
একটি মন্তব্য পড়ে আপনি রেগে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর লিখলেন। পরে বললেন, যা ঠিক মনে হয়েছে, তা-ই করেছি। কিন্তু সিদ্ধান্তটির পেছনে কি শুধু আপনার বিচার ছিল? অপমানিত হওয়ার ভয়, নিজের পক্ষকে রক্ষা করার তাগিদ, পুরোনো অভিজ্ঞতা কিংবা অন্যদের অনুমোদনের আকাঙ্ক্ষাও কি কাজ করেনি?
এই দৈনন্দিন প্রশ্ন আমাদের নিয়ে যায় সপ্তদশ শতকের দার্শনিক বারুখ স্পিনোজার কাছে। তাঁর প্রশ্ন অস্বস্তিকর: নিজের ইচ্ছা সম্পর্কে সচেতন হওয়াই কি স্বাধীনতার প্রমাণ? নাকি আমরা অনেক সময় এমন কারণের ফলকে নিজের স্বাধীন সিদ্ধান্ত বলি, যার অস্তিত্বই বুঝতে পারি না?
স্পিনোজার এথিক্স-এর প্রথম ভাগের পরিশিষ্টে এই যুক্তির ভিত্তি পাওয়া যায়। মানুষ নিজের চাওয়া সম্পর্কে সচেতন, অথচ তাকে সেই চাওয়ার দিকে ঠেলে দেওয়া কারণগুলো সম্পর্কে অজ্ঞ; এই অসম্পূর্ণ জ্ঞান থেকেই নিজেকে স্বাধীন ভাবার প্রবণতা তৈরি হয়। এটি তাঁর যুক্তির বাংলা সারার্থ, সরাসরি উদ্ধৃতি নয়।
ইচ্ছা আছে, কিন্তু তা কারণহীন নয়
সাধারণভাবে স্বাধীনতা বলতে আমরা বুঝি, চাইলে অন্য কিছু করতে পারতাম। স্পিনোজা এই অভিজ্ঞতাকে প্রশ্ন করেন। কোনো ইচ্ছা শুধু ‘আমার’ বলেই কার্যকারণের নিয়ম থেকে মুক্ত হয়ে যায় না।
তাঁর দর্শনে মানুষ প্রকৃতির ভেতরের সত্তা। মানুষের শরীর, চিন্তা ও আবেগকে বুঝতেও প্রকৃতির ধারাবাহিকতার মধ্যে থাকতে হবে। এথিক্স-এর প্রথম ভাগে তিনি বলেন, ইচ্ছাকে স্বাধীন কারণ বলা যায় না; ইচ্ছাও নির্দিষ্টভাবে অস্তিত্বশীল ও সক্রিয় হওয়ার জন্য কারণের ওপর নির্ভর করে।
স্পিনোজার ‘ঈশ্বর বা প্রকৃতি’ ধারণা এই অবস্থানের ভিত্তি। তিনি জগতের বাইরে বসে মানুষের মতো খেয়ালখুশিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া কোনো সত্তার ধারণা দিয়ে পৃথিবী ব্যাখ্যা করেন না। ঈশ্বর তাঁর কাছে অসীম, স্বয়ংস্থিত বাস্তবতা; দৃশ্যমান জিনিসগুলো সেই বাস্তবতার নির্দিষ্ট প্রকাশ। এখানে ‘প্রকৃতি’ শুধু গাছপালা বা পরিবেশের নাম নয়।
এই ধারণা মেনে নিলে মানুষকে প্রকৃতির ওপর বসানো আলাদা রাজা হিসেবে দেখা যায় না। কিন্তু তাই বলে মানুষকে নিষ্ক্রিয় যন্ত্র ভাবতে হবে—এ সিদ্ধান্তও তিনি নেন না।
নিজেকে স্বাধীন ভাবা পাথর
একটি চিঠিতে স্পিনোজা চলমান পাথরের উদাহরণ দেন। বাইরের আঘাতে একটি পাথর গতি পেয়েছে। এখন কল্পনা করা যাক, পাথরটির চেতনা আছে। সে নিজের চলার চেষ্টা অনুভব করছে, কিন্তু তাকে গতিশীল করা বাইরের কারণ সম্পর্কে জানে না। সে হয়তো ভাববে, নিজের ইচ্ছাতেই চলছে।
চিঠি ৫৮-তে ব্যবহৃত এই উদাহরণের লক্ষ্য মানুষের চিন্তাকে পাথরের সঙ্গে অভিন্ন করা নয়। লক্ষ্য হলো, কোনো কাজের সচেতন অভিজ্ঞতা এবং তার প্রকৃত কারণের জ্ঞান যে এক নয়, তা দেখানো।
আজকের জীবনে একটি পণ্য কেনার উদাহরণ ধরা যায়। আমরা ভাবতে পারি, এটি আমার স্বতন্ত্র পছন্দ। কিন্তু পরিচিত মুখের ব্যবহার, বারবার দেখা বিজ্ঞাপন, সামাজিক মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা এবং অন্যদের মতো হওয়ার ইচ্ছাও পছন্দটি গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। স্পিনোজা বিজ্ঞাপনের এই উদাহরণ দেননি; তাঁর কার্যকারণভিত্তিক প্রশ্নকে বর্তমান জীবনে প্রয়োগ করলে এই অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি হয়।
সব আকাঙ্ক্ষাকে তাই ভুয়া বলতে হবে না। অনুসন্ধান করতে হবে, কোন প্রভাব কীভাবে কাজ করছে এবং আমাদের বিচার তার কতটা পরিষ্কার ধারণা রাখে।
আবেগ আমাদের শত্রু নয়
স্পিনোজাকে শুধু শীতল যুক্তির দার্শনিক ভাবলে তাঁর নীতিশাস্ত্রের বড় অংশ হারিয়ে যায়। মানুষের আকাঙ্ক্ষা দূর করে দেওয়াই তাঁর লক্ষ্য নয়। এথিক্স-এর তৃতীয় ভাগে প্রতিটি সত্তার নিজের অস্তিত্বে টিকে থাকার চেষ্টাকে তিনি গুরুত্ব দেন। এই প্রচেষ্টার নাম কোনাতুস। মানুষের সচেতন আকাঙ্ক্ষা বুঝতে ধারণাটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখে।
আনন্দ ও দুঃখও তাঁর কাছে নিছক ভালো বা খারাপ অনুভূতির তালিকা নয়। এগুলো আমাদের সক্রিয় হওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি বা হ্রাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। সেই কারণে প্রশ্ন শুধু ‘আমি কী অনুভব করছি’ নয়; অনুভূতিটি আমার বোঝার, সম্পর্ক গড়ার ও কাজ করার ক্ষমতাকে কীভাবে বদলাচ্ছে, সেটিও জরুরি।
আমরা যখন কোনো পরিস্থিতির আংশিক ছবি দেখে আবেগে চালিত হই, তখন নিজের কাজের কারণকে যথেষ্টভাবে বুঝতে পারি না। আর বোঝাপড়া বাড়লে নিজের কর্মকাণ্ডে আমাদের সক্রিয় ভূমিকা বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
ধরা যাক, সহকর্মীর নীরবতাকে আপনি অবজ্ঞা হিসেবে নিয়েছেন। পরে জানতে পারলেন, তিনি ব্যক্তিগত সংকটে আছেন। আপনার অনুভূতি বদলে যেতে পারে, কারণ ঘটনাটির ব্যাখ্যা বদলেছে। বোঝাপড়া এখানে অনুভূতির বাইরে দাঁড়িয়ে আদেশ করছে না; অনুভূতি গঠনের প্রক্রিয়াতেই পরিবর্তন আনছে।
কারণ জানা মানেই কি মুক্তি?
কারণ বোঝার গুরুত্ব আছে, কিন্তু নিজের আচরণের একটি ব্যাখ্যা পেলেই আমরা স্বাধীন হয়ে যাই না। ‘আমি এমন করেছি, কারণ রেগে গিয়েছিলাম’—এ বক্তব্য আবেগের নাম বলে; রাগের গঠন বা তার ওপর কাজ করার ক্ষমতা কতটা বোঝায়, তা আলাদা প্রশ্ন।
এথিক্স-এর চতুর্থ ভাগে স্পিনোজা মানুষের আবেগের অধীনতাকে বিশ্লেষণ করেন। তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি হলো, কোনো আবেগকে সংযত বা অপসারিত করতে তার বিপরীত ও অধিক শক্তিশালী আবেগের প্রয়োজন হয়। সত্য জানা থাকলেই তা সব প্রবল তাড়নাকে পরাস্ত করবে—এমন সরল ধারণা তিনি গ্রহণ করেন না।
এটি দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মেলে। সম্পর্ক নষ্ট হবে জেনেও কেউ তর্কে আঘাত করতে পারেন। তখন শুধু ‘শান্ত হও’ বলা যথেষ্ট নাও হতে পারে। সম্পর্ক রক্ষার আকাঙ্ক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের উপলব্ধি এবং অন্যকে বোঝার আনন্দকে কার্যকর শক্তি হতে হয়। এই উদাহরণ লেখকের ব্যাখ্যা, স্পিনোজার নিজস্ব উদাহরণ নয়।
স্বাধীনতার অনুশীলন তাই কেবল আত্মবিশ্লেষণ নয়। আমরা কাদের সঙ্গে থাকি, কোন পরিবেশে সিদ্ধান্ত নিই এবং কী ধরনের অভ্যাস গড়ে তুলি—সেগুলোও বিবেচনায় আসে। নিজের ক্ষমতা সীমিত জেনেই অধিক সহায়ক পরিস্থিতি তৈরি করা অর্থবহ হতে পারে।
প্রয়োজনীয়তার ভেতর স্বাধীনতা
স্পিনোজার দর্শনে প্রশ্ন উঠতে পারে: সবকিছুর কারণ থাকলে যুক্তি দিয়ে ভাবা বা নিজেকে বদলানোর চেষ্টা কেন?
এর উত্তর হলো, চিন্তা, শিক্ষা ও অনুশীলনও কার্যকারণের অংশ। কোনো ঘটনা কারণনির্ভর হওয়ার অর্থ এই নয় যে পরিবর্তনের চেষ্টা অকার্যকর। বরং চেষ্টা, নতুন উপলব্ধি ও সম্পর্কের পরিবর্তনই ভিন্ন ফলের কারণ হতে পারে।
এই জায়গায় কার্যকারণনির্ভরতা এবং নিষ্ক্রিয় ভাগ্যবাদকে আলাদা করা প্রয়োজন। স্পিনোজার স্বাধীনতা প্রকৃতির নিয়মের বাইরে কোনো ব্যতিক্রম নয়। মানুষ যত বেশি পর্যাপ্ত বোঝাপড়ার ভিত্তিতে কাজ করতে পারে, তত বেশি তার কর্মকাণ্ড নিজের যুক্তিসম্মত প্রকৃতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়।
এথিক্স-এর পঞ্চম ভাগে আবেগের পরিষ্কার ধারণা গঠন এবং ঘটনাকে প্রয়োজনীয়তার পরিপ্রেক্ষিতে বোঝার গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু স্বাধীন মানুষও সীমিত মানুষ; সে বাইরের সব প্রভাব থেকে মুক্ত হয় না। স্বাধীনতা তাই মানুষের জন্য অর্জনের মাত্রা ও সাধনার বিষয়।
স্পিনোজার পথ শেষ পর্যন্ত সাধারণ আত্মনিয়ন্ত্রণের পরামর্শের চেয়েও বিস্তৃত। তাঁর ‘ঈশ্বরের বুদ্ধিবৃত্তিক ভালোবাসা’ ধারণায় বাস্তবতাকে গভীরভাবে বোঝা এবং সেই উপলব্ধি থেকে আনন্দের সম্পর্ক তৈরি হয়। এটি ইচ্ছাপূরণের জন্য প্রার্থনা বা প্রকৃতিকে মানুষের মতো ভালোবাসার ধারণা নয়; তাঁর সামগ্রিক অধিবিদ্যা ও জ্ঞানতত্ত্বের অংশ।
ব্যক্তির বোঝাপড়ার সঙ্গে সমাজের স্বাধীনতা
নিজের ইচ্ছার কারণ খোঁজার কথা বললে সব দায় ব্যক্তির ওপর চাপানোর ঝুঁকি থাকে। কেউ দারিদ্র্য, ভয় বা ক্ষমতার চাপে সিদ্ধান্ত নিলে শুধু ‘নিজেকে বুঝুন’ বলা যথেষ্ট নয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাস্তব সুযোগও প্রয়োজন।
স্পিনোজার রাজনৈতিক লেখায় চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার গুরুত্ব রয়েছে। ধর্মতাত্ত্বিক-রাজনৈতিক প্রবন্ধ-এর বিশতম অধ্যায়ে তিনি রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যকে ভয়মুক্ত নিরাপদ জীবন ও স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত করেন। তবে তাঁর অবস্থানকে সব পরিস্থিতিতে সীমাহীন মতপ্রকাশের আধুনিক দাবি হিসেবে উপস্থাপন করাও সঠিক হবে না।
এখান থেকে বর্তমানের জন্য একটি প্রশ্ন তোলা যায়: যে সমাজ মানুষকে ক্রমাগত আতঙ্কিত রাখে বা প্রশ্ন করতে নিরুৎসাহিত করে, সেখানে স্বাধীন বিচার কতটা বিকশিত হতে পারে? ব্যক্তিগত বোঝাপড়া এবং সহায়ক সামাজিক পরিবেশ—দুই স্তরেই স্বাধীনতার কাজ রয়েছে।
তবে স্পিনোজার উত্তর বিতর্কের বাইরে নয়। সমস্ত ঘটনাকে প্রয়োজনীয়তার মধ্যে ব্যাখ্যা করে নৈতিক দায় কতটা বোঝানো যায়, কিংবা মানুষের অভিজ্ঞতার অনিশ্চয়তাকে তাঁর ব্যবস্থা কতটা ধারণ করে—এসব প্রশ্ন রয়ে যায়। তাঁর দর্শনকে আধুনিক বিজ্ঞান দ্বারা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত তত্ত্ব হিসেবে উপস্থাপন করারও কারণ নেই।
তবু তাঁর প্রশ্নটি শক্তিশালী। আমরা যখন বলি, ‘এটা আমার ইচ্ছা’, তখন কি শুধু আকাঙ্ক্ষার উপস্থিতি ঘোষণা করি, নাকি তার উৎপত্তি ও প্রভাবও বুঝি?
স্পিনোজা আমাদের ইচ্ছাকে অস্বীকার করতে বলেন না। তিনি তার ভেতরে তাকাতে শেখান। আমি কী চাই—এর পাশে কেন চাই, কী আমাকে চালিত করছে এবং বোঝাপড়া বাড়লে আমার কাজ কীভাবে বদলাতে পারে—এই প্রশ্নগুলো রাখতে বলেন।
নিজের ইচ্ছার কারণ জানা স্বাধীনতার নিশ্চয়তা নয়। কিন্তু কারণ সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ভাবা আমাদের অধীনতাকেই স্বাধীনতার নামে চালিয়ে দিতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ