মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আবারও নতুন মোড় নিয়েছে। ইয়েমেনের হুতিদের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের নিরাপত্তা, তেল অবকাঠামো এবং লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ১৯ সেপ্টেম্বর রিয়াদের কাছে হামলার পর সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার দাবি করে। একই সময়ে বিমানবন্দরের কাছে আগুন ও ধোঁয়া দেখা যায়।
এই হামলা শুধু সৌদি আরবের ওপর সামরিক চাপের বিষয় নয়। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে লোহিত সাগর, বাব আল-মানদেব প্রণালি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থায়। ইয়েমেনের উপকূলীয় এলাকায় হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
হুতিরা বলছে, ইয়েমেনে সৌদি সামরিক অভিযানের জবাব হিসেবেই তারা সৌদি ভূখণ্ডে হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন পক্ষ এসব হামলাকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। ফলে পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপের মধ্যে কূটনৈতিক সমাধানের পথ আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ওয়াশিংটনের সহযোগিতা চাইলেও ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি নতুন করে ইয়েমেনে সামরিক হামলায় জড়াতে অনাগ্রহী বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্প হুতিদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য বিমান হামলার কথা বিবেচনা করলেও শেষ পর্যন্ত তা বাতিল করার খবর রয়েছে।
ওয়াশিংটনের এই অবস্থান সৌদি আরবের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে সৌদি নিরাপত্তাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক সংঘাতে মার্কিন সামরিক সম্পৃক্ততা বাড়তে থাকায় নতুন করে ইয়েমেন যুদ্ধে সরাসরি প্রবেশ করা নিয়ে ওয়াশিংটনের হিসাব বদলেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি দূরে সরে যায়নি। গোয়েন্দা সহযোগিতা ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের মতো সহায়তার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহের পরিকল্পনাও রয়েছে।
এদিকে ইউরোপ থেকেও সীমিত সামরিক সহায়তার ইঙ্গিত এসেছে। ব্রিটেন সৌদি যুদ্ধবিমানকে আকাশে জ্বালানি সরবরাহের জন্য একটি রয়্যাল এয়ার ফোর্স ভয়েজার বিমান মোতায়েনের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। ব্রিটিশ সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সহায়তার লক্ষ্য আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এর ফলে একটি নতুন বাস্তবতা সামনে এসেছে। সৌদি আরব আঞ্চলিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্র হলেও হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সংঘাতে তার নিরাপত্তা নির্ভরতা কতটা বহিরাগত অংশীদারদের ওপর, সেটি আবার আলোচনায় এসেছে।
হুতিদের সামরিক সক্ষমতার বিষয়টিও এই সংকটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাম্প্রতিক সময়ে তারা ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহারের দাবি করেছে। রিয়াদ ও ইয়ানবুর মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামলার দাবির পাশাপাশি লোহিত সাগরের নৌপথ নিয়েও তারা চাপ তৈরি করছে।
ইয়ানবু বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও তেল অবকাঠামো কেন্দ্র। সেখানে হামলার আশঙ্কা তৈরি হলে সৌদি তেল রপ্তানির বিকল্প রুটগুলোর ওপরও চাপ বাড়তে পারে।
আর এখানেই ইয়েমেনের সংঘাত একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের সীমা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব দিয়ে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহন চলে। এই পথ দীর্ঘ সময় অস্থিতিশীল থাকলে জাহাজগুলোকে বিকল্প রুট ব্যবহার করতে হতে পারে, যার ফলে পরিবহন ব্যয় ও পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি থাকে।
এর সঙ্গে হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। বিশ্বের জ্বালানি বাজারে তখন একই সঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর পড়ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সৌদি আরবের জন্য আরেকটি জটিলতা হলো আঞ্চলিক মিত্রদের ভূমিকা। রিয়াদ যে ধরনের সরাসরি সামরিক সহায়তা প্রত্যাশা করছে, সব মিত্র রাষ্ট্র তা দিতে প্রস্তুত কি না, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়। পাকিস্তান, তুরস্ক, মিসরসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সৌদি আরবের নিরাপত্তা সম্পর্ক থাকলেও প্রত্যেক দেশের নিজস্ব কৌশলগত হিসাব রয়েছে।
ইসরায়েলের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইসরায়েল উপসাগরীয় দেশগুলোকে সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে বলে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করবে কি না, সেটি নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
কারণ সৌদি আরবের নিরাপত্তা নীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও রিয়াদ একই সঙ্গে নিজের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন নিরাপত্তা অংশীদার তৈরির প্রশ্নটি ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও সংঘাতকে জটিল করে তুলছে। হুতিরা দেশের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে এবং সাম্প্রতিক সময়ে লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকায় তাদের সামরিক অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। এতে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর ওপর চাপ বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে সামরিক শক্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। কয়েক বছরের সংঘাত দেখিয়েছে, ইয়েমেনে সামরিক অভিযান কোনো সহজ সমাধান তৈরি করেনি। বরং স্থানীয় শক্তিগুলোর বিভাজন, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আন্তর্জাতিক শক্তির হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
হুতিদের বক্তব্য, সৌদি অবরোধ ও সামরিক অভিযান বন্ধ হলে তারা সংঘাত কমানোর পথে যেতে পারে। তবে এই দাবির পাশাপাশি তাদের সামরিক কর্মকাণ্ডও অব্যাহত রয়েছে। ফলে আলোচনার টেবিলে বসার আগে কোন পক্ষ কী ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চাইবে, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও সংকটটি সহজ নয়। একদিকে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের স্বার্থ রয়েছে, অন্যদিকে নতুন করে ইয়েমেনে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করলে ওয়াশিংটনকে আরও একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিতে হবে।
এই দ্বন্দ্বই বর্তমান মার্কিন নীতির কেন্দ্রবিন্দু। সৌদি আরবকে সহযোগিতা করা, কিন্তু সরাসরি যুদ্ধে না জড়ানো—ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক অবস্থানকে মোটামুটি এভাবেই দেখা যাচ্ছে।
এর মধ্যে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে। সৌদি আরব ও ইসরায়েলের জন্য বিপুল পরিমাণ মার্কিন অস্ত্র সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে সামরিক সক্ষমতা বাড়লেও একই সঙ্গে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন সমীকরণে হুতিদের গুরুত্বও তাই আগের তুলনায় বেড়েছে। ইয়েমেনের একটি আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী থেকে তারা এখন এমন একটি শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যাদের কর্মকাণ্ড সৌদি নিরাপত্তা, ইসরায়েলি কৌশল, মার্কিন সামরিক নীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ—সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।
তবে হুতিদের শক্তি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও ভুলে গেলে চলবে না। দীর্ঘ যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট, অবরোধ এবং রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে দেশটির জনগণ বছরের পর বছর মানবিক সংকটের মধ্যে রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটি শুধু কে সামরিকভাবে শক্তিশালী—সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, এই সংঘাতের এমন কোনো রাজনৈতিক সমাধান তৈরি করা যায় কি না, যেখানে সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব, হুতিদের রাজনৈতিক অবস্থান এবং লোহিত সাগরের আন্তর্জাতিক নৌপথ—সবগুলো বিষয় একই আলোচনার টেবিলে আসে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই পথ এখনো অনিশ্চিত। তবে রিয়াদের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র, লোহিত সাগরে উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখিয়ে দিচ্ছে—ইয়েমেনের যুদ্ধ আর শুধু ইয়েমেনের ভেতরের যুদ্ধ নয়। এর প্রতিটি নতুন হামলার প্রতিধ্বনি পৌঁছে যাচ্ছে উপসাগরীয় রাজনীতি থেকে শুরু করে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজার পর্যন্ত।
মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে হুতিদের উত্থান তাই একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আর সৌদি আরবের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু হামলা ঠেকানো নয়; বরং এমন একটি নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক কাঠামো তৈরি করা, যেখানে প্রতিটি সংকটের উত্তর আবার নতুন যুদ্ধ হয়ে না আসে।
প্রথম আলোর মূল কলামটি ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত হয়েছে; সাম্প্রতিক রিয়াদ হামলা ও যুক্তরাজ্যের সীমিত সামরিক সহায়তার বিষয়গুলো স্বাধীন সংবাদসূত্রেও রিপোর্ট হয়েছে।
আপনার মতামত জানানঃ