
একজন নারী একা ভ্রমণ করতে চান। একজন তরুণ পরিবারের পছন্দের পেশায় যেতে চান না। কেউ বিয়ে করবেন না বলে ঠিক করেছেন। কেউ প্রচলিত ধর্মীয় কিংবা রাজনৈতিক বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তাঁদের সিদ্ধান্তে অন্য কারও অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে কি না, সেই আলোচনা শুরুর আগেই পরিচিত একটি রায় এসে যায়: সমাজ এসব ভালো চোখে দেখে না।
কিন্তু সমাজের অপছন্দ কি কাউকে বাধা দেওয়ার যথেষ্ট কারণ? বহু মানুষ কোনো আচরণকে ভুল মনে করলেই কি সেটি নিষিদ্ধ করা ন্যায়সংগত হয়? আর একজন মানুষ নিজের জীবন নিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কি না, যা অন্যের চোখে বোকামি?
উনিশ শতকের ব্রিটিশ দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল এই প্রশ্নগুলোকে স্বাধীনতার আলোচনার কেন্দ্রে এনেছিলেন। ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত তাঁর On Liberty বইয়ের বিষয় ছিল ইচ্ছার স্বাধীনতা নিয়ে অধিবিদ্যাগত বিতর্ক নয়; ব্যক্তি মানুষের ওপর রাষ্ট্র ও সমাজ কতটুকু ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে, তার সীমা।
মিলের উত্তরের সূচনা একটি অস্বস্তিকর উপলব্ধি থেকে: মানুষ শুধু সরকারের হাতে পরাধীন হয় না। প্রতিবেশী, পরিবার, সংখ্যাগরিষ্ঠের রুচি এবং প্রচলিত নৈতিকতার চাপও তার জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
রাষ্ট্রের বাইরেও শাসক আছে
স্বাধীনতার আলোচনা সাধারণত রাষ্ট্রকে ঘিরে চলে। সরকার কী নিষিদ্ধ করেছে, পুলিশ কাকে আটকেছে, কোন বই প্রকাশে বাধা এসেছে—এসব দৃশ্যমান। মিল দেখালেন, আইনে কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও মানুষ নিজের মতো বাঁচতে ভয় পেতে পারে।
সমাজ যখন নিজের পছন্দকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক নিয়ম বানায়, তখন তৈরি হয় সামাজিক স্বৈরতন্ত্র। এর জন্য সব সময় কারাগার দরকার হয় না। দরকার হতে পারে অবিরাম অপমান, চরিত্রের বিচার কিংবা এমন চাপ, যাতে মানুষ নিজের বিশ্বাস ও পছন্দ গোপন করতে বাধ্য হয়। এগুলো মিলের যুক্তির সমকালীন প্রয়োগ; তাঁর বইয়ে আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা ছিল না।
মিলের কাছে তাই সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন ক্ষমতার সীমাহীন অনুমতিপত্র নয়। কোনো মত জনপ্রিয় হতে পারে, অথচ অন্যায্যও হতে পারে। অধিকাংশ মানুষের জীবনযাপন একটি ধরনে চলে বলেই অন্য সবাইকে সেই ছাঁচে ঢুকতে হবে—এ দাবি স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অপছন্দ আর ক্ষতি এক বিষয় নয়
মিলের স্বাধীনতার দর্শনের কেন্দ্রে আছে ‘ক্ষতি নীতি’ বা হার্ম প্রিন্সিপল। পরিণত বিচারক্ষমতাসম্পন্ন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের ন্যায্য কারণ হতে পারে অন্যের ক্ষতি প্রতিরোধ। কেবল তাঁর নিজের মঙ্গল হবে, কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠের চোখে তিনি নৈতিকভাবে ভালো হয়ে উঠবেন—এ যুক্তি যথেষ্ট নয়।
ধরা যাক, একজন মানুষ এমন পোশাক পরছেন যা প্রতিবেশীদের পছন্দ নয়। আরেকজন অদক্ষভাবে গাড়ি চালিয়ে পথচারীর জীবন বিপন্ন করছেন। দুটো আচরণই কারও বিরক্তির কারণ হতে পারে, কিন্তু তাদের প্রকৃতি এক নয়। প্রথম ক্ষেত্রে মূল বিষয় ব্যক্তিগত রুচি; দ্বিতীয়টিতে অন্য মানুষের নিরাপত্তা।
এ উদাহরণগুলো দিয়ে মিলের যুক্তি প্রয়োগ করলে প্রশ্নটি দাঁড়ায়: আমি অস্বস্তি বোধ করছি, নাকি সত্যিই কারও অধিকার ও গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ বিপন্ন হচ্ছে? অনুভূতি তীব্র হলেই তা ক্ষতির প্রমাণ হয়ে যায় না।
তবে ‘অন্যের ক্ষতি’ কথাটি বললেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায় না। কোন স্বার্থকে সুরক্ষা দিতে হবে, ঝুঁকি কতটা বিশ্বাসযোগ্য, বিধিনিষেধে আরও বড় ক্ষতি হবে কি না—এসব বিচার প্রয়োজন। ক্ষতির আশঙ্কা হস্তক্ষেপ বিবেচনার কারণ হতে পারে; প্রতিটি ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার চূড়ান্ত যুক্তি নয়।
ভালো চাইলে জোর করা যাবে?
পরিবার ও সমাজ প্রায়ই বলে: তোমার ভালোর জন্যই করছি। মিল এই দাবিকে সরাসরি প্রশ্ন করেন। কাউকে বোঝানো, তথ্য দেওয়া, সতর্ক করা এবং তাঁর হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেওয়া ভিন্ন কাজ।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিরাপদ চাকরি ছেড়ে শিল্পচর্চা করতে চাইতে পারেন। তাঁর সিদ্ধান্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। স্বজনেরা যুক্তি দিতে পারেন, সম্ভাব্য ক্ষতি বুঝিয়ে বলতে পারেন। কিন্তু নিজের জীবন পরিচালনার অধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য শুধু তাঁদের উদ্বেগ যথেষ্ট নয়।
কারণ মানুষ নিজের আকাঙ্ক্ষা, অনুভূতি ও পরিস্থিতি সম্পর্কে এমন জ্ঞান রাখেন, যা বাইরের পর্যবেক্ষকের থাকে না। অন্যের চোখে সাফল্য বলে যা বিবেচিত হয়, সেটিই তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নাও হতে পারে।
এখানে ভুল করার সুযোগও স্বাধীনতার অংশ। প্রতিটি সিদ্ধান্ত অন্যের অনুমোদন নিয়ে নিতে হলে মানুষ বিচারক্ষমতা চর্চার সুযোগ হারায়। মিলের কাছে মানুষ তৈরি কোনো যন্ত্র নয়, যাকে নির্দিষ্ট নকশা অনুসারে চালালেই পূর্ণতা আসে। ব্যক্তিত্ব বিকশিত হয় নিজের বিচার ব্যবহার করে।
তবে তিনি শিশু এবং পরিণত বিচারক্ষমতা অর্জন না করা ব্যক্তিদের একই নীতির আওতায় রাখেননি। ফলে তাঁর যুক্তিকে বয়স, সক্ষমতা ও পরিস্থিতি নির্বিশেষে সব ধরনের সুরক্ষা বাতিলের দাবি হিসেবে পড়া ভুল।
ভিন্নভাবে বাঁচার সামাজিক মূল্য
মিল ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে শুধু ব্যক্তির সুবিধা হিসেবে দেখেননি। তাঁর মতে, ভিন্ন জীবনযাপনের পরীক্ষা সমাজকেও শেখায়। সবাই একই পেশা, একই বিশ্বাস, একই পারিবারিক পথ বেছে নিলে বিকল্পের সম্ভাবনা বোঝা কঠিন হয়।
কেউ প্রচলিত কর্মজীবনের বাইরে নতুন কিছু তৈরি করেন। কেউ প্রতিষ্ঠিত রীতিকে প্রশ্ন করে বৈষম্য সামনে আনেন। কেউ নিজের জীবন দিয়ে দেখান, সুখী হওয়ার পথ একটিই নয়। সব পরীক্ষা সফল হবে না। কিন্তু ব্যর্থতার সম্ভাবনা দেখিয়ে সব পরীক্ষা বন্ধ করলে সমাজও স্থবির হয়ে পড়ে।
এই যুক্তি মানতে হলে অন্যের পছন্দকে নিজের পছন্দ বানাতে হয় না। একজন মানুষ যে পথে বাঁচছেন, সেটি আমার কাছে আকর্ষণীয় না হলেও তাঁর স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানো সম্ভব। এখানেই সহনশীলতার সঙ্গে ব্যক্তিস্বাধীনতার গভীর সম্পর্ক।
ভুল মত শোনার দরকার কেন?
মিলের স্বাধীনতার আলোচনায় মতপ্রকাশের বিশেষ গুরুত্ব আছে। তাঁর প্রথম প্রশ্ন: আমরা যে মতকে ভুল বলে থামাতে চাইছি, সেটি সত্য হওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি বাদ দিতে পারি কি? মত দমন করার মধ্যে নিজের নির্ভুলতা সম্পর্কে একটি বিপজ্জনক নিশ্চয়তা কাজ করে।
দ্বিতীয়ত, কোনো মত পুরো সত্য না হলেও তাতে সত্যের অংশ থাকতে পারে। বিপরীত অবস্থানের সঙ্গে আলোচনা আমাদের বোঝাপড়ার সীমা সামনে আনে।
তৃতীয়ত, প্রচলিত মত সত্য হলেও তাকে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে দিতে হয়। নইলে মানুষ তার ভিত্তি বোঝার বদলে মুখস্থ বিশ্বাস আঁকড়ে থাকে। মিলের ভাষায়, সত্য তখন জীবন্ত উপলব্ধির বদলে নিষ্প্রাণ মতবাদে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
এ থেকে সব দাবির প্রমাণ সমান শক্তিশালী—এ সিদ্ধান্ত আসে না। ভুল তথ্য সংশোধন, যুক্তি খণ্ডন এবং প্রমাণ যাচাইয়ের প্রয়োজন থেকেই যায়। মিলের যুক্তি আমাদের মনে করায়, শুধু কোনো বক্তব্য অপছন্দ বলেই তার আলোচনার পথ বন্ধ করা বিপজ্জনক।
তাঁর কাছেও মতপ্রকাশ পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। শস্য ব্যবসায়ীরা দরিদ্রদের অনাহারের কারণ—এ অভিযোগ সংবাদপত্রে প্রকাশ করা এবং কোনো শস্য ব্যবসায়ীর বাড়ির সামনে উত্তেজিত জনতার কাছে তা উসকানিমূলকভাবে প্রচার করা এক বিষয় নয়। একই বক্তব্য পরিস্থিতিভেদে ক্ষতিকর কাজে প্ররোচনার ভূমিকা নিতে পারে।
আজকের অনলাইন পরিবেশে এই যুক্তি প্রয়োগ করলে বিশ্বাসের সমালোচনা ও কাউকে আক্রমণ করতে জনতাকে সংগঠিত করার পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এটি মিলের উদাহরণের সমকালীন ব্যাখ্যা; নির্দিষ্ট ঘটনার বিচার করতে বক্তব্যের বিষয়বস্তু, প্রেক্ষাপট ও ঝুঁকি আলাদা করে দেখতে হবে।
সমালোচনাও স্বাধীনতার অংশ
মিলের পক্ষে দাঁড়ানো মানে কাউকে সমালোচনা করা যাবে না—এমন নয়। ব্যক্তির স্বাধীনতা অন্যের প্রশংসা পাওয়ার অধিকার নয়। অন্যরাও আপত্তি জানাতে, পরামর্শ দিতে এবং নিজের সঙ্গ বেছে নিতে স্বাধীন।
কিন্তু সমালোচনা কখন কাউকে ক্ষতিহীন ব্যক্তিগত পছন্দ ত্যাগে বাধ্য করার সংগঠিত চাপে পরিণত হচ্ছে, সেটি দেখতে হবে। ‘আমি একমত নই’ বলা এবং ‘তুমি আমার মতো না হলে তোমার জীবন অসহনীয় করে তুলব’—এই দুই অবস্থানের মধ্যে স্বাধীনতার প্রশ্নে বড় ব্যবধান আছে।
মিল সামাজিক দায়িত্বও অস্বীকার করেননি। অন্যের অধিকার রক্ষা, ন্যায্য দায়িত্ব পালন এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সাহায্য না করার দায়ও তাঁর আলোচনায় আছে। কাজেই ব্যক্তিগত স্বাধীনতা প্রতিশ্রুতি ভাঙা, নির্ভরশীল মানুষের দায়িত্ব এড়ানো কিংবা অন্যের ক্ষতি করার অজুহাত হতে পারে না।
তাঁর স্বাধীনতার ভিত্তিও নিছক অধিকারের ঘোষণা নয়। তিনি মানুষের দীর্ঘমেয়াদি বিকাশ ও কল্যাণকে গুরুত্ব দেন। কোনো মুহূর্তে সংখ্যাগরিষ্ঠ সন্তুষ্ট হলেই সমাজের প্রকৃত মঙ্গল নিশ্চিত হয় না; স্বাধীন চিন্তা ও ব্যক্তিত্বের বিকাশও সেই মঙ্গলের অংশ।
তবু মিলকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা যায় না। স্বাধীনতার এত শক্তিশালী প্রবক্তা হয়েও তিনি যেসব জনগোষ্ঠীকে তাঁর সময়ের ভাষায় ‘অসভ্য’ মনে করেছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে উন্নয়নের নামে স্বৈরশাসনের ব্যতিক্রম রেখেছিলেন। এই অবস্থানে ঔপনিবেশিক শ্রেণিবিন্যাসের গভীর সীমাবদ্ধতা আছে। স্বাধীনতা সবার বলে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে তাঁর এই ব্যতিক্রমও সমালোচনার মুখে আনতে হয়।
মিলকে পড়ার মূল্য তাই তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ায় নয়। তাঁর যুক্তির শক্তি ব্যবহার করে তাঁর নিজের সীমাবদ্ধতাকেও প্রশ্ন করা যায়। কে অন্যের হয়ে ঠিক করে দেবে যে সে স্বাধীনতার উপযুক্ত কি না—এই প্রশ্ন তাঁর দর্শনকেও ছাড় দেয় না।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ফিরে এলে প্রশ্নটি সরল: অন্যের জীবন আমার পছন্দ নয় বলে কি আমি তা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছি? নাকি তার আচরণে কারও ক্ষতি হওয়ার যুক্তিসংগত কারণ আছে?
এই দুই প্রশ্নকে আলাদা করতে পারলেই স্বাধীনতার আলোচনা অনেক বেশি সৎ হয়। একটি সমাজ কতটা স্বাধীন, তা শুধু মানুষ নিজের পছন্দের জীবন বেছে নিতে পারে কি না দিয়ে বোঝা যায় না। অন্যেরা যে জীবন পছন্দ করে না, সেই জীবনও নিরাপদে বেছে নেওয়া যায় কি না—সেখানেই পরীক্ষাটি সবচেয়ে কঠিন।
আপনার মতামত জানানঃ