ঢাকার দিলকুশা এলাকার ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝখানে উঁচু সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে বঙ্গভবন। আজ এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও সরকারি বাসভবন হিসেবে পরিচিত। রাষ্ট্রীয় নানা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, শপথ, কূটনৈতিক সাক্ষাৎ ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে এই ভবনের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। কিন্তু বঙ্গভবনের ইতিহাস শুধু স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস নয়; এর শিকড় ছড়িয়ে আছে কয়েক শতক আগের ঢাকায়। যে জায়গায় আজ রাষ্ট্রপতির বাসভবন, একসময় সেখানে ছিল মাজার, পরে মুঘল আমলের আবাসস্থল, নবাবদের বাগানবাড়ি, ব্রিটিশদের গভর্নমেন্ট হাউজ এবং পাকিস্তান আমলের গভর্নর হাউজ।
বঙ্গভবনের ইতিহাসের শুরু খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় বাংলার সুলতানি আমলে। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চদশ শতকে সুলতান ইউসুফ শাহের শাসনামলে সুফিসাধক শাহ জালাল দাখিনী কয়েকজন শিষ্যসহ গুজরাত থেকে পূর্ববঙ্গে আসেন। ঢাকার বর্তমান মতিঝিল এলাকার কাছাকাছি একটি খানকাহ প্রতিষ্ঠা করে তিনি ধর্ম প্রচার শুরু করেন। ১৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে সুলতানের লোকজনের হাতে তিনি ও তার অনুসারীরা নিহত হন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। পরে তাকে বর্তমান বঙ্গভবন এলাকার ভেতরেই সমাহিত করা হয়।
শাহ জালাল দাখিনীর পাশেই শাহ কামাল নামে আরেক ব্যক্তিকে সমাহিত করা হয় বলে গবেষক ও লেখক আবু জাফরের ‘রাজভবন থেকে বঙ্গভবন’ বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সমাধিকে ঘিরে গড়ে ওঠে মাজার। একটি গম্বুজবিশিষ্ট সেই সমাধিসৌধ আজও বঙ্গভবন এলাকার ভেতরে টিকে আছে। অর্থাৎ আজকের রাষ্ট্রপতির বাসভবনের ইতিহাসের একেবারে প্রাচীন স্তরে রয়েছে একটি সুফি মাজারের স্মৃতি।
এরপর আসে মুঘল আমল। তখন ঢাকা ছিল মুঘল প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বাংলার সুবাহদার মীর জুমলার সময় নওয়ারা মহলের দায়িত্বে ছিলেন মির্জা মুকিম। তার বাসভবন ছিল পুরানা পল্টন ময়দানের দক্ষিণ দিকে, বর্তমান ঢাকা স্টেডিয়াম এলাকা থেকে বঙ্গভবন ও দিলকুশা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে। মুঘল প্রশাসনে ‘নওয়ারা’ বলতে নদীপথের নিরাপত্তা ও নৌবহর পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত বিশেষ নৌবাহিনীকে বোঝানো হতো। আর এই নৌবাহিনীর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট এলাকাকে বলা হতো ‘নওয়ারা মহল’।
মির্জা মুকিমের বাসভবনের আশপাশে বড় বড় টিলা ছিল। তার বাসভবনের সঙ্গে বর্তমান বঙ্গভবন এলাকার ইতিহাসও এভাবেই যুক্ত হয়ে যায়। মতিঝিলের নাম নিয়েও এই অঞ্চলের পুরোনো ইতিহাসে নানা কাহিনি রয়েছে। কথিত আছে, মির্জা মুকিমের পরিবারের একজন নারী অন্দরমহলের একটি দিঘিতে নিয়মিত অলংকার ফেলতেন। সেখান থেকেই জায়গাটির নাম ‘মতিঝিল’ হয়েছে—এমন একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে।
সময়ের স্রোতে মুঘল শাসনের অবসান ঘটে এবং ঢাকার রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতেও পরিবর্তন আসে। ব্রিটিশ শাসনের সময় বঙ্গভবনের বর্তমান এলাকার মালিকানাও পরিবর্তিত হয়। চত্বরে থাকা ‘মানুক হাউজ’ নামে একটি পুরোনো ভবন সেই সময়ের স্মৃতি বহন করে। ধারণা করা হয়, এটি মানুক নামের এক আর্মেনীয় জমিদারের মালিকানাধীন ছিল। পরে ঢাকার নবাব খাজা আবদুল গনি সেই জমি কিনে নেন।
খাজা আবদুল গনি সেখানে একটি বাংলো নির্মাণ করেন এবং পুরো জায়গাটির নাম দেন ‘দিলকুশা বাগ’। তখনকার দিলকুশা ছিল আজকের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। বর্তমান বঙ্গভবন ছাড়িয়ে উত্তরের বড় একটি অংশজুড়ে ছিল এই বাগান। সেখানে ছিল লেক, ফোয়ারা, মাছের চৌবাচ্চা, নানা ধরনের গাছপালা, ফলের বাগান ও ফুলের বাগান। একসময় এটি ঢাকার নবাবদের অন্যতম আকর্ষণীয় বাগানবাড়ি হিসেবে পরিচিত ছিল।
কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বঙ্গভবনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি ঘটে। ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ করে ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ নামে নতুন প্রদেশ সৃষ্টি করে এবং ঢাকাকে তার রাজধানী ঘোষণা করে। নতুন প্রাদেশিক রাজধানীর জন্য প্রয়োজন ছিল প্রশাসনিক ভবন ও কর্মকর্তাদের আবাসস্থল। সেই প্রয়োজন থেকেই দিলকুশা এলাকায় সরকারি ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
নতুন প্রদেশের প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার জোসেফ ব্যামফিল্ড ফুলারের অস্থায়ী বাসভবন হিসেবে দিলকুশার দক্ষিণাংশে ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। ওই এলাকায় তখন প্রধান স্থাপনা ছিল মানুক হাউজ। ১৯০৬ সালে গভর্নমেন্ট হাউজ উদ্বোধন করা হলেও এর নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হয় ১৯১১ সালে। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, দিলকুশা বাগানের একটি অংশ অধিগ্রহণ করে ব্রিটিশ সরকার সেখানে এমন একটি ভবন নির্মাণ করেছিল, যেখানে পূর্ববঙ্গে সফরের সময় ভারতের ভাইসরয়ও অবস্থান করতেন।
ভবনটির নাম ছিল ‘গভর্নমেন্ট হাউজ’। ১৯০৬ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন প্রশাসনিক পরিবর্তনের মধ্যেও এই নামটি বহাল ছিল। তবে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে ঢাকার প্রাদেশিক রাজধানীর মর্যাদা শেষ হয়ে যায়। ফলে লেফটেন্যান্ট গভর্নরের নিয়মিত বাসভবন হিসেবেও ভবনটির ব্যবহার বন্ধ হয়। তারপরও বাংলার গভর্নর ঢাকায় এলে এই ভবনে অবস্থান করতেন।
এই সময়ের ভবনটি ছিল আজকের বঙ্গভবনের মতো নয়। কাঠ দিয়ে নির্মিত একতলা এই ভবনটি ছিল পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা। এর মেঝের আয়তন ছিল প্রায় ২৫ হাজার বর্গফুট এবং ছাদ ছিল টিনের। ভবনটি মাটি থেকে কয়েক ফুট উঁচুতে কাঠের কাঠামোর ওপর নির্মিত ছিল। এ কারণে এটি ‘টিম্বার প্যালেস’ বা কাঠের প্রাসাদ নামেও পরিচিত হয়ে ওঠে।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান এবং ভারত ভাগের পর পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হয়। ঢাকা আবার প্রাদেশিক রাজধানীর মর্যাদা ফিরে পায়। ব্রিটিশ আমলের গভর্নমেন্ট হাউজ তখন পূর্ববঙ্গের গভর্নরের কার্যালয় ও বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘গভর্নর হাউজ’।
তবে ১৯৬১ সালে একটি ভয়াবহ ঝড় ভবনটির ইতিহাসে নতুন মোড় তৈরি করে। কাঠের তৈরি পুরোনো ভবনটি ঝড়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শেষ পর্যন্ত সেটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। তৎকালীন গভর্নর আজম খান মানুক হাউজে বসবাস শুরু করেন। একই সঙ্গে গভর্নরের জন্য নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
নতুন ভবনের নকশার দায়িত্ব দেওয়া হয় লাহোরের স্থপতি মজনুদ্দিন চিশতীকে। তাকে ইসলামী স্থাপত্যের আদলে ভবনটির নকশা করার অনুরোধ করা হয়েছিল। তার নকশা অনুসারেই নির্মিত হয় নতুন গভর্নর হাউজ। নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৬৪ সালে। মূলত এই ভবনটিই পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের বঙ্গভবনে রূপ নেয়।
এরপর আসে ১৯৭১ সাল—বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে গভর্নর হাউজও যুদ্ধের সরাসরি প্রভাবের মুখে পড়ে। ১৪ ডিসেম্বর সেখানে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আবদুল মোতালেব মালিকের নেতৃত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক চলছিল। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ভারতীয় বিমানবাহিনী জানতে পারে যে গভর্নর হাউজে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বৈঠক চলছে।
দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটের দিকে ভারতীয় বিমানবাহিনীর চারটি মিগ-২১ যুদ্ধবিমান ভবনটিতে হামলা চালায়। পরে আরও দুটি মিগ এবং দুটি হান্টার যুদ্ধবিমান হামলায় যোগ দেয়। এতে গভর্নর হাউজ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হামলার পর গভর্নর আবদুল মোতালেব মালিক ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা পদত্যাগ করেন। স্বাধীনতার মাত্র কয়েক দিন আগে এই হামলা পাকিস্তানি প্রশাসনের ওপর বড় ধরনের মানসিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছিল।
১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে। এর মাত্র এক সপ্তাহ পর, ২৩ ডিসেম্বর, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে তৎকালীন গভর্নর হাউজে মন্ত্রিপরিষদের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকেই ভবনটির নতুন নাম নির্ধারণ করা হয়—‘বঙ্গভবন’। একই সঙ্গে এটিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির বাসভবন ও কার্যালয় হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়।
১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে বঙ্গভবনের নতুন রাষ্ট্রীয় অধ্যায়ের সূচনা হয়। এরপর থেকে ভবনটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
বঙ্গভবনের ইতিহাস তাই শুধু একটি ভবনের ইতিহাস নয়; এটি ঢাকার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক রূপান্তরেরও এক অনন্য দলিল। যে জায়গায় একসময় সুফিসাধকের মাজার ছিল, সেখানে পরে গড়ে উঠেছিল মুঘল আমলের আবাসস্থল। এরপর নবাবদের দিলকুশা বাগান, ব্রিটিশদের গভর্নমেন্ট হাউজ, পাকিস্তান আমলের গভর্নর হাউজ—প্রতিটি পর্যায় এই স্থানটির পরিচয় বদলেছে।
একই জায়গা বারবার নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে নতুন অর্থ পেয়েছে। ব্রিটিশদের হাতে এটি ছিল উপনিবেশিক প্রশাসনের কেন্দ্র, পাকিস্তান আমলে ছিল প্রাদেশিক গভর্নরের কার্যালয়, আর স্বাধীনতার পর এটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন ও কার্যালয়।
আজকের ব্যস্ত ঢাকা শহরে বঙ্গভবনকে দেখে হয়তো বোঝার উপায় নেই যে এর মাটির নিচে ও চারপাশে কত শতকের ইতিহাস জমা হয়ে আছে। মাজারের নীরবতা থেকে নবাবি বাগানের সৌন্দর্য, ঔপনিবেশিক প্রশাসনের ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিনের বিমান হামলা—সবকিছুর সাক্ষী এই স্থান।
রাষ্ট্রীয় ভবন হিসেবে বঙ্গভবনের গুরুত্ব তাই শুধু এর বর্তমান ব্যবহারে সীমাবদ্ধ নয়। এর দেয়াল, প্রাঙ্গণ ও স্থাপত্যের সঙ্গে মিশে আছে ঢাকার দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস। সুলতানি আমলের একটি মাজার থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ভবন হয়ে ওঠার এই দীর্ঘ যাত্রা আসলে ঢাকারই রূপান্তরের গল্প—একটি শহর কীভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বদলেছে, আর সেই পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে কিছু স্থান কীভাবে ইতিহাসের অংশ হয়ে থেকেছে, বঙ্গভবন তার অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ।
আপনার মতামত জানানঃ