Trial Run

ক্ষুধার্ত মানুষ দেখছে ইউরোপের শহরগুলো

ইউরোপের উন্নত ও বিত্তশালী ঝাঁ চকচকে ঐতিহ্যবাহী শহরগুলোয় এখন অনেক ক্ষুধার্ত মানুষের আনাগোনা। করোনাভাইরাস মহামারীর আঘাত-অভিঘাতে ইউরোপ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ধনী ইউরোপের লোকদের যেন মুদ্রার উল্টোপিঠ দেখতে হচ্ছে। তবে অনেক মানুষের দারিদ্র্য বেড়ে গেলেও মহাদেশটির কোনো কোনো দেশের নাগরিকদের সম্পদের পরিমাণ আবার এই মহামারির মধ্যেই বেড়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে ইউরোপের আর্থ-সামাজিক সুরক্ষা নীতির কার্যকারিতা নিয়ে।

ইউরোপে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ার পর থেকে হু হু করে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। অঞ্চলটিতে টিকাদান শুরু হওয়ায় আশার সঞ্চার হলেও নতুন করে ভয় ধরাচ্ছে ক্ষুধা। ‘ফার্স্ট লাভ ফাউন্ডেশন’ নামের লন্ডনভিত্তিক এক দাতব্য সংস্থা জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপজুড়ে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে।

খাবারের পাশাপাশি দরিদ্রদের আবাসন এবং আইনি সহায়তা দেওয়া প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, কেবল যুক্তরাজ্যেই মহামারীর প্রথম পর্যায়ে তাদের খাদ্য সহায়তার চাহিদা ৯২৫ শতাংশ বেড়েছে। সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা ডেনিস বেন্টলি বলেন, যখন করোনা আসতে দেখলাম, আমাদের জন্য খেলা পুরো বদলে গেল। তার কথায়, যুক্তরাজ্যে, বিশেষ করে টাওয়ার হ্যামলেটে আগে থেকেই খাদ্য সংকটে ভুগতে থাকা অনেকের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে এই মহামারী।

গত জুলাইয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছিলেন, ভাইরাসটি গত কয়েক দশকের ঝুঁকি ও অসমতাগুলোর চেহারা উন্মুক্ত করে দিয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এই অঞ্চলে এতদিন যারা দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং বৈষম্য নির্মূলে অগ্রগতি দেখাচ্ছিল, তারা মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে বহু বছর পেছনে ফিরে গেছে।

অবশ্য ইউরোপে বিশ্বের বেশ কিছু ধনীতম এবং সর্বাধিক উদার সামাজিক সুরক্ষা নীতি সম্পন্ন দেশেই করোনা সংকটের আগে থেকে ক্ষুধা ও বঞ্চনার অস্তিত্ব ছিল। এর মধ্যে বৈশ্বিক মহামারীর আঘাতে অবস্থা আরও করুণ হয়ে উঠেছে। ইউরোপের বড় বড় শহরে খাদ্য সংকটে ভুক্তভোগী এবং ফুড ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া মানুষের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় ফুড ব্যাংক নেটওয়ার্ক ট্রাসেল ট্রাস্ট জানিয়েছে, মহামারীর প্রথম ধাপে এবং গত ৭০ বছরের মধ্যে প্রথমবার তাদের চাহিদা এক লাফে ৪৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সংকট কাটাতে ইউনিসেফও দেশটির ক্ষুধার্ত শিশুদের সাহায্য করার ঘোষণা দিয়েছে।

সংকটের আরও বিশদ চিত্র দেখা যায় ইউরোপীয় ফুড ব্যাংক ফেডারেশনের (এফইবিএ) তথ্যে। সংস্থাটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ইউরোপে তাদের ৪৩০টি ফুড ব্যাংকে প্রায় ৩০ শতাংশ চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। করোনাপূর্ব সময়ের তুলনায় দেশভেদে এই চাহিদা বৃদ্ধির পরিমাণ ৬ থেকে ৯০ শতাংশ। এফইবিএ’র সভাপতি জ্যাক ভ্যান্ডেনশ্রিক বলেন, সহায়তা কর্মসূচিতে অনেক সময় ইইউ দেশগুলোকে গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড ধরলেও বেশ কিছু সরকারের রেখে যাওয়া খাদ্য ফুড ব্যাংকগুলোকে পূরণ করতে হচ্ছে।

ফরাসি ফুড ব্যাংক রেস্তোঁ দু কোয়েরের সভাপতি প্যাট্রিস ব্ল্যাঙ্ক বলেন, মহামারীর কারণে ফ্রান্সে ক্ষুধার স্রোত শুরু হওয়ায় চলতি বছর তাদের ফুড ব্যাংকের চাহিদা প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে। এতে সবচেয়ে বেশি ভুগছে প্যারিসের উত্তরাঞ্চলীয় শহরতলিগুলো। সেখানে প্রতিদিন শত শত লোক খাবারের সন্ধানে হাজির হচ্ছে।

অনেকটা একই কথা বলেছেন জার্মান ফুড ব্যাংক তাফেল ডয়েচল্যান্ডের চেয়ারম্যান জোশেন ব্রল। ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশেও তার সংস্থা অন্তত ১৬ লাখ মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে। তিনি বলেন, দারিদ্র্যের হুমকিতে থাকা বা এতে ক্ষতিগ্রস্ত অনেকের মধ্যেই নিঃসঙ্গতা ও মানসিক চাপ রয়েছে। আমরা বহু বছর ধরে রাজনীতিবিদ এবং সমাজকে বোঝাতে চাচ্ছি যে, দারিদ্র্য দূরীকরণ তাফেলের কাজ নয়। আমাদের কাজ বা আমরা অন্তত এটাকে যেভাবে দেখছি, তা হলো জনগণকে সহায়তা করা।

একদিকে যখন মানুষ আরো দরিদ্র্য হয়ে খাবারের খোঁজে পথে বেরোতে বাধ্য হচ্ছে, অন্যদিকে ইউরোপেরই কোনো কোনো দেশের নাগরিকরা এর মধ্যেই আরো বেশি অর্থের মালিক হয়েছেন। ২০২০ সালে করোনা মহামারির মধ্যে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ ডেনমার্কের নাগরিকদের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে অর্থ বেড়েছে ৯৩ হাজার কোটি ডলার; যা মহামারির আগের চেয়ে অনেক বেশি। এর মধ্য দিয়ে বেড়েছে দেশটিতে কোটিপতির সংখ্যা আর তাদের মোট অর্থের পরিমাণ।

কোপেন হেগেনে অবস্থিত দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, স্টক আর বন্ডের মাধ্যমে দুই প্রান্তিকে দেশের অর্থনীতিতে যোগ হয়েছে ১১ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। তবে করোনা মহামারির দ্বিতীয় ধাপের সংক্রমণের কারণে আবারো অবনতি হতে পারে দেশটির অর্থনীতির।

ইউরোপে ধনী ও দরিদ্র্য বৃদ্ধির এই চিত্র সারা বিশ্বেই একই রকম। গুটিকয়েক মানুষের অর্থের পরিমাণ বেড়েছে মহামারির মধ্যেও। অন্যদিকে বিপুল হারে বেড়েছে দরিদ্র্য মানুষের সংখ্যা। ধনী ইউরোপকেও তাই এখন ক্ষুধার্ত মানুষ দেখতে হচ্ছে অনেক বেশি হারে। ইউরোপকে এখন তাদের আর্থ-সামাজিক সুরক্ষার নীতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

এসডাব্লিউ/এসএন/আরা/

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 12
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    12
    Shares