বাংলাদেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এখন শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করছে। সাম্প্রতিক সময়ে একটি এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যায় গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার পর বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বড় ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে লোডশেডিং বেড়েছে, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে এবং বাসাবাড়িতেও গ্যাসের চাপ কমেছে।
এই পরিস্থিতি একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে—শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র বাড়ালেই বাংলাদেশের জ্বালানি সমস্যা সমাধান হবে না। প্রয়োজন গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো, দেশীয় উৎসের অনুসন্ধান জোরদার করা, এলএনজি আমদানিকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং পুরো জ্বালানি ব্যবস্থাকে আরও নির্ভরযোগ্য করে তোলা।
প্রথম কাজটি হওয়া উচিত জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যমান গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা। সাম্প্রতিক সংকটে দেখা গেছে, একটি এলএনজি টার্মিনাল অচল হয়ে পড়ায় জাতীয় গ্রিডে বড় পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। বাংলাদেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ওপর গুরুত্বপূর্ণ নির্ভরতা থাকায় একটির সমস্যা দ্রুত জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে।
তাই টার্মিনালগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও বিকল্প ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা জরুরি। শুধু একটি টার্মিনাল সচল থাকবে—এমন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। এলএনজি সরবরাহ, সংরক্ষণ, পুনর্গ্যাসীকরণ এবং জাতীয় গ্যাস গ্রিডের মধ্যে সমন্বয়ও বাড়াতে হবে।
তবে এলএনজি আমদানি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। কারণ বাংলাদেশের দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমছে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের ৬৫ শতাংশের বেশি এখন আমদানিনির্ভর।
এ কারণে দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হওয়া উচিত দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা। স্থলভাগের পাশাপাশি সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘসূত্রতা কমাতে হবে। নতুন অনুসন্ধান, কূপ খনন, পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন বাড়ানো এবং উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার—সবগুলোকে একই পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।
দেশীয় গ্যাস পাওয়া গেলে তা শুধু আমদানি বিল কমাবে না; বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পখাতেও তুলনামূলক স্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। তবে নতুন গ্যাস পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা ধরে বসে থাকাও ঠিক হবে না। অনুসন্ধান একটি ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া। তাই গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানি উৎসও দ্রুত বাড়াতে হবে।
এখানেই নবায়নযোগ্য জ্বালানির গুরুত্ব। বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, শিল্পকারখানার ছাদে সৌর প্যানেল এবং মাঝারি আকারের গ্রিড-সংযুক্ত প্রকল্প দ্রুত বাড়ানো যেতে পারে। সাম্প্রতিক আলোচনায় বিশেষজ্ঞরাও ছাদভিত্তিক ও মাঝারি আকারের সৌর প্রকল্প দ্রুত সম্প্রসারণের সম্ভাবনার কথা বলেছেন।
তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানোর অর্থ গ্যাস বা এলএনজি রাতারাতি বাদ দেওয়া নয়। সৌরবিদ্যুৎ সূর্যের ওপর নির্ভরশীল, ফলে রাতে বা মেঘলা আবহাওয়ায় উৎপাদন কমে যায়। তাই ব্যাটারি সংরক্ষণ, উন্নত গ্রিড এবং বিভিন্ন উৎসের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবস্থা হওয়া উচিত এমন একটি মিশ্র ব্যবস্থা, যেখানে গ্যাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অন্যান্য উৎস প্রয়োজন অনুযায়ী একে অন্যকে পরিপূরক করবে।
বিদ্যুৎ সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি চাহিদা ব্যবস্থাপনা। বর্তমানে সংকটের সময় দোকানপাট ও বিপণিবিতানের সময় কমিয়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্যোগ নিতে হয়েছে। সরকার সম্প্রতি দোকান, বাজার ও শপিং মল রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং আলোকসজ্জা নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দিয়েছে।
এ ধরনের জরুরি ব্যবস্থা সাময়িকভাবে চাপ কমাতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। শিল্পকারখানা, অফিস, বিপণিবিতান ও বাসাবাড়িতে শক্তি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়াতে হবে। পুরোনো ও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচকারী যন্ত্রপাতি ধীরে ধীরে দক্ষ প্রযুক্তি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা গেলে একই বিদ্যুৎ দিয়ে বেশি চাহিদা মেটানো সম্ভব।
বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শুধু উৎপাদন বাড়িয়ে লাভ নেই, যদি সেই বিদ্যুৎ প্রয়োজনীয় এলাকায় নির্ভরযোগ্যভাবে পৌঁছানো না যায়। কোথায় কত বিদ্যুৎ প্রয়োজন, কোন এলাকায় কখন সর্বোচ্চ চাহিদা তৈরি হয় এবং কীভাবে উৎপাদন ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য রাখা যায়—এসব তথ্যের ভিত্তিতে গ্রিড আধুনিক করতে হবে।
আরেকটি বড় বিষয় হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ। গ্যাসের ঘাটতির সময় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবর্তে তরল জ্বালানি বা অন্য ব্যয়বহুল উৎস ব্যবহার করতে হলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক সংকটেও গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় চাপ তৈরি হয়েছে।
তাই শুধু ‘আরও বিদ্যুৎ’ নয়, ‘কম খরচে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ’ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত লক্ষ্য। যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র অর্থনৈতিকভাবে অকার্যকর, সেগুলোর ব্যয় ও চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার। একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা, জ্বালানি ব্যয় এবং প্রকৃত উৎপাদন—সবকিছুর স্বচ্ছ হিসাব জনগণের সামনে থাকা প্রয়োজন।
এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রেও একই ধরনের কৌশল দরকার। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়তে সময় লাগবে। ফলে অন্তর্বর্তী সময়ে এলএনজি আমদানি প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু তা যেন একমাত্র সমাধান হয়ে না দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে গেলে বা সরবরাহে সমস্যা হলে বাংলাদেশ যেন আবার একই ধরনের সংকটে না পড়ে, সে জন্য দীর্ঘমেয়াদি আমদানি পরিকল্পনার পাশাপাশি বিকল্প উৎস তৈরি করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে মজুত ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু প্রয়োজনের সময় এলএনজি কেনার বদলে সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক বাজারঝুঁকি বিবেচনা করে সরবরাহ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ সাম্প্রতিক সংকট দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার একটি সমস্যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন প্রয়োজন জ্বালানি পরিকল্পনায়। বাংলাদেশকে এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে, যেখানে আগামী ১০, ২০ বা ৩০ বছরে কত গ্যাস প্রয়োজন হবে, দেশীয়ভাবে কতটা পাওয়া সম্ভব, কতটা আমদানি করতে হবে এবং নবায়নযোগ্য উৎস কতটা বাড়ানো সম্ভব—তার বাস্তব হিসাব থাকবে।
এই পরিকল্পনা শুধু আমলাতান্ত্রিক নথি হলে চলবে না। এতে প্রকৌশলী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, পরিবেশবিদ, শিল্পখাত ও ভোক্তা প্রতিনিধিদের মতামত থাকতে হবে। কোন প্রকল্প জাতীয় অর্থনীতির জন্য লাভজনক এবং কোন প্রকল্প ভবিষ্যতে ঋণ ও ব্যয়ের বোঝা বাড়াবে—সেটিও স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করা দরকার।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানো। জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিন বিদেশি প্রযুক্তি, বিদেশি কোম্পানি ও পরামর্শকের ওপর নির্ভরতা থাকলে দেশের নিজস্ব দক্ষতা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বিকশিত নাও হতে পারে। বাংলাদেশি প্রকৌশলী, গবেষক ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুসন্ধান, উৎপাদন, গ্রিড ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য প্রযুক্তি ও শক্তি সংরক্ষণে আরও বেশি যুক্ত করতে হবে।
একই সঙ্গে দুর্নীতি, অস্বচ্ছ চুক্তি ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের সুযোগ বন্ধ করতে হবে। জ্বালানি খাতে বড় বিনিয়োগ জড়িত থাকায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকল্প নেওয়ার আগে শুধু কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে তা নয়, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের প্রকৃত খরচ কত, পরিবেশগত ক্ষতি কত এবং দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের আর্থিক দায় কত—এসব হিসাব করতে হবে।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান তাই কোনো একক পদক্ষেপে হবে না। জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি সরবরাহ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন স্থিতিশীল করতে হবে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে হবে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি দ্রুত সম্প্রসারণ করতে হবে, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিক করতে হবে এবং শক্তি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়াতে হবে।
সবশেষে প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানি নীতি। একদিকে শুধু আমদানির ওপর নির্ভর করা যাবে না, অন্যদিকে বাস্তবতা উপেক্ষা করে শুধু দেশীয় উৎসের ওপরও নির্ভর করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে—স্বল্পমেয়াদে প্রয়োজনীয় এলএনজি আমদানি, মধ্যমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো এবং একই সঙ্গে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা তৈরি করা।
সাম্প্রতিক সংকটের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, একটি টার্মিনাল বন্ধ হলেই যদি পুরো জ্বালানি ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লাগে, তাহলে সেই ব্যবস্থা যথেষ্ট স্থিতিস্থাপক নয়। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি জ্বালানি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে একটি উৎস বা একটি অবকাঠামোর ব্যর্থতা পুরো দেশকে অচল করে দিতে না পারে।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের স্থায়ী সমাধান তাই শুধু আরও গ্যাস কিংবা আরও বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়। আসল সমাধান হলো—বহুমুখী জ্বালানি উৎস, শক্তিশালী দেশীয় সক্ষমতা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, আধুনিক গ্রিড, নবায়নযোগ্য শক্তির সম্প্রসারণ এবং স্বচ্ছ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এই পথেই বাংলাদেশ ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভরতা ও জ্বালানি অনিশ্চয়তা কমিয়ে একটি নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে এগোতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ