পানসুপারি—দক্ষিণ এশিয়ার পরিচিত এক উপাদান। বাংলাদেশ, ভারতসহ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বহু মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে এটি জড়িয়ে আছে। কেউ পানসুপারি খান অভ্যাসবশত, কেউ সামাজিক আড্ডায়, আবার কেউ এর সাময়িক চাঙাভাব বা প্রশান্তির অনুভূতির জন্য। কিন্তু এই পরিচিত অভ্যাসের শিকড় যে হাজার হাজার বছর গভীরে প্রোথিত, তা হয়তো অনেকেরই জানা নেই।
নতুন এক গবেষণা বলছে, পানসুপারি ব্যবহারের ইতিহাস প্রায় ২৫ হাজার বছর পুরোনো হতে পারে। অর্থাৎ কৃষির আবির্ভাব, স্থায়ী বসতি কিংবা প্রাচীন সভ্যতার উত্থানের বহু আগেই মানুষ পানসুপারির মতো উদ্ভিদজাত নেশাদ্রব্য ব্যবহার করত। ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপে পাওয়া প্রাচীন মানবদেহের দাঁতের অস্বাভাবিক ক্ষয় এবং রাসায়নিক বিশ্লেষণ থেকে গবেষকেরা এমন ধারণা পেয়েছেন।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ সাময়িকীতে। এতে প্রত্নতত্ত্ব, জীবাশ্মবিজ্ঞান, দন্তচিকিৎসা ও স্নায়ুবিজ্ঞানের তথ্য একত্র করে দেখানো হয়েছে—আধুনিক পান খাওয়ার প্রচলিত রীতিরও অনেক আগে মানুষ আস্ত পানসুপারি মুখে রেখে দীর্ঘ সময় ধরে চুষত। এই প্রক্রিয়ায় পানসুপারির ভেতরের সক্রিয় রাসায়নিক উপাদান ধীরে ধীরে শরীরে প্রবেশ করত। ফলে মানুষ একদিকে সাময়িক উত্তেজনা বা চাঙাভাব অনুভব করত, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে দাঁতের মারাত্মক ক্ষতিও হতো।
দক্ষিণ সুলাওয়েসিতে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের সময় দুই প্রাপ্তবয়স্ক শিকারি-সংগ্রাহকের কঙ্কাল পাওয়া যায়। তাঁদের একজনের বয়স আনুমানিক ২৫ হাজার থেকে ১৬ হাজার বছর আগের। অন্যজনের সময়কাল প্রায় ৭ হাজার ৬০০ থেকে ৬ হাজার ৩০০ বছর আগের। দুজনের মধ্যে সময়ের ব্যবধান ছিল অন্তত ১০ হাজার বছর। কিন্তু তাঁদের দাঁতে একটি অদ্ভুত মিল পাওয়া যায়—কয়েকটি দাঁতের গায়ে গভীর, গোলাকার খাঁজ।
প্রথমে এই খাঁজ গবেষকদের বিস্মিত করে। কারণ প্রাগৈতিহাসিক মানুষের দাঁতে এমন ক্ষয়ের দৃষ্টান্ত আগে খুব বেশি দেখা যায়নি। সাধারণ খাবার চিবানো, হাড় কামড়ানো কিংবা পাথরের সরঞ্জাম ব্যবহারের ফলে যে ধরনের দাঁতের ক্ষয় হয়, এই খাঁজ তার সঙ্গে মেলে না। বরং মনে হচ্ছিল, শক্ত ও প্রায় গোলাকার কোনো বস্তু দীর্ঘ সময় দাঁতের মধ্যে আটকে রেখে চোষার ফলে এই ক্ষয় তৈরি হয়েছে।
গবেষকেরা ধারণা করেন, ওই মানুষগুলো নিয়মিত কোনো শক্ত বীজ বা ফল দাঁতের মধ্যে ধরে রাখতেন। দীর্ঘ সময় ধরে একই কাজ করার কারণে দাঁতের ওপর ঘর্ষণ তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে গভীর খাঁজ সৃষ্টি হয়। এক ব্যক্তির দাঁতের ক্ষয় এতটাই ভয়াবহ ছিল যে দাঁতের ভেতরের সংবেদনশীল অংশ বা পাল্প চেম্বার কয়েক জায়গায় উন্মুক্ত হয়ে গিয়েছিল। এমন অবস্থা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক হওয়ার কথা।
এই অস্বাভাবিক দাঁতের দাগ গবেষকদের ঔপনিবেশিক যুগের ধূমপায়ীদের দাঁতের ক্ষয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। অতীতে মাটির তৈরি পাইপে তামাক খাওয়ার সময় অনেকে পাইপের ডাঁটি দাঁতের মধ্যে চেপে রাখতেন। দীর্ঘদিনের অভ্যাসে তাঁদের দাঁতে বিশেষ ধরনের গোলাকার দাগ তৈরি হতো। প্রাচীন সুলাওয়েসির দাঁতের ক্ষয়ের সঙ্গে সেই দাগের মিল খুঁজে পান গবেষকেরা।
এরপর তাঁদের সন্দেহ যায় পানসুপারির দিকে। পানসুপারি আসলে ‘অ্যারেকা ক্যাটেকু’ নামের এক ধরনের পামগাছের বীজ। এর বীজ শক্ত, গোলাকার এবং দাঁতের মধ্যে ধরে রাখার উপযোগী। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পানসুপারিতে রয়েছে ‘অ্যারেকোলিন’ নামের একটি সক্রিয় রাসায়নিক উপাদান। এটি মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলে এবং সাময়িক উত্তেজনা, সতর্কতা ও চাঙাভাব তৈরি করতে পারে।
আধুনিক সময়ে পান খাওয়ার জন্য সাধারণত পানপাতার সঙ্গে পানসুপারি, চুন এবং কখনো জর্দা বা অন্যান্য উপাদান মেশানো হয়। চুন সাধারণত পোড়ানো ঝিনুক, চুনাপাথর বা প্রবাল থেকে তৈরি করা হয়। চুন পানসুপারির রাসায়নিক উপাদানকে দ্রুত শরীরে শোষিত হতে সাহায্য করে। পান চিবানোর সময় লালা লাল হয়ে যায় এবং দীর্ঘদিনের অভ্যাসে দাঁত ও মাড়িতে স্থায়ী দাগ পড়ে।
কিন্তু প্রাচীন সুলাওয়েসির মানুষের দাঁতে এমন লালচে দাগ ছিল না। তাঁদের দাঁতের ক্ষয়ও আধুনিক পান চিবানোর ধরন থেকে আলাদা। এ কারণে গবেষকেরা ধারণা করেন, তখন মানুষ পানসুপারি চুনের সঙ্গে মিশিয়ে চিবাত না; বরং আস্ত পানসুপারি মুখে রেখে দীর্ঘ সময় ধরে চুষত।
এই ধারণা যাচাই করতে গবেষকেরা আধুনিক পানসুপারি কৃত্রিম লালার মধ্যে ভিজিয়ে পরীক্ষা করেন। এরপর সেই নির্যাস এমন ব্যাঙের ডিম্বকোষে প্রয়োগ করা হয়, যেগুলোকে মানুষের মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট রিসেপ্টর তৈরি করার মতো করে প্রস্তুত করা হয়েছিল। পরীক্ষায় দেখা যায়, আস্ত পানসুপারি দীর্ঘ সময় লালার সংস্পর্শে থাকলে তার ভেতরের অ্যারেকোলিন ধীরে ধীরে বের হয়ে আসে। অর্থাৎ পানসুপারি চিবানো বা গুঁড়া করা ছাড়াও শুধু চুষে এর সক্রিয় রাসায়নিক উপাদান শরীরে প্রবেশ করানো সম্ভব।
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পাওয়া যায় প্রাচীন দাঁতের রাসায়নিক বিশ্লেষণে। গবেষকেরা ওই দাঁতগুলোতে অ্যারেকোলিনের উপস্থিতি শনাক্ত করেন। ফলে তাঁদের ধারণা আরও শক্তিশালী হয় যে সুলাওয়েসির প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহকেরা নিয়মিত পানসুপারি চুষতেন।
এটি শুধু নেশাদ্রব্য ব্যবহারের ইতিহাস নয়; মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির ইতিহাসও। গবেষকদের মতে, পানসুপারি চোষার ফলে হয়তো প্রাচীন মানুষ সামান্য চাঙাভাব বা আনন্দ অনুভব করত। তবে এই প্রভাব আধুনিক পানসুপারি-চুনের মিশ্রণের তুলনায় কম শক্তিশালী ছিল বলে ধারণা করা যায়। কারণ চুন পানসুপারির রাসায়নিক উপাদান দ্রুত শরীরে প্রবেশে সহায়তা করে।
তবু দীর্ঘ সময় ধরে পানসুপারি চোষার কারণে দাঁতে বড় ধরনের ক্ষয় তৈরি হয়েছিল। এই অভ্যাসের পেছনে ব্যথা কমানোর বিষয়টিও থাকতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, দুই প্রাচীন মানুষেরই দাঁতে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা ছিল। অ্যারেকোলিনের কিছু ব্যথানাশক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ফলে দাঁতের ব্যথা সাময়িকভাবে কমানোর জন্য তাঁরা পানসুপারি ব্যবহার করে থাকতে পারেন।
এখানেই তৈরি হয় এক নির্মম বৈপরীত্য। পানসুপারি হয়তো ব্যথা কমাত, কিন্তু দীর্ঘদিনের ব্যবহারে দাঁতের ক্ষয় আরও বাড়ত। দাঁতের সমস্যা যত বাড়ত, ব্যথা কমানোর জন্য পানসুপারির ওপর নির্ভরশীলতাও তত বাড়তে পারত। অর্থাৎ যে অভ্যাস সাময়িক স্বস্তি দিত, সেটিই ধীরে ধীরে দাঁতের স্থায়ী ক্ষতির কারণ হয়ে উঠত।
এর আগে গবেষকদের ধারণা ছিল, মানুষের নেশাদ্রব্য ব্যবহারের ইতিহাস তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। কৃষির বিকাশের পর, প্রায় ১২ হাজার ৫০০ বছর আগে মানুষ শস্য থেকে মদ বা বিয়ার তৈরি করতে শেখে—এমন ধারণা প্রচলিত ছিল। কিন্তু পানসুপারির নতুন গবেষণা সেই ধারণাকে আরও পেছনে ঠেলে দিয়েছে।
যদি ২৫ হাজার বছর আগেই পানসুপারি ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে বোঝা যায়—কৃষিকাজ শুরু হওয়ার বহু আগে, মানুষ যখন শিকার ও সংগ্রহ করে জীবন ধারণ করত, তখনও তারা উদ্ভিদজাত নেশাদ্রব্যের গুণাগুণ সম্পর্কে জানত। তারা শুধু খাদ্য সংগ্রহ করত না; আশপাশের উদ্ভিদ, বীজ ও ফলের শরীরের ওপর প্রভাবও পর্যবেক্ষণ করত।
মানুষের পাশাপাশি অন্য প্রাণীরাও কখনো কখনো নেশাজাতীয় উদ্ভিদ ব্যবহার করে। বিভিন্ন প্রাণীকে গাঁজানো ফল খেতে বা বিশেষ উদ্ভিদ চিবাতে দেখা গেছে। প্রাচীন মানবগোষ্ঠীও হয়তো খাদ্য, ওষুধ, ব্যথা উপশম এবং আনন্দ—এসবের মধ্যে পার্থক্য না করেই উদ্ভিদ ব্যবহার করত। কোনো উদ্ভিদ খেয়ে যদি ব্যথা কমে বা শরীর চাঙা লাগে, তাহলে সেটি নিয়মিত ব্যবহারের অভ্যাসে পরিণত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
পানসুপারির ইতিহাস আমাদের আরও একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়। নেশাদ্রব্যের ব্যবহার আধুনিক সমাজের আবিষ্কার নয়। মানুষের সঙ্গে উদ্ভিদজাত রাসায়নিকের সম্পর্ক বহু প্রাচীন। প্রাগৈতিহাসিক মানুষও প্রকৃতির ভেতর থেকে এমন উপাদান খুঁজে বের করেছিল, যা তাদের অনুভূতি, ব্যথা ও চেতনায় পরিবর্তন আনতে পারে।
তবে প্রাচীন মানুষের অভ্যাসকে আধুনিক পানসুপারি ব্যবহারের সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা ঠিক হবে না। সময়ের সঙ্গে পান খাওয়ার পদ্ধতি, উপাদান, সামাজিক ব্যবহার ও মাত্রা বদলেছে। বর্তমানে পানসুপারি অনেক অঞ্চলে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হলেও এর স্বাস্থ্যঝুঁকি গুরুতর। নিয়মিত পানসুপারি সেবনের সঙ্গে মুখের বিভিন্ন রোগ, দাঁতের ক্ষয় এবং মুখগহ্বরের ক্যানসারের ঝুঁকি সম্পর্কিত বলে চিকিৎসাবিজ্ঞানে সতর্ক করা হয়।
গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—মানুষের নেশাদ্রব্য ব্যবহারের ইতিহাসকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করা। পানসুপারি হয়তো বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো নিয়মিত ব্যবহৃত নেশাদ্রব্যগুলোর একটি। এর ব্যবহার শুরু হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন মানুষ এখনকার মতো গ্রাম, শহর, কৃষি বা রাষ্ট্র গড়ে তোলেনি। বরফযুগের সেই শিকারি-সংগ্রাহকেরা হয়তো জানতেন না তাঁদের অভ্যাস ভবিষ্যতে কত দীর্ঘ ইতিহাস তৈরি করবে।
আজকের দিনে পানসুপারি আমাদের কাছে পরিচিত ও সহজলভ্য। কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে আছে মানুষের অভিযোজন, কৌতূহল, ব্যথা থেকে মুক্তির চেষ্টা এবং নেশার প্রতি আকর্ষণের হাজার বছরের গল্প। প্রাচীন দাঁতের ক্ষয় সেই গল্পের নীরব সাক্ষী। সেই সাক্ষ্য বলছে—মানুষ শুধু সভ্যতা গড়ার ইতিহাসই বহন করে না; নেশা, অভ্যাস ও স্বাস্থ্যঝুঁকির ইতিহাসও বহন করে আসছে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে।
আপনার মতামত জানানঃ