নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬৫ জনে দাঁড়িয়েছে। একই ঘটনায় এখনো ৮২৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত নেপালের সরকারি হিসাব অনুযায়ী এসব তথ্য পাওয়া গেছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নেপালের উত্তরাঞ্চলীয় রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত হয়। পাহাড়ি নদীতে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি, কাদা ও পাথরের ঢল নেমে আসায় রাসুয়া ছাড়াও নুওয়াকোট, ধাদিং, গোরখা, চিতওয়ান, তানাহুন এবং নওয়ালপরাসি এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নদীর স্রোতে বাড়িঘর, সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন অবকাঠামো ভেসে গেছে বা কাদার নিচে চাপা পড়েছে।
উদ্ধার করা ১৬৫টি মরদেহের মধ্যে চিতওয়ানে ৬৫টি, ধাদিংয়ে ২৭টি, নওয়ালপরাসি ইস্টে ২৬টি, গোরখায় ২০টি, নুওয়াকোটে ১২টি, তানাহুনে ৯টি, নওয়ালপরাসি ওয়েস্টে ৫টি এবং রাসুয়ায় ২টি মরদেহ পাওয়া গেছে। অনেক মরদেহ নদীর স্রোতে ভেসে দুর্গত এলাকার অনেক দূরে গিয়ে পাওয়া যাচ্ছে। ফলে নিখোঁজদের সন্ধানে নদীর নিম্নাঞ্চলেও ব্যাপক তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা। সরকারি হিসাবে ৮২৬ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৫৭৯ জন পর্যটক, যার মধ্যে ৪৬৬ জন বিদেশি নাগরিক এবং ১১৩ জন নেপালি। ফলে এই দুর্যোগে শুধু নেপালের স্থানীয় মানুষই নয়, বিভিন্ন দেশের পর্যটকরাও ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
নিখোঁজদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও রয়েছেন। নেপালি সেনাবাহিনীর ৪৪ জন, নেপাল পুলিশের ২৮ জন এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ১৩ জন সদস্য এখনো নিখোঁজ। রাসুয়া ও নুওয়াকোটের ১৬২ জন বাসিন্দারও কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
দুর্যোগের পরপরই উদ্ধার অভিযান শুরু হলেও দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, ধ্বংসপ্রাপ্ত সড়ক এবং প্রবল নদীর স্রোতের কারণে উদ্ধারকারীদের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। নেপাল সেনাবাহিনী ও অন্যান্য উদ্ধারকারী দল হেলিকপ্টার ব্যবহার করে দুর্গত এলাকায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। এখন পর্যন্ত ১০৪ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে সরকারি তথ্য জানিয়েছে।
এদিকে এই বিপর্যয়ের প্রভাব নেপালের সীমান্ত ছাড়িয়ে চীনের তিব্বতেও পড়েছে। তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। সেখানে তিনজনের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে। অর্থাৎ নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা ১ হাজার ৩৮৪-এ পৌঁছেছে।
প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে ভূমিকম্পের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানায়, এটি আসলে হিমবাহের একটি অংশ ধসে পড়া ও তার সঙ্গে শিলা-বরফের বিশাল ধসের ফলে সৃষ্ট কম্পন ছিল। সেই ধস নদীতে বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ, কাদা ও পাথর নামিয়ে দেয়। এরপর তৈরি হয় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা।
বন্যার পানির সঙ্গে ভেসে আসা কাদা ও পাথর পুরো জনপদকে মুহূর্তের মধ্যে বিপর্যস্ত করে দেয়। কোথাও বাড়িঘর পুরোপুরি কাদার নিচে চাপা পড়েছে, কোথাও শুধু বাড়ির ছাদ দেখা যাচ্ছে। নদীর স্রোতে যানবাহন ও স্থাপনা ভেসে যাওয়ার দৃশ্যও প্রকাশ পেয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় নিখোঁজদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
দুর্যোগে নেপালের বিদ্যুৎ অবকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ মিলিয়ে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দেশটির বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
বিদেশি পর্যটকদের নিখোঁজের ঘটনায় বিভিন্ন দেশের সরকারও উদ্বেগ জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, যুক্তরাজ্য ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। ফলে নেপালের স্থানীয় উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নিখোঁজ পর্যটকদের সন্ধানে তৎপরতা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে জরুরি মানবিক সহায়তার জন্য ৫ লাখ ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
দুর্যোগের পর উদ্ধারকাজের পাশাপাশি দুর্গত মানুষের জন্য খাবার, পানি, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেসব এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, সেখানে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। একই সঙ্গে নদীর পানি ও ভূমিধসের নতুন ঝুঁকি থাকায় উদ্ধারকারী দলকেও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে।
নেপালের এই দুর্যোগে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও সহায়তার প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা এখন দুর্গত মানুষদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে উদ্ধার অভিযান এখনো শেষ হয়নি। ফলে ১৬৫ জনের মৃত্যুর বর্তমান সংখ্যা চূড়ান্ত নয়। ৮২৬ জন নিখোঁজ থাকায় সামনে আরও মরদেহ উদ্ধারের আশঙ্কা যেমন রয়েছে, তেমনি জীবিত অবস্থায় নিখোঁজদের উদ্ধারের আশাও রয়েছে। কর্তৃপক্ষ তাই উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান আরও জোরদার করেছে।
নেপালের এই ভয়াবহ বন্যা আবারও দেখিয়ে দিল, হিমালয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক দুর্যোগ কত দ্রুত ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। একটি হিমবাহধস থেকে সৃষ্টি হওয়া পানির ঢল কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জনপদ, সড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে মানুষের জীবনে। এখন পর্যন্ত ১৬৫ জনের মৃত্যু এবং ৮২৬ জনের নিখোঁজ থাকার তথ্যই বলে দিচ্ছে, নেপাল কতটা ভয়াবহ এক দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উদ্ধার অভিযান যত এগোবে, এই বিপর্যয়ের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ততই স্পষ্ট হবে।
আপনার মতামত জানানঃ