Trial Run

গরিবের ইফতার আয়োজন করে আ’লীগ নেতার হাতে ‘মার খেলেন’ স্বেচ্ছাসেবক

ছবি: সংগৃহীত

করোনাভাইরাসের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় সরকার ২১ তারিখ পর্যন্ত লকডাউন ঘোষণা করেছে।  রোজায় লকডাউন নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনে নিয়ে এসেছে চরম দুর্ভোগ। করোনা ভাইরাস আক্রান্ত হয়েও মৃত্যু হতে পারে, আবার না খেতে পেয়েও মৃত্যু হতে পারে— দুই দিকেই মৃত্যুর ভয় আছে। এক মৃত্যু রুখতে গিয়ে ঘরে বসে থাকলে তাতেও মৃত্যু হতে পারে। একইসাথে চলছে রমজান মাস।  কী করবে এখন নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষেরা? চারদিকে যখন এই প্রশ্ন, তখন তাদের সহায়তা এগিয়ে আসার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে আহ্বান জানিয়ে আসছে।

ক্ষুধার্ত ও রোজাদার মানুষের জন্যই পটুয়াখালী জেলা শহরের সার্কিট হাউজ থেকে সোনালী ব্যাংক মোড় পর্যন্ত সড়কটি ইফতারের আগে সাজানো থাকে সারি সারি প্যাকেট ও পানির বোতলে। এগুলো বহন করে নিয়ে যাওয়া জন্য পাশেই রাখা থাকে একটি ছোট ব্যাগ। রোজার শুরু থেকে প্রতিদিন ইফতারের আগে এ দৃশ্য দেখা যায় সড়কটিতে।

রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া রোজাদাররা যে যার মতো করে একটি প্যাকেট নিয়ে চলে যান। ইতোমধ্যে এই দৃশ্যটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

মূলত পটুয়াখালীতে অসহায়, দরিদ্র কিংবা স্বল্পআয়ের দিনমজুরদের জন্য এমন ব্যতিক্রমী ইফতারের আয়োজন করছে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘পটুয়াখালীবাসী’। এই সংগঠনের মাত্র ছয়জন সদস্য কয়েকদিন ধরে এই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।

এবার শোনা গেলো রমযান মাসে নিম্নআয়ের মানুষদের জন্যে ইফতারের আয়োজন করে মারধরের শিকার হয়েছেন এক স্বেচ্ছাসেবক। মাহমুদুল হাসান রায়হান নামের এই স্বেচ্ছাসেবককে পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মারধর করেছেন অভিযোগ উঠেছে, যদিও আওয়ামী লীগের ওই নেতা বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

‘পটুয়াখালীবাসী’র আহ্বায়ক মাহমুদুল হাসান রায়হান অভিযোগ করেছেন, মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ইফতারের আগে সার্কিট হাউজ মোড়ে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি কাজী আলমগীর তাকে মারধর করেছেন।

রায়হানের অভিযোগ, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি কাজী আলমগীর ও চার-পাঁচটি মোটরসাইকেলে করে তার সহযোগীরা সেখানে আসেন। সার্কিট হাউজের সামনে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এসে আমাকে থাপ্পড় মারেন। আমাকে এবং ভলান্টিয়ারদের ভয় দেখিয়ে সরিয়ে দেন সেখান থেকে।

তিনি বলেন, প্রথমে তারা এসে বলে- তুই কী হয়ে গেছস? তোকে ফান্ড দেয় কে? তোমরা প্রোগ্রাম করো আমাদের জানাইছ? আমি ইফতারের আয়োজন করি বলে জানালে, তারা আমাকে প্রোগ্রাম করতে নিষেধ করে চলে যায়। তিনি বলেন, এর পাঁচ মিনিট পর তারা আবার ঘুরে আসে। এসে কোনো কথা ছাড়াই মারধর শুরু করে। লাঠিসোটা ছিল না। হাত দিয়েই মারে। শুধু আমাকেই মারে।

রায়হান জানান, আজকের ইফতার আয়োজনে টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সুলতান মৃধার মেয়ে শিল্পী। পটুয়াখালীর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মানস চন্দ্র দাসও তিন দিন এ ইফতার আয়োজনে টাকা দিয়ে সহায়তা করেছেন। আগামীকাল ৫০ জনের ইফতার আয়োজন করার কথা ছিল একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার দেওয়া টাকায়।

মাহমুদুল হাসান রায়হান পটুয়াখালী সরকারি কলেজ থেকে অ্যাকাউন্টিংয়ে মাস্টার্স করেছেন। চাকরির পাশাপাশি যুক্ত আছেন এ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে।

এদিকে, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি কাজী আলমগীর অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, রায়হানের সঙ্গে সাবেক এক শিবির কর্মীর সখ্য রয়েছে। সার্কিট হাউজের সামনে ইফতার আয়োজনে জহিরুল নামের ওই শিবিরকর্মীর সংশ্লিষ্টতার খবর পেয়ে সেখানে যান তিনি।

তিনি বলেন, তার ওপর হামলার কোনো ঘটনা ঘটেনি। রায়হানকে বলেছি- খারাপ ছেলেদের যেন প্রশ্রয় না দেয়।

পটুয়াখালীর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মানস চন্দ্র দাস বলেন, ‘আমি তিন দিন তাদের পাশে ছিলাম। উদ্যোগটা ভালো লেগেছে বলে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি।’

হামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। খবর নিচ্ছি।’

এদিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনা ও লকডাউনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন দিনমজুর, শ্রমিক ও নিম্নবিত্ত জনগণ। বিশেষ করে যারা শহর ও শহরের উপকণ্ঠে থাকেন। এ পরিস্থিতিতে অনানুষ্ঠানিক খাতের লোকজন রিকশাচালক, পরিবহনকর্মী, হকার, দিনমজুর, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, কামার, কুমোর, জেলে, দর্জি, বিভিন্ন ধরনের মিস্ত্রি, নির্মাণ শ্রমিকসহ দৈনন্দিন আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষ কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন না। কাজ থেকে দূরে থাকতে হচ্ছে ভ্যানচালক, ঠেলাগাড়িচালক, রংমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, তালা-চাবির মিস্ত্রি, সাইকেল-ভ্যান, রিকশা ও মোটর গ্যারেজের কর্মীদেরও। মোবাইল রিচার্জের ব্যবসায়ী, ফুল বিক্রেতা, দোকানের কর্মচারী, ফুটপাতের ব্যবসায়ীরাও আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। মিষ্টির দোকান ও বেকারি বন্ধ থাকায় গ্রামে দুধ ব্যবসায়ীরা দুধ কিনছেন না। এতে যারা গাভি পালন করেন, তারা ও ব্যবসায়ী উভয়েই সমস্যায় পড়েছেন। মুদ্রণ ও প্রকাশনা খাতের কর্মীরা বেকার বসে আছেন আগে থেকেই। শহরের বস্তিবাসী- যারা বাসাবাড়ি, নির্মাণ খাতসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে দিনমজুরের কাজ করেন, হকারি করেন এবং রাস্তার পাশে অস্থায়ী দোকান করেন- তারাও বেকার এখন। সামগ্রিকভাবে কৃষি, শিল্প ও সেবা সব খাতেই নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর লকডাউনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আয় হারিয়ে কর্মহীন বসে থাকার ফলে এ ধরনের মানুষের খাদ্য সংকট ছাড়াও স্বাস্থ্য ও মানসিক পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতিরও আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের তরফ থেকে নিম্ন আয়ের মানুষের সহায়তার জন্য ঘোষণা দিলেও এখনো বাস্তবায়ণ হয়নি। পূর্বের কার্যক্রমেও চলছে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি। গত লকডাউনে নিম্ন আয়ের মানুষের সহায়তার জন্য সরকারের দেওয়া অধিকাংশ ত্রাণ সামগ্রিই লুটে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও স্থানীয় মন্ত্রী চেয়ারম্যানদের বিরুদ্ধে। এবার স্বপ্রণোদিত হয়ে কিছু যুবক গরিবদের খাদ্যের ব্যবস্থা করায় ক্ষমতাসীনদের হাতে মারধরের শিকার হলো। তারা গরিবদের সহযোগিতায় না এগিয়ে আসছে, না সরকারি সহায়তায় সুষ্ঠু বণ্টন করছে, না করছে গরিবদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসা উদ্যোক্তাদের।

এরই মধ্যে কয়েকজন মন্ত্রী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সরকার লকডাউনে দরিদ্র মানুষের সহায়তায় বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। তবে কবে কখন কীভাবে এসব সহায়তা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি সরকারের পক্ষ থেকে। মন্ত্রীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সোয়া কোটি পরিবারকে ১০ কেজি চাল, এক কেজি করে ডাল, তেল, লবণ ও চার কেজি আলু দেওয়া হবে। ৩৬ লাখ পরিবারকে নগদ আড়াই হাজার টাকা করে দেবে সরকার। এক লাখ কৃষককে পাঁচ হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা দেওয়া হবে। এ ছাড়া বাড়ানো হয়েছে খোলা বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি। চালু করা হচ্ছে বিশেষ ওএমএস। দেশব্যাপী ৭৫ হাজার টন চাল ১০ টাকা দরে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে খাদ্য অধিদপ্তর। টিসিবির মাধ্যমেও বিক্রি বাড়ানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের কর্মসূচি দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে সরকারের এ কার্যক্রম পর্যাপ্ত নয়। কারণ, সরকারের সহযোগিতা পাচ্ছে কিছু মানুষ, যারা আগে থেকেই বিভিন্নভাবে সরকারের কাছে দরিদ্র ও দুস্থ হিসেবে নিবন্ধিত। কিন্তু যাদের সংকটাপন্ন পরিস্থিতির তথ্য সরকারের কাছে নেই, তাদের সহায়তা পাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। গত বছরের সাধারণ ছুটির সময় দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠী বেড়েছে। তাদের কারও কারও অবস্থার উন্নতি ঘটলেও নতুন করে লকডাউনের ফলে অনেকেই ফের দরিদ্রের তালিকায় ফিরে গেছেন। এ ধরনের মানুষের জন্য সরকারের সহায়তা আরও বাড়ানো দরকার, বিশেষ করে তাদের নগদ টাকা দেওয়া দরকার।

এসডব্লিউ/এমএন/কেএইচ/১৪০০ 


-State watch সকল পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, যেটি পাঠকদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। যে কোন পরিমাণের সহযোগিতা, সেটি ছোট বা বড় হোক, আপনাদের প্রতিটি সহযোগিতা আমাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় অবদান রাখতে পারে। তাই State watch-কে সহযোগিতার অনুরোধ জানাচ্ছি। 

ছড়িয়ে দিনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আপনার মতামত জানানঃ