ভারতের অর্থনীতির সামনে একদিকে দ্রুত প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা, অন্যদিকে বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সংকট। যে তরুণ শক্তিকে একসময় দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হিসেবে দেখা হয়েছিল, তাদের একটি বড় অংশ এখন চাকরি খুঁজতে খুঁজতে হতাশ। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে প্রায় ১০ কোটি তরুণ হতাশ হয়ে চাকরি খোঁজাই ছেড়ে দিয়েছে। ভারতের জন্য এটি শুধু বেকারত্বের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, শিক্ষা ব্যবস্থা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক-সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।
ভারতের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ কর্মক্ষম বয়সের। ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী মানুষকে সাধারণভাবে কর্মক্ষম জনসংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতে এই বয়সসীমার মানুষের সংখ্যা প্রায় ১০০ কোটি। কিন্তু তাদের মধ্যে কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে প্রায় ৬৭ কোটি মানুষের। অর্থাৎ বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনও শ্রমবাজারের বাইরে। অর্থনীতিবিদদের কাছে এই পরিস্থিতি বিশেষ উদ্বেগের, কারণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী তখনই দেশের জন্য ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ হয়ে ওঠে, যখন তাদের উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করা যায়।
ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলতে এমন একটি অর্থনৈতিক সুযোগকে বোঝায়, যখন একটি দেশের কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি থাকে। এই সময় যদি পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করা যায়, তাহলে মানুষের আয় বাড়ে, ভোগ বাড়ে, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয় এবং সরকারও বেশি কর আদায় করতে পারে। সেই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করা সম্ভব হয়। চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিম্ন বা মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ আয়ের অর্থনীতিতে উঠে এসেছে।
ভারতের ক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনা এখন প্রশ্নের মুখে। কারণ কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে চাকরি তৈরি হচ্ছে না। বরং উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যেই বেকারত্বের হার বেশি। বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্ব দেশের স্বল্পশিক্ষিত তরুণদের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। অর্থাৎ শিক্ষাকে দীর্ঘদিন ধরে যে নিরাপদ ভবিষ্যতের চাবিকাঠি হিসেবে দেখা হয়েছে, বাস্তব শ্রমবাজারে সেই ধারণা আর আগের মতো কার্যকর থাকছে না।
ভারতের তরুণদের বড় একটি অংশ সরকারি চাকরিকে নিরাপদ ভবিষ্যতের পথ হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু সরকারি চাকরির পদ সীমিত। ফলে অল্পসংখ্যক পদের জন্য লাখ লাখ তরুণ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেন। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষা পরিচালনায় অনিয়ম এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ। সম্প্রতি সরকারি চাকরির পরীক্ষা এবং চিকিৎসাবিদ্যায় প্রবেশিকা পরীক্ষা নিয়ে ভারতের বিভিন্ন স্থানে তরুণদের বিক্ষোভ তারই প্রতিফলন। দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে ঝাড়খণ্ডের রাঁচি—বিক্ষোভের কেন্দ্র ভিন্ন হলেও তরুণদের হতাশার জায়গাটি অনেকটা একই।
চাকরির সংকট শুধু সরকারি খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। বেসরকারি খাতেও উচ্চশিক্ষিত তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত ভালো চাকরি তৈরি হচ্ছে না। ভারতের অর্থনীতি দ্রুত বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থানের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়েছে। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় ‘লো এমপ্লয়মেন্ট ইলাস্টিসিটি অব গ্রোথ’। সহজভাবে বললে, দেশের জিডিপি বাড়ছে, কিন্তু সেই হারে মানুষের জন্য নতুন চাকরি তৈরি হচ্ছে না।
এই বৈপরীত্যের আরেকটি উদাহরণ পাওয়া যায় উৎপাদন খাতে। ভারতের অর্থনীতিতে উৎপাদন খাতকে বড় আকারে কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু প্রত্যাশা অনুযায়ী এই খাতের বিস্তার হয়নি। ২০১৪-১৫ সালে ভারতের জিডিপিতে উৎপাদন খাতের অংশ প্রায় ১৭ শতাংশ থাকলেও ২০২৪ সালের মধ্যে তা প্রায় ১২ শতাংশে নেমে এসেছে। বিশাল শ্রমশক্তির দেশ হিসেবে ভারতের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, ভারতের অর্থনৈতিক বিকাশের কাঠামোতেই একটি সমস্যা রয়েছে। ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক সংস্কারের পর ভারত কৃষি থেকে সরাসরি পরিষেবা খাতের দিকে দ্রুত এগিয়েছে। কিন্তু উৎপাদন খাতের যে শক্তিশালী পর্যায়টি সাধারণত একটি দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের মাঝখানে দেখা যায়, ভারত সেখানে প্রত্যাশিত অগ্রগতি করতে পারেনি। ফলে বিপুলসংখ্যক স্বল্প ও মাঝারি দক্ষতার মানুষের জন্য বড় পরিসরে শিল্পভিত্তিক চাকরি তৈরি হয়নি।
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও আর্থিক পরিষেবা খাত একসময় ভারতের শিক্ষিত তরুণদের জন্য বিপুল সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছিল। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু ধরনের কাজের চাহিদা কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে উৎপাদন ও অবকাঠামো খাতেও যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। আগে যে কাজের জন্য অনেক শ্রমিক প্রয়োজন হতো, এখন সেখানে আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে কম মানুষেই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
তবে প্রযুক্তিকে একমাত্র দায়ী করলে সমস্যাটিকে পুরোপুরি বোঝা যাবে না। ভারতের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ বা এমএসএমই খাত দীর্ঘদিন ধরে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এই খাতের দুর্বলতা নতুন চাকরি তৈরির ক্ষমতাকেও প্রভাবিত করছে। বড় শিল্প বা বহুজাতিক কোম্পানি সব মানুষের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে না। তাই স্থানীয় ব্যবসা, ক্ষুদ্র শিল্প ও মাঝারি উদ্যোগের সম্প্রসারণ ছাড়া ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে কর্মসংস্থানের সংকট দূর করা কঠিন।
শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জন করলেই যে একজন তরুণ চাকরির বাজারের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবেন, সেই ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই মিলছে না। অনেক শিক্ষার্থী স্বল্পমেয়াদি বিভিন্ন কোর্স করলেও সেগুলো সবসময় শিল্পের প্রয়োজনীয় দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হচ্ছে না। ফলে একদিকে চাকরি খুঁজছেন এমন শিক্ষিত তরুণের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে নিয়োগদাতারা প্রয়োজনীয় দক্ষতার কর্মী পাচ্ছেন না।
এই দক্ষতার ঘাটতি দূর করতে ভারত সরকার গত এক দশকে বিভিন্ন স্কিল ডেভেলপমেন্ট কর্মসূচি চালিয়েছে। কিন্তু এসব কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত দশ বছরে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও তাদের মাত্র ১৫ শতাংশ কাজ পেয়েছেন। এই পরিসংখ্যান দেখায়, শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই কর্মসংস্থানের সমস্যা সমাধান হয় না। প্রশিক্ষণকে বাস্তব শিল্পের চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করতে হয়।
আরেকটি বড় সমস্যা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা। সরকারি চাকরি বা উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের জন্য লাখ লাখ তরুণ যখন একটি পরীক্ষার ওপর নির্ভর করেন, তখন সেই পরীক্ষার সামান্য অনিয়মও তাদের জীবনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। একটি প্রশ্নপত্র ফাঁস মানে শুধু একটি পরীক্ষা বাতিল হওয়া নয়; এর অর্থ একজন তরুণের আরও কয়েক মাস বা বছর অপেক্ষা করা, নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়া এবং আর্থিক ও মানসিক চাপের মধ্যে পড়া। তাই পরীক্ষা পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি তরুণদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
কর্মসংস্থানের এই সংকটের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে মানুষের ক্রয়ক্ষমতায়। কাজ না থাকলে আয় কমে যায়। আয় কমলে মানুষ পণ্য ও পরিষেবা কম ব্যবহার করে। বাজারে চাহিদা কমলে ব্যবসার সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হয় এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগও সংকুচিত হয়। অর্থাৎ বেকারত্ব শুধু ব্যক্তির সমস্যা নয়; এটি ধীরে ধীরে পুরো অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
এর সঙ্গে রয়েছে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব। দীর্ঘদিন চাকরি খুঁজেও ব্যর্থ হওয়া একজন তরুণের মধ্যে হতাশা, ক্ষোভ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যখন একজন শিক্ষার্থী বহু বছর পড়াশোনা করে ডিগ্রি অর্জনের পরও নিজের জন্য একটি স্থায়ী জীবিকার পথ খুঁজে পান না, তখন শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর তার আস্থাও দুর্বল হতে পারে। সাম্প্রতিক তরুণদের আন্দোলনগুলোকে তাই কেবল চাকরির দাবি হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা বোঝা কঠিন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, হতাশ তরুণদের একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত চাকরি খোঁয়াই ছেড়ে দিচ্ছে। একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১২ সালে এমন তরুণের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ কোটি; বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ১০ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। তারা সবাই যে বেকারত্বের সরকারি পরিসংখ্যানে ধরা পড়বে, তা নয়। কারণ কেউ যদি কাজের সন্ধানই না করেন, তাহলে তাকে অনেক শ্রমবাজারের হিসাবেই সক্রিয় চাকরিপ্রার্থী হিসেবে গণনা করা হয় না। ফলে বাস্তব হতাশার মাত্রা প্রচলিত বেকারত্বের সংখ্যার চেয়েও বড় হতে পারে।
ভারতের সামনে তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী কি অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে, নাকি সেই জনগোষ্ঠীই ভবিষ্যতে অর্থনীতির ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়াবে? এর উত্তর নির্ভর করবে আগামী দিনের নীতিনির্ধারণের ওপর। শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি নয়, সেই প্রবৃদ্ধি কতটা কর্মসংস্থান তৈরি করছে, কতজন তরুণকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করছে এবং তাদের আয় ও জীবনযাত্রার মান কতটা বাড়াচ্ছে—এসব সূচককেও গুরুত্ব দিতে হবে।
ভারতের জন্য প্রয়োজন এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো, যেখানে উৎপাদন, এমএসএমই, পরিষেবা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো—সব খাতেই নতুন কাজ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমকে চাকরির বাজারের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে হবে। দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিকে শিল্পের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে এবং সরকারি চাকরির পরীক্ষায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ ভারতের তরুণ জনগোষ্ঠী শুধু একটি সংখ্যা নয়; তারাই দেশের আগামী দিনের শ্রমশক্তি, ভোক্তা, উদ্যোক্তা এবং করদাতা। তাদের হাতে কাজ থাকলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও দ্রুত এগিয়ে নিতে পারে। কিন্তু কাজের সুযোগ না থাকলে একই জনসংখ্যা হতাশা, আয়হীনতা ও সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে। ভারতের সামনে তাই সময় খুব বেশি নেই। বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে সম্পদে পরিণত করার সুযোগ এখনও রয়েছে, তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে চাকরি সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন ও শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারকে এখনই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
আপনার মতামত জানানঃ