১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য দিন। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ, দুই লাখের বেশি নারী নির্যাতনের শিকার হওয়া এবং কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুত জীবনের পর এই দিনেই একটি জাতি স্বাধীনতার স্বাদ পায়। এই বিজয় ছিল মূলত বাঙালির—একটি নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্র হয়ে ওঠার ইতিহাস। অথচ স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর এসে যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ১৬ ডিসেম্বরকে ‘ভারতের বিজয় দিবস’ হিসেবে উল্লেখ করে একটি পোস্ট দেন এবং সেখানে বাংলাদেশের নাম একবারও উচ্চারণ করেন না, তখন সেটি আর কেবল কূটনৈতিক অসতর্কতা থাকে না; বরং এটি দীর্ঘদিনের একটি প্রবণতার পরিণত রূপ হয়ে ওঠে—বাংলাদেশের বিজয়ের কৃতিত্ব ধীরে ধীরে নিজেদের ঘরে টেনে নেওয়ার প্রবণতা।
ইতিহাস বলে, ১৯৭১ সালের যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার মধ্য দিয়ে। তখন ভারত যুদ্ধে ছিল না। মার্চ, এপ্রিল, মে, জুন, জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর—এই দীর্ঘ সময়ে যুদ্ধ চালিয়েছে মুক্তিবাহিনী, সাধারণ মানুষ, কৃষক, ছাত্র, শ্রমিক, শিক্ষক—একটি পুরো জাতি। তখন ভারতের ভূমিকা ছিল আশ্রয় দেওয়া, প্রশিক্ষণ দেওয়া, সীমান্ত এলাকায় সহযোগিতা করা—যা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ এবং স্বীকৃত। কিন্তু সেটি সরাসরি যুদ্ধ নয়। সরাসরি ভারতীয় সেনাবাহিনী যুদ্ধে যুক্ত হয় ডিসেম্বরের শুরুতে, যখন পাকিস্তান ভারতের পশ্চিম সীমান্তে আক্রমণ করে এবং যুদ্ধ আন্তর্জাতিক রূপ নেয়। অর্থাৎ পুরো যুদ্ধের মাত্র শেষ ১৩ দিনে ভারতীয় সেনাবাহিনী সরাসরি অংশ নেয়।
এই বাস্তবতাটি ঐতিহাসিকভাবে স্পষ্ট হলেও ভারতের রাষ্ট্রীয় বয়ানে ধীরে ধীরে একটি পরিবর্তন দেখা যায়। শুরুতে ভারতীয় বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধকে বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনতার লড়াই হিসেবে স্বীকার করা হতো, ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভূমিকা বলা হতো ‘সহযোগী শক্তি’ হিসেবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ভাষা বদলাতে থাকে। ‘সহযোগিতা’ শব্দটি জায়গা করে দেয় ‘যৌথ বিজয়’-এ, আর যৌথ বিজয় থেকে ধীরে ধীরে সেটি রূপ নেয় ‘ভারতের ঐতিহাসিক বিজয়’-এ। মোদির সাম্প্রতিক পোস্ট সেই বিবর্তনেরই সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ।
এই প্রবণতা হঠাৎ শুরু হয়নি। ভারতের পাঠ্যবই, সামরিক দিবস উদ্যাপন, সরকারি ভাষণ এবং গণমাধ্যমে ১৯৭১ সালের যুদ্ধকে প্রায়ই “Indo-Pak War of 1971” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যেখানে বাংলাদেশের ভূমিকাটি ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে পড়ে। সেখানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আর একটি স্বাধীনতাযুদ্ধ নয়, বরং ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে একটি যুদ্ধের উপজাত ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। এর মধ্য দিয়ে বাঙালির আত্মত্যাগ, নেতৃত্ব, গণপ্রতিরোধ—সবকিছু ধীরে ধীরে পাদটীকায় পরিণত হয়।
মোদির পোস্টে এই প্রবণতার একটি পরিণত রাজনৈতিক রূপ দেখা যায়। তিনি ১৬ ডিসেম্বরকে ভারতের বিজয় হিসেবে তুলে ধরেন, ভারতীয় সেনাদের সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের কথা বলেন, কিন্তু একটি বাক্যেও উল্লেখ করেন না সেই দেশের নাম, যার জন্ম না হলে এই ‘বিজয়’ শব্দটির কোনো অর্থই থাকত না। কারণ ১৯৭১ সালের যুদ্ধের ফলাফল যদি বাংলাদেশের স্বাধীনতা না হতো, তাহলে ভারত কিসের বিজয় উদ্যাপন করত—এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর পোস্টেও একই সুর। সেখানে মুক্তিবাহিনীর কথা উল্লেখ থাকলেও ভাষার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে ভারতীয় বাহিনীর ‘চূড়ান্ত বিজয়’। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সেখানে একটি ফলাফল মাত্র—মূল অর্জন নয়। এটি ইতিহাস বলার একটি কৌশল, যেখানে ভাষার মাধ্যমে ক্ষমতার পুনর্বণ্টন করা হয়। যে যুদ্ধটি ছিল বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রশ্ন, সেটিকে ভারতীয় সামরিক গৌরবের অধ্যায়ে পরিণত করা হয়।

এই কৃতিত্ব চুরির প্রবণতা কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ ইতিহাস শুধু অতীত নয়, এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের রাজনৈতিক হাতিয়ার। যে জাতি নিজের বিজয়ের গল্প নিজে বলতে পারে না, তার ইতিহাস অন্য কেউ নিজের মতো করে লিখে নেয়। আজ যদি ১৯৭১ সালের বিজয়কে ভারতের বিজয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, তাহলে কাল মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব, আত্মত্যাগ এবং নৈতিক মালিকানাও প্রশ্নের মুখে পড়বে। তখন বলা হবে—বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ভারতের কারণে, নিজেদের শক্তিতে নয়।
এই বয়ান বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও প্রভাব ফেলেছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারতের প্রতি রাজনৈতিক নির্ভরশীলতা, কূটনৈতিক নীরবতা এবং ইতিহাস নিয়ে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে অনেক সময় এসব বক্তব্যের যথাযথ প্রতিবাদ করতে পারেনি। ফলে ভারতের এই দাবি বা ইঙ্গিত আন্তর্জাতিক পরিসরে অনেকটাই চ্যালেঞ্জহীন থেকে গেছে।
এখানে ভারতীয় জনগণ বা সাধারণ সৈনিকদের অবদান অস্বীকার করার প্রশ্ন নেই। ভারত যে সহযোগিতা করেছে, যে সেনারা জীবন দিয়েছেন, সেটি ইতিহাসে সম্মানের সঙ্গে লিপিবদ্ধ থাকবে। কিন্তু সহযোগী হওয়া আর মালিক হওয়া এক নয়। মুক্তিযুদ্ধের মালিকানা বাংলাদেশের জনগণের। এই মৌলিক সত্যটি অস্বীকার করা হলে তা শুধু ইতিহাস বিকৃতি নয়, এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আত্মমর্যাদার ওপর আঘাত।
মোদির পোস্টের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—এটি একটি বিচ্ছিন্ন বক্তব্য নয়, বরং একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় স্মৃতি নির্মাণের অংশ। যেখানে ভারত নিজেকে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, আর বাংলাদেশকে একটি কৃতজ্ঞ, সহায়ক চরিত্রে নামিয়ে আনে। এই স্মৃতি নির্মাণ রাজনীতির মাধ্যমে ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য, কূটনীতি ও ঐতিহাসিক ন্যায্যতাও প্রভাবিত হতে পারে।
১৬ ডিসেম্বর তাই শুধু অতীত স্মরণের দিন নয়, এটি ইতিহাসের মালিকানা রক্ষার দিনও। এই দিনে যদি বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত না হয়, তাহলে সেটি নিছক একটি শব্দ বাদ পড়া নয়—এটি একটি রাষ্ট্রকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার নীরব চেষ্টা। আর সেই চেষ্টার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সবচেয়ে আধুনিক রূপ।
মুক্তিযুদ্ধ কোনো দেশের উপহার ছিল না, এটি ছিল বাঙালির অর্জন। ভারতের সহযোগিতা ইতিহাসের অংশ, কিন্তু বিজয়ের কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশই। এই সত্য যতবারই আড়াল করার চেষ্টা করা হবে, ততবারই সেটিকে আরও স্পষ্ট করে উচ্চারণ করা প্রয়োজন। কারণ ইতিহাস নীরব থাকলে, অন্য কেউ এসে সেটিকে নিজের মতো করে লিখে নেয়।
আপনার মতামত জানানঃ