বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি আবারও আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের কাছ থেকে প্রকাশ্যে এমন একটি অঙ্গীকার চাইছে, যাতে নিশ্চিত করা হবে যে হরমুজ প্রণালি সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং সেখানে আর কোনো হামলা বা গুলি চালানোর ঘটনা ঘটবে না। শনিবার ওমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে নতুন দফার আলোচনা শুরু হওয়ার কথা, সেখানে এই বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্যসূচি হিসেবে স্থান পাচ্ছে। কারণ বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে এই প্রণালির নিরাপত্তা সরাসরি সম্পর্কিত।
যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ইরান অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের কাছে স্বীকার করেছে যে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর গুলি চালানোর ঘটনা একটি ভুল ছিল। তবে তেহরান দাবি করেছে, এই হামলার জন্য রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকেরা দায়ী নন; বরং দেশটির ভেতরে থাকা একটি নিয়ন্ত্রণহীন কট্টরপন্থি গোষ্ঠী পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে। এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে ইরান মূলত আলোচনার পথ খোলা রাখতে চাইছে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকেরা।
গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যে সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়েছিল, তা কয়েক মাসের মধ্যে সবচেয়ে বড় উত্তেজনার জন্ম দেয়। যদিও জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছেছিল, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই সমঝোতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। যুদ্ধবিরতির অন্যতম শর্ত ছিল বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা। কিন্তু কয়েকটি জাহাজে হামলার অভিযোগ ওঠার পর যুক্তরাষ্ট্র এটিকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, কেবল মৌখিক ব্যাখ্যা নয়, বরং প্রকাশ্য বিবৃতির মাধ্যমে ইরানকে জানাতে হবে যে হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলার পুনরাবৃত্তি হবে না। ওয়াশিংটন মনে করছে, এমন ঘোষণা শুধু কূটনৈতিক আস্থাই ফিরিয়ে আনবে না, বরং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলেও ইতিবাচক বার্তা দেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম অংশীদার সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, ইরানের পক্ষ থেকে মার্কিন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে যে একটি ‘পথভ্রষ্ট’ গোষ্ঠী আলোচনাকে ভেস্তে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাণিজ্যিক জাহাজে গুলি চালিয়েছিল। একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, ইরান আবার আলোচনায় ফিরে এসে স্বীকার করেছে যে এটি একটি ভুল ছিল এবং তারা আলোচনা অব্যাহত রাখতে আগ্রহী। যদিও এই বক্তব্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইরান প্রকাশ করেনি, তবুও বিষয়টি কূটনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে মার্কিন প্রশাসন আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তেহরানের কাছে স্পষ্ট বার্তা পাঠিয়েছে। সেই বার্তায় বলা হয়েছে, ইরানকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতে হবে যে হরমুজ প্রণালি নিরাপদ এবং সেখানে কোনো বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা করা হবে না। একজন মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, ইরান যদি এই বার্তা না দেয়, তাহলে তার পরিণতি ভালো হবে না। যদিও তিনি সম্ভাব্য পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি, তবে এটিকে কূটনৈতিক চাপের অংশ বলেই মনে করা হচ্ছে।
এই উত্তেজনার মধ্যেই শনিবার ওমানে নতুন দফার আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলে থাকবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। তাদের উপস্থিতি থেকে বোঝা যায়, এই আলোচনাকে যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। একই সময়ে উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে কাতারের একটি প্রতিনিধিদলও ইরান সফর করেছে, যা আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ইরান আলোচনায় ফিরে আসার অনুরোধ জানিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তাতে সম্মত হয়েছে। তবে তিনি একই সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে পূর্বের যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হয়ে গেছে। ট্রাম্পের এই বক্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে নতুন আলোচনা সম্পূর্ণ নতুন বাস্তবতায় শুরু হচ্ছে, যেখানে আস্থা পুনর্গঠনই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস প্রতিদিন এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে সামান্য উত্তেজনাও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। যুদ্ধ বা সংঘর্ষের আশঙ্কা বাড়লেই তেলের দাম বৃদ্ধি, বীমা ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এ কারণেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে এই প্রণালির নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলও কমে গেছে। অনেক শিপিং কোম্পানি বিকল্প রুট বিবেচনা করছে অথবা অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। এতে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরও পড়তে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও উদ্বেগের।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরান সম্প্রতি হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবা পরিচালনার বিষয়ে নতুন পরিকল্পনার কথা বলেছে। তাদের দাবি, প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি নতুন কাঠামো গড়ে তোলা হবে। এর আওতায় জলপথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর জন্য সম্ভাব্য সেবা ফি নির্ধারণের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। যদিও এই পরিকল্পনা এখনও বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি, তবুও এটি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান একদিকে তার সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে চাইছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পথও খোলা রাখতে বাধ্য হচ্ছে। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন তেহরানের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও বুঝতে পারছে যে সামরিক উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তাও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই সামরিক চাপ বজায় রাখার পাশাপাশি কূটনৈতিক আলোচনার ওপরও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে ওয়াশিংটন।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয় নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ভবিষ্যতের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। শনিবারের আলোচনা কতটা ফলপ্রসূ হবে, ইরান প্রকাশ্যে কী ধরনের অঙ্গীকার দেবে এবং উভয় পক্ষ কতটা আস্থা পুনর্গঠন করতে পারবে—এসব প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশ্বের দৃষ্টি এখন তাই ওমানের আলোচনার টেবিলে, যেখানে একটি সফল সমঝোতা শুধু নতুন সংঘাত এড়াতেই নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ