Trial Run

১,৭০০ ফিলিস্তিনিকে গ্রেফতার-নির্যাতন ইসরায়েলের, মদদ দিচ্ছে খোদ ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট!

ছবি: সংগৃহীত

ইসরায়েলের দখলদারিত্ব অবসানে প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের আশ্বাস আর ইসরায়েল বিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলে গ্রেফতার, নির্যাতনের দ্বিমুখী নীতিতে ক্ষুব্ধ ফিলিস্তিনিরা। আর তাই ইসরায়েলের গাজায় যুদ্ধবিরতির পরও নতুন সংকটের মুখে ফিলিস্তিনিরা। একদিকে ইসরায়েল বিরোধী বিক্ষোভের কারণে ধরপাকড় চালাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। একই কারণে নিজ নাগরিকদের ওপর আটক অভিযান চালাচ্ছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। এর পেছনে হামাসের সাথে আব্বাসের সরকারের দ্বন্দ্বের হাত কতটা আছে, সেটা ভেবে দেখার বিষয়। অন্যদিকে, জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ায় ইউরোপের চার দেশের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে ফিলিস্তিন। সব মিলিয়ে, জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে পরিস্থিতি। 

ইসরায়েলের দখলদারির জেরে ফিলিস্তিন এখন মূলত দু’ভাগে বিভক্ত। যার একটি মিসর সীমান্তে ও ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলবর্তী ভূখণ্ড গাজা উপত্যকা। যার নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিরোধ গোষ্ঠী হামাস। আরেকটি জর্ডান নদীর পাড়ের ওয়েস্ট ব্যাংক বা পশ্চিম তীর। প্যালেস্টাইনিয়ান অথোরিটি বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ নামে (পিএ) যার শাসন করছে মাহমুদ আব্বাসের সরকার। এই পশ্চিম তীরেই নিজ সরকার দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে ফিলিস্তিনিরা।

ইসরায়েলের ধরপাকড় 

যুদ্ধবিরতি অনেকটা খালি কথায় চিঁড়ে ভেজানোর মতো। কারণ ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে ফিলিস্তিনে গণগ্রেফতার চালাচ্ছে দখলদার ইসরায়েল। দুই সপ্তাহে কমপক্ষে এক হাজার ৭০০ ফিলিস্তিনিকে গ্রেফতার করেছে ইসরায়েলের পুলিশ। 

সোমবারও ফিলিস্তিনের উত্তরাঞ্চলীয় দুই শহর আরারা ও আরা থেকে অজ্ঞাত সংখ্যক যুবককে বিনাকারণে ধরে নিয়ে গেছে ইসরায়েলি পুলিশ। এদের অনেকেরই ইসরায়েলের নাগরিকত্বও রয়েছে। পাশাপাশি এদিন ইসরায়েলের সীমান্তবর্তী ফিলিস্তিনের কাফের কান্না শহর থেকেও ছয় যুবককে গ্রেফতার করে ইসরায়েলি পুলিশ।

হঠাৎ করে ইসরায়েল কেন এই গণগ্রেফতারের মিশনে নেমেছেন, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ফিলিস্তিনিরা। ধারণা করা হচ্ছে, অবৈধ ইহুদি বসতির নিরাপত্তার জন্য গোপন কোনো মিশনে নেমেছে ইসরায়েল।

সূত্র মতে, গত ২৪ মে থেকে ইসরায়েলি বাহিনী ফিলিস্তিনে এই ধরপাকড় শুরু করে। প্রতিদিন কমপক্ষে শতাধিক ফিলিস্তিনিকে তারা গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। যদিও এদের মধ্যে ৩০০ জনের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে তা কতটা সত্য, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।

প্রসঙ্গত, অধিকৃত পূর্ব-জেরুজালেমের শেখ জাররাহ মহল্লার অধিবাসীদের ইসরায়েলের পরিকল্পিত উচ্ছেদ অভিযানকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় আগ্রাসন শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। নারী ও শিশুসহ হত্যা করে দুই শতাধিক ফিলিস্তিনিকে এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ-প্রতিবাদে নামে ফিলিস্তিনিরা। 

এর মধ্যে প্রায় ১১ দিনের ভয়াবহ তাণ্ডবের পর গাজার নিয়ন্ত্রক হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর কয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও থেমে নেই ইসরায়েলি বাহিনী। ঘোষণা দিয়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর ধরপাকড় চালাচ্ছে।

মাহমুদ আব্বাসের দ্বিমুখী নীতি 

পশ্চিম তীরে বেছে বেছে ইতোমধ্যে কয়েক ডজন বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ। প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস সরকারের এমন দ্বিমুখী নীতিতে বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ ফিলিস্তিনি জনগণ।

ফিলিস্তিনিদের ভূমি দখল করে গড়ে উঠেছে ইসরায়েল। বছরের পর বছর ধরে এই দখলদারি চালিয়ে যাচ্ছে জায়নবাদী দেশটি। প্রতিবাদ করলেই নিরীহ-নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালায়। পাখির মতো গুলি করে হত্যা করে। আটক করে। মামলা দেয়। জেলে ভরে। প্রায় ৭০ বছর ধরে হত্যাযজ্ঞ, সীমাহীন নির্যাতন ও নিপীড়নের সহজ শিকার ফিলিস্তিনিরা। 

কিন্তু এবার তারা সম্পূর্ণ নতুন সংকটের মুখোমুখি। গ্রেফতার ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছে নিজ সরকার ও প্রশাসনের হাতেই। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রাস্তায় নামতে দিচ্ছে না মাহমুদ আব্বাসের প্রশাসন। নামলেই আটক করছে, নির্যাতন চালাচ্ছে।

এক প্রতিবেদনে মিডিল ইস্ট আই জানিয়েছে, ঠিক ইসরায়েলি বাহিনীর মতোই পশ্চিম তীরে নিজ নাগরিকদের বিশেষ করে ইসরায়েল বিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর গ্রেফতার অভিযান চালাচ্ছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ)। এই গ্রেফতার অভিযান সবচেয়ে বেশি চালানো হয় গত ২২ মে। ওইদিনই হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। 

রামাল্লাভিত্তিক একটি অধিকার সংস্থার রিপোর্ট মতে, বিক্ষোভে অংশগ্রহণ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইসরায়েল বিরোধী পোস্ট দেয়ায় এখন পর্যন্ত কয়েক ডজন ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়েছে। 

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের এই আটক অভিযানের সর্বশেষ শিকার তারেক আল-খুদাইরি। পশ্চিম তীরের রামাল্লা শহরে পরিবারের সঙ্গে বাস করেন ২৩ বছর বয়সি এই যুবক। ইসরায়েল বিরোধী বিক্ষোভে নিয়মিত উপস্থিতির কারণে বেশ পরিচিত তিনি। ২২ মে যুদ্ধবিরতির মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই তাকে আটক করা হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার মুখে চারদিন পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। 

ইসরায়েল বিরোধী বিক্ষোভের কারণে যে তিনি আটক হতে পারেন এটা যেন তার বিশ্বাস ও ধারণার বাইরে ছিল। মুক্তির পর আলজাজিরায় এক সাক্ষাৎকারে সেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন খুদাইরি।

হামাসের হুঁশিয়ারি 

গাজা সফররত মিসরের একটি প্রতিনিধিদলকে সোমবার গাজা উপত্যকার প্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ার জানিয়েছেন, ২০০৭ সাল থেকে এই পর্যন্ত ইহুদিবাদী ইসরায়েল গাজার ওপর যে অবরোধ দিয়ে রেখেছে তা খুব শিগগিরই ভেঙে পড়বে। সূত্র ফিলিস্তিনের বার্তা সংস্থা মা’আন জানিয়েছে। 

মিসরীয় প্রতিনিধিদলকে ইয়াহিয়া সিনওয়ার আরো বলেন, সাম্প্রতিক গাজা যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক মতামত সম্পূর্ণভাবে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে এবং ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে হামাস সব উপায় ব্যবহার করবে।

প্রসঙ্গত, ২০০৬ সালে ফিলিস্তিনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হামাস ক্ষমতায় এলে ক্ষুব্ধ হয়ে ইহুদিবাদী ইসরায়েল গাজা উপত্যকার ওপর সর্বাত্মক অবরোধ আরোপ করে। এর ফলে গাজার জনগণ বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রয়েছে এবং তাদের জীবনযাত্রার মান একেবারেই নেমে গেছে।

ইউরোপের বিরোধিতা

জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ায় ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, চেক রিপাবলিক ও বুলগেরিয়ার রাষ্ট্রদূতকে তলব করে। খবর আনাদোলুর।

পাকিস্তানসহ কয়েকটি মুসলিম দেশের আহ্বানে সম্প্রতি গাজায় নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর ইসরায়েলের বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল জরুরি বৈঠক ডাকে।

বৈঠকে নির্লজ্জভাবে দখলদার ইসরায়েলের পক্ষে ও ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে ভোট দেয় এবং মানবাধিকার নিয়ে গলাবাজি করে ইউরোপের এই চার দেশ। এ কারণে ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র সচিব আমল জাদৌ এই দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতকে তলব করেন।

আমল জাদৌ বলেন, ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে তাদের এ ভোট মানেই ইসরায়েলের দখলদারিত্ব, জবর দখল, নৃশংসতা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও হত্যাযজ্ঞকে সমর্থন করা।

এ ছাড়া ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিয়াদ আল-মালিকি ওই চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠি পাঠিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এ ঘটনার ব্যাখ্যা চেয়েছেন।

এসডব্লিউ/এমএন/এসএস/১৪৫৮ 


State watch সকল পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, যেটি পাঠকদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। যে কোন পরিমাণের সহযোগিতা, সেটি ছোট বা বড় হোক, আপনাদের প্রতিটি সহযোগিতা আমাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় অবদান রাখতে পারে। তাই State watch-কে সহযোগিতার অনুরোধ জানাচ্ছি। 

ছড়িয়ে দিনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আপনার মতামত জানানঃ