
বিশ্বব্যবস্থা বদলানোর কথা বহুদিন ধরেই বলা হচ্ছে। কিন্তু পরিবর্তনটি এখন আর শুধু কূটনৈতিক বক্তৃতা বা সম্মেলনের ঘোষণায় সীমাবদ্ধ নেই। বাণিজ্যপথ, জ্বালানি সরবরাহ, প্রযুক্তির মানদণ্ড, উন্নয়ন অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের পদ্ধতি—সব ক্ষেত্রেই পুরোনো কেন্দ্রগুলোর পাশাপাশি নতুন কেন্দ্র তৈরি হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান মঞ্চগুলোর একটি হয়ে উঠেছে ব্রিকস।
নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের অষ্টাদশ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন সেই রূপান্তরকে আরও স্পষ্ট করেছে। সম্প্রসারিত জোট এখন ১১টি উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিকে একত্র করেছে। ব্রিকসের সরকারি হিসাবে সদস্যদেশগুলো বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। এবারের দিল্লি ঘোষণায় স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জাতীয় পেমেন্ট ব্যবস্থার আন্তঃসংযোগ, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ভূমিকা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। BRICS 2026, নয়াদিল্লি ঘোষণা
এই বৃহৎ পরিবর্তনের মানচিত্রে বাংলাদেশের প্রশ্নটি তাই স্বাভাবিক: দেশটি কি ব্রিকসের দিকে যাবে, পশ্চিমা বাজারের ওপর নির্ভরতা বজায় রাখবে, নাকি দুই বলয়ের মাঝখানে নিজস্ব জায়গা তৈরি করবে?
ব্রিকস বড় হচ্ছে, কিন্তু একরকম হচ্ছে না
ব্রিকসকে অনেক সময় পশ্চিমা বিশ্বের বিপরীতে দাঁড়ানো একটি সুসংহত জোট হিসেবে তুলে ধরা হয়। বাস্তবতা আরও জটিল। ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা আছে। চীন ও রাশিয়া পশ্চিমা প্রভাব দ্রুত কমাতে চায়; ভারত একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গেও গভীর সম্পর্ক রাখে। সৌদি আরব, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আঞ্চলিক স্বার্থও সব ক্ষেত্রে এক নয়।
ফলে ব্রিকস এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো অভিন্ন বাজার নয়, ন্যাটোর মতো প্রতিরক্ষা জোটও নয়। এর কোনো একক পররাষ্ট্রনীতি, অভিন্ন শুল্কনীতি বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক নেই। সিদ্ধান্ত গ্রহণে ঐকমত্যের প্রয়োজন হওয়ায় দ্রুত ও বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নেওয়াও কঠিন।
তবু জোটটির গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। কারণ ব্রিকস এমন দেশগুলোকে একই টেবিলে বসাচ্ছে, যাদের হাতে বিপুল বাজার, জ্বালানি, কাঁচামাল, উৎপাদনক্ষমতা ও প্রযুক্তি রয়েছে। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর দাবিও এই মঞ্চে রাজনৈতিক ওজন পাচ্ছে।
২০০৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর পারস্পরিক পণ্যবাণিজ্য ১৩ গুণের বেশি বেড়েছে। তবে এই বাণিজ্যের কেন্দ্রে এখনো চীন—যা জোটটির শক্তি যেমন, ভারসাম্যহীনতার উৎসও তেমন। UNCTAD
বাংলাদেশের অবস্থান: বাইরে, আবার পুরোপুরি বাইরে নয়
বাংলাদেশ ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য বা অংশীদার দেশ নয়। কিন্তু ২০২১ সাল থেকে দেশটি ব্রিকস প্রতিষ্ঠিত নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সদস্য।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকের সদস্য হওয়া মানে অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের একটি অতিরিক্ত দরজা পাওয়া; এটি ব্রিকসের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেওয়ার সমান নয়। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক
অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ অবশ্য বহু আগেই ব্রিকস বলয়ের সঙ্গে যুক্ত। চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম আমদানি উৎসগুলোর একটি এবং বড় অবকাঠামো ও শিল্প সরঞ্জাম সরবরাহকারী। ভারত নিকটতম বৃহৎ বাজার, গুরুত্বপূর্ণ স্থলবাণিজ্য অংশীদার এবং বিদ্যুৎ, পরিবহন ও আঞ্চলিক সংযোগের কেন্দ্র। রাশিয়ার সঙ্গে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক তৈরি করেছে।
ব্রাজিল থেকে চিনি, সয়া ও কৃষিপণ্য আসে; উপসাগরীয় অর্থনীতিগুলো বাংলাদেশের জ্বালানি, বিনিয়োগ ও প্রবাসী শ্রমবাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি আয়—বিশেষত তৈরি পোশাক—এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় বাজারনির্ভর। উন্নয়ন সহযোগিতা, ব্যাংকিং, প্রযুক্তি, মাননিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও ডলার ও পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্ব গভীর।
ফলে বাংলাদেশের জন্য ‘ব্রিকস বনাম পশ্চিম’—এমন দ্বৈত পছন্দ বাস্তবসম্মত নয়। একটি দিক বেছে অন্যটি ত্যাগ করলে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাই দুর্বল হতে পারে।
নতুন উন্নয়ন অর্থায়নের সুযোগ
বাংলাদেশের সবচেয়ে বাস্তব সুযোগ নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংককে ঘিরে। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর পাশাপাশি আরেকটি অর্থায়ন উৎস থাকলে প্রকল্প বাছাই এবং ঋণের শর্ত নিয়ে সরকারের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়তে পারে।
জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নগর পরিবহন, পানি ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল সংযোগে এই ব্যাংকের অর্থায়ন কাজে লাগতে পারে।
তবে নতুন উৎস মানেই সস্তা বা ঝুঁকিমুক্ত ঋণ নয়। বৈদেশিক মুদ্রায় নেওয়া ঋণ শেষ পর্যন্ত রপ্তানি আয় বা রিজার্ভ থেকেই পরিশোধ করতে হয়। প্রকল্পের আর্থিক ফলন দুর্বল হলে ঋণদাতা বদলালেও দায় বদলায় না।
তাই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, উন্মুক্ত দরপত্র, পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং ঋণচুক্তি প্রকাশ ছাড়া ‘বিকল্প অর্থায়ন’ নতুন ধরনের নির্ভরতায় পরিণত হতে পারে।
স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য: সম্ভাবনা আছে, জাদু নেই
ব্রিকসের আলোচনায় সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ডলারের বিকল্প। দিল্লি সম্মেলন স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং পেমেন্ট ব্যবস্থার আন্তঃসংযোগ এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছে। ভারত ব্রিকস দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল মুদ্রা সংযুক্ত করে সীমান্তপারের লেনদেন সহজ করার প্রস্তাবও দিয়েছে। কিন্তু একটি অভিন্ন ব্রিকস মুদ্রা এখনো বাস্তব ব্যবস্থা নয়। রয়টার্স
বাংলাদেশ সীমিত পরিসরে রুপি, ইউয়ান বা অন্য মুদ্রায় লেনদেন বাড়ালে ডলারের তাৎক্ষণিক চাহিদা কিছুটা কমতে পারে। নিষ্পত্তি দ্রুত হতে পারে এবং কিছু লেনদেন ব্যয়ও কমতে পারে।
কিন্তু বাংলাদেশ যেসব দেশ থেকে বেশি আমদানি করে, তাদের কাছে সমপরিমাণ পণ্য রপ্তানি না করলে স্থানীয় মুদ্রা জমা হবে না। তখন ঘাটতি মেটাতে আবার ডলার বা অন্য রূপান্তরযোগ্য মুদ্রার প্রয়োজন পড়বে।
আরও বড় প্রশ্ন হলো বিনিময় হার, মুদ্রার তারল্য এবং ব্যবসায়ীর আস্থা। ডলারকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে রাতারাতি সরানো যায় না; এর পেছনে গভীর আর্থিক বাজার, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও সহজে রূপান্তরের সুবিধা আছে।
বাংলাদেশের সেরা পথ তাই ডলার বর্জন নয়, বরং নির্বাচিত বাণিজ্যে বিকল্প নিষ্পত্তি ব্যবস্থা পরীক্ষার মাধ্যমে ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়া।
রপ্তানির নতুন বাজার—কিন্তু দরজা নিজে খুলবে না
সম্প্রসারিত ব্রিকস বাংলাদেশের জন্য বিপুল ভোক্তা বাজারের সম্ভাবনা দেখায়। পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়া ও পাটজাত পণ্য, সিরামিক, হালকা প্রকৌশল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং তথ্যপ্রযুক্তি সেবার বাজার বাড়ানো সম্ভব।
আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিকসের নেটওয়ার্ক বাংলাদেশি ব্যবসার নতুন প্রবেশপথও হতে পারে।
কিন্তু সদস্যপদ বা রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাজার দেয় না। শুল্ক, মানসনদ, পরিবহন খরচ, ব্যাংকিং চ্যানেল, ভাষা, বিপণন এবং দূতাবাসের বাণিজ্যিক সক্ষমতা—প্রতিটি বাধা আলাদাভাবে মোকাবিলা করতে হবে।
বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামো যদি পোশাকনির্ভরই থাকে, তবে নতুন কোনো জোটে প্রবেশ করেও অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য আসবে না।
ভারত–চীন প্রতিযোগিতার মাঝখানে ঢাকা
ব্রিকস বাংলাদেশের জন্য সুযোগ তৈরি করলেও সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি ভূরাজনৈতিক। ভারত বাংলাদেশের ভৌগোলিকভাবে অনিবার্য প্রতিবেশী; নদী, সীমান্ত, বিদ্যুৎ, ট্রানজিট ও নিরাপত্তায় দুই দেশ পরস্পর যুক্ত। চীন আবার অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, উৎপাদন ও বাণিজ্যে বড় অংশীদার।
এই দুই শক্তি ব্রিকসের একই টেবিলে থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের প্রতিযোগিতা শেষ হয়নি।
ঢাকার ভুল হবে কোনো এক পক্ষের প্রকল্পকে অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে কৌশলগত বার্তা হিসেবে ব্যবহার করা। সঠিক নীতি হবে প্রকল্পভিত্তিক স্বচ্ছ মানদণ্ড নির্ধারণ: কোন বিনিয়োগে প্রযুক্তি হস্তান্তর হবে, স্থানীয় কর্মসংস্থান তৈরি হবে, ঋণ টেকসই থাকবে এবং জাতীয় নিরাপত্তা সুরক্ষিত হবে—সিদ্ধান্ত হবে তার ভিত্তিতে।
ভারসাম্য মানে দুই পক্ষকে সমান প্রকল্প দেওয়া নয়; ভারসাম্য মানে বাংলাদেশের স্বার্থকে স্থায়ী মাপকাঠি করা।
জলবায়ু ও জ্বালানির দ্বৈত বাস্তবতা
দিল্লি ঘোষণায় ন্যায়সংগত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জ্বালানি রূপান্তরের পাশাপাশি উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে জীবাশ্ম জ্বালানির চলমান ভূমিকাও স্বীকার করা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এই অবস্থান পরিচিত।
দেশটির শিল্প ও বিদ্যুৎ এখনো গ্যাস, তেল ও কয়লার ওপর নির্ভরশীল; একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অভিযোজন অর্থায়ন জরুরি।
ব্রিকস দেশগুলোর কাছ থেকে সস্তা জ্বালানি নেওয়া স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অবকাঠামো বাড়ালে আমদানি ঝুঁকি ও কার্বন ব্যয় আটকে যেতে পারে।
বিশেষ করে ইউরোপের পরিবেশ ও কার্বনসংক্রান্ত বাজারনীতি কঠোর হলে বাংলাদেশের রপ্তানিও চাপে পড়তে পারে। তাই ব্রিকসের অর্থায়নকে সৌরবিদ্যুৎ, গ্রিড আধুনিকায়ন, সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং দুর্যোগ সহনশীলতায় আনার কূটনীতি প্রয়োজন।
AI ও প্রযুক্তিতে আরেকটি নির্ভরতার আশঙ্কা
২০২৬ সালের সম্মেলনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতা নতুন গুরুত্ব পেয়েছে; চীন ব্রিকস AI ওপেন সোর্স জোনসহ কয়েকটি উদ্যোগের কথা বলেছে। বাংলাদেশের জন্য এটি ভাষাভিত্তিক AI, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা ও সরকারি সেবায় কম খরচে প্রযুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। রয়টার্স
কিন্তু ‘ওপেন সোর্স’ নামটি একাই প্রযুক্তিগত স্বাধীনতার নিশ্চয়তা নয়। ডেটা কোথায় থাকবে, মডেলের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, সাইবার নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে এবং বাংলা ভাষার তথ্য কে ব্যবহার করবে—এসব প্রশ্ন অপরিহার্য।
যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে যদি কেবল অন্য একটি রাষ্ট্রের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়, তবে সেটি বহুমুখীকরণ নয়। বাংলাদেশের প্রয়োজন আন্তঃকার্যকর ব্যবস্থা, দেশীয় গবেষণা এবং শক্তিশালী ডেটা সুরক্ষা আইন।
সদস্যপদ কি এখনই প্রয়োজন?
ব্রিকসের সদস্য হলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যমানতা এবং বৃহৎ উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগ বাড়তে পারে। বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান সংস্কার, জলবায়ু অর্থায়ন এবং বাণিজ্যনীতি নিয়ে যৌথ কণ্ঠস্বরও লাভজনক হতে পারে।
কিন্তু সদস্যপদ নিজে কোনো অর্থনৈতিক পুরস্কার নয়। এতে মুক্তবাণিজ্যের নিশ্চয়তা, জরুরি আর্থিক সহায়তার স্বয়ংক্রিয় অধিকার কিংবা রাজনৈতিক বিরোধে সমর্থনের প্রতিশ্রুতি নেই।
বরং আগে নির্ধারণ করা দরকার, বাংলাদেশ ব্রিকস থেকে ঠিক কী চায়। যদি লক্ষ্য হয় ঋণ, তা NDB সদস্য হিসেবেও চাওয়া যায়। যদি লক্ষ্য হয় বাজার, তবে দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি বেশি কার্যকর হতে পারে। যদি লক্ষ্য হয় রাজনৈতিক মর্যাদা, তবে দেখতে হবে সেই পরিচয় অন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক ও দেশের কূটনৈতিক স্বাধীনতায় কী প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশের জন্য পাঁচটি বাস্তব অগ্রাধিকার
বাংলাদেশের এখন কোনো শিবিরে যোগদানের ভাষার বদলে অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণের নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।
NDB অর্থায়নের জন্য জলবায়ু, পরিবহন ও জ্বালানি খাতে স্বচ্ছ এবং আয়সক্ষম প্রকল্প প্রস্তুত করতে হবে। স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন সীমিত পরীক্ষামূলক কর্মসূচি হিসেবে চালিয়ে তার ফলাফল প্রকাশ করা দরকার।
ব্রিকস বাজারে রপ্তানি বাড়াতে দেশভিত্তিক সম্ভাব্য পণ্য, শুল্ক ও অশুল্ক বাধার তালিকা তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে ভারত, চীন কিংবা পশ্চিমা অংশীদার—সবার ক্ষেত্রে অভিন্ন ঋণ, দরপত্র, ডেটা ও নিরাপত্তা মানদণ্ড প্রয়োগ করা জরুরি।
নতুন বিশ্বব্যবস্থায় ছোট দেশ মানেই অসহায় দেশ নয়। বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা ছোট রাষ্ট্রের জন্য দরকষাকষির জায়গা তৈরি করে—যদি সেই রাষ্ট্রের লক্ষ্য পরিষ্কার, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী এবং সিদ্ধান্ত স্বচ্ছ হয়।
কিন্তু নীতি যদি কেবল তাৎক্ষণিক ঋণ, রাজনৈতিক স্বীকৃতি বা কোনো বড় শক্তিকে সন্তুষ্ট করার প্রয়োজন দিয়ে পরিচালিত হয়, তবে বহুমেরু বিশ্ব স্বাধীনতা নয়; বহু দিকের নির্ভরতা তৈরি করবে।
বাংলাদেশের সামনে তাই প্রশ্নটি শুধু ব্রিকসে জায়গা পাওয়া নয়। আসল প্রশ্ন—বাংলাদেশ কি নিজের অর্থনৈতিক শক্তি, রপ্তানি বৈচিত্র্য, প্রযুক্তি সক্ষমতা ও কূটনৈতিক স্বায়ত্তশাসন এমনভাবে গড়ে তুলতে পারবে, যাতে যেকোনো জোটের সঙ্গে সম্পর্ক তার জাতীয় স্বার্থকে শক্তিশালী করে?
নতুন বিশ্বব্যবস্থায় জায়গা কেউ উপহার দেয় না; সক্ষমতা, কৌশল ও দরকষাকষির মাধ্যমে সেই জায়গা তৈরি করতে হয়।
আপনার মতামত জানানঃ