
স্পেনের পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি জনপদ মিলারেস। ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের খুব বেশি দূরে নয়, কিন্তু আধুনিক শহরের কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন। এখানকার একটি পাহাড়ের ভেতর ঢুকে গেছে দীর্ঘ এক অন্ধকার গুহা—কোভা দে লেস দোনেস। স্থানীয় ভ্যালেন্সীয় ভাষায় নামটির অর্থ ‘নারীদের গুহা’।
নামটি এত দিন লোককথা কিংবা ভৌগোলিক পরিচয় বলেই মনে করা হয়েছিল। কিন্তু গুহার দুই শতাধিক মিটার ভেতরে পাওয়া সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ইঙ্গিত দিচ্ছে—নামের সঙ্গে প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো এক নারীকেন্দ্রিক ধর্মীয় ঐতিহ্যের সম্পর্ক থাকতে পারে।
গুহার দেয়াল ও ছাদে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা অন্তত ১২০টি লাতিন শিলালিপি শনাক্ত করেছেন। এগুলোর বেশির ভাগ রোমান সাম্রাজ্যের প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীর। কয়েকটি লেখায় নারীদের নাম রয়েছে, পাঁচটি নিবেদন একই নারী-দেবতার উদ্দেশে লেখা এবং তিনটিতে দেখা যাচ্ছে রহস্যময় একটি শব্দ—‘MALACI’।
দেবীকে সরাসরি কোনো পরিচিত রোমান নাম—জুনো, ডায়ানা, মিনার্ভা কিংবা ভেনাস—দিয়ে ডাকা হয়নি। তাঁকে সম্বোধন করা হয়েছে লাতিন শব্দ ‘Domina’ দিয়ে—অর্থাৎ ‘মহীয়সী’, ‘কর্ত্রী’ কিংবা সহজভাবে ‘দ্য লেডি’।
কে ছিলেন এই দেবী? কেন নারীরা আলোহীন গুহার এত গভীরে তাঁর কাছে প্রার্থনা জানাতে যেতেন? ‘MALACI’ কি দেবীর নাম, কোনো বিশেষ উপাধি, নাকি জলের সঙ্গে যুক্ত একটি হারিয়ে যাওয়া স্থানীয় শব্দ?
দুই হাজার বছর পর গুহার দেয়ালের লেখাগুলো যেন রোমান সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক ধর্মের আড়ালে থাকা এক অজানা বিশ্বাসজগতের দরজা খুলে দিয়েছে।
অন্ধকারের ভেতর হারানো উপাসনালয়
কোভা দে লেস দোনেস স্পেনের ভ্যালেন্সিয়া প্রদেশের মিলারেস পৌর এলাকায় অবস্থিত। বাইরে থেকে এটি একটি প্রাকৃতিক চুনাপাথরের গুহা। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করলে দীর্ঘ পথ, সংকীর্ণ গ্যালারি, স্ট্যালাকটাইট-স্ট্যালাগমাইট এবং জল জমে থাকা ছোট ছোট প্রাকৃতিক পুকুরের দেখা মেলে।
গুহার প্রবেশপথ থেকে দুই শতাধিক মিটার ভেতরের একটি নির্দিষ্ট কক্ষে রোমান যুগের শিলালিপিগুলো পাওয়া গেছে। গবেষকেরা স্থানটির নাম দিয়েছেন ‘রোমান স্যাংচুয়ারি’ বা রোমান উপাসনাকক্ষ। দেয়াল ও ছাদজুড়ে ছড়িয়ে থাকা লেখাগুলো প্রবেশপথের আশপাশে নয়; এগুলো একটি সীমাবদ্ধ ও পরিকল্পিত স্থানে কেন্দ্রীভূত।
২০২৪ সালের অভিযানে প্রথমে মাত্র ১৫টি লাতিন শিলালিপি শনাক্ত হয়েছিল। একই এলাকায় সম্রাট ক্লডিয়াসের সময়কার একটি রোমান মুদ্রাও পাওয়া যায়। মুদ্রাটি ছাদের একটি ফাটল ও স্ট্যালাকটাইটের মধ্যবর্তী স্থানে এমনভাবে রাখা ছিল, যা গবেষকদের কাছে ইচ্ছাকৃত ধর্মীয় নিবেদন বলে মনে হয়। ক্লডিয়াস ৪১ থেকে ৫৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রোম শাসন করেছিলেন। ফলে মুদ্রাটি গুহার রোমান ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়চিহ্ন দেয়। ইউনিভার্সিটি অব অ্যালিকান্তের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন
২০২৬ সালের মে ও জুনে পরিচালিত নতুন অনুসন্ধানে শিলালিপির সংখ্যা এক লাফে বেড়ে অন্তত ১২০-এ পৌঁছায়। গবেষক দলের হিসাবে, এটি শুধু রোমান হিস্পানিয়া নয়, গোটা রোমান সাম্রাজ্যের পরিচিত গুহা-উপাসনালয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লাতিন শিলালিপির সমাবেশ হতে পারে। ইউনিভার্সিটি অব অ্যালিকান্তের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা
১২০টি লেখা—কিন্তু সেগুলো কী বলছে?
শিরোনামে এগুলোকে ‘লাতিন বার্তা’ বলা হলেও প্রত্নতাত্ত্বিক অর্থে এগুলো মূলত খোদাই করা শিলালিপি। সব লেখা এখনও পুরোপুরি পাঠোদ্ধার হয়নি। কোনোটি ব্যক্তির নাম, কোনোটি দেবতার উদ্দেশে নিবেদন, আবার কোনোটি সম্ভবত প্রার্থনা, কৃতজ্ঞতা কিংবা প্রতিজ্ঞার সংক্ষিপ্ত প্রকাশ।
রোমান ধর্মীয় সংস্কৃতিতে কোনো দেবতার কাছে মানত, প্রার্থনা বা কৃতজ্ঞতা জানিয়ে স্থায়ী লেখা রেখে যাওয়ার প্রচলন ছিল। কেউ অসুস্থতা থেকে মুক্তি, নিরাপদ সন্তান জন্ম, পারিবারিক মঙ্গল, ভালো ফসল কিংবা ব্যক্তিগত সংকট সমাধানের জন্য দেবতার কাছে নিবেদন করতে পারতেন। ইচ্ছা পূরণ হলে পাথর, ধাতু, মৃৎপাত্র বা উপাসনালয়ের দেয়ালে তাঁর নাম ও কৃতজ্ঞতার বাক্য লেখা হতো।
কোভা দে লেস দোনেসের লেখাগুলোও সেই বৃহত্তর ‘votive inscription’ বা মানত-নিবেদনের ঐতিহ্যের অংশ বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু এখানে দুটি বিষয় একে ব্যতিক্রমী করে তুলেছে।
প্রথমত, লেখাগুলো একটি গুহার গভীরে কেন্দ্রীভূত। এগুলো কোনো নগরের প্রকাশ্য মন্দির, প্রশাসনিক ভবন বা সামরিক স্মৃতিস্তম্ভের লেখা নয়।
দ্বিতীয়ত, এখন পর্যন্ত পাঠোদ্ধার করা লেখাগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি নারীর নাম পাওয়া গেছে। উপাসনালয়ে নারীদের সক্রিয় উপস্থিতির সঙ্গে মাটিতে পাওয়া নারীজীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন বস্তু মিলিয়ে গবেষকেরা মনে করছেন, গুহাটি বিশেষভাবে নারীদের ধর্মীয় চর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।
তবে ১২০টি লেখার প্রতিটিই নারী লিখেছিলেন অথবা স্থানটি পুরুষদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল—এমন সিদ্ধান্ত এখনও প্রমাণিত নয়। গবেষণার ফল প্রাথমিক। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, নারীরা এখানে শুধু দর্শনার্থী ছিলেন না; ধর্মীয় আচার ও নিবেদনে তাঁদের দৃশ্যমান ও সক্রিয় ভূমিকা ছিল।
‘Domina’—নাম নয়, সম্মানের সম্বোধন
পাঠোদ্ধার করা পাঁচটি নিবেদন একটি নির্দিষ্ট নারী-দেবতার উদ্দেশে করা হয়েছে। লেখাগুলোতে তাঁকে ‘Domina’ বলা হয়েছে।
লাতিন ভাষায় domina শব্দটি dominus-এর স্ত্রীলিঙ্গ। এর অর্থ কর্ত্রী, গৃহের সম্মানিত নারী, মহীয়সী কিংবা কোনো উচ্চ মর্যাদার নারী। দেবতার ক্ষেত্রে শব্দটি শ্রদ্ধাপূর্ণ সম্বোধন—বাংলায় ‘মহীয়সী’, ‘অধিষ্ঠাত্রী’ বা ‘আমাদের কর্ত্রী’র কাছাকাছি।
এটি সম্ভবত দেবীর প্রকৃত নাম নয়। উপাসকেরা হয়তো শ্রদ্ধা, গোপনীয়তা কিংবা স্থানীয় ধর্মীয় রীতি অনুসারে তাঁর নামের পরিবর্তে এই উপাধি ব্যবহার করেছিলেন।
রোমান সাম্রাজ্যে এমন ঘটনা অস্বাভাবিক ছিল না। কোনো দেবতার পরিচিত নামের সঙ্গে স্থানীয় উপাধি যুক্ত হতো, আবার কোনো স্থানীয় দেবতাকে রোমান ধর্মীয় ভাষায় নতুনভাবে সম্বোধন করা হতো। সাম্রাজ্যের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে রোম স্থানীয় দেবতাদের সব সময় নির্মূল করেনি; বরং অনেককে রোমান দেবতার সঙ্গে মিলিয়ে, নতুন নাম দিয়ে অথবা স্থানীয় রূপ বজায় রেখে সাম্রাজ্যিক ধর্মব্যবস্থার মধ্যে জায়গা দিয়েছিল।
ফলে কোভা দে লেস দোনেসের ‘Domina’ হয়তো সম্পূর্ণ স্থানীয় কোনো আইবেরীয় দেবী ছিলেন। রোমান শাসনের পর তাঁর উপাসকেরা লাতিন ভাষা গ্রহণ করলেও দেবীর পুরোনো পরিচয় ধরে রেখেছিলেন। আবার তিনি কোনো পরিচিত রোমান দেবীর আঞ্চলিক রূপও হতে পারেন।
কোন ব্যাখ্যাটি সঠিক, তা এখনও জানা যায়নি।
‘MALACI’ শব্দের রহস্য
পাঁচটি নিবেদনের মধ্যে তিনটিতে ‘MALACI’ শব্দটি পড়তে পেরেছেন শিলালিপি বিশেষজ্ঞরা। রোমান দেবতাদের পরিচিত উপাধির তালিকায় এই রূপটি আগে পাওয়া যায়নি। ফলে শব্দটি নিয়ে কয়েকটি সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে।
এটি দেবীর নিজস্ব নাম হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ অজানা এক স্থানীয় নারী-দেবতার পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে।
এটি আবার ‘Domina’র একটি বিশেষ উপাধিও হতে পারে—যেমন কোনো নির্দিষ্ট স্থান, জনগোষ্ঠী, শক্তি বা প্রাকৃতিক উপাদানের অধিষ্ঠাত্রী। রোমান ধর্মে একই দেবীর বিভিন্ন কাজ ও স্থানের জন্য আলাদা উপাধি ব্যবহারের প্রচলন ছিল।
তৃতীয় সম্ভাবনা, শব্দটি জলের সঙ্গে সম্পর্কিত। গুহার উপাসনাকক্ষে প্রাকৃতিকভাবে পানি জমে থাকা ছোট ছোট পুকুর বা gour রয়েছে। সেখানে এবং আশপাশে নিবেদনের বস্তু পাওয়া গেছে। গবেষকেরা তাই দেবীটির সঙ্গে জল, ঝরনা, উর্বরতা, নিরাময় কিংবা নারীর প্রজননজীবনের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা পরীক্ষা করছেন।
তবে গবেষক Silvia Alfayé ও Sergio García-Dils সতর্ক করে বলেছেন, ‘MALACI’র চূড়ান্ত পাঠ এবং অর্থ নিয়ে কাজ এখনও চলছে। জল-সম্পর্কিত ব্যাখ্যাটি আকর্ষণীয় হলেও এখনই তাকে প্রতিষ্ঠিত সত্য বলা যাবে না। ইউনিভার্সিটি অব জারাগোজার গবেষণা-সারাংশ
কেন গুহা হয়ে উঠেছিল দেবীর ঘর?
রোমান সাম্রাজ্যে অধিকাংশ বড় মন্দির ছিল নগর, বাজার, প্রশাসনিক কেন্দ্র কিংবা প্রধান সড়কের পাশে। সেগুলো প্রকাশ্য, স্থাপত্যসমৃদ্ধ এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার দৃশ্যমান প্রতীক ছিল। কিন্তু গুহা-উপাসনালয়ের ধর্মীয় অভিজ্ঞতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
গুহায় ঢোকা মানে পরিচিত পৃথিবী ছেড়ে অন্ধকারের ভেতরে প্রবেশ করা। সূর্যের আলো হারিয়ে যায়, বাইরের শব্দ থেমে যায়, বাতাসের তাপমাত্রা বদলে যায়। পানি পড়ার শব্দ, প্রতিধ্বনি, মশাল বা তেলের প্রদীপের আলো এবং পাথরের অদ্ভুত আকৃতি মানুষের মনে অন্য জগতে প্রবেশের অনুভূতি সৃষ্টি করে।
প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় সংস্কৃতিতে গুহাকে প্রায়ই পৃথিবীর নিচের জগৎ, দেবতার জন্মস্থান, মৃতদের আবাস, ভবিষ্যদ্বাণী কিংবা নিরাময়কারী জলের উৎস হিসেবে দেখা হতো। দেবীর ক্ষেত্রে গুহা আরও গভীর প্রতীকের জন্ম দিতে পারে—পৃথিবীর গর্ভ, জন্ম, উর্বরতা এবং পুনর্জীবন।
কোভা দে লেস দোনেসে স্থায়ী পানির উপস্থিতি সম্ভবত স্থানটির পবিত্রতা বাড়িয়েছিল। পানি আকাশ থেকে পড়ে পাথরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ছোট পুকুরে জমা হচ্ছিল। প্রাচীন উপাসকের কাছে এটি সাধারণ ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া নয়, বরং পৃথিবীর ভেতর থেকে আসা দেবীর আশীর্বাদ বলে মনে হতে পারে।
গবেষক Aitor Ruiz-Redondo মনে করেন, হাজার হাজার বছর ধরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর কাছে গুহাটির গুরুত্ব বজায় থাকার পেছনে স্থায়ী পানি, ভূগর্ভস্থ দৃশ্যপট ও তুলনামূলক সহজ প্রবেশপথ ভূমিকা রাখতে পারে।
আংটি, চরকা ও নারীর জীবনের চিহ্ন
শিলালিপির নিচে ও প্রাকৃতিক জলাধারের কাছে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা দুটি ব্রোঞ্জের আংটি, একটি ব্রেসলেট, পেয়ালার মতো ছোট পাত্র, মৃৎপাত্রের টুকরো, প্রাণীর অবশেষ এবং বহু spindle whorl বা চরকার চাকতি পেয়েছেন।
স্পিন্ডল হোয়ার্ল ছিল সুতা কাটার কাঠের দণ্ডের নিচে লাগানো ছোট গোলাকার ভার। এটি দণ্ডটিকে ঘূর্ণায়মান ও ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে সাহায্য করত। প্রাচীন রোমান সমাজে সুতা কাটা ও বস্ত্র তৈরি প্রধানত নারীর গৃহস্থালি কাজ হিসেবে চিহ্নিত ছিল। ফলে দেবীর কাছে এসব বস্তু রেখে যাওয়া নারীর শ্রম, পরিচয় কিংবা জীবনের বিশেষ কোনো প্রার্থনার প্রতীক হতে পারে।
এগুলো ব্যবহার করা দৈনন্দিন বস্তু ছিল, নাকি বিশেষভাবে উপাসনার জন্য তৈরি—তা আরও পরীক্ষার বিষয়। তবে শিলালিপিতে নারীর নাম এবং একই এলাকায় চরকার বহু চাকতি পাওয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দেখছেন গবেষকেরা।
আংটি ও ব্রেসলেট ব্যক্তিগত নিবেদন হতে পারে। এগুলো মূল্যবান হলেও সম্রাটের ধনভান্ডারের উপযোগী বিপুল সম্পদ নয়। বরং ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহৃত, শরীরের সঙ্গে যুক্ত এবং স্মৃতিবাহী বস্তু। কোনো নারী তাঁর প্রার্থনা পূর্ণ হওয়ার পর নিজের আংটি খুলে দেবীর জলের পাশে রেখে গেছেন—এমন দৃশ্য কল্পনা করা অসম্ভব নয়।
এই ছোট বস্তুগুলোই ইতিহাসকে মানবিক করে তোলে। সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক নথি যেখানে সম্রাট, সেনাপতি ও যুদ্ধের কথা বলে, সেখানে একটি চরকার চাকতি কিংবা ব্রোঞ্জের আংটি সাধারণ নারীর নীরব ধর্মবিশ্বাসের সাক্ষ্য বহন করে।
রোমান ধর্ম কি শুধু পুরুষের জগৎ ছিল?
রোমান সমাজ ছিল পুরুষতান্ত্রিক। রাজনৈতিক ক্ষমতা, সেনাবাহিনী, আইন ও পরিবারের আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব প্রধানত পুরুষের হাতে ছিল। অধিকাংশ সরকারি ধর্মীয় পদও পুরুষরা নিয়ন্ত্রণ করতেন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে নারীরা ধর্মীয় জীবনে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। ভেস্টাল ভার্জিনদের মতো রাষ্ট্রীয় নারী-পুরোহিত ছিলেন, মাতৃত্ব ও উর্বরতার দেবীদের উৎসবে নারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এবং গৃহস্থালি ধর্মে মা ও গৃহকর্ত্রীরা নিয়মিত আচার পালন করতেন।
সমস্যা হলো, নারীদের এসব ধর্মীয় অভিজ্ঞতা লিখিত ইতিহাসে কম সংরক্ষিত হয়েছে। অধিকাংশ প্রাচীন সাহিত্য পুরুষ অভিজাতদের লেখা। জনসমক্ষে নির্মিত বড় শিলালিপিও প্রধানত সম্রাট, কর্মকর্তা ও সম্পদশালী পুরুষদের স্মৃতি ধরে রেখেছে।
কোভা দে লেস দোনেস সেই অসম নথিভান্ডারে বিরল ব্যতিক্রম। এখানে নারীরা নিজেদের নাম পাথরে লিখে গেছেন এবং তাঁদের ব্যবহৃত বস্তু দেবীর কাছে রেখে গেছেন। তাঁরা কোনো পুরুষ ইতিহাসবিদের বর্ণনার বিষয় নন; নিজেরাই ধর্মীয় উপস্থিতির চিহ্ন তৈরি করেছেন।
এ কারণেই আবিষ্কারটি শুধু একটি অজানা দেবীর সন্ধান নয়। এটি রোমান সাম্রাজ্যের সাধারণ নারীরা কীভাবে বিশ্বাস, প্রার্থনা ও ব্যক্তিগত সংকটের মোকাবিলা করতেন, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ।
রোমানদেরও ২৪ হাজার বছর আগে
গুহার ইতিহাস রোমান যুগে শুরু হয়নি। ২০২৩ সালে প্রকাশিত গবেষণায় কোভা দে লেস দোনেসে শতাধিক প্রাগৈতিহাসিক চিত্র ও খোদাইয়ের সন্ধান প্রকাশ করা হয়। এগুলোর কয়েকটি ২৪ হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো এবং গুহাটিকে পূর্ব আইবেরীয় উপদ্বীপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্যালিওলিথিক শিল্পস্থলে পরিণত করেছে।
অর্থাৎ রোমান নারীরা যখন প্রদীপ হাতে গুহায় প্রবেশ করেছিলেন, তখন দেয়ালের কোনো কোনো ছবি ইতোমধ্যে প্রায় ২০ হাজার বছর ধরে সেখানে ছিল।
তাঁরা কি সেই প্রাগৈতিহাসিক চিত্র দেখেছিলেন? সেগুলোর অর্থ বুঝতে পেরেছিলেন? প্রাচীন কোনো দেবতার চিহ্ন ভেবে স্থানটিকে আরও পবিত্র মনে করেছিলেন?
গবেষকেরা এখনও নিশ্চিত নন। কিছু প্রাগৈতিহাসিক চিত্র কাদামাটি ও খনিজ আবরণে অস্পষ্ট হয়ে থাকতে পারে। আবার প্রদীপের আলোয় দৃশ্যমান কোনো অদ্ভুত প্রাণী বা প্রতীক রোমান যুগের দর্শনার্থীদের কল্পনায় নতুন ধর্মীয় অর্থ তৈরি করতে পারে।
২০২৫ সালের অভিযানে গুহার শতাধিক স্ট্যালাগমাইটে ইচ্ছাকৃত মানবীয় পরিবর্তনের চিহ্নও পাওয়া যায়। এগুলোকে speleofact বলা হচ্ছে। ফলে গুহাটি শুধু ছবি আঁকার স্থান নয়; প্রাগৈতিহাসিক মানুষেরা এর ভেতরের ভূদৃশ্যও পরিকল্পিতভাবে পরিবর্তন করেছিলেন।
একই স্থান প্যালিওলিথিক শিকারি-সংগ্রাহক, পরবর্তী প্রাগৈতিহাসিক জনগোষ্ঠী এবং রোমান যুগের উপাসকদের কাছে হাজার হাজার বছর ধরে বিশেষ অর্থ বহন করেছে—এটি কোভা দে লেস দোনেসকে অনন্য করে তুলেছে।
এটি কি সত্যিই গোপন নারীমন্দির ছিল?
সংবাদ শিরোনামে স্থানটিকে ‘নারীদের গোপন মন্দির’ বলা সহজ। কিন্তু গবেষণার বর্তমান পর্যায়ে কিছু সতর্কতা জরুরি।
গুহায় পাওয়া নারীর নাম, চরকার চাকতি এবং নারী-দেবতার নিবেদন থেকে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। কিন্তু শুধু নারীরাই সেখানে যেতে পারতেন—এমন কোনো বিধি বা লিখিত নির্দেশ এখনও পাওয়া যায়নি।
‘MALACI’কে সরাসরি দেবীর ব্যক্তিগত নাম বলা হলেও গবেষক দল এটিকে আপাতত অজানা উপাধি বা appellation হিসেবে বিবেচনা করছে। চূড়ান্ত পাঠ এখনও বাকি।
জলের সঙ্গে দেবীর সম্পর্কও সম্ভাব্য ব্যাখ্যা, প্রমাণিত সিদ্ধান্ত নয়।
এমনকি ১২০টি শিলালিপির সবই পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় বাক্য নয়। এগুলোর কিছু হয়তো কেবল নাম, সংক্ষিপ্ত অক্ষর বা আংশিকভাবে ক্ষয়ে যাওয়া নিবেদন। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা এখনও সেগুলোর নথিবদ্ধকরণ, পাঠোদ্ধার ও সময় নির্ধারণ করছেন।
এই অনিশ্চয়তা আবিষ্কারের গুরুত্ব কমায় না। বরং এখানেই প্রত্নতত্ত্বের সৌন্দর্য—প্রমাণ যতটুকু কথা বলে, গবেষককে ততটুকুই শুনতে হয়; নীরব অংশ নিজের কল্পনায় পূরণ করলে ইতিহাস সহজেই কিংবদন্তিতে পরিণত হয়।
সামনে আরও আবিষ্কার
গুহার বড় অংশ এখনও বিস্তারিতভাবে অনুসন্ধান করা হয়নি। শনাক্ত করা বহু শিলালিপির পাঠ অসম্পূর্ণ। গবেষকেরা ভবিষ্যতে লেখার ডিজিটাল নথি, আলোকচিত্র, থ্রিডি মডেল এবং তুলনামূলক ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করবেন।
গুহার নিরাপত্তা ও সংরক্ষণ উন্নত করার পাশাপাশি একটি ডিজিটাল টুইন তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ সরাসরি গুহায় প্রবেশ না করেও ভার্চুয়ালি উপাসনাকক্ষ ও প্রাগৈতিহাসিক চিত্র দেখতে পারবেন।
পরবর্তী গবেষণায় ‘MALACI’ শব্দটির অর্থ, দেবীর পরিচয়, উপাসকদের সামাজিক অবস্থান এবং আচারগুলো কত শতাব্দী চলেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেতে পারে।
সম্ভবত আরও লেখা অপেক্ষা করছে অন্ধকারের মধ্যে।
পরিশেষে বলা যায়, রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাস সাধারণত সম্রাট, যুদ্ধ, সেনাবাহিনী, সড়ক, নগর ও স্থাপত্যের ইতিহাস হিসেবে লেখা হয়। কিন্তু সাম্রাজ্যের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অনেক সময় টিকে থাকে একটি ক্ষুদ্র আংটি, ভাঙা পাত্র, চরকার চাকতি কিংবা পাথরে আঁচড় দেওয়া কয়েকটি অক্ষরের মধ্যে।
কোভা দে লেস দোনেসের ১২০টি লাতিন শিলালিপি সেই নীরব ইতিহাসকে সামনে এনেছে।
দুই হাজার বছর আগে নারীরা প্রদীপ হাতে গুহার অন্ধকার পথ অতিক্রম করেছিলেন। তাঁরা জলের পাশে ব্যক্তিগত বস্তু রেখে গেছেন, দেয়ালে নিজেদের নাম লিখেছেন এবং এমন এক দেবীকে ডেকেছেন, যাঁর প্রকৃত পরিচয় ইতিহাস হারিয়ে ফেলেছে।
আমরা এখনও জানি না তাঁদের প্রার্থনা কী ছিল। অসুস্থতা থেকে মুক্তি, সন্তান, নিরাপদ প্রসব, ভালোবাসা, পারিবারিক শান্তি—নাকি জীবনের অন্য কোনো সংকট? শুধু এটুকু জানা যায়, তাঁদের কাছে গুহার সেই ‘Domina’ যথেষ্ট বাস্তব ও শক্তিশালী ছিলেন।
সম্রাটদের মূর্তি ভেঙে গেছে, মন্দির হারিয়ে গেছে, সাম্রাজ্য বিলুপ্ত হয়েছে। অথচ অন্ধকার গুহায় নারীদের খোদাই করা প্রার্থনার চিহ্ন এখনও রয়ে গেছে।
দেবী তাঁর নাম হারিয়েছেন। কিন্তু তাঁর উপাসকদের কণ্ঠ, প্রায় দুই হাজার বছর পর, আবার শোনা যাচ্ছে।
আপনার মতামত জানানঃ