Trial Run

ইউনাইটেডে অগ্নিকাণ্ড : ক্ষতিপূরণ নিয়ে আদালতে টানানাটানি চলছেই

ইউনাটেডে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের অর্থ দেয়া নিয়ে আদালতে টানাটানি অব্যাহত রয়েছে। হাইকোর্টের ক্ষতিপূরণের আদেশ আবারো স্থগিত করেছে আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারক। রাজধানী ঢাকার গুলশানে অবস্থিত বেসরকারি ইউনাটেড হাসপাতালে গত বছর ২৭ মে অগ্নিকাণ্ড ঘটে কোভিড-১৯ ইউনিটের পাঁচ রোগীর মৃত্যু হয়। এতে কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও অবহেলার প্রমাণ পায় আদালত।

শুরুতে গাফিলতির প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও আদালত ইউনাটেড কর্তৃপক্ষ ও ক্ষতিগ্রস্তের পরিবারের মধ্যে সমঝোতার সুযোগ দেয়। তা না হলে পরে পাঁচ রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত চার পরিবারকে ১৫ দিনের মধ্যে ৩০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। গতকাল রোববার, ১৭ জানুয়ারি ২০২১ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে শুনানির পর আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারক মো. নূরুজ্জামান আট সপ্তাহের জন্য হাইকোর্টের ওই আদেশের ক্ষতিপূরণের অংশ স্থগিত রাখার আদেশ দিয়েছেন।

এ আদালতে ইউনাইটেড হাসপাতালের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান খান। রিটকারী পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী অনীক আর হক, হাসান এম এস আজিম, মুনতাসির উদ্দিন আহমেদ, নিয়াজ মোহাম্মদ মাহবুব ও শাহিদা সুলতানা শীলা ও রাকিব হাসান। পরে মোস্তাফিজুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ৩০ লাখ টাকা করে দিতে হাই কোর্ট ক’দিন আগে যে আদেশ দিয়েছিল, তার কার্যকারিতা আপাতত আট সপ্তাহের জন্য স্থগিত করে দিয়েছেন চেম্বার আদালত।”

আদালতে আসামীপক্ষ ইউনাইটেড যুক্তি তুলে ধরে যে, এটা জনস্বার্থের কোনো মামলা না। যারা আবেদনকারী তারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য। প্রশ্ন হচ্ছে, একটা বেসরকারি পক্ষ আরেকটি বেসরকারি পক্ষের বিরুদ্ধে রিট করার এখতিয়ার রাখে কিনা। তাছাড়া এ ঘটনায় প্রকৃতপক্ষে ইউনাইটেড হাসপাতালের দায় আছে কিনা সেটা সাক্ষ্য-প্রমাণের বিষয়। রিটে এই বিষয়টির নিরসন সম্ভব না। তার জন্য নিম্ন আদালতে মামলা করতে হবে। ফ্যাটাল অ্যাকসিডেন্ট অ্যাক্ট ১৮৫৫ অনুযায়ী দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু যদি হয়, তাহলে সেই মৃত্যুতে যারা ক্ষতিগ্রস্ত, তারা ক্ষতিপূরণের মামলা অবশ্যই করতে পারবেন। তার জন্য নিম্ন আদালতে দেওয়ানী মামলা করতে হবে।

অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্তদের আইনজীবী বলছেন, ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রশ্নে হাইকোর্ট একটি রুল জারি করেছেন, যে রুলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে। জানতে চাওয়া হয়েছে, কেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ১৫ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেওয়া হবে না। তবে ৩০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের ব্যাপার ভিন্ন। আদালত শুরুতে ক্ষতির যে পরিমাণ ঠিক করেছে, সেটা তাদের দিতে হবে। পরবর্তীতে আদালত জানতে চাইছে, আরো বেশি কেন দেয়া হবে না? এটার মীমাংসা করার জন্য ওই ৩০ লাখ টাকা প্রদানের আদেশ স্থগিত করার কোনো প্রয়োজন ছিল না।

ইউনাইটেড কর্তৃপক্ষ তাদের শক্তি ও প্রভাব ব্যবহার করে ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদানে দীর্ঘসূত্রী ও বিঘ্ন সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারের সদস্যরা। আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া মাহবুব এলাহী চৌধুরীর ছেলে আননান চৌধুরী মনে করেন, তারা চাইছে আমরা যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ি এবং ক্ষতিপূরণের দাবি থেকে সরে যাই। কিন্তু এটা এখন আর আমাদের ব্যাপার নয়। এটা হলো হাইকোর্টের রায় এবং পুলিশের প্রতিবেদনে উঠে আসা প্রমাণ। এগুলো চাইলেই গায়ের জোরে বদলে দেয়া যাবে না।

গত বছরের ২৭ মে রাতে গুলশানের বেসরকারি ওই হাসপাতালের প্রাঙ্গণে কোভিড-১৯ রোগীদের জন্য করা আইসোলেশন ইউনিটে আগুন লেগে পাঁচ রোগীর মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে তিনজনের কোভিড-১৯ পজিটিভ ছিল। ওই পাঁচজন হলেন- মো. মাহবুব (৫০), মো. মনির হোসেন (৭৫), ভারনন অ্যান্থনি পল (৭৪), খোদেজা বেগম (৭০) ও রিয়াজ উল আলম (৪৫)।

ওই ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও গাফিলতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে কমিটি গঠন এবং নিহতদের পরিবারকে পাঁচ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে গত ৩০ মে একটি রিট আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নিয়াজ মাহবুব ও শাহিদা শিলা। আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া মাহবুব এলাহী চৌধুরীর ছেলে আননান চৌধুরী এবং ভারনন অ্যান্থনি পলের ছেলে আন্দ্রে ডোমিনিক পলও পরে সে রিট আবেদনে অন্তর্ভুক্ত হন।

এরপর নিহত রিয়াজুল আলমের স্ত্রী ফৌজিয়া আক্তার ১৫ কোটি ক্ষতিপূরণ চেয়ে আলাদা একটি রিট আবেদন করেন। তাতে এক কোটি টাকা অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়। তার আগে এ ঘটনার বিচারিক তদন্ত চেয়ে গত বছর ১ জুন আরও দুটি রিট আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী রেদওয়ান আহমেদ ও হামিদুল মিসবাহ। এরপর ২ জুন এসব আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে রাজউক, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ১৪ জুনের মধ্যে ঘটনার প্রতিবেদন দিতে বলে হাইকোর্ট।

এর মধ্যে পুলিশের দেওয়া প্রতিবেদনে ইউনাইটেড হাসপাতালের গাফিলতির কথা আসে। রাজউক জানায়, কোভিড-১৯ রোগীদের জন্য আলাদা করে আইসেলেশন ইউনিট করার অনুমতি নেয়নি ইউনাইটেড কর্তৃপক্ষ। ফায়ার সার্ভিসের প্রতিবেদনে বলা হয়, অগ্নিকাণ্ডের সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নিলে রোগীদের মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হত। তাছাড়া হাসপাতালের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ। অন্যদিকে ইউনাইটেড হাসপাতালের প্রতিবেদনে অগ্নিকাণ্ডের ওই ঘটনাকে ‘স্রেফ দুর্ঘটনা’ বলা হয়।

ওই প্রতিবেদন পাওয়ার পর গত বছর ২৯ জুন এক আদেশে হাই কোর্ট ইউনাইটেড হাসপাতালকে ১২ জুলাইয়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করতে বলে। সেই সঙ্গে ইউনাইটেড হাসপাতালের বিরুদ্ধে অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে করা মামলাটির তদন্তও দ্রুত শেষ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। ইউনাইটেড হাসাপাতালের আইনজীবী মোস্তাফিজুর তখন বলেছিলেন, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তারা ক্ষতিগ্রস্ত সবার পরিবারের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলেন। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যে অর্থ দিতে চেয়েছিল, তাতে রাজি হয়নি চার পরিবার। অগ্নিকাণ্ডে মারা যাওয়া মনির হোসেনের পরিবার শুধু ২০ লাখ টাকায় সমঝোতায় সম্মত হয়।

পরে ক্ষতিপূরণ প্রশ্নে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সমঝোতায় আসতে না পারার বিষয়টি হাই কোর্টকে জানানো হলে ওই বছর ১৫ জুলাই হাই কোর্ট ক্ষতিগ্রস্ত চার পরিবারকে ১৫ দিনের মধ্যে ৩০ লাখ টাকা করে দিতে নির্দেশ দেয়। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেয়। একক বেঞ্চ হওয়ায় আদালত সেদিন রুল জারি থেকে বিরত থাকে। পরে হাই কোর্টের সে আদেশ স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন করে ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

গত বছর ২১ জুলাই চেম্বার আদালত হাইকোর্টের আদেশটির কার্যকারিতা স্থগিত করে দেয় এবং ইউনাইটেডের আবেদনটি আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির জন্য রাখে। পরে গত বছর ২০ আগস্ট রিট আবেদনগুলো নতুন করে হাইকোর্টের রিট বেঞ্চে উপস্থাপন করতে বলে আপিল বিভাগ। সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে এ ঘটনায় ক্ষতিপূরণ, বিচারিক তদন্ত চেয়ে করা তিনটি রিট আবেদন বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের বেঞ্চে উপস্থাপন করা হলে গত ১১ জানুয়ারি আদালত রুলসহ আদেশ দেয়। সে আদেশে ক্ষতিগ্রস্ত চার পরিবারকে প্রাথমিকভাবে ৩০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

এছাড়া আগুনে মারা যাওয়া চার রোগীর ক্ষতিগ্রস্ত চার পরিবারকে ১৫ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, সেই সঙ্গে হাসপাতালে রোগীদের অধিকার রক্ষায় বিবাদীদের ব্যর্থতাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং অবহেলার দায়ে ইউনাইটেড হাসপাতালের অনুমতি কেন বাতিল করা হবে না, জানতে চাওয়া হয় রুলে। স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়।

এর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত চার পরিবারকে প্রাথমিকভাবে ৩০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশটি স্থগিত চেয়ে আবেদন করে হাইনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সে আবেদনের শুনানির পর রোববার চেম্বার আদালত হাই কোর্টের আদেশের এ অংশটি স্থগিত করে দিল।

এসডাব্লিউ/বিডিএন/আরা/০৯৪৪

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 10
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    10
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ