অ্যাক্ট’ কেবল ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা বিস্তৃত হয়েছে ইরান, মধ্যপ্রাচ্য এবং বৈশ্বিক কৌশলগত অঙ্গনে।
১৪ এপ্রিলের ফোনালাপে ট্রাম্প ও মোদির মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়, যা কেবল সৌজন্য বিনিময় ছিল না; বরং এর মধ্যে ছিল কৌশলগত বার্তা। ট্রাম্পের পক্ষ থেকে মোদিকে দেওয়া প্রশংসা যেমন ভারতকে আশ্বস্ত করার প্রচেষ্টা, তেমনি একই সময়ে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান মুনিরকে প্রশংসা করা এক ধরনের ‘ডাবল সিগন্যাল’। এই দ্বৈত বার্তার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বোঝাতে চাইছে যে তারা দক্ষিণ এশিয়ায় কোনো একপক্ষের ওপর নির্ভর করছে না, বরং দুই পক্ষকেই নিজেদের কৌশলগত খেলায় ব্যবহার করতে চায়।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পাকিস্তানের নির্বাচিত সরকারকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি সেনাবাহিনীর প্রধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া। শাহবাজ শরিফ থাকলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছেন মুনির। এটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার বাস্তবতাকে তুলে ধরে, যেখানে সামরিক বাহিনী দীর্ঘদিন ধরেই প্রকৃত ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক। যুক্তরাষ্ট্র এই বাস্তবতাকে স্বীকার করেই তাদের কূটনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করছে। কিন্তু এর ফলে গণতান্ত্রিক কাঠামো আরও দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
ইরানকে ঘিরে যে নতুন আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে, সেখানে পাকিস্তানকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। কারণ পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ইরানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ রয়েছে, যা কূটনৈতিক আলোচনায় কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি করতে পারে, যেখানে নির্বাচিত সরকার নয়, বরং সামরিক নেতৃত্বই আন্তর্জাতিক কূটনীতির মুখ হয়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত মনে হয়। একদিকে ভারতকে একটি উদীয়মান বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে পাকিস্তানকে একই সমীকরণে টেনে আনা হচ্ছে। এটি অনেকটাই পুরোনো ‘হাইফেনেশন’ নীতির পুনরাবৃত্তি, যেখানে ভারত ও পাকিস্তানকে একই পাল্লায় মাপা হতো। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই তুলনা আর কার্যকর নয়। ভারত অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও কূটনীতিতে অনেক এগিয়ে গেছে, যেখানে পাকিস্তান এখনও অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভুগছে।
তবুও যুক্তরাষ্ট্র কেন এই দুই দেশকে একই ফ্রেমে রাখছে? এর উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, এটি মূলত একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ। যুক্তরাষ্ট্র চায়, দক্ষিণ এশিয়ায় কোনো একটি দেশ অতিরিক্ত শক্তিশালী হয়ে না ওঠে। তাই তারা একদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে, অন্যদিকে পাকিস্তানকে কৌশলগতভাবে প্রাসঙ্গিক রাখছে। এতে করে তারা দুই দেশের ওপরই প্রভাব বজায় রাখতে পারে।
এই কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো চীন। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক নীতির মূল লক্ষ্য চীনের প্রভাব কমানো। এই ক্ষেত্রে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কোয়াড জোটের মাধ্যমে ভারতকে আরও সক্রিয় ভূমিকা দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। তবে একই সঙ্গে তারা চীনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে চায় না। ফলে একধরনের ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে, যেখানে ভারতকে ব্যবহার করা হচ্ছে, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করা হচ্ছে না।
পাকিস্তানের জন্য এই পরিস্থিতি একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হওয়ায় তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কিছুটা গুরুত্ব পাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নতুন করে জোরদার হতে পারে। কিন্তু এই সুযোগ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম, কারণ দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তাদের সামরিক ও বেসামরিক ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা। সেনাবাহিনী দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতির ওপর ব্যাপক প্রভাব রাখে, যা গণতান্ত্রিক উন্নয়নের পথে বড় বাধা। যুক্তরাষ্ট্র যদি এই কাঠামোকে শক্তিশালী করে, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে পাকিস্তানের জন্য ক্ষতিকর হবে। একই সঙ্গে এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।
ভারতের জন্য এই নতুন পরিস্থিতি বেশ সংবেদনশীল। তাদের একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, অন্যদিকে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের উপস্থিতি বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। শুধু সংযুক্ত আরব আমিরাত নয়, বরং ইরানসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে হবে। কারণ ভবিষ্যতে এই অঞ্চলই বৈশ্বিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার এই নতুন ভূরাজনৈতিক খেলায় যুক্তরাষ্ট্র একটি সূক্ষ্ম কৌশল অবলম্বন করছে। তারা একদিকে ভারতকে শক্তিশালী করছে, অন্যদিকে পাকিস্তানকে সম্পূর্ণভাবে পাশ কাটিয়ে দিচ্ছে না। এই ‘ডুয়াল অ্যাপ্রোচ’ হয়তো স্বল্পমেয়াদে কার্যকর হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি অঞ্চলে নতুন ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ভারত, পাকিস্তান এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিগুলোর উচিত নিজেদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে স্বাধীন কৌশল গ্রহণ করা। কারণ বৈশ্বিক শক্তিগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা শেষ পর্যন্ত তাদের নিজেদের অবস্থানকেই দুর্বল করে দিতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে এই দেশগুলো কতটা বিচক্ষণতার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে তার ওপর।
আপনার মতামত জানানঃ