ভারতের রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ২০১৪ সালে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর ২০১৯ সালেও দলটি আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে। কিন্তু ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজেপিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য জোটসঙ্গীদের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এর পর থেকে দেশের রাজনীতি নিয়ে নতুন করে নানা প্রশ্ন উঠছে। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন হলো—তরুণ ভোটারদের মধ্যে বিজেপির যে শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, সেখানে কি এখন ফাটল ধরতে শুরু করেছে?
বিজেপির ভবিষ্যৎ নিয়ে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলোতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে তরুণদের ক্ষোভ। চাকরির সংকট, সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম, প্রশ্নপত্র ফাঁস, উচ্চশিক্ষার বাড়তি খরচ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে ভারতের শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়ছে। এই অসন্তোষ যদি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়, তাহলে আগামী লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
ভারতে চাকরির বাজারের সংকট নতুন নয়। তবে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে এর প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। একটি ডিগ্রি অর্জনের পর ভালো চাকরি পাওয়া যাবে—এমন প্রত্যাশা নিয়ে লাখ লাখ তরুণ প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন পেশাগত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন। এরপর সরকারি চাকরি কিংবা উচ্চশিক্ষার প্রবেশিকা পরীক্ষাকে তারা ভবিষ্যৎ গড়ার অন্যতম পথ হিসেবে বেছে নেন। কিন্তু এসব পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস বা নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তাদের সামনে থাকা সামান্য সুযোগটুকুও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
চিকিৎসাশিক্ষায় ভর্তির জন্য ভারতের বহুল প্রতিযোগিতামূলক ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট বা নীটকে ঘিরে এমন অভিযোগ তরুণদের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়েছে। প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থী যেখানে সীমিতসংখ্যক মেডিকেল আসনের জন্য প্রতিযোগিতা করে, সেখানে পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা তাদের কাছে শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরাসরি আঘাত।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও তাই দ্রুত রাজনৈতিক মাত্রা পেয়েছে। দিল্লির যন্তর মন্তরে তরুণদের বিক্ষোভ, জবাবদিহির দাবি এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সরকারের বিরুদ্ধে তরুণদের একটি অংশের ক্ষোভ তখন আর শুধু পরীক্ষার অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং সরকারের প্রতি আস্থার প্রশ্ন।
এখানেই বিজেপির জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি। কারণ তরুণ ভোটারদের সমর্থন বিজেপির উত্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল। ২০০৯ সালের তুলনায় ২০১৪ এবং ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিজেপির তরুণ ভোটারের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। ২০১৪ সালে তরুণদের মধ্যে বিজেপির সমর্থন প্রায় ৩৪ শতাংশ এবং ২০১৯ সালে তা প্রায় ৪১ শতাংশে পৌঁছেছিল। ২০২৪ সালেও এই সমর্থন প্রায় ৩৮ শতাংশের কাছাকাছি ছিল বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই তরুণদের একটি বড় অংশ বিজেপির কাছে এসেছিল উন্নত অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং ‘ভালো দিন’-এর প্রত্যাশা নিয়ে। ২০১৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে বিজেপি বিপুল কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু এক দশকের বেশি সময় পরও চাকরির বাজারে তরুণদের হতাশা পুরোপুরি দূর হয়নি। বরং উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্ব এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়ম নিয়ে অসন্তোষ আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
তরুণদের ক্ষোভের সঙ্গে সরকারের প্রতিক্রিয়াও এখন রাজনৈতিক আলোচনার অংশ। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করেছে। বিশেষ করে দিল্লির মতো দেশের রাজধানীতে বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের আচরণ নিয়ে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসে। তবে এসব ভিডিও ও অভিযোগের সবকটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
রাজনীতিতে একটি আন্দোলনের শক্তি অনেক সময় তার দাবির চেয়েও বেশি নির্ভর করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার আবেগগত সংযোগের ওপর। চাকরি পাওয়া, পরীক্ষায় স্বচ্ছতা এবং ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা—এগুলো এমন দাবি, যা ভারতের বিপুলসংখ্যক তরুণের ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে কোনো নির্দিষ্ট সংগঠন বা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত না থেকেও অনেক তরুণ এসব দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল হতে পারেন।
এ কারণেই তরুণদের আন্দোলনকে বিজেপি সহজে উপেক্ষা করতে পারছে না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেও তরুণদের উদ্বেগ নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্যে শিক্ষিত তরুণদের ভবিষ্যৎ, চাকরি এবং পরিবারের প্রত্যাশার বিষয় উঠে এসেছে। সরকারপক্ষ থেকে তরুণদের পাশে থাকার বার্তাও দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক সমস্যার ক্ষেত্রে বক্তব্যের পাশাপাশি বাস্তব ফলাফলও গুরুত্বপূর্ণ। একজন তরুণ যদি বছরের পর বছর পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েও একটি স্বচ্ছ নিয়োগের সুযোগ না পান, তাহলে কেবল আশ্বাস দিয়ে তার আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভারতের রাজনৈতিক বিরোধীদের অবস্থান। বিজেপির বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হওয়া আর সেই ক্ষোভকে বিরোধীদের ভোটে পরিণত করা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। অতীতে বিজেপির বিরুদ্ধে অসন্তোষ তৈরি হলেও বিরোধীরা সবসময় তা রাজনৈতিক সুবিধায় রূপান্তর করতে পারেনি। বিরোধীদের সামনে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে একটি বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প তৈরি করা।
বিশেষ করে কর্মসংস্থান নিয়ে বিরোধীদের স্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু বিজেপির সমালোচনা করে তরুণ ভোটারদের দীর্ঘমেয়াদি সমর্থন পাওয়া সম্ভব নয়। কোথায় নতুন চাকরি তৈরি হবে, উৎপাদন খাত কীভাবে সম্প্রসারিত হবে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাকে কীভাবে সহায়তা দেওয়া হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কীভাবে চাকরির বাজারের সঙ্গে যুক্ত হবে—এসব প্রশ্নের বাস্তব উত্তর দিতে হবে।
এখানে বিরোধী জোটগুলোর জন্য আরেকটি সুযোগ রয়েছে। যেসব রাজ্যে তারা ক্ষমতায় আছে, সেখানে নিজেদের কর্মসংস্থান নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে তারা দেখাতে পারে যে বিকল্প সরকার কীভাবে কাজ করতে পারে। নির্বাচনের আগে শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব সাফল্যের উদাহরণ তৈরি করতে পারলে তরুণ ভোটারদের আস্থা অর্জন করা সহজ হতে পারে।
তবে বিজেপির পতন অবশ্যম্ভাবী—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানোও ঠিক হবে না। একটি বা দুটি উপনির্বাচনের ফল, একটি আন্দোলন কিংবা কোনো নির্দিষ্ট ইস্যু দিয়ে তিন বছর পরের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করা যায় না। ভারতের মতো বিশাল ও বৈচিত্র্যময় দেশে ভোটারের সিদ্ধান্তে স্থানীয় রাজনীতি, জাতপাত, ধর্ম, আঞ্চলিক নেতৃত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সরকারের বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচি—সবকিছুর প্রভাব থাকে।
বিজেপির সবচেয়ে বড় শক্তি এখনও তাদের সাংগঠনিক কাঠামো, শক্তিশালী নেতৃত্ব এবং বিস্তৃত রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক। নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। ফলে তরুণদের বর্তমান ক্ষোভকে বিজেপি যদি কর্মসংস্থান ও শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে মোকাবিলা করতে পারে, তাহলে পরিস্থিতি বদলাতেও পারে।
কিন্তু বিপদটা অন্য জায়গায়। তরুণ ভোটাররা যদি মনে করতে শুরু করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই, তাহলে শুধু বিজেপি নয়, পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিই আস্থা কমতে পারে। আর সেই শূন্যতা থেকেই নতুন ধরনের রাজনৈতিক আন্দোলন বা নতুন নেতৃত্বের উত্থান ঘটতে পারে।
ভারতের তরুণদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ধর্ম, পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক স্লোগানের বাইরে গিয়ে খুব সাধারণ—তাদের ভবিষ্যৎ কী? তারা পড়াশোনা শেষ করার পর একটি স্থায়ী চাকরি পাবে কি না, পরীক্ষায় পরিশ্রমের মূল্য পাওয়া যাবে কি না এবং নিজেদের পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করতে পারবে কি না—এই প্রশ্নগুলোই তাদের জীবনের বাস্তবতা।
২০১৪ সালে বিজেপির উত্থানের সময় তরুণদের বড় অংশ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল। এক দশকের বেশি সময় পর সেই প্রজন্মের একটি অংশ যদি মনে করে তাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, তাহলে সেটি অবশ্যই বিজেপির জন্য সতর্কবার্তা। কারণ ভোটারদের রাজনৈতিক আনুগত্য চিরস্থায়ী নয়।
২০২৯ সালের নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় থাকবে কি না, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—তরুণদের কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগকে আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিজেপি যদি এই অসন্তোষকে বাস্তব নীতি ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে মোকাবিলা করতে পারে, তাহলে তাদের রাজনৈতিক ভিত্তি ধরে রাখার সুযোগ থাকবে। আর যদি তরুণদের ক্ষোভ আরও গভীর হয় এবং বিরোধীরা সেই ক্ষোভের জন্য বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক বিকল্প তৈরি করতে পারে, তাহলে ভারতের আগামী লোকসভা নির্বাচন নিঃসন্দেহে মোদি ও বিজেপির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে।
শেষ পর্যন্ত ভারতের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে হয়তো সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হবে—কে তরুণদের কাছে শুধু ভালো ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাতে পারে, আর কে সেই ভবিষ্যৎ বাস্তবে তৈরি করতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ