
সমৃদ্ধ দেশে বাস করলেই ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যায় না। রাষ্ট্রের সামগ্রিক সম্পদ আর একজন তরুণের সামনে থাকা সুযোগ এক জিনিস নয়। পড়াশোনার পরিবেশ, বাসস্থানের ব্যয়, কাজের সম্ভাবনা এবং নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার—এসব দিয়েই ভবিষ্যতের নিরাপত্তা অনুভূত হয়।
জার্মানিতে আজ, ৩১ অক্টোবর, ‘Gen Z regelt’ উদ্যোগের বিক্ষোভকে এই ব্যবধানের আলোয় পড়া যায়। নামটির ভাবার্থ, ‘জেন জি এবার দায়িত্ব নিচ্ছে’। কিন্তু এই নাম পুরো একটি প্রজন্মের অভিন্ন মত বোঝায় না। এটি নির্দিষ্ট আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীদের একটি রাজনৈতিক উদ্যোগ।
রয়টার্স জানিয়েছে, দেশজুড়ে কয়েক দশ হাজার মানুষ বিক্ষোভে যোগ দিয়েছে; আয়োজকেরা ৩৪টি শহরে কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছিল। তবে কিছু প্রধান শহরে পুলিশ ও আয়োজকদের উপস্থিতির হিসাবে বড় ব্যবধান ছিল। ফলে পূর্বঘোষিত সম্ভাব্য অংশগ্রহণকে বাস্তব উপস্থিতি হিসেবে লেখা ঠিক হবে না।
সংখ্যার বাইরেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে: তরুণদের এই ক্ষোভ কী নিয়ে, কে তা প্রতিনিধিত্ব করছে এবং রাজপথের আওয়াজ নীতিগত পরিবর্তনে পৌঁছাবে কীভাবে?
শিক্ষা ও জীবনযাত্রা কেন একই দাবিতে
আয়োজকদের প্রকাশিত অবস্থান উদ্ধৃত করে জার্মান সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দাবির মধ্যে রয়েছে শিক্ষায় বিনিয়োগ, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, সাশ্রয়ী জীবন ও জলবায়ু সুরক্ষা। সম্ভাব্য বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার বিরোধিতাও কর্মসূচির অংশ।
দাবিগুলো বিচ্ছিন্ন মনে হতে পারে। কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর জীবনে এগুলো একে অপরকে প্রভাবিত করে। ভালো শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ থাকলেও বাসস্থানের ব্যয় সামলাতে বেশি কাজ করতে হলে পড়াশোনার সময় কমতে পারে। ভবিষ্যতের চাকরি নিয়ে উদ্বেগ থাকলে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ বা উচ্চশিক্ষায় যাওয়ার সিদ্ধান্তও কঠিন হয়।
এগুলো প্রতিটি বিক্ষোভকারীর যাচাই করা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার তালিকা নয়; দাবিগুলোর মধ্যে সম্পর্ক বোঝার বিশ্লেষণ। আন্দোলনের রাজনৈতিক শক্তি তৈরি হতে পারে এই সম্পর্ক পরিষ্কার করতে পারলে।
একটি দেশ ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ জনবল চাইলে শিক্ষাকে কেবল ব্যয়ের খাত হিসেবে দেখলে চলে না। একইভাবে তরুণদের দায়িত্বশীল নাগরিক হতে বলার সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের মত শোনার ব্যবস্থাও থাকতে হয়।
বিক্ষোভের কেন্দ্রে তাই শুধু ‘আরও অর্থ চাই’ নেই। রাষ্ট্র কোন প্রয়োজনকে আগে রাখবে এবং সেই অগ্রাধিকার নির্ধারণে কারা কথা বলবে, সেই প্রশ্নও আছে।
সামরিক সেবা: স্লোগান ও বর্তমান আইনের পার্থক্য
বিক্ষোভের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামরিক সেবা। কিন্তু ‘বাধ্যতামূলক নিয়োগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ’ শুনে ধরে নেওয়া যাবে না যে জার্মানিতে সব তরুণকে ইতিমধ্যে বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক চাকরিতে নেওয়া হচ্ছে।
ফেডারেল সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নতুন সামরিক সেবা আইন ১ জানুয়ারি ২০২৬ কার্যকর হয়েছে। সামরিক সেবা স্বেচ্ছাভিত্তিক হলেও নিবন্ধন ও প্রশ্নপত্রসংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা রয়েছে; পুরুষদের প্রশ্নপত্রের উত্তর দেওয়া বাধ্যতামূলক। প্রয়োজনভিত্তিক বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা চালুর জন্য আবার সংসদীয় আইনপ্রণয়ন প্রক্রিয়া প্রয়োজন। সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয় না।
সরকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতার যুক্তি দিচ্ছে। অন্যদিকে প্রতিবাদকারীদের একাংশের প্রশ্ন, ভবিষ্যতের সামরিক প্রয়োজন পূরণের দায়িত্ব তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন ও পছন্দকে কতটা প্রভাবিত করবে।
এখানে শুধু প্রতিরক্ষা বনাম শিক্ষা—এমন সরল দ্বন্দ্ব যথেষ্ট নয়। কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং ভালো শিক্ষা দুটোই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বিতর্কটি হওয়া উচিত ব্যয়, প্রয়োজন, ন্যায্যতা ও নাগরিক স্বাধীনতার ভারসাম্য নিয়ে।
তরুণদের কাছে রাষ্ট্র যদি দায়িত্ব প্রত্যাশা করে, তবে সেই দায়িত্ব কেন, কার ওপর কতটা এবং কোন গণতান্ত্রিক সম্মতিতে চাপছে—তারও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
একটি প্রজন্ম, কিন্তু একটিমাত্র কণ্ঠ নয়
আন্দোলনের নামেই প্রতিনিধিত্বের বড় দাবি আছে। অথচ একই বয়সের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থান, রাজনৈতিক মত বা সামরিক সেবা সম্পর্কে ধারণা এক নয়। ‘জেন জি’ একটি পরিচিত প্রজন্মগত নাম; সেটি নিজে রাজনৈতিক ঐকমত্য নয়।
জার্মানির জাতীয় স্কুলশিক্ষার্থী প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন Bundesschüler*innenkonferenz বা BSK এই কর্মসূচি থেকে দূরত্ব রেখেছে। তাদের নিজস্ব বিবৃতিতে অস্পষ্ট সাংগঠনিক কাঠামো এবং তরুণদের উদ্বেগ রাজনৈতিক ব্যবহারের শিকার হওয়ার আশঙ্কার কথা আছে। একই সঙ্গে সংগঠনটি ভালো শিক্ষা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের দাবির প্রতি সমর্থন স্পষ্ট করেছে।
এই অবস্থানকে ‘শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের বিরোধিতা করেছে’ বললেও ভুল হবে। আবার সব শিক্ষার্থী সংগঠন একত্র হয়েছে বলাও ঠিক নয়। মতভেদের বিষয় হলো নেতৃত্ব, সংগঠন, প্রতিনিধিত্ব ও কর্মপদ্ধতি।
বিক্ষোভের আয়োজকদের জন্য তাই স্বচ্ছতা জরুরি। সিদ্ধান্ত কীভাবে হয়, স্থানীয় কর্মসূচির দায় কার, সহযোগী সংগঠনগুলোর ভূমিকা কী এবং অংশগ্রহণকারীরা কীভাবে মত দিতে পারেন—এসব প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর আন্দোলনের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে পারে।
রাজনৈতিক সংগঠনের উপস্থিতি থাকলেই কোনো দাবি অযৌক্তিক হয়ে যায় না। কিন্তু রাজনৈতিক অবস্থান অস্পষ্ট রেখে সম্পূর্ণ প্রজন্মের পক্ষে কথা বলার দাবি করলে জবাবদিহির প্রশ্ন উঠবেই।
হামবুর্গ: প্রতিবাদ, প্রস্তুতি ও ঘটনার পার্থক্য
হামবুর্গে জুংফার্নশ্টিগ থেকে বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়। কর্মসূচির আগে কিছু দোকান জানালা সুরক্ষিত করেছিল এবং পুলিশ বড় প্রস্তুতি নিয়েছিল। একই দিনে হ্যালোইন থাকায় আইনশৃঙ্খলার আলাদা দায়িত্বও ছিল। তবে হামবুর্গ পুলিশ আগাম ব্যাপক সহিংসতার নিশ্চিত তথ্য থাকার কথা বলেনি; মূলত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির প্রত্যাশাই জানিয়েছিল।
এই পার্থক্য সংবাদে গুরুত্বপূর্ণ। দোকানের জানালায় কাঠ লাগানোর ছবি সম্ভাব্য ক্ষতির আশঙ্কা দেখায়; সেটি ঘটে যাওয়া হামলার প্রমাণ নয়।
অবশ্য দিনের পরের সংবাদে বিচ্ছিন্ন বিশৃঙ্খলার তথ্যও এসেছে। রয়টার্স হামবুর্গে কিছু ব্যারিকেডে আগুন দেওয়ার কথা জানিয়েছে। ZDF জানিয়েছে, কোলনে মুখ ঢেকে রাখা ও আতশবাজিজাতীয় সামগ্রী ব্যবহারের কারণে মিছিল বন্ধ করা হয়; স্টুটগার্টেও পুলিশ কর্মসূচি একাধিকবার থামায়।
এসব ঘটনা আড়াল করা উচিত নয়। কিন্তু নির্দিষ্ট শহরের নির্দিষ্ট ঘটনার দায় পুরো বিক্ষোভে অংশ নেওয়া প্রত্যেকের ওপর চাপানোও তথ্যসম্মত নয়। একইভাবে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির দাবি দিয়ে অপরাধমূলক আচরণের দায় এড়ানো যায় না।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার নিশ্চিত করা একসঙ্গে সম্ভব হওয়া দরকার। সেই কাজের মূল্যায়ন হবে নির্দিষ্ট আচরণ, পুলিশের প্রতিক্রিয়া এবং যাচাইযোগ্য ঘটনার ভিত্তিতে।
অনলাইনের আগ্রহ থেকে রাজনৈতিক সংগঠন
অনলাইন প্রচার দ্রুত পরিচিতি তৈরি করতে পারে। কিন্তু ওয়েবসাইটে অংশগ্রহণের ঘোষণা, সামাজিক মাধ্যমে প্রচার এবং বাস্তবে মিছিলে উপস্থিতি আলাদা বিষয়। দিনের পুলিশি ও আয়োজক-হিসাবের ব্যবধান এই সতর্কতার প্রয়োজন দেখিয়েছে।
সংখ্যা প্রত্যাশার চেয়ে কম হলে দাবিগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে অযৌক্তিক হয় না। আবার বড় ভিড় হলেই প্রস্তাব কার্যকর হয়ে যায় না। অংশগ্রহণ আন্দোলনের শক্তির একটি সূচক; নীতির যুক্তি, সংগঠনের স্থায়িত্ব ও জনসমর্থনের বিস্তারও গুরুত্বপূর্ণ।
এই উদ্যোগের সামনে এখন কাজ হলো বিস্তৃত ক্ষোভকে নির্দিষ্ট প্রস্তাবে রূপ দেওয়া। শিক্ষার কোন খাতে বিনিয়োগ দরকার? সাশ্রয়ী বাসস্থানের কোন ব্যবস্থা চাই? সামরিক সেবার ক্ষেত্রে কোন বাধ্যবাধকতার বিরোধিতা এবং কোন বিকল্প প্রস্তাব আছে?
জার্মানির ফেডারেল কাঠামোয় শিক্ষার বহু দায়িত্ব রাজ্যগুলোর হাতে। তাই শুধু কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশে ক্ষোভ জানালেই সব দাবি বাস্তবায়নের পথ তৈরি হবে না। সংশ্লিষ্ট স্তরের কর্তৃপক্ষ, অর্থায়ন ও সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া আলাদা করতে হবে।
প্রতিবাদের সাফল্য তখনই টেকসই হওয়ার সুযোগ পায়, যখন স্লোগান থেকে বাস্তবায়নযোগ্য দাবি এবং দাবি থেকে পরিমাপযোগ্য পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়।
তরুণ বনাম প্রবীণ—এত সরল নয়
এই বিক্ষোভকে শুধু তরুণ ও প্রবীণের সংঘাত হিসেবে দেখলে সাধারণ স্বার্থগুলো আড়ালে পড়ে। ভালো স্বাস্থ্যব্যবস্থা, কার্যকর গণপরিবহন, নিরাপদ বাসস্থান ও মানসম্মত শিক্ষা একটি বয়সগোষ্ঠীর একার প্রয়োজন নয়।
প্রশ্ন হওয়া উচিত, ব্যয় ও সুযোগ কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে। একই প্রজন্মের ভেতরেও বৈষম্য আছে। পারিবারিক সহায়তা পাওয়া শিক্ষার্থী এবং নিজের আয় দিয়ে সব খরচ চালানো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ-উদ্বেগ একই রকম নয়।
সুতরাং প্রজন্মের ভাষা মানুষকে একত্র করতে পারে, কিন্তু সমাধান তৈরিতে আয়, শ্রেণি, অঞ্চল ও সুযোগের পার্থক্যও বুঝতে হবে। তা না হলে সবচেয়ে অনিশ্চিত অবস্থায় থাকা তরুণদের প্রয়োজনই আবার অস্পষ্ট থেকে যেতে পারে।
জার্মানির আজকের বিক্ষোভ রাষ্ট্রভাঙার ঘোষণা নয়। একে তরুণদের একাংশের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ও ভবিষ্যতের ন্যায্য অংশীদারত্বের দাবি হিসেবে পড়া বেশি সংগত।
সরকারের পরীক্ষা হলো অভিযোগগুলোকে শুধু নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে না দেখে নীতিগত উত্তর দেওয়া। আয়োজকদের পরীক্ষা হলো স্বচ্ছতা, অহিংস কর্মপদ্ধতি এবং বাস্তবসম্মত দাবির মাধ্যমে আস্থা তৈরি করা।
এক দিনের সমাবেশ দিয়ে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না। কিন্তু আজকের প্রশ্নটি থেকে যায়: সমৃদ্ধির উত্তরাধিকার বহনের দায়িত্ব যাদের ওপর পড়বে, সেই তরুণেরা সমৃদ্ধির সিদ্ধান্তে কতটা অংশ নিতে পারছে?
আপনার মতামত জানানঃ