মানুষের মস্তিষ্ক আজ পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল জৈব কাঠামোগুলোর একটি। চিন্তা করা, স্মৃতি ধরে রাখা, ভাষা তৈরি, সমস্যা সমাধান কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—এসব অসাধারণ ক্ষমতার পেছনে রয়েছে লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তন। কিন্তু এত বড় ও শক্তিশালী মস্তিষ্ক তৈরি হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল শক্তি এল কোথা থেকে? এতদিন মানুষের মস্তিষ্কের বিবর্তন নিয়ে আলোচনায় মাংস, প্রাণীজ প্রোটিন ও চর্বিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন এক গবেষণা সেই প্রচলিত ধারণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে। গবেষকদের মতে, মস্তিষ্কের বিবর্তনে প্রাকৃতিক শর্করা বা গ্লুকোজের ভূমিকাও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সিডনি বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নতুন গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘Science’-এ। গবেষণায় প্রায় ৪০ লক্ষ বছরের মানব বিবর্তনকে বিবেচনায় নিয়ে দেখা হয়েছে, আমাদের পূর্বপুরুষদের মস্তিষ্ক বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের গ্লুকোজের চাহিদা কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। গবেষকদের তৈরি মডেল থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, রান্নার প্রচলন হওয়ার বহু আগে থেকেই ফল, মধু ও অন্যান্য প্রাকৃতিকভাবে মিষ্টি খাবার মস্তিষ্কের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল।
মানুষের মস্তিষ্কের বিবর্তনের ইতিহাস সত্যিই বিস্ময়কর। গবেষণায় ব্যবহৃত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০ লক্ষ বছর আগে অস্ট্রালোপিথেকাস আফারেনসিসের মতো প্রাচীন মানব পূর্বপুরুষের মস্তিষ্কের ওজন ছিল আনুমানিক ৩০০ গ্রাম। আধুনিক মানুষের মস্তিষ্কের ওজন প্রায় ১ হাজার ৫০০ গ্রাম। অর্থাৎ কয়েক মিলিয়ন বছরের বিবর্তনের পথে মস্তিষ্কের আকার প্রায় পাঁচ গুণ হয়েছে। এই আকার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের শক্তির প্রয়োজনও বেড়েছে। আর সেই শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো গ্লুকোজ।
এখানেই গবেষণাটির মূল প্রশ্ন। মস্তিষ্ক এত বেশি গ্লুকোজ পেল কোথা থেকে? কারণ মানুষের পূর্বপুরুষদের খাদ্যাভ্যাস আজকের মতো ছিল না। তখন কৃষি ছিল না, বাজার ছিল না, এমনকি আগুন নিয়ন্ত্রণ করে নিয়মিত রান্না করার প্রযুক্তিও ছিল না। ফলে আজ আমরা যেসব খাবার থেকে সহজে শর্করা পাই, সেগুলোর অনেকটাই তখন মানুষের নাগালের বাইরে ছিল।
গবেষকদের মতে, সেই সময় ফলমূল ও মধুর মতো প্রাকৃতিকভাবে মিষ্টি খাবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এসব খাবারে থাকা সহজলভ্য শর্করা শরীরে গ্লুকোজের জোগান দিতে পারত। আর মস্তিষ্কের জন্য গ্লুকোজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জ্বালানি। মানুষের মস্তিষ্ক শরীরের ওজনের তুলনায় খুব ছোট একটি অঙ্গ হলেও এটি শরীরের বিপাকীয় শক্তির বড় অংশ ব্যবহার করে। নতুন গবেষণাটি সেই শক্তির উৎসের বিবর্তনীয় ইতিহাস বোঝার চেষ্টা করেছে।
এখানে অবশ্য একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। গবেষকরা বলছেন না যে শুধু মিষ্টি খাবার খাওয়ার কারণেই মানুষের মস্তিষ্ক বড় হয়েছে। মানুষের মস্তিষ্কের বিবর্তন ছিল অত্যন্ত জটিল একটি প্রক্রিয়া, যেখানে খাদ্য, পরিবেশ, সামাজিক জীবন, শারীরিক পরিবর্তন এবং অন্যান্য বিবর্তনীয় চাপ একসঙ্গে কাজ করেছে। নতুন গবেষণার মূল বক্তব্য হলো—মাংস ও প্রাণীজ প্রোটিনের পাশাপাশি পর্যাপ্ত গ্লুকোজ সরবরাহও এই দীর্ঘ বিবর্তনীয় যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
মানুষের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের সঙ্গে এই গল্পটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। প্রাচীন মানুষের খাদ্যতালিকায় ধীরে ধীরে প্রাণীজ খাবারের পরিমাণ বাড়ে। মাংস ও অন্যান্য প্রাণীজ খাবার থেকে পাওয়া প্রোটিন ও চর্বি শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি সরবরাহ করত। কিন্তু শুধু প্রোটিন পেলেই বড় মস্তিষ্ক চালানো সম্ভব নয়। মস্তিষ্কের বিপুল শক্তির চাহিদা পূরণের জন্য গ্লুকোজেরও প্রয়োজন ছিল। ফলে বিবর্তনের গল্পে প্রাণীজ খাবার ও উদ্ভিজ্জ শর্করাকে একে অপরের বিকল্প হিসেবে না দেখে পরস্পরকে সম্পূরক হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত পুষ্টিবিদ জেনি ব্র্যান্ড-মিলারের বক্তব্যের মূল বিষয়ও এটাই। প্রাণীজ প্রোটিন মানুষের বিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ হলেও মস্তিষ্কের জন্য গ্লুকোজের প্রয়োজনীয়তাকে উপেক্ষা করা যায় না। বিশেষ করে মানুষের মস্তিষ্ক অন্যান্য অনেক প্রাণীর তুলনায় বড় হওয়ায় তার শক্তির চাহিদাও বেশি।
তবে এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে—মানুষ যদি তখন দানাশস্য বা আলু জাতীয় খাবার সহজে হজম করতে না পারত, তাহলে প্রয়োজনীয় শর্করা আসত কীভাবে?
এর উত্তর খুঁজতে গেলে আগুনের ব্যবহার এবং রান্নার ইতিহাস সামনে আসে। গবেষকদের মতে, মানুষের খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তন আসে যখন তারা আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে এবং খাবার রান্না করতে শেখে। রান্নার ফলে কন্দ, শিকড় ও অন্যান্য স্টার্চসমৃদ্ধ খাবার অনেক বেশি সহজপাচ্য হয়ে ওঠে। ফলে খাবার থেকে শরীরে শক্তি পাওয়ার পরিমাণও বাড়ে।
অর্থাৎ মানব বিবর্তনের খাদ্য ইতিহাসকে মোটামুটি দুটি পর্যায়ে দেখা যায়। এক পর্যায়ে মানুষ রান্নার আগে ফল, মধু ও অন্যান্য প্রাকৃতিক মিষ্টি খাবার থেকে সহজলভ্য শর্করা পেত। পরে আগুন ও রান্নার প্রযুক্তি আয়ত্ত করার পর কন্দ, শিকড় ও অন্যান্য স্টার্চসমৃদ্ধ খাবার থেকে আরও বেশি পরিমাণে গ্লুকোজ পাওয়া সম্ভব হয়। এরপর অনেক পরে কৃষির বিকাশের সঙ্গে দানাশস্য মানুষের নিয়মিত খাদ্যের অংশ হয়ে ওঠে।
এই পরিবর্তনটি শুধু মানুষের পেট ভরানোর বিষয় ছিল না। এটি মানুষের মস্তিষ্কের শক্তি ব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত ছিল। গবেষকদের তৈরি মডেলে বিবর্তনের ছয়টি ধাপ বিবেচনা করা হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষের খাদ্যতালিকায় উদ্ভিজ ও প্রাণীজ খাবারের অনুপাত কীভাবে বদলেছে এবং তার সঙ্গে গ্লুকোজের চাহিদা কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এই গবেষণার একটি আকর্ষণীয় দিক হলো, বিজ্ঞানীরা শুধু মস্তিষ্কের গ্লুকোজের প্রয়োজন হিসাব করেননি। লোহিত রক্তকণিকা, কিডনি, প্রজনন ব্যবস্থা এবং গর্ভাবস্থার সঙ্গে যুক্ত টিস্যুগুলোর গ্লুকোজের প্রয়োজনীয়তাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শরীরের কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ও প্রক্রিয়া গ্লুকোজের ওপর নির্ভর করে, তার একটি বিস্তৃত চিত্র তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে।
বিশেষ করে গর্ভাবস্থার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ভ্রূণের বিকাশের জন্যও প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হয়। মায়ের শরীরে গ্লুকোজের চাহিদা তখন বেড়ে যায়। গবেষণায় তাই শুধু মস্তিষ্কের বিবর্তন নয়, প্রজনন ও মানবদেহের সামগ্রিক শক্তির চাহিদার কথাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
মানুষের মিষ্টির প্রতি আকর্ষণের সঙ্গেও এই গবেষণার একটি সম্ভাব্য সম্পর্ক রয়েছে। আজ আমরা মিষ্টি খাবারকে অনেক সময় অতিরিক্ত ক্যালরি বা স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করি। কিন্তু বিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাসে মিষ্টি স্বাদ হয়তো ছিল শক্তির সংকেত। ফল পাকা হলে তাতে সহজলভ্য শর্করার পরিমাণ বাড়ে। মধুও উচ্চশক্তির একটি প্রাকৃতিক খাদ্য। তাই প্রাচীন মানুষের জন্য মিষ্টি খাবারের প্রতি আকর্ষণ টিকে থাকার ক্ষেত্রে সুবিধা তৈরি করে থাকতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে আধুনিক মানুষ যত বেশি মিষ্টি খাবে, তত বেশি বুদ্ধিমান হবে। বরং গবেষণাটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কেন মানুষের খাদ্যাভ্যাসে শর্করার গুরুত্ব এত পুরোনো। প্রাকৃতিক ফল ও মধু থেকে শুরু করে রান্না করা কন্দ, পরে দানাশস্য—মানুষের খাদ্য বিবর্তনের সঙ্গে শর্করার উৎসও বদলেছে।
এখানে ‘চিনি’ শব্দটি নিয়ে একটি ভুল ধারণা এড়িয়ে চলা দরকার। আধুনিক চিনি, মিষ্টি, কোমল পানীয় বা অতিরিক্ত পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেটের সঙ্গে প্রাচীন মানুষের ফল ও মধু খাওয়াকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। গবেষণায় মূলত গ্লুকোজের জৈবিক প্রয়োজন এবং বিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়ে তার সম্ভাব্য খাদ্য উৎস নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ গবেষণার বক্তব্য ‘বেশি চিনি খাওয়া ভালো’—এমন কোনো স্বাস্থ্যপরামর্শ নয়।
বরং এই গবেষণা মানুষের বিবর্তনকে আরও বিস্তৃতভাবে দেখার সুযোগ দিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে মানব মস্তিষ্কের বড় হওয়ার গল্পে মাংস খাওয়াকে কেন্দ্রীয় ব্যাখ্যা হিসেবে দেখা হয়েছে। নতুন গবেষণা সেই গল্পে কার্বোহাইড্রেট ও উদ্ভিজ্জ শর্করার গুরুত্বকে সামনে আনছে। মাংস হয়তো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি দিয়েছে, কিন্তু বড় মস্তিষ্ক চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির প্রশ্নটি আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
মানুষের বিবর্তন আসলে এক ধরনের খাদ্য-প্রযুক্তির গল্পও। প্রথমে মানুষ প্রকৃতি থেকে পাওয়া খাবারের ওপর নির্ভর করেছে। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণ করেছে। রান্নার মাধ্যমে এমন অনেক খাবারকে সহজপাচ্য করেছে, যেগুলো কাঁচা অবস্থায় ততটা কার্যকর ছিল না। এরপর কৃষি এসেছে, মানুষ দানাশস্য উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে শিখেছে। প্রতিটি ধাপে খাদ্য থেকে শক্তি পাওয়ার ক্ষমতা বদলেছে এবং মানুষের জীবনযাত্রাও পরিবর্তিত হয়েছে।
এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের বিবর্তনের সম্পর্ক খুঁজে দেখা তাই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বড় মস্তিষ্ক শুধু বেশি শক্তি ব্যবহার করে না; বড় মস্তিষ্ক আবার মানুষকে আরও জটিল প্রযুক্তি, সামাজিক ব্যবস্থা ও খাদ্য সংগ্রহের কৌশল তৈরি করার ক্ষমতাও দিয়েছে। অর্থাৎ মস্তিষ্ক ও খাদ্যের মধ্যে সম্পর্কটি একমুখী ছিল না। খাদ্য মস্তিষ্ককে শক্তি দিয়েছে, আবার মস্তিষ্কের বিকাশ মানুষকে নতুন খাদ্য সংগ্রহ ও প্রস্তুতির কৌশল আবিষ্কার করতে সাহায্য করেছে।
নতুন গবেষণাটি তাই মানুষের বিবর্তনের একটি পুরোনো প্রশ্নের নতুন উত্তর খোঁজার চেষ্টা। মানুষ কেন অন্য অনেক প্রাণীর তুলনায় এত বড় মস্তিষ্ক তৈরি করল? এর উত্তর হয়তো কোনো একটি খাবারের মধ্যে লুকিয়ে নেই। মাংস, চর্বি, উদ্ভিজ্জ খাবার, শর্করা, রান্না, পরিবেশ এবং সামাজিক সহযোগিতা—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবেই মানুষ আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে।
সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। মানুষের মস্তিষ্কের গল্প শুধু মাংস খাওয়ার গল্প নয়, আবার শুধু মিষ্টি খাওয়ার গল্পও নয়। এটি কোটি কোটি ছোট ছোট পরিবর্তনের ফল—যেখানে খাদ্য ও শক্তির প্রাপ্যতা, পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার একসঙ্গে কাজ করেছে।
প্রায় ৪০ লক্ষ বছরের সেই দীর্ঘ যাত্রায় মানুষের মস্তিষ্ক প্রায় ৩০০ গ্রাম থেকে ১ হাজার ৫০০ গ্রামের বিশাল এক জটিল অঙ্গে পরিণত হয়েছে। আর সেই বিবর্তনের পেছনে প্রাকৃতিক শর্করা ও গ্লুকোজের ভূমিকাকে সামনে এনে নতুন গবেষণা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে—মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর গল্প অনেক সময় লুকিয়ে থাকে আমাদের প্রতিদিনের খাবারের মধ্যেই।
আপনার মতামত জানানঃ