বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আধুনিকায়নের আলোচনায় চীনের তৈরি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান এখন আর কেবল সম্ভাব্য একটি ক্রয়প্রস্তাবের নাম নয়; এটি ধীরে ধীরে দেশের প্রতিরক্ষা নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় পরিণত হচ্ছে। মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, জে-১০সিইসহ বিভিন্ন ধরনের আধুনিক যুদ্ধবিমান, অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ভিআইপি হেলিকপ্টার ও ইউএভি ব্যবস্থা সংগ্রহের কার্যক্রম চলছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জে-১০সিই কেনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কমিটির মাধ্যমে আলোচনা ও দর-কষাকষি এগিয়ে গেছে এবং চুক্তির খসড়াও প্রস্তুত করা হয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টি এখন নিছক আগ্রহ প্রকাশের পর্যায়ে নেই; ক্রয়প্রক্রিয়া বাস্তব আলোচনার দিকে এগিয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এই উদ্যোগের গুরুত্ব বুঝতে হলে প্রথমে বিমান বাহিনীর বর্তমান অবস্থানটি দেখতে হয়। দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে চীনা উৎসের যুদ্ধবিমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে পুরোনো প্রজন্মের যুদ্ধবিমান দিয়ে ভবিষ্যতের আকাশযুদ্ধের চাহিদা পূরণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। আধুনিক যুদ্ধবিমান এখন শুধু দ্রুত উড়তে পারে বা দূরপাল্লার অস্ত্র বহন করতে পারে—এতটুকু দিয়ে তার সক্ষমতা বিচার করা হয় না। রাডার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা, ডেটা লিংক, সেন্সর, ক্ষেপণাস্ত্র, পাইলটের situational awareness এবং বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সমন্বিতভাবে যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা একটি আধুনিক যুদ্ধবিমানের কার্যকারিতা নির্ধারণ করে। জে-১০সিই সেই পরিবর্তিত যুদ্ধধারণার সঙ্গে বাংলাদেশের বিমান বাহিনীকে যুক্ত করার সম্ভাবনা তৈরি করছে।
জে-১০সিই মূলত চীনের জে-১০সি যুদ্ধবিমানের রপ্তানি সংস্করণ। এটি ৪.৫ প্রজন্মের মাল্টিরোল ফাইটার হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই প্ল্যাটফর্মে আধুনিক অ্যাভিওনিকস, AESA রাডার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা এবং দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা রয়েছে। ফলে এটি শুধু আকাশে অন্য যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য নয়; নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধেও বিভিন্ন ধরনের মিশন পরিচালনা করতে পারে। বাংলাদেশের মতো সীমিত ভূখণ্ডের একটি দেশের জন্য এই বহুমুখী সক্ষমতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একই প্ল্যাটফর্মকে বিভিন্ন ধরনের প্রতিরক্ষা মিশনে ব্যবহার করার সুযোগ পাওয়া যায়।
তবে জে-১০সিই নিয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ আজকের আলোচনায় হঠাৎ তৈরি হয়নি। ২০২৪ সালের শেষদিকে বাংলাদেশের সামরিক প্রতিনিধিদের চীনে নতুন মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান ও অ্যাটাক হেলিকপ্টার সংগ্রহের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার খবর প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালে চীনের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনাতেও মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট সংগ্রহের বিষয়টি উঠে আসে। এরপর ২০২৫ সালের অক্টোবরে The Business Standard সরকারি নথির ভিত্তিতে জানায়, বাংলাদেশ ২০টি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার জন্য প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলারের একটি সম্ভাব্য কর্মসূচি বিবেচনা করছে। ওই প্যাকেজে শুধু বিমান নয়, প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবহন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রতিবেদনে সম্ভাব্য সংখ্যা ২০ থেকে ২৪টি পর্যন্ত হতে পারে বলে উঠে এসেছে। কিন্তু এখানেই একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি—চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর না হওয়া পর্যন্ত বিমানসংখ্যা, অস্ত্রের প্যাকেজ, মোট ব্যয় এবং সরবরাহের সময়সূচিকে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। সামরিক সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে প্রাথমিক প্রস্তাব, দর-কষাকষির পর্যায়ের সংখ্যা এবং চূড়ান্ত চুক্তির সংখ্যা এক নাও হতে পারে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, চূড়ান্ত কনফিগারেশন ও চুক্তি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এসব বিষয় আলোচনাধীন হিসেবেই দেখা উচিত।
তাহলে প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের আগ্রহের কেন্দ্রে জে-১০সিই কেন?
এর একটি বড় কারণ অর্থনীতি। আধুনিক পশ্চিমা যুদ্ধবিমানগুলোর দাম শুধু বিমান কেনার মূল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রশিক্ষণ, অস্ত্র, খুচরা যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ, অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি লজিস্টিক সহায়তা মিলিয়ে একটি যুদ্ধবিমান কর্মসূচির মোট ব্যয় অনেক বেড়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য একই সঙ্গে আধুনিক যুদ্ধক্ষমতা অর্জন এবং প্রতিরক্ষা বাজেটের ওপর চাপ নিয়ন্ত্রণ করা বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের সরকারি নথিভিত্তিক প্রতিবেদনে ২০টি জে-১০সিইসহ সংশ্লিষ্ট প্যাকেজের মোট ব্যয় প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল, যেখানে বিমানগুলোর পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য সহায়ক ব্যয় ধরা হয়েছিল।
অন্যদিকে, জে-১০সিই নিয়ে বাংলাদেশের আগ্রহের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘাত। ওই সংঘাতে পাকিস্তানের ব্যবহৃত চীনা জে-১০ যুদ্ধবিমান আন্তর্জাতিক সামরিক পর্যবেক্ষকদের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। Reuters-এর প্রতিবেদনে দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়েছিল, পাকিস্তানের জে-১০ অন্তত দুটি ভারতীয় সামরিক বিমান ভূপাতিত করেছিল এবং অন্তত একটি ছিল ফরাসি তৈরি রাফাল। তবে ভারতের পক্ষ থেকে সে সময় এই দাবির বিষয়ে নিশ্চিত স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে কোন অস্ত্র কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল এবং সংঘর্ষের প্রকৃত পরিস্থিতি কী ছিল, তা নিয়ে আরও বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
এই জায়গাটিই জে-১০সিইকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সতর্কতার দাবি রাখে। একটি যুদ্ধবিমান কোনো যুদ্ধে সফলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে—এমন খবর তার সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হতে পারে, কিন্তু একটি যুদ্ধের ফলাফল দিয়ে পুরো বিমানটির সামগ্রিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা যায় না। যুদ্ধের ফল নির্ভর করে শুধু বিমানের ওপর নয়; পাইলটের প্রশিক্ষণ, রাডার ও গোয়েন্দা তথ্য, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র, কৌশল এবং পরিস্থিতিগত সুবিধা—সবকিছুর ওপর। Reuters-ও ২০২৫ সালের সংঘাতের পর উল্লেখ করেছিল যে ওই যুদ্ধ বিমান, পাইলট ও আকাশযুদ্ধের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার বাস্তব কর্মক্ষমতা বিশ্লেষণের একটি বিরল সুযোগ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাই আসল প্রশ্ন শুধু ‘জে-১০সিই কতটা শক্তিশালী’ নয়। বরং প্রশ্ন হলো, এই বিমানকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করার জন্য বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রয়োজনীয় অবকাঠামো কতটা প্রস্তুত। আধুনিক যুদ্ধবিমান কেনার সঙ্গে সঙ্গে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, সিমুলেটর, রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা, অস্ত্র সংরক্ষণ, রানওয়ে ও ঘাঁটির অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা, রাডার নেটওয়ার্ক এবং কমান্ড কাঠামোকেও আধুনিক করতে হয়। একটি অত্যাধুনিক বিমান যদি পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, অস্ত্র, রক্ষণাবেক্ষণ ও তথ্য-সমর্থন না পায়, তাহলে কাগজে থাকা সক্ষমতা বাস্তব যুদ্ধক্ষমতায় পুরোপুরি রূপান্তরিত হয় না।
এই কারণে জে-১০সিই কেনার সম্ভাবনাকে বাংলাদেশের বিমান বাহিনীর একটি বড় প্রযুক্তিগত রূপান্তরের অংশ হিসেবে দেখা যায়। এটি শুধু পুরোনো বিমান বদলে নতুন বিমান আনার বিষয় নয়; এর সঙ্গে পুরো combat ecosystem পরিবর্তনের প্রশ্ন জড়িত। আধুনিক সেন্সর, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, নেটওয়ার্কভিত্তিক যুদ্ধ এবং beyond-visual-range engagement-এর মতো ধারণা বাংলাদেশের বিমান বাহিনীর কার্যক্রমে আরও বড় ভূমিকা নিতে পারে। সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণেও জে-১০সিই কর্মসূচিকে শুধু কয়েকটি বিমান কেনার পরিবর্তে প্রশিক্ষণ, অস্ত্র, রক্ষণাবেক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা তৈরির একটি সম্ভাব্য ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কূটনীতি। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন উৎস থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছে। বিমান বাহিনীর বর্তমান বহরে চীনা, রুশ ও পশ্চিমা প্রযুক্তির উপস্থিতি রয়েছে। ফলে নতুন যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্ত শুধু সামরিক সক্ষমতার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে ভবিষ্যতের প্রতিরক্ষা সরবরাহব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা এবং কূটনৈতিক সম্পর্কও জড়িয়ে থাকে। চীনা যুদ্ধবিমান বেছে নিলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর হতে পারে। একই সঙ্গে পশ্চিমা বা অন্য উৎসের প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সমন্বয়ের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে যে যুক্তিটি সামনে এসেছে, সেটি হলো জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে স্বাধীনভাবে প্রতিরক্ষা সিদ্ধান্ত নেওয়া। বাস্তবে একটি দেশের প্রতিরক্ষা ক্রয়ের ক্ষেত্রে এই স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ। তবে স্বাধীন সিদ্ধান্তের অর্থ শুধু কোনো একটি দেশের বিমান কেনা নয়; বরং দেশের নিজস্ব প্রয়োজন, বাজেট, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত সামঞ্জস্য, যুদ্ধকৌশল এবং সম্ভাব্য হুমকি বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। কোনো যুদ্ধবিমান রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হতে পারে, কিন্তু সেটি বাংলাদেশের বাস্তব প্রতিরক্ষা প্রয়োজনের সঙ্গে কতটা মানানসই—শেষ পর্যন্ত সেটিই হওয়া উচিত মূল প্রশ্ন।
এখানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতাও উপেক্ষা করা যায় না। প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য প্যাকেজ একটি বড় অঙ্ক। শুধু বিমান কেনার সময়কার ব্যয় নয়, আগামী কয়েক দশকে এসব বিমানের উড্ডয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ, ইঞ্জিন, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও আপগ্রেডের জন্যও বিপুল অর্থ প্রয়োজন হবে। ফলে কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের সুবিধা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি জীবনচক্র ব্যয় হিসাব করা অপরিহার্য। একটি যুদ্ধবিমান তুলনামূলকভাবে সস্তা কেনা গেলেও তার রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় যদি বেশি হয়, তাহলে কয়েক দশকে মোট ব্যয় অনেক বেড়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুদ্ধবিমান একা আকাশ প্রতিরক্ষা তৈরি করে না। কার্যকর air defence-এর জন্য যুদ্ধবিমানের সঙ্গে স্থলভিত্তিক রাডার, আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র, দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান, কমান্ড সেন্টার, ইউএভি এবং গোয়েন্দা নজরদারি ব্যবস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করতে হয়। তাই জে-১০সিই কেনার পাশাপাশি সরকার যদি ইউএভি, রাডার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ও কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল ব্যবস্থার উন্নয়নও করে, তাহলে পুরো কর্মসূচির বাস্তব মূল্য অনেক বেশি হতে পারে।
আবার আঞ্চলিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ যদি প্রথমবারের মতো উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় আধুনিক ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করে, তাহলে বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ এশিয়ার আকাশক্ষমতার হিসাবেও কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। ভারত ইতোমধ্যে রাফালসহ বিভিন্ন আধুনিক যুদ্ধবিমান পরিচালনা করছে এবং পাকিস্তান চীনা জে-১০সি/জে-১০সিই পরিবার ব্যবহার করছে। ফলে বাংলাদেশের নতুন যুদ্ধবিমান কর্মসূচি শুধু দেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা নয়; আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্য নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি করতে পারে।
তবে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কারও সঙ্গে প্রতিযোগিতা নয়, বরং নিজের আকাশসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আধুনিক যুদ্ধবিমান কেনার যৌক্তিকতা তাই কোনো প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে সামরিক সক্ষমতা দেখানোর মধ্যে নয়; বরং দেশের আকাশসীমা, সমুদ্রসীমা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা তৈরির মধ্যে। একই সঙ্গে যুদ্ধ এড়ানোর কূটনৈতিক সক্ষমতা ও প্রতিরোধ ক্ষমতা—দুটিই একটি আধুনিক প্রতিরক্ষা নীতির অংশ।
জে-১০সিই নিয়ে আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক তাই হয়তো বিমানটির গতি, অস্ত্র বা রাডারের তালিকা নয়। আসল বিষয় হলো বাংলাদেশ আগামী কয়েক দশকের জন্য কেমন বিমান বাহিনী তৈরি করতে চায়। শুধু নতুন বিমান কেনা, নাকি একটি আধুনিক, সমন্বিত এবং টেকসই air power তৈরি করা—সিদ্ধান্তের প্রকৃত গুরুত্ব এখানেই।
সরকারের সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, জে-১০সিই কেনার আলোচনা এখন আরও বাস্তব পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু চূড়ান্ত চুক্তি, বিমানসংখ্যা, অস্ত্রের কনফিগারেশন, মূল্য এবং সরবরাহের সময়সূচি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি তথ্যকে সম্ভাব্য বা আলোচনাধীন হিসেবেই দেখা উচিত। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে জে-১০-এর কথিত সাফল্যকে মূল্যায়ন করার সময়ও রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি স্বাধীন সামরিক বিশ্লেষণ জরুরি।
বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে জে-১০সিই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু একটি যুদ্ধবিমান কখনো একা একটি দেশের প্রতিরক্ষা শক্তি বদলে দেয় না। শক্তিশালী বিমান বাহিনী তৈরি হয় দক্ষ পাইলট, আধুনিক সেন্সর, নির্ভরযোগ্য অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য, কমান্ড ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতার সমন্বয়ে। তাই জে-১০সিই কেনার আলোচনা শেষ পর্যন্ত শুধু ‘চীনা বিমান বনাম ইউরোপীয় বিমান’ বিতর্ক নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা দর্শন, কৌশলগত স্বাধীনতা এবং আকাশসীমার নিরাপত্তা নিয়ে একটি বড় সিদ্ধান্তের সূচনা।
চুক্তি শেষ পর্যন্ত কোন আকার নেয়, কতটি বিমান আসে, কী অস্ত্র ও প্রযুক্তি প্যাকেজের সঙ্গে আসে এবং সেগুলো কতটা কার্যকরভাবে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা যায়—তার ওপরই নির্ভর করবে এই ক্রয় দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় কতটা বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি হলো, বাংলাদেশ আধুনিক যুদ্ধবিমান সংগ্রহের বিষয়ে আর শুধু সম্ভাবনার কথা বলছে না; আলোচনার টেবিলে বসে বাস্তব সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে।
আপনার মতামত জানানঃ