বিশ্বজুড়ে ক্যান্সার এখন অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে নতুন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বর্তমানের তুলনায় প্রায় ৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়া, নগরায়ণ, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, পরিবেশ দূষণ এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ অভ্যাসকে দায়ী করা হচ্ছে।
বাংলাদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে মোট মৃত্যুর ১১.৯ শতাংশই ক্যান্সারের কারণে ঘটে। অর্থাৎ প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ এই রোগে প্রাণ হারাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতার অভাব, দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়া এবং অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা শুরু না হওয়াই মৃত্যুহার বাড়ার অন্যতম কারণ।
ক্যান্সার কী?
ক্যান্সার হলো এমন একটি রোগ, যেখানে শরীরের কিছু কোষ নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। এই অস্বাভাবিক কোষগুলো আশপাশের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং রক্ত বা লসিকার মাধ্যমে শরীরের অন্য অঙ্গেও পৌঁছে যেতে পারে। এই অবস্থাকে মেটাস্ট্যাসিস (Metastasis) বলা হয়, যা ক্যান্সারের সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায়গুলোর একটি।
কেন বাড়ছে ক্যান্সারের ঝুঁকি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়—
• ধূমপান ও তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার
• অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
• নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের অভাব
• অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা
• অতিরিক্ত মদ্যপান
• বায়ুদূষণ ও পরিবেশগত দূষণ
• HPV ও Hepatitis B-এর মতো কিছু ভাইরাসজনিত সংক্রমণ
• পারিবারিক বা বংশগত কারণ
• অতিরিক্ত সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শ
বাংলাদেশে বেশি দেখা যায় যেসব ক্যান্সার
বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে যেসব ক্যান্সার বেশি শনাক্ত হয়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
• স্তন ক্যান্সার (Breast Cancer)
• ফুসফুসের ক্যান্সার (Lung Cancer)
• মুখ ও গলার ক্যান্সার (Oral & Throat Cancer)
• জরায়ুমুখের ক্যান্সার (Cervical Cancer)
• পাকস্থলীর ক্যান্সার (Stomach Cancer)
• লিভার ক্যান্সার (Liver Cancer)
যেসব লক্ষণ অবহেলা করা উচিত নয়
ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ সবসময় একই রকম হয় না। তবে নিচের লক্ষণগুলো দীর্ঘদিন থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি—
• শরীরে অস্বাভাবিক গাঁট বা ফোলা
• দীর্ঘদিনের কাশি বা কণ্ঠস্বর পরিবর্তন
• অকারণে দ্রুত ওজন কমে যাওয়া
• অস্বাভাবিক রক্তপাত
• দীর্ঘদিনের জ্বর বা অতিরিক্ত ক্লান্তি
• ক্ষত দীর্ঘদিনেও না শুকানো
• খাওয়া গিলতে অসুবিধা বা হজমে সমস্যা
ক্যান্সার প্রতিরোধে কী করবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ধরনের ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব যদি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অনুসরণ করা যায়। এজন্য—
• ধূমপান ও তামাক সম্পূর্ণভাবে বর্জন করুন।
• প্রতিদিন ফল, শাকসবজি ও পুষ্টিকর খাবার খান।
• নিয়মিত ব্যায়াম করুন এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন।
• Hepatitis B ও HPV টিকা গ্রহণ করুন।
• অপ্রয়োজনীয় বিকিরণ ও ক্ষতিকর রাসায়নিক থেকে দূরে থাকুন।
• নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ক্যান্সার স্ক্রিনিং করান।
• শরীরে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সচেতনতাই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ
চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে বর্তমানে অনেক ধরনের ক্যান্সার সফলভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব, বিশেষ করে যদি রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হয়। তাই ক্যান্সার সম্পর্কে ভয় নয়, বরং সচেতনতা বাড়ানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে অসংখ্য প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব।
সচেতন হোন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন এবং অন্যদেরও সচেতন করুন। কারণ ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সচেতনতাই সবচেয়ে বড় শক্তি।
সূত্র: World Health Organization (WHO)
আপনার মতামত জানানঃ