একটি সাধারণ ছবি। হয়তো ফেসবুক প্রোফাইলে দেওয়া, কিংবা কোনো অনুষ্ঠানে তোলা স্বাভাবিক একটি মুহূর্তের স্মৃতি। ছবিটি দেখে কারও মনে কোনো অস্বস্তি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সেই ছবিই যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্যে বিকৃত করে নগ্ন বা আপত্তিকর ছবিতে রূপান্তর করা হয়, তখন একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবন মুহূর্তেই হয়ে উঠতে পারে দুর্বিষহ। প্রযুক্তির এই অপব্যবহার এখন আর কেবল কাল্পনিক কোনো আশঙ্কা নয়; বাংলাদেশেও এটি ভয়ংকর সামাজিক ও ব্যক্তিগত সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে নারীদের ছবি, পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে ভুয়া যৌন ছবি ও ভিডিও। এরপর সেগুলো ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, সামাজিকভাবে হেয় করা কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
একজন ভুক্তভোগীর সকাল শুরু হয়েছিল এমনই এক আতঙ্কের মধ্য দিয়ে। ছদ্মনাম জ্যোত্স্না খাতুনের মেসেঞ্জারে পাঠানো হয় তাঁর মুখ বসানো একটি অশ্লীল ছবি। ছবিটি তাঁর নয়, এমনকি ছবিতে দেখানো ঘটনাটির সঙ্গেও তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অন্য একটি নগ্ন ছবির সঙ্গে তাঁর মুখ জুড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তির তৈরি সেই মিথ্যা ছবিই হয়ে ওঠে তাঁর জন্য ভয়াবহ মানসিক চাপের কারণ। ছবিটি পাঠানোর পর অপরিচিত ব্যক্তি তাঁকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার হুমকি দেন। টাকা না দিলে ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হবে, পাঠানো হবে আত্মীয়স্বজনের কাছেও। বাস্তবে অপরাধটি করেছেন অন্য কেউ, অথচ সম্ভাব্য সামাজিক অপমানের আশঙ্কায় ভীত হয়ে পড়েন জ্যোত্স্না।
এখানেই এআইয়ের অপব্যবহারের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি ছবি বাস্তব না হলেও তার সামাজিক প্রভাব অনেক সময় বাস্তবের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। ভুক্তভোগী জানেন, ছবিটি মিথ্যা। কিন্তু তিনি এটাও জানেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটি ছড়িয়ে পড়লে সবাই হয়তো সত্য-মিথ্যা যাচাই করবেন না। পরিচিতজন, আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী কিংবা প্রতিবেশীদের কাছে তাঁকে বারবার নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করতে হতে পারে। অপরাধী এই সামাজিক বাস্তবতাকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। অর্থাৎ এআই দিয়ে তৈরি একটি ভুয়া ছবি শুধু ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে না, এটি একজন মানুষের আত্মসম্মান, সামাজিক অবস্থান ও মানসিক নিরাপত্তাকেও আঘাত করে।
আগে ছবি বিকৃত করার জন্য বিভিন্ন সফটওয়্যার ও সম্পাদনা কৌশল ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এআই প্রযুক্তির সহজলভ্যতা অপরাধের ধরনকে আরও জটিল করে তুলেছে। এখন তুলনামূলক কম দক্ষতাতেও কারও মুখ অন্য ব্যক্তির শরীরে বসানো, কণ্ঠস্বর নকল করা, ভিডিওতে মুখ পরিবর্তন করা কিংবা সম্পূর্ণ কাল্পনিক দৃশ্য তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে অপরাধের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতা কমে এসেছে, কিন্তু অপরাধের সম্ভাব্য ক্ষতির পরিধি বেড়েছে বহুগুণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত সাধারণ একটি ছবিও কারও হাতে গিয়ে অপব্যবহারের উপকরণ হয়ে উঠতে পারে।
এই প্রবণতা শুধু সাধারণ মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, অভিনেত্রী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, এমনকি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানও এ ধরনের অপপ্রচারের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। বাংলাদেশের অভিনেত্রী পরীমনি ও মেহজাবীন চৌধুরীর ছবি ব্যবহার করে তৈরি করা আপত্তিকর এআই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা এ সংকটের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট টেলিভিশন চ্যানেল পরে দুই অভিনেত্রীর কাছে ক্ষমা চায়। মেহজাবীন চৌধুরী স্পষ্টভাবে বলেছেন, এআই ব্যবহার করে কারও নামে মিথ্যা ও বানোয়াট কনটেন্ট তৈরি করে তাঁকে হেয় করা বিনোদন নয়, বরং জঘন্য অপরাধ। পরীমনিও জানিয়েছেন, এমন ঘটনার কারণে তাঁর স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়েছে।
এ ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে, পরিচিতি বা জনপ্রিয়তা কাউকে এআইয়ের অপব্যবহার থেকে নিরাপদ রাখতে পারে না। বরং পরিচিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ভুয়া ছবি ও ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ তাঁদের নিয়ে মানুষের আগ্রহ বেশি থাকায় যাচাই না করেই অনেকে কনটেন্ট শেয়ার করেন। এর ফলে মিথ্যা তথ্য ও বিকৃত দৃশ্য অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ভুক্তভোগীর পক্ষে তখন প্রতিটি দর্শকের কাছে গিয়ে সত্য ব্যাখ্যা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন তৈরিতেও এআই এখন বিপজ্জনক হাতিয়ার হয়ে উঠছে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে সেনাবাহিনীর পোশাকের মতো পোশাক পরা একজন ব্যক্তির ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ভিডিওতে সরকার গঠন নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্যের মাধ্যমে জনমত চাওয়া হয়েছিল। পরে রিউমার স্ক্যানার জানায়, সেনা সদস্যের বক্তব্য হিসেবে প্রচারিত ভিডিওটি ভুয়া। একইভাবে দেবী দুর্গার প্রতিমায় সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার মুখ বসিয়ে তৈরি করা একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের কনটেন্ট শুধু ব্যক্তির সম্মানহানির উদ্দেশ্যেই তৈরি হয় না; এগুলোর মাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, সাম্প্রদায়িক বিভাজন এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরির চেষ্টাও হতে পারে।
অর্থাৎ এআইয়ের অপব্যবহার এখন ব্যক্তিগত প্রতিশোধ বা ব্ল্যাকমেইলের গণ্ডি পেরিয়ে সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি হয়ে উঠছে। একটি ভুয়া ভিডিও দিয়ে মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করা যায়, কোনো প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ভুল ধারণা ছড়ানো যায়, এমনকি রাজনৈতিক বা ধর্মীয় উত্তেজনা উসকে দেওয়া সম্ভব। প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার পার্থক্য সাধারণ মানুষের কাছে তত কঠিন হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশে এ ধরনের অপরাধের প্রকৃত চিত্র বোঝার জন্য পুলিশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার সাইবার সাপোর্ট সেন্টারের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত সেখানে মোট ১ হাজার ৯৯৭টি সাধারণ ডায়েরি বা জিডি হয়েছে। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার ও মানহানির অভিযোগ ৩৪৯টি, ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে হয়রানির অভিযোগ ১৯৮টি এবং ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ ১৬৬টি। এই পরিসংখ্যান দেখায়, ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও সম্মানহানির ঘটনা কতটা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
মাসভিত্তিক তথ্যেও সমস্যাটির ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়। জানুয়ারিতে অপপ্রচার, মানহানি, ব্ল্যাকমেইল ও ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে হয়রানির ঘটনায় ৫৮ জন অভিযোগ করেন। ফেব্রুয়ারিতে এ সংখ্যা ছিল ৫৯, মার্চে ৮১, এপ্রিলে ৮৬, মে মাসে ৯১, জুনে ৭৯, জুলাইয়ে ৭২, আগস্টে ৮৮, সেপ্টেম্বরে ৬৫ এবং ২০ অক্টোবর পর্যন্ত ৩৪ জন। সংখ্যাগুলো কেবল অভিযোগের হিসাব; প্রকৃত ভুক্তভোগীর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ সামাজিক লজ্জা, ভয়, পারিবারিক চাপ এবং আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেকে অভিযোগ জানাতেই চান না।
পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের তথ্যও একই বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ছবি ও ভিডিওভিত্তিক যৌন হয়রানির ৩৮৪টি অভিযোগ জমা পড়ে। এসব অভিযোগ নিয়ে করা গবেষণায় দেখা যায়, ১২২টি ঘটনায় নারীর মুখ অন্য নগ্ন বা যৌন ছবি কিংবা ভিডিওতে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ মোট অভিযোগের প্রায় ৩১ দশমিক ৮ শতাংশেই মুখ বসিয়ে বিকৃত ছবি বা ভিডিও তৈরির ঘটনা ছিল। উল্লেখ্য, এই গবেষণায় শুধু এআই দিয়ে তৈরি ছবি নয়, এআইসহ বিভিন্ন সম্পাদনা প্রযুক্তির অপব্যবহারের ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তবে অভিযোগের সংখ্যা যতই বাড়ুক, আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের অনীহা একটি বড় সমস্যা। সাইবার সাপোর্ট সেন্টারের সহকারী পুলিশ কমিশনার দীল আশরাফী লতিফের ভাষ্য অনুযায়ী, ৯০ শতাংশেরও বেশি অভিযোগকারী বা ভুক্তভোগী মামলা করতে চান না। তাঁদের বড় অংশের প্রধান চাওয়া থাকে, আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও যেন দ্রুত সরিয়ে ফেলা হয়। অনেকেই চান না, বিষয়টি পরিবারের বাইরে বা সামাজিক পরিসরে প্রকাশ পাক। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, পারিবারিক সম্মান এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তাঁদের আইনি পদক্ষেপ থেকে দূরে রাখে।
সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেনের তথ্যেও এ প্রবণতা স্পষ্ট। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালে তারা ৭১টি ঘটনা নথিভুক্ত করে। এর মধ্যে ২০টি ঘটনায় মামলা এবং ১৫টি ঘটনায় জিডি হয়। বাকি ৩৬টি ঘটনায় ভুক্তভোগীরা মামলা বা জিডি করতে চাননি। তাঁদের অনেকে গোপনে সমস্যার সমাধান চেয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি মেটার মাধ্যমে ১৯টি আপত্তিকর কনটেন্ট সরানোর ব্যবস্থা করেছিল। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, ভুক্তভোগীদের কাছে অনেক সময় বিচার পাওয়ার চেয়েও তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিকর কনটেন্ট সরিয়ে ফেলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কিন্তু কনটেন্ট সরিয়ে ফেললেই কি সমস্যার সমাধান হয়? বাস্তবে একবার কোনো ছবি বা ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে সেটি পুরোপুরি মুছে ফেলা অত্যন্ত কঠিন। কেউ সেটি ডাউনলোড করতে পারে, অন্য অ্যাকাউন্টে পুনরায় আপলোড করতে পারে কিংবা বিভিন্ন গ্রুপে ছড়িয়ে দিতে পারে। একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে ফেলার পরও অন্য জায়গায় একই কনটেন্ট ফিরে আসার আশঙ্কা থাকে। তাই শুধু কনটেন্ট অপসারণ নয়, অপরাধীর পরিচয় শনাক্ত করা, তথ্যপ্রমাণ সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।
এখানে আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা। ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্তের প্রয়োজনে জব্দ করা মোবাইল ফোন, কম্পিউটার ও অন্যান্য ডিজিটাল আলামত সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানোর পর অনেক ক্ষেত্রে ছয় মাসের বেশি সময় ধরে প্রতিবেদন পাওয়া যায় না। ফরেনসিক পরীক্ষার ফল ছাড়া অনেক মামলার তদন্ত শেষ করা এবং অভিযোগপত্র দাখিল করা কঠিন হয়ে পড়ে। অপরাধী শনাক্ত হলেও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পেতে দেরি হলে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়। এতে ভুক্তভোগীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয় এবং অন্যরা মামলা করতে আরও বেশি ভয় পান।
আইনের ক্ষেত্রেও কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সাইবার ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর রফিকুল ইসলামের মতে, প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে অপরাধের ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে, কিন্তু আইনের ভাষা সব সময় সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হচ্ছে না। ফলে কিছু ঘটনায় প্রচলিত আইনের প্রয়োগ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া যৌন ছবি, কণ্ঠস্বর নকল করে প্রতারণা কিংবা কারও পরিচয় ব্যবহার করে মিথ্যা বিজ্ঞাপন প্রচারের মতো অপরাধ মোকাবেলায় আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রযুক্তির অপব্যবহার যে কেবল যৌন হয়রানি বা ব্যক্তিগত মানহানিতে সীমাবদ্ধ নয়, চিকিৎসকদের ছবি ও কণ্ঠস্বর নকল করে ভুয়া ওষুধের বিজ্ঞাপন তৈরির ঘটনাও তার প্রমাণ। সম্প্রতি কয়েকজন চিকিৎসক অভিযোগ করেছেন, তাঁদের পরিচয় ব্যবহার করে এআই দিয়ে ভিডিও তৈরি করে বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ প্রতারিত হওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসকদের পেশাগত সুনামও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত ২০ আগস্ট ইউরোলজিস্ট ও কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন অধ্যাপক মো. কামরুল ইসলামের ছবি, নাম, পরিচয় ও কণ্ঠস্বর নকল করে ওষুধের বিজ্ঞাপন দেওয়ার অভিযোগে চট্টগ্রাম থেকে দুজনকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপি। এ ধরনের ঘটনা দেখায়, এআইয়ের অপব্যবহার ব্যক্তিগত সম্মানহানির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক প্রতারণার ঝুঁকিও তৈরি করছে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশেও একই ধরনের সংকট দেখা যাচ্ছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির ছবি ব্যবহার করে একাধিক ভুয়া ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় এসেছে। তিনি নিজেই ডিপফেক ও এআইয়ের বিপজ্জনক দিক সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা হলো, অনলাইনে কোনো কিছু দেখেই বিশ্বাস করা বা যাচাই না করে শেয়ার করা উচিত নয়। কারণ একজন পরিচিত ব্যক্তি নিজের পক্ষে প্রতিবাদ জানাতে পারলেও সাধারণ ভুক্তভোগীর পক্ষে তা সব সময় সম্ভব হয় না।
এ অবস্থায় প্রযুক্তিগত সমাধানের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, কোনো ব্যক্তির ছবি বা ভিডিও দেখেই তাঁকে অপরাধী কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে ধরে নেওয়া যাবে না। ছবি বা ভিডিওটি বাস্তব কি না, সেটি যাচাই করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার সামাজিক প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। কারও ছবি বিকৃত করে ছড়িয়ে দিলে অপরাধী সেই কাজ করেছে; এর দায় কোনোভাবেই ছবির মূল ব্যক্তির নয়। তৃতীয়ত, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমকে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীল অনলাইন আচরণ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
কোনো ব্যক্তি এ ধরনের ব্ল্যাকমেইলের শিকার হলে আতঙ্কিত হয়ে অর্থ পাঠানো উচিত নয়। অপরাধীর সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ বন্ধ করে হুমকির বার্তা, অ্যাকাউন্টের পরিচয়, ফোন নম্বর, লেনদেনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কনটেন্টের লিংক বা স্ক্রিনশট সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। প্রমাণ মুছে ফেলার আগে সেগুলো নিরাপদে রাখতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট ও অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে হবে এবং পুলিশের সহায়তা নিতে হবে। বাংলাদেশে ডিএমপির সাইবার সাপোর্ট সেন্টার এবং পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের মাধ্যমে অভিযোগ জানানোর সুযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীরা ডিএমপির সাইবার সাপোর্ট সেন্টারের ০১৭৩০২০২০২০ নম্বরে এবং পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের ০১৩২০০০০৮৮৮ নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন। ঢাকার বাইরের ভুক্তভোগীরাও সংশ্লিষ্ট জেলা পুলিশের সাইবার ইউনিট বা ডিবি কার্যালয়ের সহায়তা নিতে পারেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভুয়া ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে ভুক্তভোগীকে সামাজিকভাবে একঘরে না করে তাঁর পাশে দাঁড়াতে হবে। কারণ একটি বিকৃত ছবি একজন মানুষের পরিচয় নয়, একটি মিথ্যা ভিডিও তাঁর চরিত্রের প্রমাণ নয়। এআইয়ের তৈরি দৃশ্য যত বাস্তবসম্মতই হোক, সেটি সত্য হয়ে যায় না। কিন্তু সমাজ যদি যাচাই না করে সেটিকে সত্য বলে গ্রহণ করে, তাহলে প্রযুক্তির অপরাধ আরও ভয়ংকর হয়ে উঠবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের জীবনকে সহজ করার জন্য তৈরি হয়েছে। চিকিৎসা, শিক্ষা, গবেষণা, যোগাযোগ, শিল্প ও অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক অবদান ইতিমধ্যে দৃশ্যমান। কিন্তু একই প্রযুক্তি যখন কারও সম্মান নষ্ট করা, অর্থ আদায়, মিথ্যা প্রচার কিংবা সামাজিক বিভাজনের অস্ত্র হয়ে ওঠে, তখন তার নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে আসে। প্রযুক্তিকে থামিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু প্রযুক্তির নামে অপরাধকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এআইয়ের যুগে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু কোন ছবিটি আসল আর কোনটি নকল, তা শনাক্ত করা নয়; বরং সত্য যাচাইয়ের অভ্যাস, মানবিকতা এবং আইনের প্রতি আস্থা প্রতিষ্ঠা করা। অপরাধীকে শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনা, দ্রুত ফরেনসিক প্রতিবেদন নিশ্চিত করা, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা রক্ষা—সবকিছু একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। অন্যথায় প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার পরিবর্তে নতুন আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। মনে রাখতে হবে, এআই দিয়ে একটি মুখ বদলে দেওয়া সম্ভব, কিন্তু সেই মুখের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একজন মানুষের সম্মান, অনুভূতি ও জীবনকে ধ্বংস করার অধিকার কারও নেই।
আপনার মতামত জানানঃ