Trial Run

করোনায় নেপালের করুণ অবস্থা, টিকার জন্য যুক্তরাজ্যের কাছে কাতর আর্জি

ছবি: ডিডব্লিউ

দক্ষিণ এশিয়ায় করোনা মহামারির তাণ্ডবে বিপর্যস্ত ভারতের নিকটতম-প্রতিবেশি নেপালেও বিরাজ করছে চরম নাজেহাল পরিস্থিতি। ক্রমবর্ধমান কোভিডে আক্রান্ত অসংখ্য মানুষের জন্যে নেপালে শুধু অক্সিজেন নয়, আকাল দেখা দিয়েছে পর্যাপ্ত সিলিন্ডারেরও।

চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেই ব্যাপক করোনা সংক্রমণের কারণে মানবিক বিপর্যয়ের পদধ্বনি শুনতে পাওয়া যাচ্ছে নেপালে। পরিস্থিতি এতটুকুই নাজুক হয়েছে যে, হিমালয়ের মাউন্ট এভারেস্ট অভিযাত্রীদের কাছে নেপাল সরকারের অনুরোধ, ‘অক্সিজেনের ফাঁকা পাত্রগুলো ফেলে আসবেন না। নেমে আসার সময় দয়া করে সেগুলো ফিরিয়ে আনুন।’

নেপাল করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলা করছে। প্রথম ঢেউয়ের চেয়ে দ্বিতীয় ঢেউ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে সেখানে। দেশটিতে করোনার প্রথম ঢেউ যখন সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছেছিল, তখন দৈনিক সংক্রমণ ছিল প্রায় ৬ হাজার। গত বছরের অক্টোবরে এই চিত্র দেখা দিয়েছিল নেপালে। অক্টোবরের শেষে সেখানে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার। মোট মৃত্যু ছিল ১ হাজার ৩০০–এর বেশি।

এরপর থেকে নেপালে করোনার দৈনিক সংক্রমণ ও মৃত্যু কয়েক গুণ বেড়েছে। গত ১১ মে দেশটিতে সর্বোচ্চ সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এদিন সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল ৯ হাজারের বেশি। আর সর্বোচ্চ মৃত্যু ছিল ১৯ মে। সেদিন মারা যান ২৪৬ জন।

করোনার সার্বক্ষণিক তথ্য সরবরাহকারী ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডোমিটারসের তথ্য অনুসারে, দেশটিতে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত মোট সংক্রমণ ছিল ৫ লাখ ৭৬ হাজারের বেশি। এ পর্যন্ত মারা গেছেন সাড়ে ৭ হাজারের বেশি মানুষ। আর সুস্থ হয়েছেন ৪ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি রোগী।

যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে যে হিসাব দেওয়া হচ্ছে তার থেকে প্রকৃত সংক্রমণ ও মৃত্যু বেশি। এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, প্রতিদিন যে পরিমাণ নমুনা পরীক্ষা প্রয়োজন সেই পরিমাণ পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। আর কয়েক সপ্তাহ ধরে নেপালে সংক্রমণের হার ৪০ শতাংশের ওপরে।

নেপালের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলার জন্য নেপালের প্রস্তুতি ছিল না। করোনার প্রথম ঢেউ যখন আঘাত হানে তখন প্রায় ১০ লাখ প্রবাসী শ্রমিক দেশে ফিরেছিলেন। ওই শ্রমিকদের করোনা পরীক্ষা ও কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করেছিল সরকার। কিন্তু এবার তা করতে দেরি হয়ে গেছে। এর জন্য গণমাধ্যমটি দেশটির বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে দায়ী করেছে।

সম্প্রতি নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি পার্লামেন্টে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট বিদ্যা দেবী ভান্ডারি। বিশ্লেষকেরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে করোনা সংশ্লিষ্ট অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্রতিবেশী দেশ ভারতের মতো নেপালও হাসপাতালে শয্যা সংকট এবং অক্সিজেন সংকটে ভুগছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী কাঠমন্ডুর করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও দেশটির গ্রাম এলাকায় এখন ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়াচ্ছে।

অক্সিজেনের সংকট প্রসঙ্গে নেপালের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সমীর কুমার অধিকারী যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম সিএনবিসিকে বলেন, ‘আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংকটের মুখে পড়েছে। অক্সিজেনের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। রয়েছে টিকার সংকটও।’

বিবিসি জানিয়েছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতেও নেপালে দৈনিক সংক্রমণের সংখ্যা ছিল ১০০-এর আশেপাশে। কিন্তু মে মাসের শুরুতে এই সংখ্যা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯ হাজারে। অবস্থা বেগতিক দেখে এপ্রিল মাসে দেশে লকডাউন জারি করা হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত প্রয়োজনের সময়ের তুলনায় অনেক দেরিতে নেওয়া হয়েছিল।

এছাড়া ভারতের সঙ্গে নেপালের সীমান্ত এখনও খোলা রয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, সীমান্ত বন্ধ করতে ব্যর্থ হওয়ার করণে ভারতে শনাক্ত করোনার অতি সংক্রামক ধরনটি নেপালে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।

করোনায় নেপালের স্বাস্থ্যব্যবস্থা যেমন ভেঙে পড়েছে, তেমনি ভেঙে পড়েছে অর্থনৈতিক অবস্থাও। কারণ, দেশটির অন্যতম আয়ের উৎস পর্যটন খাত একেবারে ভেঙে পড়েছে। নেপালের সঙ্গে বিভিন্ন দেশ ফ্লাইট বন্ধ করে দিয়েছে।

হিমালয়ান টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, ফ্লাইট বন্ধ থাকায় পর্যটকেরা নেপালে যেতে পারছেন না। উল্টো যেসব পর্বতারোহীরা দেশটিতে গিয়েছেন, সেখান থেকে ফিরতে গিয়ে তারা বিপাকে পড়ছেন।

করোনা টিকার জন্য যুক্তরাজ্যের কাছে আর্জি

মহামারি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে টিকা পাঠাতে যুক্তরাজ্যের কাছে কাতর আর্জি জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি’র কাছে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের কাছে টিকা পাঠানোর এই অনুরোধ জানান তিনি।

বিবিসি’র সঙ্গে সাক্ষাৎকারে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রক্ষা করাটা যুক্তরাজ্যের দায়িত্ব। তিনি বলেন, নেপালের গোর্খা সৈন্যরা যুক্তরাজ্যকে যে সেবা দিয়েছে, সেকথা স্মরণ করে হলেও যুক্তরাজ্যের করোনা সহায়তা পাওয়া দেশের তালিকায় নেপালের নাম ওপরের দিকেই রাখা উচিত বরিস জনসন সরকারের।

কে পি শর্মা ওলি বলেন, ‘আমি যুক্তরাজ্যের সরকারকে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনকে নেপালের চলমান পরিস্থিতির দিকে একটু তাকাতে বলবো। মহামারির মধ্যে আমরা কিভাবে ভুগছি সেটা দেখতে বলবো।’

করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবিলায় হিমালয়ের কোলে অবস্থিত এই দেশটি এখন পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে ২৬০টি ভেন্টিলেটর এবং ২ হাজার পিপিই-সহ বেশ কিছু চিকিৎসা সরঞ্জাম সহায়তা হিসেবে পেয়েছে। কিন্তু ভাইরাস মোকাবিলায় টিকাও প্রয়োজন বলে উল্লেখ করছেন প্রধানমন্ত্রী ওলি।

তিনি আরও বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গোর্খারা যুক্তরাজ্যের সেবা দিয়েছে। এছাড়া যুক্তরাজ্যে বর্তমানে কাজ করছেন এমন অনেকের পরিবারও নেপালে রয়েছে।’

এসময় তিনি যুক্তরাজ্যকে নেপালের ‘সবচেয়ে পুরোনো বন্ধু’ বলেও অভিহিত করেন।

ওলি বলছেন, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডমিনিক রাবের সঙ্গে টিকা ইস্যুতে কথা বলেছেন। তবে তিনি সরাসরি বরিস জনসনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করতে চান। যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ায় ৭০ লাখ টিকা পাঠাবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। এর একাংশ নেপালেও পাঠানো হবে।

নেপালের জনসংখ্যা প্রায় তিন কোটি। কিন্তু এখন পর্যন্ত ৩ শতাংশেরও কম নাগরিককে টিকা দিতে সক্ষম হয়েছে দেশটি।

ওলি বলেছেন, ‘যদি আমরা জনগণকে টিকা দিতে পারি, তাহলে করোনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারব। তা না হলে পরিস্থিতি আমাদের জন্য কঠিন হয়ে যাবে।’

নেপাল সরকার চীন থেকে টিকা আনার নির্দেশ দিয়েছে। তবে নেপালে যারা অ্যাস্ট্রাজেনেকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন, তারা আর দ্বিতীয় ডোজ পাচ্ছেন না। ভারত থেকে প্রতিশ্রুতি অনুসারে টিকা পেতে দেরি হওয়ার কারণে দেশটিতে এই সংকট দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ওলি নেপালের পুরোনো বন্ধু যুক্তরাজ্যের কাছে টিকা চেয়েছেন।

নেপাল সেনাবাহিনীকে সুরক্ষা সামগ্রী দিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

নেপাল সেনাবাহিনীর অনুরোধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জরুরি চিকিৎসা ও সুরক্ষা সামগ্রী উপহার হিসাবে দিয়েছে। বিমান বাহিনী ঘাঁটি বঙ্গবন্ধু, ঢাকাতে বৃহস্পতিবার সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ভারপ্রাপ্ত সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এসএম শফিউদ্দিন আহমেদ নেপালের রাষ্ট্রদূত ডা. বানসিধর মিশরাকে এসব সামগ্রী হস্তান্তর করেন।

এসব সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে- বিভিন্ন প্রকারের জরুরি ওষুধ, পিপিই সেট, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সার্জিক্যাল মাস্ক, ডিসপোজেবল ক্যাপ, এক্সামিনেশন গ্লাভস ইত্যাদি। সেনাবাহিনীর এ সহায়তা নেপাল সেনাবাহিনীকে কোভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহায়তা করবে।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে।

ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে নেপালে একজনের মৃত্যু

ব্ল্যাক ফাঙ্গাস নামে পরিচিত মিউকরমাইকোসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে নেপালে প্রথম কোনও ব্যক্তির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নেপালের সেতি প্রাদেশিক হাসপাতালের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।

মৃত ব্যক্তি একজন ৬৫ বছর বয়সী পুরুষ। টেম্পোরাল লোব এনসেফালাইটিস ধরার পড়ার পর তাকে হাসপাতালের ইনটেন্সিভ কেয়ার ইউনিটে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছিল।

সেতি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ‘ন্যাসাল সোয়াবে ছত্রাকের হাইফা এবং বায়োপসি পরীক্ষায় নাক ও ঠোঁটে মিউকর পাওয়ার পর তিনি ৩ জুন (বৃহস্পতিবার) মারা যান।’

তবে ওই ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন না বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কৃষ্ণ প্রসাদ পৌদেল বলেছেন, নেপালে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে অন্তত ১০ জনের আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

মিউকরমাইকোসিস বা ব্ল্যাক ফাঙ্গাস প্রাণঘাতী এক রোগ। আক্রান্ত রোগীকে বাঁচাতে অনেক সময় রোগীর চোখ, নাক বা চোয়াল অপসারণ করতে বাধ্য হন চিকিৎসকরা, যেন রোগটি মস্তিষ্কে না পৌঁছায়। এই রোগে মৃত্যুহার ৫০ শতাংশ।

ভারতে হাজার হাজার মানুষ ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আক্রান্ত হচ্ছেন। দিল্লিতে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসকে মহামারি ঘোষণা করা হয়েছে। ভারতে লাখ লাখ করোনা রোগীদের সুস্থ করতে স্টেরয়েড প্রয়োগের কারণে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এসডব্লিউ/এমএন/কেএইচ/১৫২৫ 


State watch সকল পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, যেটি পাঠকদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। যে কোন পরিমাণের সহযোগিতা, সেটি ছোট বা বড় হোক, আপনাদের প্রতিটি সহযোগিতা আমাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় অবদান রাখতে পারে। তাই State watch-কে সহযোগিতার অনুরোধ জানাচ্ছি। 

ছড়িয়ে দিনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আপনার মতামত জানানঃ