
ধরা যাক, একটি জাহাজে যাত্রীরা বিপদে পড়েছেন। কে জাহাজ চালাবেন—যিনি নক্ষত্র, বাতাস ও সমুদ্রপথ বোঝেন, নাকি যিনি সবচেয়ে বেশি মানুষকে নিজের পক্ষে আনতে পারেন? রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্নে প্লেটোর উদ্বেগ অনেকটা এমন। ক্ষমতা অর্জনের দক্ষতা এবং ভালোভাবে শাসন করার দক্ষতা কি একই জিনিস?
তবে এই তুলনাই আরেকটি প্রশ্ন তৈরি করে। দক্ষ নাবিক জাহাজ চালাতে পারেন, কিন্তু যাত্রার গন্তব্য কি তিনিই একা ঠিক করবেন? যাঁদের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত হচ্ছে, তাঁদের মতামতের মূল্য কতটুকু?
প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্র নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্র এখানেই। তিনি রাজনীতিতে জ্ঞান ও নৈতিকতার দাবি তুলেছেন। কিন্তু তাঁর প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় জনগণের সিদ্ধান্তক্ষমতা সীমিত। ফলে তাঁকে পড়তে হয় একই সঙ্গে শিক্ষকের মতো এবং প্রশ্নের মুখে থাকা চিন্তকের মতো।
আদর্শ রাষ্ট্রের আগে ন্যায়বিচারের প্রশ্ন
‘রিপাবলিক’ কেবল একটি রাষ্ট্র কীভাবে চলবে, তার পরিকল্পনা নয়। সংলাপটির কেন্দ্রে রয়েছে ন্যায় কী এবং অন্যায় করে সুবিধা পাওয়া গেলেও মানুষ কেন ন্যায়পরায়ণ থাকবে—এই প্রশ্ন। প্লেটো সক্রেটিসকে প্রধান বক্তা করে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যে তুলনার সাহায্যে উত্তর খোঁজেন।
রাষ্ট্রকে তিনি বড় পরিসরে মানুষের চরিত্র বোঝার উপায় হিসেবে ব্যবহার করেন। মানুষের মধ্যে যুক্তি, উদ্যম বা আত্মমর্যাদার তাড়না এবং নানা কামনা রয়েছে। তাঁর আদর্শে যুক্তি অন্য প্রবণতাগুলোকে যথাযথভাবে পরিচালনা করবে। রাষ্ট্রেও থাকবে দায়িত্বের বিন্যাস ও সামঞ্জস্য।
এই রাষ্ট্রে প্রধানত উৎপাদক, রক্ষক-সহায়ক এবং শাসক—তিন ধরনের ভূমিকা দেখা যায়। প্রত্যেকে উপযুক্ত কাজ করবে এবং অন্যের দায়িত্ব দখল করবে না—এমন সামঞ্জস্যকে তিনি ন্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত মনে করেন।
আজকের পাঠকের কাছে এখানেই প্রশ্ন উঠবে: মানুষের উপযুক্ত কাজ কে নির্ধারণ করবে? শ্রমবিভাগ দরকার হতে পারে, কিন্তু তা যদি রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার যুক্তি হয়, তবে সামঞ্জস্যের নামে ক্ষমতার অসমতা স্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
‘জ্ঞানী’ মানে শুধু উচ্চশিক্ষিত নন
‘রিপাবলিক’-এর পঞ্চম খণ্ডে সক্রেটিসের বক্তব্যের মর্ম হলো, দার্শনিকেরা শাসক না হলে কিংবা শাসকেরা যথার্থ দর্শনচর্চায় মন না দিলে রাষ্ট্রের দুর্দশা শেষ হবে না। এই ভাবনাই দার্শনিক শাসকের ধারণার ভিত্তি।
এখানে ‘দার্শনিক’ বলতে শুধু বই পড়া ব্যক্তি, ডিগ্রিধারী বিশেষজ্ঞ বা চতুর যুক্তিবিদ বোঝানো হয়নি। প্লেটোর আদর্শ শাসক সত্য ও মঙ্গলের অনুসন্ধান করবেন, নিজের আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখবেন এবং ব্যক্তিগত লাভের বদলে সমগ্র রাষ্ট্রের কল্যাণে সিদ্ধান্ত নেবেন।
তাই আধুনিক কোনো আমলা, অর্থনীতিবিদ বা প্রযুক্তিবিদকে সরাসরি প্লেটোর দার্শনিক শাসক বলা ভুল। কোনো বিষয়ে দক্ষতা তাঁর কল্পিত প্রজ্ঞার একটি অংশ হতে পারে; সম্পূর্ণ বিকল্প নয়। শাসকের কাছে তিনি জ্ঞান ও নৈতিক চরিত্রের মিল চেয়েছেন।
এই দাবির শক্তি রয়েছে। জনপ্রিয়তা, বংশপরিচয় বা সম্পদ কাউকে ন্যায়বান করে না। আবার একটি বিষয়ে অসাধারণ দক্ষতাও সব রাজনৈতিক প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানার নিশ্চয়তা দেয় না।
গুহার বাইরে গিয়ে আবার ফিরে আসা
প্লেটোর বিখ্যাত গুহার রূপকে কিছু মানুষ শৈশব থেকে এমনভাবে আবদ্ধ থাকে যে দেয়ালে পড়া ছায়াকেই বাস্তব বলে মনে করে। একজন বাইরে গিয়ে আলো ও বৃহত্তর জগতের মুখোমুখি হলে তাঁর পরিচিত ধারণা বদলে যায়। এই রূপক শিক্ষাকে শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়, উপলব্ধির পরিবর্তন হিসেবে ভাবতে শেখায়।
কিন্তু দার্শনিকের কাজ বাইরে গিয়ে নিজের উপলব্ধিতে সন্তুষ্ট থাকা নয়। আদর্শ রাষ্ট্রের শিক্ষিত মানুষকে আবার অন্যদের মধ্যে ফিরে দায়িত্ব নিতে হবে। শাসন তাঁর ব্যক্তিগত পুরস্কার নয়; সামাজিক কর্তব্য।
শাসক তৈরির পথও তাই দীর্ঘ। গণিত, যুক্তিমূলক অনুসন্ধান এবং বাস্তব দায়িত্বের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে নির্বাচন চলে। সপ্তম খণ্ডে প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের পূর্ণ দায়িত্বে পৌঁছানোর কথা আসে।
এই পরিকল্পনায় তাড়াহুড়ো করে কাউকে ‘জাতির ত্রাতা’ বানানোর সুযোগ কম। কিন্তু প্রশিক্ষণ যত কঠোরই হোক, তা ভুলের সম্ভাবনা শূন্য করে কি না—সেই প্রশ্ন থেকে যায়।
গণতন্ত্র নিয়ে তাঁর আপত্তি কোথায়?
প্লেটো গণতন্ত্রের স্বাধীনতা ও বৈচিত্র্য লক্ষ্য করেছিলেন। অষ্টম খণ্ডে গণতান্ত্রিক নগরকে নানা জীবনধারায় ভরা সমাজ হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু তাঁর ভয়, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা যদি সংযম ও যথাযথ কর্তৃত্বের সব দাবি প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে পারে।
তাঁর রাজনৈতিক বর্ণনায় গণতন্ত্রের ভেতর থেকেই একজন জননেতা অত্যাচারী শাসকে পরিণত হওয়ার পথ তৈরি হয়। স্বাধীনতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতাই কেড়ে নিতে পারে।
এই বিবরণকে সব গণতন্ত্রের অনিবার্য ভবিষ্যৎ হিসেবে নেওয়া উচিত নয়। এটি প্লেটোর দার্শনিক ব্যাখ্যা ও সতর্কতা; আধুনিক সব রাষ্ট্রের জন্য পরীক্ষিত কোনো অপরিবর্তনীয় সূত্র নয়।
আরও মনে রাখতে হবে, তাঁর আলোচনার পটভূমি প্রাচীন নগররাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র। আধুনিক প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের সংবিধান, অধিকার সুরক্ষা, ক্ষমতার বিভাজন এবং নির্বাচিত নেতৃত্বের সঙ্গে বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক হুবহু সেই ব্যবস্থা নয়।
তবু তাঁর উদ্বেগ প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন তোলে: নাগরিকের আবেগকে কাজে লাগিয়ে জনপ্রিয় হওয়া এবং নাগরিকের দীর্ঘমেয়াদি মঙ্গলে সিদ্ধান্ত নেওয়া কি সব সময় একসঙ্গে চলে? গণতন্ত্রকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়।
শাসককে লোভ থেকে বাঁচানোর চেষ্টা
প্লেটো শুধু শাসকের নৈতিকতার প্রশংসা করে থেমে থাকেননি। অভিভাবক শ্রেণির ব্যক্তিগত সম্পদ ও জীবনযাত্রার ওপর কঠোর বিধিনিষেধের কথা বলেছেন। উদ্দেশ্য ছিল, রাষ্ট্ররক্ষকেরা যেন সম্পদশালী মালিক হয়ে অন্য নাগরিকের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে না যান।
পঞ্চম খণ্ডে উপযুক্ত নারীদেরও অভিভাবকের কাজ ও শিক্ষায় অংশ নেওয়ার পক্ষে যুক্তি রয়েছে। তবে এটিকে আধুনিক অর্থে পূর্ণ নারীসমতা ভাবা উচিত নয়; তাঁর ব্যবস্থার লক্ষ্য ও সীমা আলাদা।
এসব বিষয় দেখায়, প্লেটোর আদর্শ নিছক শিক্ষিত ব্যক্তিকে সীমাহীন ভোগের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব নয়। তিনি ক্ষমতার সঙ্গে সম্পদলোভের সম্পর্ক নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন।
কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পত্তির সীমা থাকলেই রাজনৈতিক আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা শেষ হয় না। মানুষ নিজের মতকে অপরিহার্য ভাবতে পারে, সমালোচনাকে ক্ষতিকর মনে করতে পারে। ক্ষমতার বিপদ শুধু অর্থলোভে সীমিত নয়।
জনগণের মঙ্গলের নামে জনগণকে নীরব করা?
আদর্শ রাষ্ট্রের অস্বস্তিকর দিকগুলোও পড়তে হবে। শিক্ষা ও চরিত্র গঠনের নামে কবিতা, কাহিনি ও সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা নিয়ন্ত্রণের আলোচনা রয়েছে। তৃতীয় খণ্ডে রাষ্ট্রের মঙ্গলের যুক্তিতে শাসকদের কিছু ক্ষেত্রে অসত্য বলার অনুমতিও দেওয়া হয়।
এখানেই তাঁর আদর্শের বিপদ স্পষ্ট। শাসক যদি জানেন কোন শিক্ষা উপযুক্ত, কোন কথা ক্ষতিকর এবং জনগণকে কখন সত্য না বলাই ভালো—তাহলে নাগরিক তাঁকে প্রশ্ন করবেন কোন স্বাধীন জায়গা থেকে?
এই ব্যবস্থাকে কেবল আধুনিক কোনো রাজনৈতিক অভিধা দিয়ে শেষ করে দিলে পাঠ অসম্পূর্ণ হয়। তবে নাগরিকের স্বাধীনতা ও মতভিন্নতার দিক থেকে আপত্তিগুলো গুরুতর। সমগ্র রাষ্ট্রের ঐক্য রক্ষার লক্ষ্য ব্যক্তির আপত্তিকে কতটা জায়গা দেবে, তা জিজ্ঞাসা করতেই হবে।
জ্ঞান যাচাই করবে কে?
দার্শনিক শাসনের সবচেয়ে কঠিন সমস্যা জ্ঞানকে মূল্য দেওয়া নয়; জ্ঞানের একচ্ছত্র দাবিকে যাচাই করা। সত্যিকারের জ্ঞানীকে ভণ্ডের কাছ থেকে আলাদা করবেন কে? শাসকের সিদ্ধান্ত ভুল হলে সংশোধনের ক্ষমতা কার থাকবে?
রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান প্রয়োজন। কিন্তু সব সিদ্ধান্ত নিছক কারিগরি সমস্যা নয়। একটি বাঁধ কীভাবে বানানো যায়, তা প্রকৌশলের প্রশ্ন। বাঁধের জন্য কার জমি যাবে, ক্ষতিপূরণ কেমন হবে এবং বিকল্পগুলো কতটা গ্রহণযোগ্য—সেখানে সংশ্লিষ্ট মানুষের মূল্যবোধ ও অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ।
জাহাজের উপমার সীমা তাই এখানেই। নাবিক পথের দক্ষতা জানেন; কিন্তু যাত্রীরা কোথায় যেতে চান, সেই প্রশ্ন মুছে যায় না। নাগরিকের অভিজ্ঞতাকে অজ্ঞতা বলে সরিয়ে দিলে শাসক বাস্তব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানও হারাতে পারেন।
গণতন্ত্রের পক্ষে একটি শক্তিশালী যুক্তি হলো, শাসনের অধীন মানুষ সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করার এবং নেতৃত্ব বদলানোর অধিকার রাখবেন। এই অধিকার সব সিদ্ধান্তকে সঠিক করে না। বরং ভুল শনাক্ত ও সংশোধনের রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করে।
তাহলে কোন শাসন ভালো?
প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্র আধুনিক গণতন্ত্রের চেয়ে ভালো—এমন সরল রায় দেওয়া যায় না। তাঁর কল্পিত নৈতিকভাবে উত্তম শাসককে বাস্তবের সব দুর্বলতাসম্পন্ন গণতন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করলে তুলনাটিই অসম হয়ে যায়। বাস্তবে দেখতে হবে, কে শাসক নির্বাচন করে, কীভাবে সিদ্ধান্ত যাচাই হয় এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর উপায় কী।
এই লেখার মূল্যায়নে, প্লেটোর সবচেয়ে মূল্যবান শিক্ষা হলো: রাষ্ট্র পরিচালনায় জ্ঞান, চরিত্র ও জনকল্যাণের দাবি এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কিন্তু এই দাবি নাগরিকের সমান মর্যাদা ও জবাবদিহির বিকল্প হওয়া উচিত নয়।
গণতন্ত্রকে ভালো করতে হলে বিশেষজ্ঞ মত গ্রহণ, নাগরিক শিক্ষা, তথ্যের স্বাধীনতা এবং সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য ব্যাখ্যা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞ ও শাসককে প্রশ্নের মুখে রাখা দরকার। প্রজ্ঞার সম্মান এবং ক্ষমতার সীমা একসঙ্গে ভাবাই এখানে জরুরি।
প্লেটো আমাদের জিজ্ঞাসা করতে শেখান, অজ্ঞতা ও লোভের হাতে রাষ্ট্র কেন তুলে দেব? তাঁর প্রস্তাবকে প্রশ্ন করতে গিয়ে আমরা যোগ করি, নিজেকে জ্ঞানী দাবি করলেই কাউকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখব কেন?
ভালো শাসনের জন্য জ্ঞানী মানুষ প্রয়োজন। তাঁদের জ্ঞান ভুল প্রমাণিত হলে তা বলার স্বাধীনতাও প্রয়োজন।
আপনার মতামত জানানঃ