মৃত্যুর পর মানুষের শেষ ঠিকানা একটি কবর। জীবনের সব পরিচয়, ব্যস্ততা, স্বপ্ন আর সংগ্রামের শেষে মানুষ যেখানে শুয়ে থাকে, সেই জায়গাটুকুকেই পৃথিবীর সবচেয়ে মৌলিক মানবিক অধিকারগুলোর একটি মনে করা হয়। কিন্তু গাজায় এখন সেই শেষ আশ্রয়টুকুও ক্রমেই দুর্লভ হয়ে উঠছে। যুদ্ধ শুধু মানুষের ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, স্কুল কিংবা রাস্তাঘাট ধ্বংস করেনি; ধ্বংস করেছে কবরস্থানও। ফলে যারা বেঁচে আছেন, তাঁদের জন্য যেমন নিরাপদ আশ্রয়ের সংকট, মৃতদের জন্যও তেমনি নেই পর্যাপ্ত জায়গা।
২০ বছরের তরুণ ওমর আল-সাওহির কাছে বাবাকে হারানোর বেদনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি নির্মম বাস্তবতা—বাবাকে কোথায় দাফন করবেন? তাঁর বাবা ৪০ বছর বয়সী মোহাম্মদ আল-সাওহি গাজা সিটির জেইতুন এলাকার একটি ছোট রাস্তার পাশের দোকানে চা-কফি বিক্রি করতেন। গত ১০ জুন গলায় গুলি লেগে তাঁর মৃত্যু হয়। যুদ্ধের এই দীর্ঘ সময়ে এমন মৃত্যু গাজায় আর অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু মোহাম্মদের পরিবারের জন্য মৃত্যুর পরের সময়টিও হয়ে ওঠে এক কঠিন সংগ্রাম।
বাবার মরদেহ নিয়ে ওমর যখন জেইতুন কবরস্থানে যান, তখন তাঁর চোখে পড়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য। কবরগুলো এত কাছাকাছি যে নতুন করে আর জায়গা বের করা কঠিন। সারি সারি কবরের মাঝে ফাঁকা জায়গা প্রায় নেই বললেই চলে। অনেক কবরের ওপর নেই প্রচলিত কবরফলক। কোথাও একটি পাথর, কোথাও কাগজে লেখা নাম—এভাবেই চিহ্নিত করা হয়েছে মৃতদের শেষ ঠিকানা।
ওমরের বর্ণনায় সেই দৃশ্য আরও ভারী হয়ে ওঠে। তিনি জানান, কবরস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তাঁর মনে হয়েছে, চারদিকে যেন অসংখ্য কবরের স্তূপ। বালুর নিচে শুয়ে আছেন মানুষ। কোনো কোনো কবর এতটাই অস্থায়ী যে সেখানে শুধু একটি পাথর আর তার সঙ্গে লাগানো একটি কাগজে লেখা মৃত ব্যক্তির নাম। যুদ্ধের আগে মানুষকে যেভাবে সম্মানের সঙ্গে কবর দেওয়া হতো, এখন অনেক ক্ষেত্রেই সেই সুযোগ নেই।
একটি পরিবারের জন্য বাবার দাফনের জায়গা খুঁজে না পাওয়ার এই অভিজ্ঞতা এখন গাজার বহু পরিবারের বাস্তবতা। মোহাম্মোদের পরিবার শেষ পর্যন্ত নতুন কোনো কবরের জায়গা খুঁজে পায়নি। অর্থের সংকটও ছিল। বর্তমানে গাজায় একটি কবরের জন্য প্রায় ৫০০ শেকেল বা ১৬৭ ডলার খরচ হতে পারে। যুদ্ধের মধ্যে যেখানে মানুষের খাবার, পানি, ওষুধ ও আশ্রয়ের নিশ্চয়তাই নেই, সেখানে একটি কবরের জন্য এত টাকা জোগাড় করাও অনেক পরিবারের কাছে অসম্ভব।
শেষ পর্যন্ত ওমরদের পরিবার সিদ্ধান্ত নেয়, নতুন কবর খোঁজার বদলে পরিবারের পুরোনো একটি কবরে বাবাকে দাফন করা হবে। তাঁর দাদার কবরেই জায়গা করে দেওয়া হয় মোহাম্মোদের জন্য। জীবনের শেষ ঠিকানাও সেখানে নতুন করে তৈরি করার সুযোগ হয়নি; বরং পুরোনো কবরের সঙ্গেই যুক্ত হয়েছে আরেকটি দেহের স্মৃতি।
গাজার কবর সংকটের পেছনে রয়েছে যুদ্ধের দীর্ঘ ছায়া। ২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধের ভয়াবহতায় বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। গাজার কর্তৃপক্ষের হিসাবে, নিহতের সংখ্যা ৭৩ হাজার ছাড়িয়েছে। কিন্তু মৃতের সংখ্যা যত বেড়েছে, ততই সংকুচিত হয়েছে তাঁদের জন্য নির্ধারিত জায়গা।
শুধু কবরস্থানের জায়গা কমে যাওয়াই সমস্যা নয়। যুদ্ধের সময় বহু কবরস্থানও ধ্বংস হয়েছে। গাজার ধর্মীয় বিষয়ক ও ওয়াক্ফ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর ৪০টির বেশি কবরস্থান ধ্বংস হয়েছে। বোমাবর্ষণ, স্থাপনা ধসে পড়া এবং সামরিক অভিযানের কারণে অনেক কবরস্থান আর আগের মতো ব্যবহারযোগ্য নেই। কোথাও কবরের ওপর ধ্বংসস্তূপ, কোথাও চারপাশে সামরিক বিধিনিষেধ। ফলে মৃতদের জন্য নির্ধারিত জায়গাও যুদ্ধের আঘাত থেকে রেহাই পায়নি।
গাজার পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বাস্তুচ্যুত মানুষের ঢলে। ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির কারণে লাখ লাখ মানুষ তাঁদের বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। যেসব জায়গা একসময় কবরস্থান হিসেবে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত ছিল, সেগুলোর কিছু এখন বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়স্থল। মানুষের বেঁচে থাকার জায়গা এবং মৃতদের শেষ আশ্রয়ের জায়গা—দুইয়ের মধ্যেই তৈরি হয়েছে তীব্র সংকট।
যুদ্ধের সময় পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে অনেক মৃতকে নিয়মিত কবরস্থানে নেওয়ার সুযোগও পাওয়া যায়নি। বাড়ির আঙিনা, তাঁবু, বাস্তুচ্যুত মানুষের শিবির, স্কুল কিংবা হাসপাতালের প্রাঙ্গণে অস্থায়ীভাবে দাফন করা হয়েছে বহু মানুষকে। কোথাও পরিবারগুলো নিজেরাই মরদেহ মাটিচাপা দিয়েছে। কোথাও নিরাপত্তার ঝুঁকির কারণে কবরস্থান পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে অনেক মৃত মানুষের অবস্থান দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চিত থেকেছে।
পরে যখন সহিংসতা সাময়িকভাবে কিছুটা কমেছে, তখন পরিবারগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ি, ধ্বংসস্তূপ কিংবা অস্থায়ী দাফনস্থল থেকে তাঁদের স্বজনদের মরদেহ উদ্ধার করতে শুরু করে। কিন্তু মরদেহ উদ্ধার করলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। তাঁদের আবার কোথাও নিয়ে গিয়ে যথাযথভাবে দাফন করতে হচ্ছে। অথচ সেই জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা নেই।
হাসপাতালগুলোর প্রাঙ্গণে থাকা গণকবর থেকেও মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। গাজার কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সাতটি গণকবর থেকে ৫২৯ ফিলিস্তিনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। যুদ্ধবিরতির পরও সহিংসতায় নিহত মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকায় দাফনের প্রয়োজনীয় জায়গার ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
এই সংকটের আরেকটি দিক হলো দাফনের খরচ। কবরের জায়গা পাওয়ার পাশাপাশি কবর তৈরি, ফলক ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহের খরচও বেড়েছে। গাজার কর্তৃপক্ষের হিসাবে, এখন একজন মৃত ব্যক্তিকে দাফন করতে ৭০০ থেকে ১ হাজার শেকেল পর্যন্ত খরচ হতে পারে, যা প্রায় ২৩৫ থেকে ৩৩৫ ডলারের সমান। যুদ্ধের কারণে সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় কবরের ফলকসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে।
তাই অনেক পরিবারকে বাধ্য হয়ে বিকল্প উপকরণ ব্যবহার করতে হচ্ছে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবনের ইট-পাথর, কাদা কিংবা ঢেউটিনের টুকরো দিয়ে কবর চিহ্নিত করা হচ্ছে। কখনো একটি পাথরই হয়ে উঠছে কোনো মানুষের পরিচয়ের একমাত্র চিহ্ন। পরে সামর্থ্য হলে অস্থায়ী চিহ্নের জায়গায় স্থায়ী কবরফলক বসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
কবর খননকারীদের জীবনও এই যুদ্ধের ভয়াবহতার একটি আলাদা দলিল হয়ে উঠেছে। ৫০ বছর বয়সী তাফেশ আবু হাতাব গত ১৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে কবর খোঁড়ার কাজ করছেন। কিন্তু তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে গাজার বর্তমান পরিস্থিতির মতো ভয়াবহ সময় তিনি দেখেননি।
খান ইউনিসের যে কবরস্থানে তিনি কাজ করেন, যুদ্ধ শুরুর সময় সেখানে প্রায় ৬০টি কবর ছিল। এখন সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ হাজারে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে তাঁকে প্রতিদিন প্রায় ৩৫টি করে কবর প্রস্তুত করতে হয়েছে। একদিনে কয়েক ডজন মৃতদেহ দাফনের প্রস্তুতি নেওয়া তাঁর কাছে হয়ে উঠেছে নিয়মিত কাজের অংশ।
কবর খোঁড়ার সময় তাফেশের সামনে আসে যুদ্ধের সবচেয়ে নির্মম চিত্রগুলো। তাঁর হাতে দাফন হয়েছে নারী, শিশু, এমনকি নবজাতকের মরদেহও। কোনো কোনো সময় একটি ভবন, গাড়ি বা তাঁবুতে হামলা হলে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের মরদেহ একসঙ্গে কবরস্থানে নিয়ে আসা হয়। ফলে একটি কবর কখনো শুধু একজন মানুষের শেষ ঠিকানা নয়; হয়ে ওঠে একটি পুরো পরিবারের শেষ স্মৃতিচিহ্ন।
সবচেয়ে নির্মম ব্যাপার হলো, যে ধ্বংসস্তূপের নিচে মানুষ চাপা পড়ছে, সেই ধ্বংসস্তূপের উপকরণ দিয়েই পরে তাঁদের কবর তৈরি করতে হচ্ছে। একটি বাড়ি যেখানে কোনো পরিবারের স্বপ্ন, নিরাপত্তা ও জীবন ছিল, সেটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর তার ইট-পাথরই হয়ে উঠছে সেই পরিবারের কারও শেষ কবরের চিহ্ন।
গাজার ওয়াক্ফ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধের আগেই গাজার প্রায় ৬০টি কবরস্থানের অনেকগুলোতে জায়গা ফুরিয়ে এসেছিল। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই সমস্যাটি ছিল। কিন্তু দীর্ঘ যুদ্ধ, ব্যাপক প্রাণহানি, কবরস্থান ধ্বংস এবং বাস্তুচ্যুতির কারণে সেই সংকট এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
নতুন কবরস্থান তৈরি করা তাই এখন জরুরি হয়ে উঠেছে। কিন্তু নতুন জায়গা খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। গাজার ভূমি সংকট, ধ্বংসস্তূপ, বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয় এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি সবকিছুকে জটিল করে তুলেছে। আবার অস্থায়ীভাবে যেসব জায়গায় মানুষকে দাফন করা হয়েছিল, সেখান থেকেও মরদেহ তুলে যথাযথ কবরস্থানে স্থানান্তর করতে হবে। এই কাজও অত্যন্ত সংবেদনশীল। প্রতিটি মরদেহের পরিচয়, পরিবারের সম্মতি, স্থানীয় প্রশাসন এবং ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের সমন্বয় প্রয়োজন।
গাজার বর্তমান কবর সংকট তাই শুধু জায়গার সংকট নয়। এটি একটি সমাজের ভেঙে পড়া অবকাঠামো, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি এবং মানবিক বিপর্যয়ের প্রতিচ্ছবি। যুদ্ধ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কেড়ে নেয়—এ কথা আমরা প্রায়ই শুনি। কিন্তু গাজার বাস্তবতা দেখাচ্ছে, যুদ্ধ কখনো কখনো মৃত্যুর পর মানুষের শেষ সম্মানটুকুও কেড়ে নেয়।
একজন মানুষ মারা যাওয়ার পর তাঁর পরিবারের সবচেয়ে মৌলিক প্রত্যাশা থাকে, প্রিয়জনকে অন্তত সম্মানের সঙ্গে দাফন করা যাবে। গাজায় সেই অধিকারও এখন অনিশ্চিত। কেউ দাদার কবরে বাবাকে দাফন করছেন, কেউ অস্থায়ী কবরের ওপর একটি পাথর রেখে নাম লিখে রাখছেন, কেউ ধ্বংসস্তূপের ইট দিয়ে তৈরি করছেন শেষ ঠিকানা। আর কবর খোঁড়ার শ্রমিকেরা প্রতিদিন নতুন কবর খুঁড়তে খুঁড়তে দেখছেন যুদ্ধের দীর্ঘতম মূল্যটি—মাটির নিচে বাড়তে থাকা মানুষের সংখ্যা।
গাজার আকাশে যুদ্ধের শব্দ হয়তো কোনো একদিন থামবে। ধ্বংসস্তূপ সরানো হবে, ঘরবাড়ি আবার তৈরি হবে, রাস্তা মেরামত হবে, হাসপাতাল পুনর্গঠনের চেষ্টা হবে। কিন্তু কবরগুলো থেকে যাবে। প্রতিটি কবর হয়ে থাকবে একটি নাম, একটি পরিবার, একটি হারিয়ে যাওয়া জীবন এবং একটি অসমাপ্ত গল্পের স্মারক।
মৃত্যুর পর মানুষের আর কোনো দাবি থাকে না। থাকে শুধু একটু মাটি, একটি নাম এবং শেষবারের মতো সম্মানের সঙ্গে বিদায় নেওয়ার অধিকার। গাজায় সেই সামান্য জায়গাটুকুও যখন ফুরিয়ে আসছে, তখন কবরের সংকট আসলে শুধু মৃতদের সংকট নয়—এটি জীবিত পৃথিবীর জন্যও এক গভীর মানবিক প্রশ্ন। যুদ্ধ কতটা ধ্বংস করতে পারে, তার সবচেয়ে নীরব প্রমাণ হয়তো এখন গাজার সেই কবরস্থানগুলোতেই দেখা যাচ্ছে, যেখানে নতুন করে কাউকে শোয়ানোর মতো জায়গাও আর অবশিষ্ট নেই।
আপনার মতামত জানানঃ