Trial Run

টিকটকের ফাঁদে ফেলে তরুণীদের ভারতে পাচার, ফিরে আসা তরুণী দিলেন ভয়ঙ্কর তথ্য

ছবি: সংগৃহীত

টিকটক ভিডিও তৈরির ফাঁদে ফেলে তরুণীদের ভারতে পাচার করা হচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশি তরুণীকে যৌন নির্যাতনের ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার পর ভারতে নারী পাচার হওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে। ভারতে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের সে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার রাতে হাতিরঝিল থানায় পাঁচজনকে আসামি করে মানব পাচার ও পর্নোগ্রাফি আইনে মামলা করেছেন তরুণীটির বাবা। তিনি মামলায় বলেছেন, তার মেয়েকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর কথা বলে ভারতে নিয়ে যান রিফাদুল ইসলাম ওরফে টিকটক হৃদয় (২৬)।

সেই আলোচিত ঘটনার পর এবার আরেকজন কিশোরী পালিয়ে এসে নিজেই হাতিরঝিল থানায় মামলাটি করেছেন। ২০১২ সালের মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলাটি করা হয়। গতকাল রাত সাড়ে ১০টায় সাতক্ষীরা জেলার সীমান্তবর্তী দাবকপাড়া কালিয়ানী এলাকা থেকে ভুক্তভোগীকে ভারতে পাচারের সঙ্গে জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে নারী পাচারের কাজে ব্যবহৃত দুটি মোটরসাইকেল, একটি ডায়েরি, চারটি মোবাইল ফোন ও একটি ভারতীয় সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে।

এ মামলার ১২ আসামীর মধ্যে গ্রেপ্তার তিনজনসহ মোট পাঁচজন বাংলাদেশে অবস্থান করছেন বলে প্রাথমিকভাবে জেনেছে পুলিশ। বাকিরা ভারত থেকে নিয়ন্ত্রণ করতেন।

নারী পাচারকারী চক্রের ৩ সদস্য গ্রেপ্তার

সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী দাবকপাড়া কালিয়ানী এলাকা থেকে ভারতে নারী পাচারকারী চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। আজ বুধবার সকালে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. শহিদুল্লাহ এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘গতকাল রাত সাড়ে ১০টার দিকে পাচারে জড়িত তিন জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরা হলেন— মেহেদী হাসান বাবু, মহিউদ্দিন ও আব্দুল কাদের। এ সময় পাচারের ব্যবহৃত দুটি মোটরসাইকেল, একটি ডায়েরি, চারটি মোবাইল ফোন ও একটি ভারতীয় সিম কার্ড পাওয়া গেছে।’

শহিদুল্লাহ বলেন, ‘হৃদয় বাবুর মামলা তদন্ত করতে গিয়ে আমরা পাচারের শিকার আরেক নারীর সন্ধান পেয়েছি। তিনি ভারতে পাচারের পরে তিন মাস বন্দিদশায় ছিলেন। সেখানে থেকে পালিয়ে আসেন। গতকাল তিনি হাতিরঝিল থানায় মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ এর ৭, ৮, ১০ ও ১১ ধারায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলা নম্বর ৩। ওই মামলার এজাহারনামীয় ১২ আসামির মধ্যে পাঁচ জন বাংলাদেশে অবস্থান করছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। ইতোমধ্যে তিন জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

হাজারের বেশি নারীকে ভারতে পাচার করেছেন মেহেদি

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে মেহেদি হাসান বাবু (৩৫) এক হাজারের বেশি নারীকে ভারতে পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছেন তেজগাঁও বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. শহিদুল্লাহ।

তিনি বলেন ‘মেহেদী হাসান বাবু মামলার বাদীসহ এক হাজারের বেশি নারীকে পাচারে জড়িত বলে স্বীকার করেছেন। তিনি প্রায় আট বছর ধরে মানব পাচারে জড়িত। তার কাছ পাওয়া মোবাইল ও ডায়েরিতে হৃদয় বাবু, সাগর, সবুজ, ডালিম ও রুবেলের ভারতীয় মোবাইল নম্বর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া, পাচারের শিকার ও পাচারে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে। অন্য দুই আসামি মহিউদ্দিন ও আব্দুল কাদের পাঁচ শতাধিক নারীকে ভারতীয় দালালের হাতে তুলে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।’

৫০০ নারীকে ভারতে পাচার করেছে ‘বস রাফি’

র‍্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, ভারতে নারী পাচার চক্রের মূল হোতা আশরাফুল ইসলাম ওরফে বস রাফি আট বছর ধরে ভারতে যাতায়াত করতেন। আর পাঁচ বছর ধরে ভারতে নারী পাচার করে আসছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদে আশরাফুল ইসলাম স্বীকার করেন, তিনি গত পাঁচ বছরে পাঁচ শতাধিক নারীকে বিভিন্নভাবে ভারতে পাচার করেছেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা এ ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। প্রতারণার ফাঁদ পেতে তরুণীদের পাশের দেশ ভারতে পাচার করত এই চক্র। দেশি-বিদেশি ৫০ জন সংঘবদ্ধভাবে এই চক্রের সঙ্গে জড়িত।

র‍্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, আশরাফুল আলমের সহযোগী টিকটক হৃদয় বাবু অনলাইনে সোশ্যাল মিডিয়ায় তরুণীদের মাধ্যমে একটি গ্রুপ তৈরি করেন। তরুণীদের মডেল বানানোর প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে তাদের প্রথমে আকর্ষণ করা হতো। পরে তাদের বিভিন্ন সুপার মার্কেট ও পাশের দেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে আশরাফুলের সহযোগিতায় বিদেশে পাচার করত ওই গ্রুপ।

যেভাবে পাচার করা হয় পালিয়ে আসা তরুণীকে

ডিসি মো. শহিদুল্লাহ বলেন, পাচার হওয়া ভুক্তভোগীর সঙ্গে আসামী টিকটক হৃদয়ের পরিচয় ২০১৯ সালে হাতিরঝিলের মধুবাগ ব্রিজে। টিকটক ‘তারকা’ বানাতে চেয়ে বা ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তরুণীটিকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করে হৃদয় বাবু।

এরপর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জের অ্যাডভেঞ্চার ল্যান্ড পার্কে ৭০ থেকে ৮০ জনকে নিয়ে ‘টিকটক হ্যাংআউট’ করেন হৃদয়। এরপর একই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের আফরিন গার্ডেন রিসোর্টে ৭০০ থেকে ৮০০ তরুণ-তরুণীকে নিয়ে ‘পুল পার্টির’ আয়োজন করে হৃদয়।

অবশেষে ২০২১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ায় বাউল লালন শাহের মাজারে আয়োজিত টিকটক হ্যাংআউটে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে আন্তর্জাতিকভাবে সক্রিয় এ মানব পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে বলে জানিয়েছেন তেঁজগাওয়ের উপকমিশনার।

পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, ভারতে পাচারের পর ভুক্তভোগীকে বেঙ্গালুরুর আনন্দপুর এলাকায় কয়েকটি বাসায় পর্যায়ক্রমে রাখা হয়। পালিয়ে আসা তরুণীটি এ চক্র কর্তৃক পাচার করা আরও কয়েকজন বাংলাদেশি ভুক্তভোগীকে সেখানে দেখতে পান। তাদের সুপারমার্কেট, সুপারশপ ও বিউটি পারলারে ভালো বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করা হয়েছে।

অবশেষে ভারতে পাচারের ৭৭ দিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল ভিডিওর ঘটনার ভুক্তভোগীর সহযোগীতায় আস্তানা থেকে এ তরুণী পালিয়ে আসেন বলে জানিয়েছেন ডিসি মো. শহিদুল্লাহ।

এই তরুণীর সঙ্গে আর কোনো কিশোরী পালাতে পেরেছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি পালিয়ে আসা কিশোরীদের সংখ্যা জানার জন্য। তাদের পরিচয় নিশ্চিত হতে পারলে এবং যোগাযোগ পুরোপুরি স্থাপন করতে পারলে আপনাদের জানাব।’

পাচার হওয়া তরুণী দেশে ফিরে জানালেন ‘ভয়ঙ্কর’ সব তথ্য

ভারতে গণধর্ষণের শিকার বাংলাদেশি তরুণীর দেশে ফিরে এসে মানবপাচার আইনে মামলা করেছেন।  তিনি ভয়ঙ্কর সব তথ্যও দিয়েছেন পাচারকারী ও নিপীড়কদের সম্পর্কে।

তরুণী জানান, টিকটকের মাধ্যমে পরিচয়। অতঃপর টিকটক স্টার বানানোর কথা বলে মগবাজার এলাকার এক তরুণীকে ভারতে পাচার করে দেয়া হয়। সেখানে ধারাবাহিক শারীরিক ও বিকৃত যৌন নির্যাতনের শিকার ওই তরুণী কৌশলে ৭৭ দিন পর দেশে পালিয়ে আসেন।

ওই তরুণী জানান, সেখানে অবস্থান করার সময় তিনি আরও অনেক বাংলাদেশি তরুণীকে দেখেছেন। যারা বিভিন্ন সময়ে এই চক্রের মাধ্যমে পাচার হয়েছেন।

ওই তরুণীর বরাত দিয়ে মঙ্গলবার সকালে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. শহিদুল্লাহ বলেন, ব্যাঙ্গালুরুতে পৌঁছানোর কয়েকদিন পরই ওই ভুক্তভোগী তরুণীকে চেন্নাইয়ের অয়ো (Oyo) হোটেলে ১০ দিনের জন্য পাঠানো হয়। সেখানে অমানবিক শারীরিক ও বিকৃত যৌন নির্যাতন করা হয় তাকে। সেখানে সামান্যতম দয়া কিংবা করুণা দেখায়নি চক্রের সদস্যরা।

কৌশলে নেশা জাতীয় দ্রব্য খাইয়ে কিংবা জোরপূর্বক বিবস্ত্র ভিডিও ধারণ করে পরিবারের সদস্য বা পরিচিতদের পাঠিয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে জিম্মি করে রাখা হয়েছিল এই ভুক্তভোগী তরুণীকে। পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ার পর থেকে পালিয়ে দেশে ফেরা ওই কিশোরীর করা মামলার এজাহারে ও তদন্তে উঠে এসেছে লোমহর্ষক বর্ণনা, যা করুণ কাহিনী কল্পনাকেও হার মানিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে নির্যাতিত ওই তরুণীর সহায়তায় ভারতে পাচার হওয়া তিনজন দেশে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। যাদের একজন ভারতে পাচারের ৭৭ দিন পর দেশে ফিরেছেন, তিনিই হাতিরঝিল থানায় মামলাটি দায়ের করেন। বাকি দুইজন ভারতফেরত ভুক্তভোগীর নাম-ঠিকানা জেনে যোগাযোগের চেষ্টা করছে পুলিশ।

মামলায় আসামি ১২ পাচারকারী

মামলায় উল্লেখিত চক্রে জড়িত ১২ জনের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশে অবস্থান করছে। এদের মধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যতম হোতা টিকটক হৃদয় ও এই গ্রেপ্তার তিনজন একই চক্রের সদস্য। বাকি সাতজন ভারতীয় বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে।

ডিসি শহিদুল্লাহ বলেন, মঙ্গলবার (১ জুন) রাতে সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী দাবকপাড়া কালিয়ানী এলাকা থেকে পাচারে জড়িত দেশীয় ওই তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে থেকে পাচারের কাজে ব্যবহৃত ২টি মোটরসাইকেল, একটি ডায়েরি, চারটি মোবাইল ও একটি ভারতীয় সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে।

নজরদারিতে টিকটকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গ্রুপ

ডিসি শহীদুল্লাহ বলেন, টিকটকের কার্যক্রম শুরুর পর থেকে এই পাচারকেন্দ্রিক অপচেষ্টা শুরু হয়েছে। উঠতি বয়সী কিশোরী তরুণীদেরকে মডেল বা স্টার বানানোর প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলে পাচার করছে একটি চক্র। এজন্য আমরা টিকটককে নেগেটিভলি দেখছি। টিকটককেন্দ্রিক অপচেষ্টা বন্ধে আমরা জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসব।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে ডিসি বলেন, পাচারের শিকার ও পাচারকারীরা অবৈধভাবে ভারতে যায়। তাদের কাছে ভিসা-পাসপোর্ট বা কোনো ধরনের বৈধ কাগজপত্র থাকে না। এরপর চক্রের ভারতীয়দের সহায়তায় সে দেশের আধার কার্ডের ব্যবস্থা করা হয়। যে কার্ড ব্যবহার করে তারা ভারতে মুভমেন্ট করে থাকেন।

পাচারকারী চক্রে কতজন জড়িত জানতে চাইলে ডিসি আরও বলেন, তদন্তের এ পর্যায়ে আমরা অনেকের নাম পেয়েছি। তদন্তের আরেকটু পর সংখ্যাটি নিশ্চিত হয়ে বলতে পারবো। প্রথমে নির্যাতিত ভিডিও ভাইরালের ঘটনায় আমরা নিখিল নামে একজন ভারতীয়কে সে দেশের পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তারের তথ্য পেয়েছি।

এসডব্লিউ/এমএন/কেএইচ/১৬৫৯ 


State watch সকল পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, যেটি পাঠকদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। যে কোন পরিমাণের সহযোগিতা, সেটি ছোট বা বড় হোক, আপনাদের প্রতিটি সহযোগিতা আমাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় অবদান রাখতে পারে। তাই State watch-কে সহযোগিতার অনুরোধ জানাচ্ছি। 

ছড়িয়ে দিনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আপনার মতামত জানানঃ