
রাষ্ট্রপতির চেয়ার খালি। কিন্তু প্রশ্নটা শুধু কে বসবেন তা নয় — প্রশ্নটা হলো, কোন নিয়মে বসবেন? গণভোটে অনুমোদিত জুলাই সনদ বলছে এক কথা, কার্যকর সংবিধান বলছে আরেক কথা। আর বাস্তবে সিদ্ধান্তটা নেবে একটি দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন তাই কেবল একটি শূন্যপদ পূরণের প্রক্রিয়া নয়, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতির প্রথম বড় পরীক্ষা।
যেভাবে শূন্য হলো পদ
গত ২৪ জুলাই, শুক্রবার বিকেলে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের কাছে স্বাক্ষরিত পদত্যাগপত্র জমা দেন। কারণ হিসেবে দেখানো হয় গুরুতর অসুস্থতা। সংবিধান অনুযায়ী স্পিকারের কাছে জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পদত্যাগ কার্যকর হয়।
২০২৩ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত সাহাবুদ্দিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৮ সালের এপ্রিলে। অর্থাৎ মেয়াদের প্রায় দুই বছর বাকি থাকতেই তিনি সরে দাঁড়ালেন। এর ফলে সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার এখন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন, আর সংসদ পরিচালনার ভার গেছে ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের হাতে।
নির্বাচন কমিশন বলছে, সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন — অর্থাৎ অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যে। আইনমন্ত্রীর ভাষ্য, ভোট হবে সেপ্টেম্বরের নিয়মিত সংসদ অধিবেশনে; দ্বিতীয় অধিবেশন শেষ হয়েছে ১৫ জুলাই, তৃতীয় অধিবেশন বসতে হবে ১৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন অবশ্য এখনো তারিখ ঘোষণা করেননি; ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সংখ্যার রাজনীতি: সিদ্ধান্ত একজনের
সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের ভোটে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে সরকার গঠন করেছে। ফলে গণিতটা সরল: বিএনপি যাঁকে মনোনয়ন দেবে, তিনিই রাষ্ট্রপতি।
দলীয় সূত্রের বরাতে গণমাধ্যমে যেসব নাম আলোচনায় এসেছে — এলজিআরডি মন্ত্রী ও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান। কোনো নাম আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি, শর্টলিস্টও প্রকাশ করেনি দল। বিএনপির নেতারা বলছেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছ থেকে — “রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও বড় বিতর্কমুক্ত” কাউকে খোঁজা হচ্ছে।
এখানেই প্রথম বৈপরীত্য। আওয়ামী লীগের একদলীয় মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের যে চর্চাকে জুলাই অভ্যুত্থানের পর “দলীয়করণের প্রতীক” বলা হয়েছিল, সেই একই কাঠামোয় এবার নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। শুধু মনোনয়নদাতা দলের নামটি বদলেছে।
জুলাই সনদ যা বলেছিল
২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি বদলের সুস্পষ্ট প্রস্তাব ছিল: রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন আইনসভার উভয় কক্ষের সদস্যদের গোপন ভোটে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে। উদ্দেশ্য ছিল একটাই — একক দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় রাষ্ট্রপতি পদটি যেন স্রেফ দলীয় পুরস্কারে পরিণত না হয়। সনদে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাবও ছিল, যাতে নির্বাহী বিভাগের ওপর ভারসাম্য তৈরি হয়।
১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে ৬১ শতাংশ ভোটার সংস্কার প্যাকেজের পক্ষে রায় দিয়েছেন। কিন্তু চারটি বিষয়কে একটি “হ্যাঁ/না” প্রশ্নে গুছিয়ে ফেলার কারণে ঠিক কোন প্রস্তাবগুলো অনুমোদিত হলো এবং সেগুলোর বাধ্যবাধকতা কতটুকু — এই অস্পষ্টতা রয়ে গেছে শুরু থেকেই। উচ্চকক্ষ গঠন ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের কাজ এখনো অসমাপ্ত। ফলাফল: সনদ-পরবর্তী প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনটি হতে যাচ্ছে সনদ-পূর্ব নিয়মে।
বিরোধীদের হিসাব
সংবিধান সংশোধনে সরকারের গঠিত ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটিকে ইতিমধ্যেই “প্রহসন” বলেছে বিরোধী শিবির। তাদের দাবি, খণ্ডিত সংশোধনী নয়, গণভোটের রায় অনুযায়ী পূর্ণ সংস্কার। এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবের অভিযোগ, নির্বাচনের পর বিএনপি তাদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে; দলটি রাজপথে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী আবার নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে “দলীয় ব্যক্তির” নিয়োগকে নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য হুমকি বলে বিবৃতি দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন একটি পরীক্ষা: বিএনপি কি নিজের দলেরই একজন প্রবীণ নেতাকে বঙ্গভবনে পাঠাবে, নাকি বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত নির্দলীয় কোনো নাম বেছে নেবে? প্রথমটি হলে সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধিতা আরও তীব্র হবে; দ্বিতীয়টি হলে সরকার কিছুটা রাজনৈতিক পুঁজি অর্জন করবে।
কেন এই পদ এবার গুরুত্বপূর্ণ
প্রচলিত ধারণায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আলংকারিক। কিন্তু আগামী মেয়াদে তিনটি কারণে পদটি ভিন্ন গুরুত্ব বহন করে।
প্রথমত, সংস্কার প্রক্রিয়া চলমান। সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়বে — অর্থাৎ যিনি এখন নির্বাচিত হবেন, তিনি মেয়াদের মধ্যেই আরও ক্ষমতাধর একটি পদে পরিণত হতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে এবং সাংবিধানিক সংস্থাগুলোতে নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক চলমান। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর ছাড়া এসব নিয়োগ চূড়ান্ত হয় না।
তৃতীয়ত, সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ও ট্রাইব্যুনাল-সংক্রান্ত আলোচনা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। উত্তরসূরির গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করবে বঙ্গভবন প্রতিষ্ঠান হিসেবে কতটা আস্থা ফিরে পায়।
যে প্রশ্নগুলো এখনো অমীমাংসিত
- তফসিল কবে? ইসি এখনো তারিখ দেয়নি, আর আইনমন্ত্রী বলছেন সেপ্টেম্বরের অধিবেশন — ৯০ দিনের সীমা শেষ হচ্ছে অক্টোবরের শেষ ভাগে।
- ভোট হবে প্রকাশ্যে না গোপন ব্যালটে, এবং সনদের “উভয় কক্ষ” শর্তটির কী হবে?
- বিরোধী দলগুলো কি প্রার্থী দেবে, নাকি ২০২৩-এর মতো আবারও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হবে?
উত্তরগুলো আসতে কয়েক সপ্তাহ লাগবে। কিন্তু প্রশ্নগুলোর ধরন থেকেই স্পষ্ট — অভ্যুত্থানের দুই বছর পর বাংলাদেশ এখনো ঠিক করতে পারেনি, রাষ্ট্রপতি পদটি দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয় থাকবে, নাকি জাতীয় ঐকমত্যের।
আপনার মতামত জানানঃ