
ভোটের আগে নাগরিকের প্রথম প্রশ্ন হওয়ার কথা—কাকে ভোট দেবেন? পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা নিয়ে চলমান বিতর্কে তারও আগে আরেকটি উদ্বেগ জায়গা করে নিচ্ছে: ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকবে তো? নাম যুক্ত করা, ভুল সংশোধন ও অযোগ্য নাম সরানোর প্রশাসনিক কাজ যখন দলীয় অভিযোগের কেন্দ্রে চলে আসে, তখন তালিকার নির্ভুলতার পাশাপাশি তার ওপর মানুষের আস্থাও পরীক্ষার মুখে পড়ে।
১৭ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য আবার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর করার দাবি তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, আগের প্রক্রিয়ায় নথি পোড়ানো, কর্মকর্তাদের ওপর হামলা ও বাধাদানের ঘটনা ঘটেছিল। তিনি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার পক্ষেও বক্তব্য দিয়েছেন। এগুলো বিজেপি নেতার অভিযোগ ও রাজনৈতিক মূল্যায়ন; তাঁর বক্তব্য নিজে থেকে প্রতিটি ঘটনার স্বাধীন প্রমাণ নয়।
এখানে একটি জরুরি পার্থক্য আছে। নতুন এসআইআর করার দলীয় দাবি এবং নির্বাচন কমিশনের ইতিমধ্যে ঘোষিত বিশেষ সংক্ষিপ্ত সংশোধন বা এসএসআর এক বিষয় নয়। কমিশনের ১৫ অক্টোবরের নির্দেশে পশ্চিমবঙ্গসহ ১৭টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের জন্য এসএসআরের সূচি রয়েছে। খসড়া তালিকা প্রকাশ ১২ নভেম্বর, দাবি ও আপত্তি জানানোর সময় ১২ নভেম্বর থেকে ১১ ডিসেম্বর এবং চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের নির্ধারিত দিন ৪ জানুয়ারি ২০২৭। এই নির্দেশকে পশ্চিমবঙ্গে নতুন এসআইআরের অনুমোদন হিসেবে পড়া ভুল।
দুটি প্রক্রিয়ার পার্থক্য হারিয়ে গেলে সাধারণ মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত হতে পারেন। আবার সবাইকে নতুন করে একই নথি দিতে হবে কি না, আগের আবেদন বাতিল কি না, কিংবা দলীয় দাবি ইতিমধ্যে সরকারি সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে কি না—অযথা উদ্বেগ তৈরি হয়। রাজনৈতিক বক্তব্য, প্রশাসনিক নির্দেশ ও ব্যক্তির করণীয় আলাদা করে জানানো তাই আস্থা ফেরানোর প্রথম কাজ।
তালিকা হালনাগাদের প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। নতুন যোগ্য ভোটার আসেন, মানুষ মারা যান, স্থায়ীভাবে বাসস্থান বদলান, ভুল বা একাধিক এন্ট্রিও থাকতে পারে। এগুলো সংশোধন না হলে নির্বাচনী ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু কত নাম বাদ গেল, সেটিকে সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড করলে উল্টো বিপদ আছে। যোগ্য ব্যক্তির নাম কত নির্ভুলভাবে রাখা বা ফেরানো গেল, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই ভারসাম্য থেকেই বর্তমান বিতর্ককে বিচার করা প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যায় সংশোধনের লক্ষ্য মৃত, স্থানান্তরিত, একাধিকবার নিবন্ধিত ও অযোগ্য এন্ট্রি সরানো। বিরোধীদের অভিযোগ, যোগ্য মানুষও বাদ পড়েছেন এবং প্রক্রিয়াটি রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হয়েছে। কমিশন ও বিজেপি পক্ষপাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এই বিরোধকে দাবি ও পাল্টা দাবির সীমা ছাড়িয়ে যাচাইযোগ্য তথ্যের আলোচনায় নিতে হবে।
তালিকায় ভুল নাম থাকা এবং সঠিক নাম ভুলভাবে বাদ পড়া—দুটিই সমস্যার আলাদা ধরন। প্রথমটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে দ্বিতীয়টির ক্ষতি স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া যায় না। আবার ভুল বাদ পড়ার অভিযোগ থাকলেই তালিকা যাচাইয়ের প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় না। বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়াকে উভয় ধরনের ভুল শনাক্ত ও সংশোধন করতে হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, নাগরিকের বাস্তব সামর্থ্য কতটা বিবেচনায় আসছে। পুরোনো কাগজ গুছিয়ে রাখা, অনলাইনে তথ্য পরীক্ষা, আবেদন পূরণ কিংবা শুনানিতে যাওয়ার সুযোগ সবার সমান নয়। একটি বানানভুল সংশোধন করতে দিনমজুরের কর্মদিবস নষ্ট হতে পারে। বৃদ্ধ ব্যক্তির জন্য দূরের দপ্তরে যাতায়াত কঠিন হতে পারে। বাসস্থান বদলানো পরিবারের পুরোনো নথি সংগ্রহে সময় লাগতে পারে। এগুলো সম্ভাব্য প্রশাসনিক বাধার উদাহরণ; কোনো কল্পিত ব্যক্তির সাক্ষ্য নয়।
নিয়ম সবার জন্য এক হলেও নিয়ম মানার খরচ অসম হতে পারে। ফলে কেবল আবেদন করার সুযোগ আছে বললে যথেষ্ট হয় না। মানুষ সেই সুযোগ ব্যবহার করতে পারছেন কি না, সহায়তা পাচ্ছেন কি না এবং ভুলের প্রতিকার সময়মতো হচ্ছে কি না—এসব দিয়ে ব্যবস্থার কার্যকারিতা মাপতে হবে।
নাম বাদ দেওয়ার প্রশ্নে আপত্তি ও প্রমাণের পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। একজনের আবেদন অন্যজনের ভোটার-যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে; সেই আবেদনই অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠা করে না। নির্বাচন কমিশন ৯ অক্টোবর ফর্ম ৭ জমার সংখ্যা সীমিত করার নির্দেশ দিয়েছে। সংশোধনের দাবি ও আপত্তির পর্যায়ে ব্যক্তি-পিছু সর্বোচ্চ ১০টি এবং নিয়মিত হালনাগাদের সময়ে মাসে পাঁচটি আবেদন করার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আপত্তিকারীর বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির শুনানির গুরুত্বও উঠে এসেছে।
সংখ্যার সীমা অপব্যবহারের সুযোগ কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে আসল পরীক্ষা প্রতিটি সিদ্ধান্তের কারণ ও প্রমাণ। অভিযোগ কেন গ্রহণ করা হলো, মাঠপর্যায়ে কী পাওয়া গেল, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কীভাবে জানানো হলো—এসবের নথি থাকতে হবে। একসঙ্গে অনেক আপত্তি এলে প্রশাসনিক চাপ বাড়ে; সেই চাপ ব্যক্তির কথা শোনার প্রয়োজন দূর করে না।
প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। তথ্যভান্ডার তুলনা করে সম্ভাব্য ভুল খুঁজে পাওয়া কার্যকর হতে পারে। কিন্তু সফটওয়্যারের চিহ্নিত অসংগতি এবং মানুষের অযোগ্যতা এক সিদ্ধান্ত নয়। নামের বানান, বয়স বা পারিবারিক তথ্যের অমিলের পেছনে তথ্যভুক্তির ভুলও থাকতে পারে। প্রযুক্তি যাচাইয়ের সহায়ক হবে, প্রশ্নহীন কর্তৃত্ব হয়ে উঠবে না।
তালিকা সংশোধনের সঙ্গে পরিচয়-রাজনীতি মিশলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। সীমান্তবর্তী জনপদ, ভাষা, ধর্ম কিংবা পরিবারের ইতিহাস দিয়ে কোনো জনগোষ্ঠীকে সমষ্টিগত সন্দেহের মধ্যে ফেলা ন্যায়সংগত যাচাইকে দুর্বল করে। যোগ্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন ব্যক্তিসংক্রান্ত প্রমাণ ও প্রযোজ্য প্রক্রিয়া। নামের বানান বা পরিচয়ের ধরন দিয়ে রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে কাউকে অযোগ্য ঘোষণা করার সংস্কৃতি ভোটার তালিকার ওপর আস্থা ফেরাতে পারে না।
আবার যোগ্য মানুষের উদ্বেগকে ব্যবহার করে প্রতিটি যাচাইকে ষড়যন্ত্র বললেও সমাধান আসে না। দলগুলোর দায়িত্ব নির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে ধরা। কোথায় কার আবেদন আটকে আছে, কী নথি দেওয়া হয়েছে, কী কারণ দেখানো হয়েছে—এমন তথ্য অনুসন্ধান ও প্রতিকারের পথ খুলে দেয়। অস্পষ্ট বড় অভিযোগ জনমত তৈরি করতে পারে, কিন্তু ভুক্তভোগীর নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধান নাও করতে পারে।
প্রতিকারের সময়ও এখানে মৌলিক বিষয়। কোনো নির্বাচনের পরে নাম ফেরত পাওয়া প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু পেরিয়ে যাওয়া ভোটের সুযোগ ফিরিয়ে দেয় না। তাই আপিলের পথ থাকা এবং ভোটের আগে কার্যকর নিষ্পত্তি পাওয়া আলাদা প্রশ্ন। নাম বাদ পড়া ভোটারদের মামলা দ্রুত শোনার আবেদন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে সাম্প্রতিক আলোচনাও এই সময়গত সংকট সামনে এনেছে। আগের শুনানিতে আদালত সম্ভাব্য অগ্রাধিকারের কথা বলেছে; সেটিকে সব আপিল নিষ্পত্তির চূড়ান্ত নিশ্চয়তা বলা যায় না।
আস্থা ফেরাতে নির্বাচন কমিশনের কাছে সবচেয়ে প্রয়োজন সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করার সক্ষমতা। কত আবেদন এল, কোন কারণে কত সিদ্ধান্ত হলো, কত ভুল সংশোধিত হলো এবং কত আবেদন বাকি—এমন পরিসংখ্যান নিয়মিত প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রেখেই প্রক্রিয়ার সামগ্রিক মান যাচাই করা সম্ভব। কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় অস্বাভাবিক প্রবণতা দেখা গেলে তা অনুসন্ধানের সুযোগও তৈরি হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। নিজেদের সুবিধাজনক মনে হলে কমিশনকে নিঃশর্ত সমর্থন, আর অসুবিধাজনক মনে হলে প্রতিটি সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য—এই অবস্থান প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা দুর্বল করে। তালিকার মান বিচার করার একই নীতি সব এলাকায় এবং সব দলের সম্ভাব্য সমর্থকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে হবে। তালিকা কোনো দলের সম্ভাব্য ভোটভিত্তির তালিকা নয়।
নাগরিকের জন্য তথ্যপ্রাপ্তি সহজ করাও জরুরি। কোন প্রক্রিয়া চলছে, কোন আবেদন কোথায় যাবে এবং সিদ্ধান্তের পর কী করা সম্ভব—এসব স্থানীয় ভাষায় স্পষ্ট জানাতে হবে। কমিশনের নির্দেশে নতুন অন্তর্ভুক্তির জন্য ফর্ম ৬, আপত্তি বা নাম বাদ দেওয়ার আবেদনের জন্য ফর্ম ৭ এবং তথ্য সংশোধন বা স্থানান্তরের জন্য ফর্ম ৮-এর উল্লেখ রয়েছে। নিজের অবস্থা অনুযায়ী হালনাগাদ সরকারি নির্দেশ যাচাই করা প্রয়োজন।
পশ্চিমবঙ্গের সামনে তাই প্রশ্ন কেবল আরও এক দফা সংশোধন হবে কি না, সেটি নয়। যেকোনো সংশোধনে তালিকার ভুল কমানোর পাশাপাশি যোগ্য মানুষের অনিশ্চয়তা কমছে কি না, সেটিই প্রধান পরীক্ষা। বারবার যাচাই হলেও যদি সিদ্ধান্ত বোঝা না যায় বা প্রতিকার নাগালের বাইরে থাকে, তবে কাজের পরিমাণ বাড়বে, আস্থা বাড়বে না।
ভোটার তালিকার গ্রহণযোগ্যতা কোনো একটি দল সন্তুষ্ট হলো কি না, তা দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না। এর ভিত্তি হবে নিয়মের ধারাবাহিকতা, প্রমাণের মান, বক্তব্য জানানোর সুযোগ এবং ভুল সংশোধনের কার্যকারিতা। একজন যোগ্য নাগরিক যেন জানেন—তাঁর নাম কোনো নেতার অনুগ্রহে নেই, আর কোনো অভিযোগের জোরেই তা হারিয়ে যাবে না। সেই নিশ্চয়তা তৈরি হলেই সংশোধন সত্যিকার অর্থে আস্থা ফেরানোর কাজ হয়ে উঠবে।
আপনার মতামত জানানঃ