মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির সমুদ্রপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে এক বহুজাতিক সামরিক জোট, আর সেই তালিকায় নাম উঠেছে বাংলাদেশেরও। পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশরসহ মোট চৌদ্দটি দেশের এই উদ্যোগ ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যেমন কৌতূহল তৈরি হয়েছে, তেমনি ঢাকার কূটনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে নতুন হিসাব-নিকাশ। প্রশ্ন উঠছে—এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য আদতে কতটা লাভজনক, আর এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ঝুঁকিগুলোই বা কতটা গুরুতর।
বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হরমুজ প্রণালি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের জেরে দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অচল। বৈশ্বিক তেল সরবরাহের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়েই চলাচল করত, ফলে এর অচলাবস্থা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি করেছে। এই বাস্তবতায় উপসাগরীয় দেশগুলো, বিশেষত সৌদি আরব, বিকল্প রুট হিসেবে লোহিত সাগরের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে।
কিন্তু সেই বিকল্প পথও এখন নিরাপদ নয়। ইয়েমেনভিত্তিক হুথি বিদ্রোহীরা মাঝেমধ্যেই লোহিত সাগরে জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে, এমনকি বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে কার্যত অবরোধের মতো পরিস্থিতি তৈরি করার হুমকিও দিয়েছে তারা। ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত সংকীর্ণ এই প্রণালি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে, আর বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সামুদ্রিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহন এই পথেই সম্পন্ন হয়। দুটি গুরুত্বপূর্ণ চেকপয়েন্ট একসঙ্গে ঝুঁকিতে পড়ায় বিশ্ববাজারে অস্থিরতার আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে গেছে।
এই প্রেক্ষাপটেই সৌদি আরব নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ নৌ-মহড়া ও সমন্বিত টহল কার্যক্রম কেন্দ্রিক একটি জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাত বা ওমানের অনুপস্থিতি অনেকের নজর কেড়েছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক সম্পর্কের ইতিহাস নতুন নয়—নব্বইয়ের দশকের উপসাগরীয় যুদ্ধেও বাংলাদেশ সেনা পাঠিয়েছিল সৌদি ভূখণ্ড রক্ষায়। সেই ধারাবাহিকতাতেই বর্তমান সিদ্ধান্তকে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে অর্থনৈতিক নির্ভরতার প্রশ্ন। লাখো বাংলাদেশি শ্রমিক সৌদি আরবে কর্মরত, ফলে দেশটির কোনো কৌশলগত অনুরোধ উপেক্ষা করলে ভিসা প্রক্রিয়া বা শ্রমবাজারে বিরূপ প্রভাব পড়ার শঙ্কা থেকেই যায়। একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তার মতে, সৌদির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখতেই এই ধরনের অনুরোধে সাড়া দেওয়া প্রায় অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়।
শুধু বাধ্যবাধকতা নয়, এখানে সুযোগও দেখছেন সামরিক বিশ্লেষকরা। বহুজাতিক এই জোটে অংশ নিলে বাংলাদেশ নৌবাহিনী আধুনিক নৌ-কৌশল, যৌথ মহড়া এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের নৌ সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। এছাড়া লোহিত সাগরের ওপারে আফ্রিকা মহাদেশের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য ও জনশক্তি রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন তারা। পাশাপাশি এই রুট নিরাপদ থাকলে বাংলাদেশি পণ্যবাহী জাহাজগুলোও নিরাপদে চলাচল করতে পারবে, যা রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বেশ কিছু জটিলতাও। সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রশ্নটি হলো ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান মিত্র এবং ইরানের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী—এই বাস্তবতায় সৌদি-নেতৃত্বাধীন যেকোনো জোটকে তেহরান কীভাবে ব্যাখ্যা করবে, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নৌবাহিনীর এক সাবেক কর্মকর্তার আশঙ্কা, বাংলাদেশের এই পদক্ষেপ ইরান মনে রাখবে, এবং সংঘাত-পরবর্তী সময়ে ইরান যদি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আরও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, তাহলে তা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক জটিলতার কারণ হতে পারে। যেহেতু এই জোট জাতিসংঘের কোনো আনুষ্ঠানিক শান্তিরক্ষা কাঠামোর অংশ নয়, তাই সক্রিয় সংঘাতপ্রবণ এলাকায় মোতায়েন হওয়া বাহিনী সরাসরি হামলার শিকার হওয়ার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অতীতে সৌদি ভূখণ্ডে বাংলাদেশি বাহিনী মোতায়েনের সময় মিত্রশক্তির কাছ থেকে বাড়তি নিরাপত্তা সহায়তা মিলেছিল—এবার সেই নিশ্চয়তা কে দেবে, সে প্রশ্নও তুলছেন বিশ্লেষকরা।
আরেকটি উদ্বেগের জায়গা হলো বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত শুরুর পর থেকে ঢাকা সব পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়ে একধরনের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সৌদি-নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটে সরাসরি যুক্ত হলে এই নিরপেক্ষতা কতটা অক্ষুণ্ন থাকবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এখানে প্রয়োজন সতর্ক কূটনৈতিক বার্তা—তেহরানকে এটা স্পষ্টভাবে বোঝানো যে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ কোনো পক্ষ নেওয়ার বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং কেবল সামুদ্রিক নিরাপত্তা রক্ষার একটি প্রায়োগিক পদক্ষেপ।
জোটে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি এখনো বেশ কিছু বাস্তব প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব প্রয়োজন। এই জোটে বাংলাদেশের প্রকৃত ভূমিকা কী হবে, কোনো ক্ষয়ক্ষতি হলে তার দায় কে বহন করবে, মোতায়েন করা নৌ সদস্যদের বিমা ও নিরাপত্তা সুবিধা কেমন হবে—এই বিষয়গুলো এখনো অস্পষ্ট। প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক পর্যায়ে বিস্তারিত রূপরেখা চূড়ান্ত না হলে ঝুঁকির প্রকৃত মাত্রা বোঝা কঠিন।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখলে, হরমুজের পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবও যদি দীর্ঘমেয়াদে অস্থির থাকে, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হবে। আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এই বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতা রক্ষায় অবদান রাখার একটি যৌক্তিকতা আছে। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেশের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ভারসাম্য যেন বিপন্ন না হয়, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক নেতৃত্বের কাছে সেটিই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
শেষ পর্যন্ত এই জোটে যোগদান বাংলাদেশের জন্য একইসঙ্গে সুযোগ ও সতর্কতার এক জটিল মিশ্রণ তৈরি করেছে। অর্থনৈতিক নির্ভরতা, নৌ সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা এবং বৈশ্বিক দায়বদ্ধতা একদিকে যেমন এই সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক করে তুলছে, তেমনি ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য উত্তেজনা ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির ক্ষয় নিয়ে উদ্বেগও কম নয়। আগামী দিনগুলোতে ঢাকা কীভাবে এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে, তার ওপরই নির্ভর করবে এই সিদ্ধান্তের প্রকৃত ফলাফল।
আপনার মতামত জানানঃ