
ধরা যাক, ফোনের পর্দায় একটি খবর পড়ছেন। একজন মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, একটি পরিবার ঘর হারিয়েছে কিংবা কারও সন্তান আর বাড়ি ফেরেনি। প্রথম কয়েকটি বাক্যে মন খারাপ হলো। তারপর জানা গেল তাঁর ধর্ম, জাতীয়তা বা রাজনৈতিক পরিচয়। সেই তথ্য জানার পরও কি আগের মতোই কষ্ট অনুভব করলেন? নাকি মনে হলো, বিষয়টি আরও জটিল, এত দ্রুত বিচলিত হওয়ার প্রয়োজন নেই?
এটি কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার বিবরণ নয়; নিজের প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করার একটি কাল্পনিক পরিস্থিতি। কারণ অন্যের পক্ষপাত আমরা সহজে চিনতে পারি, নিজের অনুভূতির পরিবর্তন তত সহজে ধরতে পারি না। আমরা হয়তো মনে করি মানুষের কষ্ট দেখেই ব্যথিত হই। কিন্তু কখনো সেই কষ্ট আমাদের কাছে পৌঁছানোর আগে পরিচয়ের একটি দরজা পেরিয়ে আসে।
প্রশ্নটি তাই শুধু আমরা দয়ালু কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, আমাদের দয়া কত দূর যায় এবং কোথায় গিয়ে থামে। যে মানুষটি আমার মতো কথা বলেন না, আমার দলের নন, আমার বিশ্বাস মানেন না—তাঁর দুর্ভোগও কি আমার কাছে একই ধরনের মানবিক দাবি তৈরি করে?
এখানে কয়েকটি শব্দ আলাদা করা দরকার। অন্যের অভিজ্ঞতা বোঝা, তাঁর অনুভূতির সঙ্গে আবেগগত সাড়া দেওয়া এবং তাঁর কষ্ট কমাতে চাওয়া এক বিষয় নয়। এই লেখায় ‘সহানুভূতি’ শব্দটি সাধারণ অর্থে ব্যবহার করা হচ্ছে; প্রয়োজনমতো কষ্ট বোঝা ও সাহায্যের ইচ্ছাকে পৃথক রাখা হচ্ছে। কারও অবস্থান বুঝতে পারলেই তাঁকে সাহায্য করব, এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার তাঁর মতো অনুভব করতে না পারলেও ন্যায্য আচরণ করা সম্ভব।
পরিচয়ের ভেতরে মানুষ, মানুষের বদলে পরিচয়
নিজের ঘনিষ্ঠ মানুষের প্রতি বেশি টান থাকা অস্বাভাবিক নয়। অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে একজন মা-বাবার উদ্বেগ এবং দূরের অপরিচিত কারও জন্য তাঁর উদ্বেগ একই তীব্রতার হবে না। প্রতিটি মানুষের জন্য সমান আবেগ অনুভব করার দাবিও বাস্তবসম্মত নয়। সমস্যা শুরু হয় ঘনিষ্ঠতার পার্থক্য থেকে মানুষের মর্যাদার পার্থক্য বানালে—যখন পরিচিতের নিরাপত্তা অধিকার, আর অপরিচিতের নিরাপত্তা অনুগ্রহ হয়ে দাঁড়ায়।
সামাজিক মনস্তত্ত্বের গবেষণা এই সীমার কিছু দিক দেখিয়েছে। মিনা সিকারা ও সহকর্মীদের ২০১৪ সালের গবেষণায় নতুনভাবে তৈরি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ও সম্পর্কের ধরন বদলে অংশগ্রহণকারীদের প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করা হয়। নির্দিষ্ট পরীক্ষামূলক পরিস্থিতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর মানুষের দুর্ভাগ্যে কম সহানুভূতি এবং কখনো আনন্দের প্রতিক্রিয়াও পাওয়া যায়। অর্থাৎ এমন প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে সব সময় দীর্ঘদিনের শত্রুতার প্রয়োজন হয়নি।
তবে পরীক্ষার ফল থেকে কোনো ধর্ম, জাতি বা রাজনৈতিক দলের সব মানুষকে নিষ্ঠুর বলা যাবে না। গবেষকেরাও বাস্তব সামাজিক গোষ্ঠীতে আরও যাচাইয়ের প্রয়োজনের কথা বলেছেন। পরীক্ষাগারে তৈরি প্রতিযোগিতা সমাজের দীর্ঘ সংঘাতের সম্পূর্ণ প্রতিরূপ নয়। গবেষণাটি আমাদের একটি প্রবণতা বুঝতে সাহায্য করে; ব্যক্তির নৈতিক চরিত্রের চূড়ান্ত সনদ দেয় না।
গ্রিট হাইন ও সহকর্মীদের ২০১০ সালের একটি গবেষণায় ফুটবল সমর্থকদের নিজের ও প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সমর্থকের কষ্ট দেখানো হয়। অন্যকে সাহায্য করতে নিজের ওপর খরচ নিতে রাজি হওয়ার সঙ্গে তাঁদের প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ক পরীক্ষা করা হয়েছিল। গবেষণাটি গোষ্ঠীপরিচয়, কষ্টের প্রতি সাড়া ও সাহায্যের আচরণের যোগসূত্র দেখায়। কিন্তু মস্তিষ্কের কোনো একটি অঞ্চলের সক্রিয়তাকে মানুষের সম্পূর্ণ নৈতিকতার মাপকাঠি ভাবা ভুল হবে।
আমাদের দৈনন্দিন চিন্তায় এই প্রশ্নের একটি সহজ রূপ দেখা যায়। নিজের পক্ষের কেউ আক্রান্ত হলে আমরা প্রথমে তাঁর আঘাতের কথা ভাবি। বিপক্ষের কেউ আক্রান্ত হলে হয়তো আগে জানতে চাই, তিনি অতীতে কী বলেছিলেন। অতীতের আচরণ প্রাসঙ্গিক হতে পারে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে একই তথ্য একইভাবে খুঁজছি কি না, তা-ও পরীক্ষা করা দরকার। প্রমাণ যাচাইয়ের নীতি যদি পরিচয় বদলালে বদলে যায়, তখন সতর্কতার আড়ালেও পক্ষপাত থাকতে পারে।
আবার প্রতিপক্ষের কষ্ট দেখে আনন্দ পাওয়া এবং ন্যায়বিচার হওয়ায় স্বস্তি পাওয়া আলাদা। অন্যায়কারী জবাবদিহির মুখোমুখি হলে সন্তুষ্ট হওয়া সম্ভব। কিন্তু অসুস্থতা, ব্যক্তিগত শোক বা নির্বিচার হামলাকে তাঁর প্রাপ্য বলে উদ্যাপন করা ভিন্ন নৈতিক অবস্থান। অভিযোগের বিচার এবং যন্ত্রণার আনন্দকে এক করে ফেললে শাস্তির সীমা কোথায়, সে প্রশ্নও হারিয়ে যায়।
একজন মানুষকে পুরো গোষ্ঠীর প্রতিনিধি বানালেও তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অদৃশ্য হয়। আমরা ভাবতে শুরু করি, তাঁর কষ্ট স্বীকার করলে বুঝি তাঁর দলকে ছাড় দেওয়া হবে। অথচ কারও দুর্ভোগকে স্বীকার করা তাঁর সব বক্তব্য মেনে নেওয়া নয়। বিরোধিতা এবং মানবিক আচরণ পাশাপাশি রাখা সম্ভব। এই পার্থক্য হারিয়ে গেলে সাহায্যও আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত হয়।
আবেগের সীমা যেখানে, ন্যায্যতার কাজ সেখানে
একটি কঠিন উদাহরণ ভাবা যায়। যে ব্যক্তি অন্যের প্রতি অবিচার করেছেন, তিনি নিজে আহত বা অসুস্থ হলেন। তাঁর প্রতি কোমল অনুভূতি না-ও আসতে পারে। কিন্তু তাঁর চিকিৎসা বা নিরাপত্তার প্রয়োজনকে স্বীকার করতে তাঁর প্রতি ভালোবাসা থাকা জরুরি নয়। ন্যায্যতার একটি কাজই হলো আমাদের তাৎক্ষণিক অনুভূতির বাইরে কিছু স্থির সীমা ধরে রাখা।
এই কারণে সহানুভূতি মূল্যবান হলেও সেটিকে সব সিদ্ধান্তের একমাত্র ভিত্তি করা কঠিন। একটি দৃশ্যমান মুখের গল্প আমাদের দ্রুত নাড়া দিতে পারে; একই ধরনের আরও অনেক অদেখা মানুষের প্রয়োজন তখন আড়ালে থেকে যেতে পারে। অনুভূতিকে তাই প্রশ্নের মুখে ফেলতে হয়: সাহায্যটি কার সবচেয়ে প্রয়োজন, কার কথা শোনা যাচ্ছে না, আর আমার মনোযোগের বাইরে কারা রয়ে গেলেন?
অ্যাডাম স্মিথ The Theory of Moral Sentiments-এ নিজের আচরণকে একজন ন্যায্য ও নিরপেক্ষ দর্শকের চোখে কল্পনা করে দেখার কথা বলেছেন। নিজের স্বাভাবিক অবস্থান থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে বিচার করার এই চেষ্টা আত্মপরীক্ষার উপায় হতে পারে। এর অর্থ সব সম্পর্ক ত্যাগ করা নয়; নিজের সম্পর্ক ও স্বার্থ কীভাবে বিচারকে রং দিচ্ছে, তা দেখার চেষ্টা।
এই ধারণা থেকে একটি ব্যবহারিক প্রশ্ন করা যায়: ঘটনার মানুষের পরিচয়টি বদলে দিলে আমার অবস্থানও কি বদলাত? একই অন্যায় নিজের পক্ষের মানুষ করলে আমি কি একই কথা বলতাম? এটি কোনো বৈজ্ঞানিক পক্ষপাত-মাপার পরীক্ষা নয়। নিজের যুক্তির ধারাবাহিকতা যাচাইয়ের একটি দার্শনিক অনুশীলন। উত্তর অস্বস্তিকর হলে সেটিই আরও ভাবার জায়গা।
তবে নিরপেক্ষতা মানে পরিচয় অদৃশ্য করে দেওয়া নয়। কোনো মানুষ তাঁর ধর্ম, জাতিগত পরিচয়, লিঙ্গ বা সামাজিক অবস্থানের কারণে বিশেষভাবে আক্রান্ত হলে সেই পরিচয় জানা সমস্যার কারণ বুঝতে সাহায্য করে। পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়ার দুটি আলাদা কাজ আছে: একটিতে বোঝা হয় কেন তিনি ঝুঁকিতে; অন্যটিতে ঠিক করা হয় তাঁর কষ্ট আদৌ গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য কি না। প্রথমটি প্রয়োজনীয় হতে পারে, দ্বিতীয়টি বৈষম্যের পথ খুলে দেয়।
তেমনি সমান মর্যাদা মানে সব ঘটনার দায় সমান বলা নয়। একটি ঘটনায় যে পক্ষ বেশি ক্ষমতাবান বা যে ব্যক্তি নির্দিষ্ট অন্যায় করেছেন, তাঁর দায় আলাদা করে চিহ্নিত করা যায়। সবার কষ্ট স্বীকার করতে গিয়ে ক্ষমতার অসমতা মুছে ফেলার প্রয়োজন নেই। বরং মানুষের মর্যাদা এবং ঘটনার দায়—দুটি প্রশ্ন আলাদা রাখলে বিশ্লেষণ আরও নির্ভুল হয়।
আমরা কেউই প্রতিদিন সব দুর্ভোগের খবর নিতে পারি না। সময়, মনোযোগ ও সামর্থ্যের সীমা আছে। তাই কোনো বিষয়ে নীরব থাকলেই একজনকে নির্দয় বলা চলে না। কিন্তু নিজের সীমার কারণে সব জায়গায় সাহায্য করতে না পারা এবং কোনো পরিচয়ের মানুষ সাহায্যের যোগ্য নন বলে মনে করা এক নয়। সীমিত সামর্থ্য ন্যায্য অগ্রাধিকার চাইতে পারে; মানুষের মূল্য কমিয়ে দেওয়ার অনুমতি দেয় না।
নিজের প্রতিক্রিয়া বদলাতে প্রথম কাজ হতে পারে সিদ্ধান্তের আগে একটু থামা। কোনো খবরের সত্যতা যাচাই করা এবং সম্ভাব্য ভুক্তভোগীকে অবজ্ঞা না করা একসঙ্গে সম্ভব। আমরা বলতে পারি, কী ঘটেছে নিশ্চিত হওয়া দরকার; সত্য হলে ঘটনাটি গুরুতর। এতে অযাচাইকৃত দাবিকে সমর্থন করা হয় না, আবার পরিচয়ের কারণে আগেই দরজা বন্ধও করা হয় না।
আরেকটি কাজ হলো মানুষের নিজের অভিজ্ঞতা শোনা। শুধু পরিচিত রাজনৈতিক ব্যাখ্যার মধ্যে তাঁকে বসিয়ে না দিয়ে জানতে চাওয়া, তিনি কী হারিয়েছেন, এখন কী প্রয়োজন এবং কোন পরিস্থিতিতে আছেন। শোনা মানে প্রতিটি বক্তব্য সত্য ধরে নেওয়া নয়। এর অর্থ বিচার করার আগে ব্যক্তিটিকে একটি স্লোগান বা গোষ্ঠীর প্রতীকে নামিয়ে না আনা।
প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও এই পার্থক্য জরুরি। সাহায্য বণ্টন, সেবা দেওয়া বা অভিযোগ শোনার ব্যবস্থা যদি ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর নির্ভর করে, আবেগের পক্ষপাত সিদ্ধান্তে ঢুকে পড়তে পারে। প্রয়োজন, ঝুঁকি ও প্রমাণের স্পষ্ট মানদণ্ড সেই সম্ভাবনা কমানোর একটি পথ। এখানে ন্যায্য নিয়ম সহানুভূতির বিকল্প নয়; যাঁদের জন্য স্বতঃস্ফূর্ত সহানুভূতি জাগে না, তাঁদেরও বিবেচনায় রাখার ব্যবস্থা।
মানুষের কষ্ট বুঝি, নাকি পরিচয় দেখে সহানুভূতি দেখাই—উত্তরটি সব সময় একদিকে যায় না। আমাদের মধ্যে যত্নের ক্ষমতা আছে, বাছাই করে যত্ন নেওয়ার প্রবণতাও আছে। নৈতিকতার দাবি হয়তো সব অপরিচিতের জন্য সমান কান্না নয়। দাবি হলো, নিজের অনুভূতি কম বলেই অন্যের কষ্টের মূল্য কমিয়ে না দেওয়া। যে মানুষটিকে পছন্দ করি না, তাঁর দুর্ভোগের সামনেও যদি মর্যাদার একটি সীমা ধরে রাখতে পারি, তখন সহানুভূতি আনুগত্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়।
আপনার মতামত জানানঃ