
দেশের মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থীদের ওপর যৌন নির্যাতনের খবরে শিউরে উঠছে সারা দেশ। যদিও মাদ্রাসাগুলোতে ক্রমবর্ধমান এই ধর্ষণ নিয়ে মাথাব্যথা নেই সরকারের। দেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলোও সরব নয়। নেই বার্ষিক কোন প্রতিবেদন। তাই এই সব নির্যাতনের প্রকৃত চিত্র থেকে যাচ্ছে অজানা।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের পর শিক্ষার্থীরা লজ্জা, ভয়, নানান কিছুর কারণে তা প্রকাশ করে না। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শিশুদের উপর যৌন নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে সবথেকে কম কথা বলা হয়। এর কারণ হয়তো সেক্স, অপ্রাপ্তবয়স্ক ভুক্তভোগী এবং ধর্মের মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে মানুষের অন্ধবিশ্বাস।
এরই ধারাবাহিকতায় এবার ঢাকার সাভারে একটি মাদ্রাসায় ‘মাদ্রাসাশিক্ষকের মারধরে’ জখম হয়েছে এক শিশুশিক্ষার্থী।
আশুলিয়ার কুরগাঁও চারিগ্রাম ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা ও এতিমখানায় বুধবার(৩০ মার্চ) রাতে এ ঘটনা ঘটে। শুক্রবার(০১ এপ্রিল) সাপ্তাহিক ছুটিতে ১১ বছর বয়সী মো. সাকিব বাড়ি ফিরলে পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি জানতে পারে।
পরিবারের অভিযোগ, শুক্রবার দিনভর তারা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়েও কোনো বিচার পাননি।
মাদ্রাসার ওই শিক্ষক হাফেজ মো. আজাদকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ শিশুটির বাবা। আজাদের বাড়ি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার পূর্বসটি গ্রামে।
সাকিবের বাবা মো. ইব্রাহিম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সপ্তাহে ছয় দিন আমার পোলাডা মাদ্রাসায় থাকে। গত বুধবার রাইতে মাদ্রাসার আরেক পোলার চানাচুর খাওয়া নিয়া সাকিবরে হাত-পা বাইন্ধা ওর ছার আজাদ অনেক মারছে। লাঠি দিয়া মাইরা কিছু রাখে নাই আমার পোলাডার।
‘মাদ্রাসা খোলা থাকায় বাসায় আইতেও পারে নাই। আমরাও কিছু জানতে পারিনি। পরে শুক্রবার সকালে মাদ্রাসা থাইকা সাকিব বাসায় আইছে। ওর আম্মায় গোসল করাইতে গিয়া দ্যাখে মাইরের দাগ। পরে আমি ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়া ভর্তি করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিকালে বিচারের জন্য মেম্বারের কাছে গেছি। সে আমাদের মাদ্রাসায় পাঠাইছে। কইছে দ্যাখেন গিয়া, হ্যারা কী বিচার করে। মাদ্রাসার লোকজন ওই ছাররে লুকায় রাখছে। সারা দিন আরও লোকের কাছে গেছি কিন্তু কোনো বিচার পাই নাই। এহন শনিবার সকালে পুলিশের কাছে যামু।’
পরিবারের অভিযোগ, শুক্রবার দিনভর তারা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়েও কোনো বিচার পাননি।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে ওই শিক্ষককে ফোন দেয়া হলে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়।
মাদ্রাসার সভাপতি আতাউর রহমান ও পাথালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শফিউল আলম সোহাগের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একাধিকবার ফোন দেয়া হলেও কেউ ধরেননি।
আশুলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) হারুন অর রশিদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মাদ্রাসার এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিশু শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনা শুনেছি। তবে এখনও পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
দেশে বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিশু শিক্ষার্থীদের মারধরের ঘটনা নতুন নয়। প্রায়শ মাদ্রাসার শিক্ষকদের বিরুদ্ধে তুচ্ছ কারণে শিক্ষার্থীদের মারধরের অভিযোগ ওঠে।
শিশু শিক্ষার্থীদের উপর মাদ্রাসা শিক্ষকদের চালানো নির্মম নির্যাতনের একাধিক ভিডিও ফেসবুকে ভাইরালও হয়েছে। একাধিক শিক্ষককে কারাগারেও পাঠিয়েছে আদালত।
গত বছরের মার্চে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায় একটি মাদ্রাসায় এক শিশুকে বেদম পিটুনির ভিডিও ভাইরাল হয়। পরে ওই শিক্ষককে আটক করা হয়। এর পরপরই সাতকানিয়ার একটি মাদ্রাসায় চার শিক্ষার্থীকে নির্মমভাবে পেটানো হয়। এই ঘটনায় নাম আসা শিক্ষকেও কারাগারে পাঠানো হয়। গত ১০ আগস্ট ঝালকাঠি সদর উপজেলার একটি মাদ্রাসায় ১০ ছাত্রকে বেত্রাঘাত করেন এক শিক্ষক।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালে সারাদেশে এক হাজার ৭৪১টি শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে৷ এরমধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের হাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১২৫টি শিশু৷ এইসব ঘটনায় মোট মামলা হয়েছে মাত্র আটটি৷ এই সময়ে শিক্ষকদের দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে ১৪ জন শিক্ষার্থী৷ ছেলে শিশুরাও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে৷
বাংলাদেশের আইনে ছাত্রদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেয়া দণ্ডনীয় অপরাধ৷ ২০১১ সালে হাইকোর্টের এক আদেশের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি বন্ধে নীতিমালা প্রণয়ন করে৷ আর তাতে শারীরিক ও মানসিক শাস্তির সংজ্ঞাও দেয়া হয়েছে৷
শারীরিক শাস্তি বলতে যেকোনো ধরনের দৈহিক আঘাত বলা হয়েছে৷ মারধর ছাড়াও আইনে কান ধরা, চুল টানা, বেঞ্চের নিচে মাথা রাখতে বাধ্য করাও দৈহিক শাস্তি৷ আর মানসিক শাস্তির মধ্যে শিশু বা তার পরিবারকে উদ্দেশ্য করে বাজে মন্তব্য বা যেকেনো আপত্তিকর অঙ্গভঙ্গি৷
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই দুই ধরনের শাস্তি দেয়াকেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলেছে৷ যাদের বিরুদ্ধে এই অপরাধ প্রমাণ হবে তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে৷ একই সঙ্গে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে৷
কিন্তু এরপরও বাংলাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শাস্তি দেয়ার প্রবণতা বেশ লক্ষ্য করা যায়৷ বিশেষ করে মাদ্রাসায় এটা প্রকট৷
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভিন্ন সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে জানা যাচ্ছে, মাদ্রাসাগুলোতে প্রায়ই মারধর ও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। আর এদের বেশির ভাগই সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশ থেকে আসা। সাধারণ শিক্ষার ব্যয় বহন করতে না পেরে অনেক অভিভাবকই সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠিয়ে থাকেন। আবার ধর্মীয় চেতনা থেকেও শিক্ষার্থীদের মাদ্রাসায় পাঠানো হয়। তাই সমস্যাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করার আগেই।
এসডব্লিউ/এমএন/কেএইচ/১৪৪১
আপনার মতামত জানানঃ