Trial Run

নিরীহ তক্ষক যে কারণে অপরাধের উৎস

ছবি: উইকিপিডিয়া।

বিপন্ন প্রাণী তক্ষক ধরে হুজুগের বশে পাচার করার ঘটনা বেড়েছে আর একে কেন্দ্র করে বাড়ছে অপরাধ। তক্ষক পাচারের বিরোধের জের ধরে খুনের ঘটনাও ঘটেছে। আবার তক্ষক পাচার ও ব্যবসার অন্তরালে জাল টাকা ও মাদক ব্যবসার সিন্ডিকেটও গড়ে উঠেছে। এদিকে তক্ষক পাচার ঘিরে অপরাধ বাড়লেও চক্রের হোতারা অধরাই থেকে যাচ্ছে। মূল সিন্ডিকেটের কাছে পৌঁছাতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, আইনি ঝামেলায় পড়ার ভয়ে প্রতারিত ব্যক্তিরা অভিযোগ না করায় আড়ালে থেকে যায় প্রতারক চক্রের হোতারা। যদিও তক্ষকের কোনো আর্থিক মূল্য নেই বলে জানিয়েছেন প্রাণী বিশেষজ্ঞরা।

তক্ষক এক ধরনের গিরগিটি। এর সারা শরীরে থাকে লাল ও সাদাটে ধূসর ফোঁটা। তক্ষকের ডাক চড়া, স্পষ্ট ও অনেক দূর থেকে শোনা যায়। কক্‌কক্‌ আওয়াজ দিয়ে ডাক শুরু হয়, অতঃপর ‘তক্‌-ক্কা’ ডাকে কয়েক বার ও স্পষ্টস্বরে। ডাকের জন্যই তার এমন নাম। তক্ষক দক্ষিণ এশিয়ায় বিপর্যস্ত ও বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী। এশিয়ান প্রাচীন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ও আধুনিক চিকিৎসাায় হাঁপানি, এইডস, ক্যান্সারের ওষুধ তৈরিতে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। কার্যত এ ঔষধিগুণের কোনো প্রমাণ মেলে না। তা সত্ত্বেও ব্যাপক হারে তক্ষকের বিলুপ্তি ও শিকার চলছে।

তক্ষক নিয়ে প্রচলিত গুজব হলো ক্যানসারের মূল্যবান ওষুধ তৈরি হয় এই প্রাণী থেকে। কিন্তু কী ওষুধ কিংবা কোন দেশে এসব ওষুধ তৈরি হয় তা নিয়ে কেউই কিছু জানে না। তারপরও তক্ষক নিয়ে সারা দেশের মতো চট্টগ্রামেও চলছে প্রতারণা। সর্বশেষ ২৪ নভেম্বর ২০২০, মঙ্গলবার কর্ণফুলী থানার মইজ্জ্যারটেক থেকে বিরল প্রজাতির দুটি তক্ষকসহ মনিরুল হক (৬৫) নামে একজনকে আটক করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দেলোয়ার হোসেন (৫০) নামে আরও একজনকে আটক করা হয়। ১০ হাজার টাকা জরিমানার পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) কর্ণফুলী জোনের সহকারী কমিশনার ইয়াসির আরাফাত গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আটক মনিরুল তক্ষক নিয়ে বান্দরবান থেকে ঢাকায় যাচ্ছিলেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন। তিনি মূলত বাহক। পৌঁছে দেওয়ার কাজটি করেন। আমরা এর ব্যাকওয়ার্ড ফরোয়ার্ড লিংকে কারা আছে এসব তথ্য খোঁজার চেষ্টা করছি। চক্রটিকে গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে।’

পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, প্রায় এক দশক ধরে তিন পার্বত্য জেলা এবং কয়েকটি উপজেলার পাহাড়ি গহিন অঞ্চলে তক্ষক বেচাকেনার ঘটনায় খুন অপহরণের ঘটনা হরহামেশা ঘটলেও প্রতারিতরা ঝামেলার ভয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগও করেন না।

গত ১৯ নভেম্বর ফটিকছড়ির ভুজপুর থানার বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী বাগানবাজার ইউনিয়নের নুরপুর গ্রামের একটি পাহাড় থেকে এনজিও কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিনের (৩৭) লাশ উদ্ধার করে পিবিআই। চাঁদপুরের বাসিন্দা হেলাল এক বছর আগে কম দামে তক্ষক কিনতে এসে নিখোঁজ হয়েছিলেন। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) চট্টগ্রাম জেলার সুপার নাজমুল হোসেন বলেন, ‘৫০ ফুট মাটির গর্ত খুঁড়ে হেলাল উদ্দিনের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। তক্ষকের দাম নিয়ে বনিবনা না হওয়ায় তাকে হত্যা করে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের নুরপুরে গর্ত করে সেখানে লাশ ফেলে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে এ ঘটনায় গ্রেপ্তার বিল্লাল ও জাকির হোসেন নামে দুজন। এসব অপরাধে কারা জড়িত, কারা তাদের গডফাদার তা খোঁজ নিচ্ছি।’

ফটিকছড়ির বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী রামগড়-বাগানবাজার ও হেঁয়াকোর গহিন জঙ্গলে তক্ষক পাওয়া যায়। এর কোনো আর্থিক মূল্য না থাকলেও বিভিন্ন গুজব রটিয়ে একটি চক্র তক্ষক কিনতে আসা লোকজনকে ওই পাহাড়ে এনে জিম্মি করে টাকা আদায় করে। ফটিকছড়ির বাগানবাজার ইউপি চেয়ারম্যান রুস্তম আলী বলেন, ‘তক্ষকের দাম কোটি টাকা বলে তথ্য দিয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে কিছু লোকজন। তাদের সঙ্গে জড়িত আছে ইয়াবা কারবারিরা। আমরা স্থানীয় থানাকে এ বিষয়ে জানিয়েছি। বিভিন্ন জায়গার লোক আসে এ পাহাড়ে। তাদের মুক্তিপণ দাবি করে খুন করে। মূলত তক্ষক নিয়ে এসব অপকর্ম চলছে। কেউ থানায় মামলা না করায় ঘটনা ঘটলেও কেউ জানে না।’

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং বন্যপ্রাণী গবেষক ড. কামরুল হাসান বলেন, ‘এর দু’রকম কারণ রয়েছে। আমি কয়েকদিন আগে ভারতে সরীসৃপ প্রাণীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত একটি কর্মশালায় যোগদান করেছিলাম। ওরাও সমস্যার মধ্যে রয়েছে। প্রায়ই তাদেরও বিভিন্ন জায়গা থেকে তক্ষক ধরা পড়ে। এগুলোর মূল হোতা হচ্ছে চায়না। চায়নাতে ওরা যেটা করে তাহলো এক. মেডিশনাল কাজে ব্যবহার করে এবং দুই. বিপন্ন প্রাণীদের সংরক্ষণ ও প্রজনন। অর্থাৎ ভারত, বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের বিপন্ন বন্যপ্রাণীগুলোকে টাকার বিনিময়ে ধরে নিয়ে যায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘মনে করেন কোনো প্রজাতি পৃথিবীব্যাপী মহাবিপন্ন হয়ে পড়লো। আর সেগুলোর খবর যখন পত্র-পত্রিকা, গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয় তখন ওরা ওই প্রাণীটাকে টার্গেট করে সংগ্রহ করে তাদের প্রজননকেন্দ্রে নিয়ে রাখে। এর উদ্দেশ্যই হলো যখন আমাদের এ অঞ্চল থেকে এই প্রাণীগুলো চিরতরে হারিয়ে যাবে তখন ওরা সেগুলো উচ্চমূল্যে আবার বিক্রি করতে পারবে। এটা শুধু তক্ষকের ক্ষেত্রেই না। অন্য বিরল প্রাণীর ক্ষেত্রেও।’

উদাহরণ টেনে ড. কামরুল হাসান বলেন, ‘যেমন ধরেন- প্যাঙ্গোলিন (বনরুই)। এটি পৃথিবীব্যাপী মহাবিপন্ন প্রাণী। চায়না এই প্যাঙ্গোলিনগুলো আফ্রিকা, ভারতসহ আমাদের দেশ থেকে সমানে অবৈধভাবে সংগ্রহ করছে। আমাদের দেশ থেকে প্যাঙ্গোলিন যখন চিরতরে শেষ হয়ে যাবে তখন ওরা তাদের কাছে পাঁচগুণ-দশগুণ দামে বিক্রি করবে। এটা চায়নার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।’

তক্ষকের ওষুধি গুণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এর মেডিশনাল ভ্যালু (ওষুধি গুণাগুণ) তেমন নেই, কিন্তু আমাদের দেশ বা ইন্ডিয়াতেও একটা ‘রিউমার’ (গুজব) আছে যে, একেকটা তক্ষক কোটি টাকা। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউই কোনো তক্ষক পাচার করে কোটি টাকা তো অনেক দূরের কথা, লাখ টাকাও পায়নি। কেউ লাখ টাকায় তক্ষক বিক্রি করছে এমন কাউকেও আজ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি। এটা গ্রুপের মাধ্যমে মিথ্যা গুজব ছাড়ানো হয়। বর্তমানে এটা কমে আসছে। কিছুদিন আগেও এটা বেশি পরিমাণে ছিল।’

অন্যদিকে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার কিউরেটর ডা. শাহাদাত হোসেন শুভ বলেন, ‘তক্ষক বেচাকেনা নিয়ে যেসব হচ্ছে তা গুজব। কেউ তক্ষক পাচার কিংবা বিক্রি করে কোটি টাকা পেয়েছে তা বলতে পারবে না। শুধু হাতবদল আর কোটি টাকার স্বপ্নই চলছে। কারণ তক্ষকের তো কোনো ঔষধি গুণাগুণ নেই যে এটি কেউ কিনবে। এই প্রাণী দিয়ে ক্যানসার তো দূরের কথা কোনো রোগেরই ওষুধ তৈরি হয় না। তক্ষক নিয়ে ওষুধ তৈরির কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও নেই।’

তক্ষক ধরে কোটিপতি হওয়ার স্বপ্নে ভাসছেন কিছু সংখ্যক মানুষ। বিশেষ করে চট্টগ্রামের পাহাড়ি উপজেলা ফটিকছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবন, খাগড়াছড়ি পর্যন্ত তক্ষক বেচাকেনার নেশায় প্রতিনিয়ত ছুটছে সেই মানুষগুলো। সেই দলে সাধারণ লোক থেকে শুরু করে প্রভাবশালী মানুষসহ সম্পৃক্ত রয়েছে এ পেশায়। লোকচক্ষুর আড়ালে সেখানে যেমন আছে কোটি কোটি টাকা হারানোর মর্মান্তিক গল্প, তেমনি গহীন জঙ্গলে তক্ষক কিনতে যাওয়া লোককে অপহরণ কিংবা খুনের ঘটনাও ঘটে প্রায়ই।

পার্বত্য তিন জেলার বনাঞ্চল থেকেই বেশিরভাগ তক্ষক ধরা হয়ে থাকে। ফলে পাহাড়ি জেলা ও উপজেলাগুলোতে অনেকদিন ধরেই সক্রিয় তক্ষক পাচারকারীরা। সেখানে বিভিন্ন এলাকায় তক্ষক পাচারকারীরা স্থানীয়দের কোটি টাকার লোভ দেখায়। তাদের বলা হয়, একেকটি তক্ষকের মূল্য কোটি টাকা। এভাবে দেশের বাইরে পাচার এবং পাচারকারীদের হাতে থাকা অবস্থায় মারা যাওয়ায় পাঁচ হাজারেরও বেশি তক্ষক হারিয়ে গেছে। অথচ বন্য প্রাণী আইন ২০১২ এর ৩২ ধারা মতে তক্ষকজাতীয় প্রাণী ধরা ও পাচার করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

মিই/

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 8
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    8
    Shares