
এক বিকেলে আপনি নদীর পাশে বসে ছিলেন। কোনো সিদ্ধান্ত নেননি, কোনো সমস্যার সমাধান করেননি। আলো বদলেছে, কয়েকটি নৌকা গেছে, তারপর বাড়ি ফিরেছেন। কেউ যদি জানতে চায়, ‘এতে কী লাভ হলো?’—হয়তো বলার মতো উত্তর খুঁজে পাবেন না। অথচ বিকেলটিকে অর্থহীন বলতেও মন সায় দেবে না। কিছু সময় আমাদের ভালো লাগে, কিন্তু সেই ভালো লাগার পক্ষে প্রমাণ হাজির করা কঠিন।
জীবনের সব অভিজ্ঞতা কাজে লাগতেই হবে কি না, প্রশ্নটির শুরু এখানেই। আমরা কোনো বিষয় শেখার জন্য সময় দিই, জীবিকা অর্জনের জন্য কাজ করি, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিই। এসবের প্রয়োজন আছে। কিন্তু সেই প্রয়োজনের হিসাব যখন জীবনের প্রতিটি কোণে ঢুকে পড়ে, তখন একটি গান শোনা, বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দেওয়া কিংবা একা হাঁটারও ব্যাখ্যা দিতে হয়। যেন সময়ের ব্যবহার গ্রহণযোগ্য হতে হলে তার শেষে কিছু অর্জিত হওয়া চাই।
এমনকি অবসরকেও আমরা কখনো কাজের ভাষায় বৈধতা দিই। বিশ্রাম দরকার, কারণ তাতে পরে আরও ভালো কাজ করা যাবে। উপন্যাস পড়া দরকার, কারণ তাতে ভাষাজ্ঞান বাড়বে। ভ্রমণ দরকার, কারণ তাতে দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত হবে। এগুলো সত্য হতে পারে। তবু একটি প্রশ্ন থেকে যায়: পরে কোনো লাভ না হলেও কি বিশ্রাম, পাঠ বা ভ্রমণ মূল্যবান হতে পারত?
মূল্য আর ব্যবহার এক বিষয় নয়
কোনো কিছুর মূল্য থাকতে পারে অন্য কিছু পাওয়ার উপায় হিসেবে। চাবির গুরুত্ব দরজা খোলায়। আবার কোনো কিছুকে আমরা চাই সেই অভিজ্ঞতাটির জন্যই। প্রিয় গানটির শেষ পর্যন্ত বসে থাকা সব সময় পরবর্তী কাজের প্রস্তুতি নয়। গানটি শুনতে ভালো লাগছে—এই কারণটিও যথেষ্ট হতে পারে।
অ্যারিস্টটল তাঁর ‘নিকোম্যাকিয়ান এথিকস’-এর দশম বইয়ে মননশীল কর্মকাণ্ডকে এমন কিছু হিসেবে বিবেচনা করেন, যার মূল্য তার বাইরের কোনো ফলের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে না। তাঁর সুখ ও মননের ধারণাকে প্রতিটি বিনোদনের পক্ষে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না। তবে তাঁর আলোচনা একটি দরজা খুলে দেয়: মানুষের সব মূল্যবান কাজকে অন্য কোনো লক্ষ্য অর্জনের সিঁড়ি হতে হয় না।
এই পার্থক্য ভুলে গেলে জীবন এক অদ্ভুত অপেক্ষায় পরিণত হয়। আজকের পড়াশোনা আগামী দিনের চাকরির জন্য, চাকরি নিরাপত্তার জন্য, নিরাপত্তা ভবিষ্যতে নিশ্চিন্তে থাকার জন্য। প্রস্তুতি জরুরি; কিন্তু নিশ্চিন্তে থাকার মুহূর্তটিও যদি আবার নতুন প্রস্তুতিতে ব্যয় হয়, তাহলে বেঁচে থাকার সময় কখন আসবে?
আনন্দেরও কি সনদ প্রয়োজন?
একটি শখ শুরু করার পর আমরা কখনো তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। আঁকতে ভালো লাগলে ভাবি, এটি থেকে আয় করা যাবে কি না। ছবি তুলতে ভালো লাগলে ভাবি, কত মানুষ দেখবে। রান্না উপভোগ করলে ভাবি, ছোট ব্যবসা করা যায় কি না। শখকে পেশায় পরিণত করা আনন্দের হতে পারে। সমস্যা দেখা দেয় যখন পেশা বা স্বীকৃতি হয়ে ওঠাই শখটির মূল্য প্রমাণের শর্ত হয়।
তখন যে মানুষটি ভালো আঁকতে পারে না, কিন্তু আঁকতে ভালোবাসে, তার জায়গা সংকুচিত হয়। যে পাঠক বই শেষ করার পর কিছুই লিখতে চায় না, তার পড়া যেন অসম্পূর্ণ থাকে। অভিজ্ঞতার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বদলে যায়: আমরা যা করছি, তার চেয়ে সেটি থেকে কী বের করা যাবে, সেই চিন্তা বড় হয়ে ওঠে।
একজন বন্ধুর সঙ্গে কথোপকথনের মূল্যও কি শুধু যোগাযোগের দক্ষতা বাড়ানোয়? বন্ধুটি কোনো সুযোগ এনে না দিলে, পরিচিতির পরিধি না বাড়ালে, সেই সময় কি বৃথা? প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর, কারণ সম্পর্কের ভেতরে লাভের হিসাব ঢুকে পড়লে আমরা বুঝতে পারি, ব্যবহারের মাপকাঠি জীবনের সব জায়গায় মানায় না।
সব কষ্টকে শিক্ষা বানাতে হবে না
আনন্দের অভিজ্ঞতার মতো কষ্টের অভিজ্ঞতাকেও কাজে লাগানোর চাপ আছে। সম্পর্ক ভাঙলে বলা হয়, নিশ্চয়ই কিছু শিখেছ। ব্যর্থ হলে বলা হয়, এটি তোমাকে শক্ত করেছে। ক্ষতি হলে বলা হয়, ভবিষ্যতে এর উপকার বুঝবে। কারও নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে এমন ব্যাখ্যা সত্য হতে পারে। কিন্তু বাইরে থেকে সবার ওপর সেটি চাপিয়ে দেওয়া কঠিন এক দাবি।
কোনো কষ্ট থেকে শিক্ষা পাওয়া সম্ভব। আবার কোনো কষ্ট শুধু ক্ষতিও রেখে যেতে পারে। একজন মানুষ এখনো তার অভিজ্ঞতার অর্থ খুঁজে না পেলে, সেটি তার আরেকটি ব্যর্থতা নয়। তাকে কষ্ট সামলানোর পাশাপাশি সেই কষ্টের লাভও প্রমাণ করতে বলা উচিত নয়।
শেখা এবং ঘটনার ন্যায্যতা আলাদা বিষয়। প্রতারণার পর কেউ সতর্ক হতে শিখলে প্রতারণাটি ভালো হয়ে যায় না। অন্যায়ের অভিজ্ঞতা কাউকে প্রতিবাদী করে তুললেও অন্যায়টি প্রয়োজনীয় ছিল—এমন সিদ্ধান্ত আসে না। মানুষ ক্ষতির পর কীভাবে বাঁচবে, সেটি তার নিজের অনুসন্ধান; ক্ষতিকে উপকারী বলে ঘোষণা করার দায় তার নেই।
এখানে আরও একটি স্বাধীনতা দরকার: কোনো অভিজ্ঞতাকে এখনই ব্যাখ্যা না করার স্বাধীনতা। জীবনের সব ঘটনার নিচে একটি শিক্ষণীয় বাক্য লিখে দিতে হয় না। কিছু ঘটনা বুঝতে সময় লাগে, কিছু ঘটনা সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়া বদলায়, আর কিছু প্রশ্ন হয়তো খোলাই থেকে যায়।
অবসর কার নাগালে?
তবে ‘কাজে না লাগলেও সময় কাটাও’ বলা সবার কাছে একই অর্থ বহন করে না। দীর্ঘ কর্মদিবস, অনিশ্চিত আয় বা পরিবারের যত্নের দায়িত্ব যার ওপর, তার কাছে নিজের মতো সময় পাওয়া কঠিন। অবসরের মূল্য নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এই বাস্তবতা এড়িয়ে গেলে কথাটি সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের উপদেশ হয়ে দাঁড়ায়।
বার্ট্রান্ড রাসেল ১৯৩২ সালের ‘ইন প্রেইজ অব আইডলনেস’ প্রবন্ধে কাজকে নিজেই নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ ধরে নেওয়ার ধারণাকে প্রশ্ন করেছিলেন। তাঁর অবসরের পক্ষে যুক্তির সঙ্গে কাজের সময় ও শ্রমের বণ্টনের প্রশ্নও ছিল। সেই আলোচনা মনে করিয়ে দেয়, অবসর কেবল ব্যক্তিগত অভ্যাসের বিষয় নয়; মানুষ কীভাবে সময় পাবে, সেটিও সামাজিক প্রশ্ন।
এই লেখার যুক্তি তাই দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া নয়। দায়িত্ব আছে, সীমিত সময়ের হিসাব আছে, অন্যের প্রতি দায়ও আছে। কিন্তু প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি এমন সময়ের সুযোগও থাকা দরকার, যার জন্য কাউকে উৎপাদনশীলতার সনদ দেখাতে হবে না।
এখানে একটি সূক্ষ্ম ফাঁদ আছে। আমরা বলতে পারি, উদ্দেশ্যহীন সময়ও শেষ পর্যন্ত সৃজনশীলতা বাড়ায়, তাই সেটি মূল্যবান। কখনো তা হতে পারে। কিন্তু এই যুক্তিতেই যদি থামি, তাহলে আবার সেই পুরোনো শর্ত ফিরে আসে: লাভ হলে তবেই সময়টি গ্রহণযোগ্য। এই লেখার প্রস্তাব আরও সরল—লাভের নিশ্চয়তা ছাড়াও কিছু সময়ের মূল্য স্বীকার করা যায়।
জীবনের সব অভিজ্ঞতা সমান মূল্যবান নয়। কিছু সিদ্ধান্ত ভুল হতে পারে, কিছু সময় পরে অপচয় মনে হতে পারে। নিজের জীবন নিয়ে বিচার করার প্রয়োজনও আছে। কিন্তু বিচার আর প্রতিটি মুহূর্তকে লাভে পরিণত করার বাধ্যবাধকতা এক নয়। আমরা কোনো বিকেল থেকে কিছু শিখিনি বলেই বিকেলটি ব্যর্থ হয়ে যায় না। কোনো আনন্দ ভবিষ্যৎ বদলায়নি বলেই আনন্দটি মিথ্যা নয়।
নদীর পাশে বসে থাকা সেই মানুষটির কাছে আবার ফিরে যাওয়া যাক। তিনি হয়তো নতুন কোনো ধারণা নিয়ে ফেরেননি। পরদিনও তাঁর জীবন আগের মতোই চলেছে। শুধু ওই বিকেলে তিনি নদী দেখেছিলেন, কিছুক্ষণ নিজের মতো ছিলেন। অভিজ্ঞতাটি থেকে আর কিছু বের না হলেও এই কথাটুকু সত্য থাকে।
জীবনের সব অভিজ্ঞতা কাজে লাগতেই হবে না। কিছু অভিজ্ঞতা আমাদের কোথাও পৌঁছে দেয়। কিছু অভিজ্ঞতার ভেতরেই আমরা একটু সময় বাস করি।
আপনার মতামত জানানঃ