
১৯৭৩ সালের ২৩ আগস্ট, বৃহস্পতিবার সকাল। সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের নরমালমস্তর্গ স্কয়ারে ক্রেডিটব্যাংকেনের শাখায় অন্য দিনের মতোই কাজ চলছিল। হঠাৎ পরচুলা ও কালো চশমা পরা এক ব্যক্তি ব্যাংকে ঢুকে সাবমেশিনগান উঁচিয়ে গুলি ছোড়ে। আতঙ্কিত কর্মী ও গ্রাহকেরা পালিয়ে গেলে সে কয়েকজনকে ব্যাংকের ভল্টের কাছে আটকে ফেলে।
ডাকাতির পরিকল্পনাটি দ্রুত ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল। পুলিশ ব্যাংক ঘিরে ফেলেছিল, পালানোর রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কয়েক মিনিটের ব্যর্থ ব্যাংক ডাকাতি পরিণত হয় ছয় দিনের জিম্মি সংকটে। ভারী ইস্পাতের ভল্টে চার কর্মচারীকে আটকে রেখে সশস্ত্র ডাকাত পুলিশের সঙ্গে দর-কষাকষি শুরু করে।
পরবর্তী ছয় দিনে এমন কিছু ঘটে, যা পুলিশ, সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। বন্দিরা ধীরে ধীরে অপহরণকারীদের তুলনায় পুলিশকেই বেশি ভয় করতে শুরু করেন। তাঁদের একজন প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে ডাকাতদের সঙ্গে বেরিয়ে যাওয়ার অনুমতি চান। উদ্ধার অভিযান শুরু হলে তাঁরা আশঙ্কা করেন—পুলিশের গুলিতেই হয়তো তাঁদের মৃত্যু হবে।
ঘটনার পর এই আচরণ ব্যাখ্যা করতে জন্ম নেয় বহুল আলোচিত শব্দবন্ধ—‘স্টকহোম সিনড্রোম’।
কিন্তু বন্দিরা কি সত্যিই অপহরণকারীদের ভালোবেসে ফেলেছিলেন? নাকি মৃত্যুভয়ের মধ্যে তাঁরা এমন একটি বেঁচে থাকার কৌশল গ্রহণ করেছিলেন, যাকে পরে মনোরোগের নাম দিয়ে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে?
ছুটি পাওয়া বন্দি থেকে সশস্ত্র ডাকাত
ডাকাতটির নাম ইয়ান-এরিক ওলসন। ৩২ বছর বয়সী এই দণ্ডিত অপরাধী কারাগার থেকে সাময়িক ছুটি পেয়ে আর ফিরে যাননি। ২৩ আগস্ট তিনি অস্ত্র নিয়ে ক্রেডিটব্যাংকেনে ঢোকেন। পুলিশের দ্রুত উপস্থিতিতে তাঁর পালানোর পরিকল্পনা ভেস্তে গেলে চার ব্যাংককর্মী—ক্রিস্টিন এনমার্ক, বিরগিটা লুন্ডব্লাদ, এলিজাবেথ ওল্ডগ্রেন ও সভেন সেফস্ট্রমকে জিম্মি করেন।
ওলসনের দাবির মধ্যে ছিল ৩০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা, দুটি অস্ত্র, বুলেটপ্রুফ পোশাক, একটি দ্রুতগতির গাড়ি এবং তাঁর পুরোনো কারাসঙ্গী ক্লার্ক ওলোফসনের মুক্তি।
অদ্ভুতভাবে সরকার ক্লার্ককে কারাগার থেকে ব্যাংকে নিয়ে আসার অনুমতি দেয়। পুলিশের আশা ছিল, ক্লার্ক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ওলসনকে শান্ত করতে এবং জিম্মিদের মুক্ত করতে সাহায্য করবেন। কিন্তু ব্যাংকে প্রবেশের পর তিনি ডাকাতের সঙ্গে ভল্টে অবস্থান নেন। ফলে তিনি আলোচনার দূত, সহায়তাকারী নাকি দ্বিতীয় অপহরণকারী—এই সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়।
চার জিম্মিকে ব্যাংকের মূল ভল্টে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁদের সামনে ছিল দুই সশস্ত্র অপরাধী; বাইরে ছিল পুলিশ, শার্পশুটার, আলোচক এবং দেশজুড়ে সরাসরি সম্প্রচার করতে থাকা সংবাদমাধ্যম।
১৯৭৩ সালের এই ঘটনা সুইডেনে সরাসরি টেলিভিশনে সম্প্রচারিত প্রথম বড় অপরাধগুলোর একটি ছিল। ছয় দিন ধরে গোটা দেশ ব্যাংকটির দিকে তাকিয়ে ছিল। ঘটনার ঐতিহাসিক বিবরণ
ভয় থেকে নির্ভরতার শুরু
প্রথম দিকে জিম্মিরা ওলসনকে ভয় পাচ্ছিলেন। তিনি গুলি চালিয়েছিলেন, পুলিশকে হুমকি দিয়েছিলেন এবং জিম্মিদের হত্যা করার কথা বলেছিলেন। তবে দীর্ঘ সময় ধরে একই সংকীর্ণ স্থানে আটকে থাকার পর সম্পর্কের প্রকৃতি বদলাতে শুরু করে।
জিম্মিদের কাছে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র পথ ছিল তাঁদের অপহরণকারীরা। কখন খাবার পাওয়া যাবে, বাথরুমে যাওয়া যাবে কি না, কার সঙ্গে কথা বলা যাবে কিংবা পুলিশ কোনো অভিযান চালালে কী হবে—সবকিছুই তাঁদের ওপর নির্ভর করছিল।
এই পরিস্থিতিতে অপহরণকারীর সামান্য মানবিক আচরণও বন্দির কাছে অসাধারণ দয়া বলে মনে হতে পারে। একটি কম্বল দেওয়া, খাবার ভাগ করে নেওয়া, ফোনে কথা বলার সুযোগ দেওয়া অথবা সরাসরি হত্যা না করা—স্বাভাবিক জীবনে এগুলো সাধারণ আচরণ। কিন্তু মৃত্যুভয়ের মধ্যে বন্দি মানুষের মস্তিষ্ক এগুলোকে নিরাপত্তার প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।
ওলসন ও ক্লার্ক জিম্মিদের সঙ্গে কথা বলতেন, তাঁদের আতঙ্ক শান্ত করার চেষ্টা করতেন এবং পুলিশি অভিযানের বিপদ নিয়ে সতর্ক করতেন। অন্যদিকে পুলিশ ভল্টে ছিদ্র করছিল, অস্ত্র তাক করে অবস্থান নিচ্ছিল এবং বলপ্রয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ফলে বন্দিদের চোখে ঝুঁকির দুটি উৎস তৈরি হয়—ভল্টের ভেতরের অস্ত্রধারী এবং বাইরে থাকা উদ্ধারকারীরা।
প্রথমজনের আচরণ তাঁরা কাছ থেকে দেখতে পারছিলেন। দ্বিতীয় পক্ষ কী করবে, তা তাঁদের জানা ছিল না।
মানুষ অনিশ্চিত বিপদের চেয়ে পরিচিত বিপদকে অনেক সময় বেশি নিয়ন্ত্রণযোগ্য মনে করে। ওলসন ছিলেন বিপজ্জনক, কিন্তু তাঁর মেজাজ, ভাষা ও আচরণ সম্পর্কে জিম্মিরা ধীরে ধীরে ধারণা তৈরি করতে পেরেছিলেন। পুলিশের পরিকল্পনা তাঁদের কাছে ছিল অদৃশ্য এবং অনিশ্চিত।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সেই অস্বাভাবিক কথোপকথন
জিম্মিদের মধ্যে ২৩ বছর বয়সী ক্রিস্টিন এনমার্ক সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসেন। তিনি সুইডেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ওলোফ পালমের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছিলেন। কথোপকথনে তিনি জানান, ওলসন ও ক্লার্কের তুলনায় পুলিশের অভিযানের সম্ভাবনাই তাঁকে বেশি আতঙ্কিত করছে। তিনি ডাকাতদের সঙ্গে গাড়িতে ব্যাংক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার অনুমতি চান।
বাইরের মানুষের কাছে এই অনুরোধ অযৌক্তিক মনে হয়েছিল। একজন বন্দি কীভাবে সশস্ত্র ডাকাতের সঙ্গে পালিয়ে যেতে চাইতে পারেন?
কিন্তু ক্রিস্টিনের দৃষ্টিতে বিষয়টি ছিল আলাদা। ডাকাতেরা তাঁদের নিয়ে বেরিয়ে যেতে চাইলেও পুলিশ কোনো জিম্মিকে সঙ্গে নেওয়ার অনুমতি দিতে রাজি ছিল না। পুলিশ বলপ্রয়োগ করলে ভল্টের ভেতরের সবাই গুলিবিদ্ধ কিংবা বিস্ফোরণে নিহত হতে পারেন—এমন আশঙ্কা জিম্মিদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল।
ক্রিস্টিন পরে বলেছেন, তিনি দুই ধরনের মৃত্যুঝুঁকির মাঝখানে আটকে ছিলেন—একদিকে ডাকাত, অন্যদিকে পুলিশের অভিযান। তাঁর ভাষায়, তিনি যা করেছিলেন, তা ভালোবাসা কিংবা অন্ধ আনুগত্য থেকে নয়; বেঁচে থাকার চেষ্টা থেকে। পরবর্তী জীবনে তিনি ‘স্টকহোম সিনড্রোম’ তত্ত্বকে ভুক্তভোগীকেই দায়ী করার একটি পদ্ধতি হিসেবে সমালোচনা করেন।
ঘটনাটির ৫০ বছর পূর্তিতে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বিশেষজ্ঞরা বলেন, একে স্বতন্ত্র মানসিক রোগের চেয়ে বন্দিদশায় ব্যবহৃত একটি মানসিক মোকাবিলা বা টিকে থাকার কৌশল হিসেবে দেখা বেশি যৌক্তিক। AP-এর বিশ্লেষণ
ভল্টে ছয় দিনের যুদ্ধ
সংকটের মধ্যবর্তী সময়ে পুলিশ ব্যাংকের ওপরের একটি কক্ষ থেকে ভল্টের ছাদে ছিদ্র করে। সেই ছিদ্র দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও ছবি তোলার চেষ্টা করা হয়। ওলসন ছিদ্র লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে একজন পুলিশ সদস্য আহত হন।
পুলিশের এই তৎপরতা জিম্মিদের ভয় আরও বাড়ায়। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, অভিযান শুরু হলে ওলসন প্রতিশোধ নিতে পারেন অথবা দুই পক্ষের গোলাগুলির মাঝখানে তাঁরা মারা যেতে পারেন। ফলে তাঁরা ডাকাতদের উত্তেজিত না করে শান্ত রাখার চেষ্টা করেন।
২৮ আগস্ট পুলিশ ভল্টে কাঁদানে গ্যাস প্রবেশ করায়। প্রায় এক ঘণ্টা পর ওলসন ও ক্লার্ক আত্মসমর্পণ করেন। চার জিম্মিই জীবিত উদ্ধার হন এবং কেউ স্থায়ী শারীরিক আঘাত পাননি।
কিন্তু উদ্ধার মুহূর্তেও তাঁদের আচরণ পুলিশকে বিস্মিত করে। তাঁরা আগে ডাকাতদের বের হতে দিতে চেয়েছিলেন, কারণ পুলিশের গুলিতে তাঁদের মৃত্যু হতে পারে বলে আশঙ্কা করেছিলেন। মুক্তির পরও কেউ কেউ অপহরণকারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং পুলিশের ব্যবস্থাপনার সমালোচনা করেন।
ওলসন পরে ১০ বছরের কারাদণ্ড পান। ক্লার্ক প্রথমে দোষী সাব্যস্ত হলেও আপিল আদালত ব্যাংক ডাকাতিতে তাঁর প্রত্যক্ষ সহযোগিতার যথেষ্ট প্রমাণ না পাওয়ায় তাঁকে খালাস দেয়; তাঁকে আগের অপরাধের অবশিষ্ট সাজা ভোগ করতে হয়। ২৩ থেকে ২৮ আগস্টের এই ঘটনাই পরবর্তী সময়ে নরমালমস্তর্গ ডাকাতি নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
কীভাবে জন্ম নিল ‘স্টকহোম সিনড্রোম’
সংকটের সময় সুইডিশ পুলিশকে পরামর্শ দিচ্ছিলেন মনোরোগবিদ্যা ও অপরাধবিদ্যার সঙ্গে যুক্ত নিলস বেজেরট। জিম্মিরা কেন পুলিশকে অবিশ্বাস এবং অপহরণকারীদের প্রতি সহানুভূতি দেখাচ্ছেন—তা ব্যাখ্যা করতে তিনি ‘নরমালমস্তর্গ সিনড্রোম’ শব্দটি ব্যবহার করেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে পরে সেটিই ‘স্টকহোম সিনড্রোম’ হয়ে যায়।
ধারণাটি সাধারণভাবে এমন একটি মানসিক প্রতিক্রিয়াকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যেখানে বন্দি বা নির্যাতিত ব্যক্তি তাঁর ওপর নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তির প্রতি ইতিবাচক অনুভূতি তৈরি করেন, তাঁকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন এবং উদ্ধারকারী কিংবা কর্তৃপক্ষকে শত্রু মনে করতে শুরু করেন।
কয়েকটি পরিস্থিতি এ ধরনের সম্পর্ক তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে:
- বন্দি মনে করেন, অপহরণকারী যেকোনো সময় তাঁকে হত্যা করতে পারেন।
- বাইরের পৃথিবী থেকে তিনি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকেন।
- অপহরণকারী মাঝেমধ্যে সামান্য দয়া বা মানবিক আচরণ করেন।
- পালানোর কোনো বাস্তবসম্মত পথ থাকে না।
- বেঁচে থাকার জন্য অপহরণকারীর মেজাজ বুঝে চলা প্রয়োজন হয়।
এগুলো একত্র হলে বন্দির মন অপহরণকারীকে কেবল হুমকি হিসেবে না দেখে নিরাপত্তার একমাত্র সম্ভাব্য উৎস হিসেবেও বিবেচনা করতে পারে। সম্পর্কটি তখন ভালোবাসার চেয়ে বেশি হয় ভয়, নির্ভরতা, কৃতজ্ঞতা এবং আত্মরক্ষার মিশ্রণ।
মস্তিষ্ক কেন এমন প্রতিক্রিয়া দেখায়?
চরম বিপদে মানুষের প্রতিক্রিয়া শুধু ‘লড়াই অথবা পালানো’য় সীমাবদ্ধ নয়। মানুষ জমে যেতে পারে, বাধ্যতামূলক আনুগত্য দেখাতে পারে কিংবা হুমকিদাতাকে শান্ত রাখার চেষ্টা করতে পারে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় শেষের প্রতিক্রিয়াটিকে অনেক সময় appeasement বা তুষ্টকরণ বলা হয়।
অপহরণকারীর আচরণ পর্যবেক্ষণ, তাঁর সঙ্গে কথা বলা, উত্তেজনা কমানো এবং নিজেকে নিরীহ প্রমাণ করা—এসবই বন্দির মৃত্যুঝুঁকি কমাতে পারে। দীর্ঘ বন্দিদশায় এই কৌশল স্বয়ংক্রিয় মানসিক সম্পর্কে পরিণত হতে পারে।
এখানে ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পূর্ণ একপক্ষীয়। অপহরণকারী খাবার, ঘুম, যোগাযোগ ও জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখেন। বন্দি তাঁর প্রতিটি আচরণের অর্থ খোঁজেন। আক্রমণ না করাকে দয়া, পানি দেওয়াকে যত্ন এবং কথা বলাকে বন্ধুত্ব মনে হতে পারে। কারণ বন্দির স্বাভাবিক তুলনামূলক মানদণ্ড ততক্ষণে ভেঙে গেছে।
গবেষকেরা এখন প্রস্তাব করছেন, ‘সিনড্রোম’ বলে ভুক্তভোগীর আচরণকে অস্বাভাবিক ঘোষণা করার বদলে এটিকে বিপদের মধ্যে একটি অভিযোজনমূলক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা উচিত। একটি গবেষণাপত্রে ‘স্টকহোম সিনড্রোম’-এর পরিবর্তে appeasement ধারণাটি ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে, কারণ এটি ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা ও বেঁচে থাকার কৌশলকে বেশি সম্মান করে। গবেষণাটি পড়ুন
এটি কি সত্যিই মানসিক রোগ?
জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে ‘স্টকহোম সিনড্রোম’ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলেও এটি কোনো স্বীকৃত স্বতন্ত্র মানসিক রোগ নয়। আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের DSM কিংবা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আন্তর্জাতিক রোগ শ্রেণিবিন্যাসে এটি আলাদা রোগনির্ণয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
২০০৮ সালে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় গবেষকেরা দেখেন, ধারণাটির জন্য সুস্পষ্ট ও সর্বজনস্বীকৃত রোগনির্ণয়ের মানদণ্ড নেই। অধিকাংশ তথ্য এসেছে সংবাদ প্রতিবেদন ও বহুল আলোচিত কিছু ঘটনার বর্ণনা থেকে; যথেষ্ট ক্লিনিক্যাল গবেষণা পাওয়া যায়নি। গবেষকেরা তাই প্রশ্ন তোলেন—এটি মনোরোগের বৈজ্ঞানিক শ্রেণি, নাকি গণমাধ্যমে তৈরি একটি শক্তিশালী সামাজিক ধারণা। PubMed-এ গবেষণার সারাংশ
সব বন্দি অপহরণকারীর প্রতি অনুরাগ তৈরি করেন না। যাঁরা করেন বলে মনে হয়, তাঁদের মধ্যেও আচরণ ও কারণ এক নয়। কেউ ভয় থেকে সহযোগিতা করেন, কেউ অপহরণকারীকে শান্ত রাখতে অভিনয় করেন, কেউ উদ্ধারকারীদের পরিকল্পনাকে বিপজ্জনক মনে করেন এবং কেউ দীর্ঘ নির্যাতনের পর বাস্তবতা বিচার করার ক্ষমতায় সাময়িক পরিবর্তনের সম্মুখীন হন।
অতএব, কোনো নির্যাতিত ব্যক্তি তাঁর নির্যাতনকারীকে ছেড়ে যেতে না পারলে কিংবা তাঁর পক্ষ নিলে সঙ্গে সঙ্গে ‘স্টকহোম সিনড্রোম’ বলে দেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে যথাযথ নয়। সেখানে আর্থিক নির্ভরতা, নিরাপত্তাহীনতা, সন্তান, সামাজিক চাপ, হুমকি, ট্রমা এবং পালানোর বাস্তব সুযোগ—সবই বিবেচনা করতে হয়।
গল্পটি কি ভুক্তভোগীদের কণ্ঠ চাপা দিয়েছিল?
‘স্টকহোম সিনড্রোম’-এর সবচেয়ে বড় সমালোচনা হলো, ধারণাটি ঘটনার নিয়ন্ত্রণহীন পরিস্থিতিতে জিম্মিদের যৌক্তিক সিদ্ধান্তকে মানসিক অস্বাভাবিকতা হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
ক্রিস্টিন এনমার্ক পুলিশের কৌশলের বিরোধিতা করেছিলেন বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল, তিনি নিশ্চয়ই ডাকাতের প্রভাবে ‘ব্রেনওয়াশড’ হয়েছেন। কিন্তু তাঁর নিজের ব্যাখ্যা ছিল—পুলিশ এমন একটি অভিযান চালাতে পারে, যাতে জিম্মিদের মৃত্যু হবে। তিনি ডাকাতকে নির্দোষ ভাবেননি; বরং সেই মুহূর্তে তাঁর কাছে পুলিশের পরিকল্পনাই বেশি অনিশ্চিত মনে হয়েছিল।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। অপহরণকারীর সঙ্গে সহযোগিতা করা আর তাঁকে ভালোবাসা এক বিষয় নয়। কারও আচরণের সঙ্গে সাময়িকভাবে মানিয়ে নেওয়া আর তাঁর অপরাধকে সমর্থন করাও এক নয়।
বন্দিরা ভল্টের মধ্যে বাস্তব সময়ের ঝুঁকি দেখেছিলেন। বাইরে থাকা পুলিশ, চিকিৎসক ও সংবাদমাধ্যম তাঁদের অভিজ্ঞতা দেখেছিল দূর থেকে। পরবর্তী সময়ে যে ব্যাখ্যাটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, সেটি মূলত বাইরের পর্যবেক্ষকদের ভাষা; ভুক্তভোগীদের নিজস্ব ভাষা নয়।
জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে অমর হয়ে যাওয়া শব্দ
নরমালমস্তর্গের ঘটনার পর ‘স্টকহোম সিনড্রোম’ দ্রুত সিনেমা, উপন্যাস, সংবাদ প্রতিবেদন এবং অপরাধবিষয়ক আলোচনায় জায়গা করে নেয়। ১৯৭৪ সালে প্যাটি হার্স্ট অপহরণের পর অপহরণকারীদের সংগঠনে যোগ দিলে শব্দটি আরও জনপ্রিয় হয়।
এর পর থেকে যুদ্ধবন্দি, অপহৃত ব্যক্তি, গৃহসহিংসতার শিকার, ধর্মীয় গোষ্ঠীর সদস্য এবং নির্যাতনমূলক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। কখনও এটি জটিল আচরণ বোঝাতে সাহায্য করেছে; আবার কখনও ভুক্তভোগীর সিদ্ধান্তকে অবজ্ঞা করার সহজ লেবেলে পরিণত হয়েছে।
শব্দটির সাংস্কৃতিক শক্তি তার বৈজ্ঞানিক ভিত্তির চেয়ে অনেক বেশি। মানুষ বিপদের মধ্যে কেন নিজের শত্রুর কাছেই নিরাপত্তা খোঁজে—এই আপাতবিরোধী প্রশ্ন গল্প, চলচ্চিত্র ও সংবাদমাধ্যমকে এখনও আকর্ষণ করে।
১৯৭৩ সালের সেই ব্যাংক ডাকাতিতে চার জিম্মি অপহরণকারীদের অপরাধ ভুলে যাননি। তাঁরা এমন এক পরিস্থিতিতে আটকে পড়েছিলেন, যেখানে প্রতিটি ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য হতে পারত মৃত্যু। বাইরে পুলিশের সম্ভাব্য অভিযান এবং ভেতরে অস্ত্রধারী ডাকাত—দুই বিপদের মাঝখানে তাঁরা যে পক্ষকে সাময়িকভাবে বেশি অনুমানযোগ্য মনে করেছিলেন, তার সঙ্গেই সহযোগিতা করেছিলেন।
তাঁদের আচরণ প্রেমের গল্প ছিল না; ছিল বন্দিদশায় বেঁচে থাকার জটিল মনস্তত্ত্ব।
‘স্টকহোম সিনড্রোম’ শব্দটি সেই জটিলতাকে একটি আকর্ষণীয় নাম দিয়েছে। কিন্তু নামটি পুরো সত্যকে ধারণ করে না। কারণ মানুষের বেঁচে থাকার প্রতিক্রিয়া সব সময় বাইরে থেকে যুক্তিসংগত দেখায় না—তবু সেটি ভেতরের বাস্তবতায় সম্পূর্ণ অর্থপূর্ণ হতে পারে।
ব্যাংকের ভল্টে ছয় দিনের সেই সংকট তাই শুধু একটি ব্যর্থ ডাকাতির ইতিহাস নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়, ভয় ও ক্ষমতার চাপে মানুষের মন এমন সম্পর্ক তৈরি করতে পারে, যা ভালোবাসার মতো দেখায়—কিন্তু আসলে তার গভীরে থাকে জীবিত ফিরে আসার মরিয়া চেষ্টা।
আপনার মতামত জানানঃ