মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দিনের তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ ভেঙে আবারও নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। যুদ্ধবিরতির মতো একটি পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর যখন অনেকেই ধারণা করছিলেন যে অন্তত সাময়িকভাবে সংঘাতের গতি কমতে পারে, ঠিক তখনই ইরানের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পুরো সমীকরণ বদলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এই হামলা ছিল কোনো তাৎক্ষণিক মার্কিন আঘাতের প্রতিক্রিয়া নয়; বরং ইরান নিজ উদ্যোগে নতুন করে সংঘাতের সূচনা করেছে। এ ঘটনাকে শুধু একটি সামরিক অভিযান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রতিরোধ কৌশল এবং আঞ্চলিক আধিপত্যের প্রশ্নকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে।
গত কয়েক বছরে ইরানের সামরিক ও কূটনৈতিক নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। আগে তেহরান সাধারণত সরাসরি সংঘর্ষের পরিবর্তে তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করত। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দেখা যাচ্ছে, ইরান প্রয়োজনে নিজেই উদ্যোগ নিয়ে হামলা চালাতে প্রস্তুত। এর মাধ্যমে তারা একটি বার্তা দিতে চাইছে—মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও সামরিক সমীকরণে তারা আর কেবল প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি নয়; বরং পরিস্থিতি নিজেদের পক্ষে ঘুরিয়ে দেওয়ার সক্ষমতাও রাখে।
এই হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত কঠোর। তিনি জানিয়েছেন, ইরানের এই পদক্ষেপের জবাব দেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে আরও শক্তিশালী সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই দাবি করেছে, ইরানের বিপ্লবী গার্ডের একাধিক স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালানো হয়েছে। এর অর্থ হলো, সংঘাত আবারও সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ফিরে এসেছে এবং প্রক্সি যুদ্ধের সীমা অতিক্রম করে আরও বিস্তৃত রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, যুদ্ধ থেমে থাকার মধ্যেই ইরান কেন এমন ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিল? বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, তেহরান বুঝতে পেরেছে যে শুধুমাত্র প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থেকে তারা তাদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না। বরং প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে হলে প্রয়োজনমতো আগাম আঘাত হানার সক্ষমতা প্রদর্শন করতে হবে। এই মানসিক পরিবর্তনই সম্ভবত নতুন হামলার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠান এসডব্লিউপির বিশেষজ্ঞ হামিদ রেজা আজিজির মতে, ইরানের কৌশলগত চিন্তায় একটি মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। তাঁর মতে, আগের তুলনায় এখন ইরান অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং প্রয়োজন হলে প্রথম হামলা চালাতেও দ্বিধা করছে না। এই পরিবর্তন শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে ইরান দেখাতে চাইছে যে তারা আর প্রতিপক্ষের পদক্ষেপের অপেক্ষায় থাকবে না।
ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বৈঠকের পরপরই ইরানের এই হামলা নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রকে নয়, ইসরায়েলকেও একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়ার প্রচেষ্টা। তেহরান বোঝাতে চাইছে, তাদের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্বার্থ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে নেওয়া হলে তারা সামরিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত।
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সৌদি আরবের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততা। এত দিন সৌদি আরব মূলত পরোক্ষভাবে সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে দেশটি একাধিক দিক থেকে নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ইয়েমেনের হুতি, ইরাকে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া এবং সরাসরি ইরানের সামরিক কর্মকাণ্ড—এই তিনটি দিক থেকেই রিয়াদের ওপর চাপ বাড়ছে। ফলে সৌদি আরবও ধীরে ধীরে সংঘাতের গভীরে জড়িয়ে পড়ছে।
সৌদি আরবের সম্পৃক্ততা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও জটিল করে তুলেছে। কারণ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে সৌদি আরবের স্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি দেশটি সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
এই সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি তেল এই সংকীর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে হরমুজ শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়; এটি আন্তর্জাতিক অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধমনি। ইরান দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, এই প্রণালিতে তাদের সার্বভৌম অধিকার ও কৌশলগত অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বিকল্প নৌপথ তৈরির মাধ্যমে ইরানের প্রভাব কমিয়ে আনতে চায়।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ তাদের জন্য অস্তিত্বের প্রশ্ন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যদি বিকল্প নৌপথ কার্যকর হয়ে যায়, তাহলে হরমুজে ইরানের কৌশলগত গুরুত্ব অনেকটাই কমে যাবে। ফলে তেহরানের দৃষ্টিতে এটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ও।
অন্যদিকে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরাও এই সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে। তাদের অবস্থান হলো, গাজা সংকট ও আঞ্চলিক অবরোধের প্রশ্নে পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত তারা সামরিক অভিযান বন্ধ করবে না। ফলে ইরান, হুতি এবং ইরান-সমর্থিত অন্যান্য গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড এখন একটি বৃহত্তর কৌশলগত কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইসরায়েলি গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ মনে করেন, তেহরান কিংবা তাদের মিত্ররা এখন নিজেদের মূল কৌশলগত লক্ষ্য থেকে সরে আসতে রাজি নয়। বরং তারা মনে করছে, ধারাবাহিক সামরিক চাপের মাধ্যমেই প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক ছাড় দিতে বাধ্য করা সম্ভব। এই ধারণাই সংঘাতকে আরও দীর্ঘায়িত করার আশঙ্কা তৈরি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও পরিস্থিতি সহজ নয়। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। যদি ওয়াশিংটন কঠোর সামরিক জবাব অব্যাহত রাখে, তাহলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে। আবার যদি কূটনৈতিক সমাধানের পথে এগোয়, তাহলে সেটিকে দুর্বলতা হিসেবে দেখার ঝুঁকিও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে মূলত দুটি পথ খোলা রয়েছে। প্রথমত, সীমিত সমঝোতার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করা। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে ইরান ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রাখা। উভয় পথেরই রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক ব্যয় রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক এই উত্তেজনা বিশ্বের জ্বালানি বাজারের জন্যও বড় উদ্বেগের বিষয়। হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এশিয়া, ইউরোপ এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক কূটনীতিও নতুন পরীক্ষার মুখে পড়েছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি এখন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ এই সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করে, তাহলে তা শুধু কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে ইরানের সাম্প্রতিক হামলা একটি তাৎক্ষণিক সামরিক অভিযান নয়; এটি একটি বৃহত্তর কৌশলগত বার্তা। তেহরান দেখাতে চায় যে তারা এখন নিজেদের শর্তে আঞ্চলিক সমীকরণ নির্ধারণের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত এবং কূটনীতি ও সামরিক শক্তির মধ্যে কী ধরনের ভারসাম্য তৈরি করতে পারে, সেটিই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান বাস্তবতা বলছে, আপাত শান্তির আড়ালে সংঘাতের আগুন এখনও জ্বলছে। আর সেই আগুন যদি আরও ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে এর প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রতিটি স্তরেই তার প্রতিধ্বনি শোনা যাবে।
আপনার মতামত জানানঃ