ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ‘আটক’ করার ঘটনাটি একদিকে যেমন আকস্মিক, অন্যদিকে তেমনই বহু বছরের জমে থাকা উত্তেজনার বিস্ফোরণ। হোয়াইট হাউসের ভাষ্যে এটি ছিল মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী এক “প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ”, কিন্তু সমালোচকদের কাছে এটি আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন, সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রের ওপর সরাসরি আঘাত। এই অভিযানের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কেবল লাতিন আমেরিকার রাজনীতিকে নতুন করে অস্থির করেননি, বরং বিশ্ব রাজনীতিতেও এক গভীর প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন—শক্তির সীমা কোথায়?
ট্রুথ সোশালে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, আটক হওয়ার পর ক্লান্ত ও বিবর্ণ মুখে নিকোলাস মাদুরো। সেই ছবি ছিল প্রতীকী—একজন নেতা, যিনি একসময় নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের মুখ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, এখন সেই যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই বন্দি। ট্রাম্পের দাবি, মাদুরো ও তার স্ত্রীকে নিউ ইয়র্কে নিয়ে গিয়ে “আমেরিকান বিচারের মুখোমুখি” করা হবে। এই ঘোষণার মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায়, এটি কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং রাজনৈতিক বার্তাও—যুক্তরাষ্ট্র তার চোখে ‘শত্রু’ রাষ্ট্রনেতাদের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।
এই ঘটনার পেছনের পটভূমি কয়েক দশকের। হুগো শাভেজের সময় থেকেই ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ছিল বৈরী। শাভেজের মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরি মাদুরো ক্ষমতায় আসেন এবং ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান নিজের দলের নিয়ন্ত্রণে আনেন। নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক, বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়—সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলা এক দীর্ঘ সংকটে আটকে পড়ে। এই সংকটের ফলেই গত এক দশকে প্রায় আট মিলিয়ন ভেনেজুয়েলান দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, যাদের একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়েছে। ট্রাম্প এই অভিবাসন প্রবাহকে নিজের রাজনৈতিক ভাষ্যে রূপ দিয়েছেন ‘জাতীয় নিরাপত্তা সংকট’ হিসেবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ, মাদুরো সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে অপরাধী ও গ্যাং সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছে। প্রমাণ ছাড়াই তিনি দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলার কারাগার ও মানসিক হাসপাতাল খালি করে বন্দিদের ‘উত্তরে ঠেলে দেওয়া’ হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাদক পাচারের অভিযোগ। ট্রাম্প ফেন্টানিলকে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ হিসেবে ঘোষণা করে মাদকবিরোধী যুদ্ধকে কার্যত সামরিক রূপ দেন। ভেনেজুয়েলার দুটি অপরাধী গোষ্ঠীকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করা হয়, আর মাদুরোর মাথার ওপর ঝুলতে থাকে বাড়তে থাকা পুরস্কার।
কিন্তু মাদক বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ ভিন্ন ছবি দেখায়। ভেনেজুয়েলা বৈশ্বিক মাদক পাচারের মূল কেন্দ্র নয়; এটি মূলত একটি ট্রানজিট রুট। অধিকাংশ কোকেন আসে কলম্বিয়া থেকে এবং যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছায় প্রশান্ত মহাসাগরীয় পথে। ফেন্টানিলের প্রধান উৎস মেক্সিকো। তবু ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্যে ভেনেজুয়েলা হয়ে ওঠে এক সুবিধাজনক প্রতীক—অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সীমান্ত ও মাদক সমস্যার জন্য একটি বহিরাগত ‘দোষী’।
অভিযানের দিন ভোরে কারাকাসের আকাশ কেঁপে ওঠে বিস্ফোরণে। বাসিন্দারা বিমান ও হেলিকপ্টারের শব্দ শুনতে পান, বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, শীর্ষ সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট ডেল্টা ফোর্স এই অভিযানে অংশ নিয়েছে। মাদুরোকে কোথা থেকে, কীভাবে আটক করা হয়েছে—সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। ভেনেজুয়েলা সরকার হামলার কথা স্বীকার করলেও দাবি করেছে, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা এখনো ক্ষমতায় রয়েছেন। তবু বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া একটি নজিরবিহীন ঘটনা।
ট্রাম্পের বক্তব্যে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত স্পষ্ট। তিনি ঘোষণা করেন, “ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ রদবদল না হওয়া পর্যন্ত আমরাই দেশটি চালাবো।” কারা সেই ‘আমরা’, সে প্রশ্নে তিনি নিজের দিকে ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে ইঙ্গিত করেন। এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, কারণ এটি কার্যত একটি রাষ্ট্রের ওপর সরাসরি শাসন চাপিয়ে দেওয়ার ঘোষণা। যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলো শিগগিরই ভেনেজুয়েলায় প্রবেশ করবে—এই মন্তব্য সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করে যে, অভিযানের পেছনে তেলসম্পদের বিষয়টি উপেক্ষণীয় নয়।
ভেনেজুয়েলার রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেল মজুদ। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, বিনিয়োগের অভাব ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে উৎপাদন কমে গেলেও তেল এখনো দেশটির অর্থনীতির মেরুদণ্ড। মাদুরো বরাবরই অভিযোগ করে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আসল লক্ষ্য এই তেলসম্পদ। ট্রাম্পের একটি মন্তব্য—“আমার ধারণা আমরা তেল রেখে দেব”—এই অভিযোগকে আরও জোরালো করে। যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা তা অস্বীকার করেছেন, বাস্তবে সামরিক অভিযান, নৌ অবরোধ ও তেলবাহী জাহাজ জব্দ করার ঘটনাগুলো ভিন্ন ইঙ্গিত দেয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যে ‘অ-আন্তর্জাতিক সশস্ত্র সংঘাত’-এর কথা বলছে, তা বিতর্কিত। শান্তিকালে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি বারবার হামলা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন হতে পারে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সাবেক কৌঁসুলির মন্তব্য, এটি পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত হামলার পর্যায়ে পড়তে পারে—এই সংকটকে আরও গভীর করে তোলে। অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র নিজের নাগরিকদের রক্ষা করতে বাধ্য, আর মাদক কার্টেলগুলো কার্যত যুদ্ধ চালাচ্ছে।
এই অভিযানের আঞ্চলিক প্রভাবও গভীর। লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ একে নতুন ধরনের হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে, যা ঠান্ডা যুদ্ধের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। একই সঙ্গে এটি ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাডোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ট্রাম্প তাকে “ভালো মানুষ” বললেও দাবি করেছেন, তার দেশের ভেতরে যথেষ্ট সমর্থন নেই। ফলে মাদুরো পরবর্তী ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক রূপরেখা এখনো অস্পষ্ট।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে একাধিক স্তরে পড়া যায়। এটি যেমন তার কঠোর আইনশৃঙ্খলা ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ধারাবাহিকতা, তেমনি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় শক্তির নগ্ন প্রয়োগের উদাহরণ। মাদুরোকে ‘আটক’ করার মধ্য দিয়ে তিনি দেখাতে চেয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার শত্রুদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় রাখে না। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন থেকে যায়—এই পথ কি দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনবে, নাকি আরও সংঘাতের বীজ বপন করবে?
ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের জন্য বাস্তবতা আরও কঠিন। বছরের পর বছর সংকটে থাকা একটি দেশ এখন সামরিক হস্তক্ষেপের ধাক্কা সামলাচ্ছে। রাস্তাঘাট ফাঁকা, অর্থনীতি স্থবির, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ট্রাম্পের ভাষ্যে এটি ‘মুক্তি অভিযান’ হতে পারে, কিন্তু ইতিহাস বলে, বাহ্যিক শক্তির চাপ দিয়ে টেকসই গণতন্ত্র খুব কম ক্ষেত্রেই এসেছে। এই অভিযানের শেষ পরিণতি কী হবে—তা নির্ভর করবে শুধু ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তে নয়, ভেনেজুয়েলার জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়ার ওপরও।
এক অর্থে, এই ঘটনা আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি কঠিন সত্য সামনে আনে। যখন নিরাপত্তা, মাদক, অভিবাসন ও সম্পদের প্রশ্ন একসূত্রে গাঁথা হয়ে যায়, তখন সীমারেখা ঝাপসা হয়ে ওঠে। ট্রাম্প সেই ঝাপসা রেখা পেরিয়ে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এটি ইতিহাসে শক্ত অবস্থানের উদাহরণ হিসেবে লেখা হবে, নাকি বিপজ্জনক নজির হিসেবে—তার রায় দেবে সময়ই।
আপনার মতামত জানানঃ