একসময় আকাশে উড়ন্ত ড্রোনকে কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের একটি আধুনিক প্রযুক্তি হিসেবেই দেখা হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রযুক্তির ব্যবহার যুদ্ধের সীমা পেরিয়ে কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা, অবকাঠামো নির্মাণ, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, নিরাপত্তা এবং শিল্প উৎপাদনের মতো অসংখ্য ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বের উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলো এখন ড্রোন প্রযুক্তিকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচনা করছে। এমন বাস্তবতায় তুরস্কের সহযোগিতায় বাংলাদেশে ড্রোন উৎপাদনের কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন এবং শিল্প উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী বগুড়ায় নির্মাণাধীন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশেই যৌথ উদ্যোগে ড্রোন তৈরির কারখানা গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে সেখানে বিমানবাহিনীর নতুন ঘাঁটি এবং আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর নির্মাণের কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে উত্তরাঞ্চলকে কেন্দ্র করে একটি নতুন এভিয়েশন ও প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এটি শুধু একটি কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনা নয়; বরং দেশের শিল্প, প্রযুক্তি ও কৌশলগত সক্ষমতার নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলেই বিবেচিত হতে পারে।
বিশ্বের প্রতিরক্ষা শিল্পে বর্তমানে তুরস্ক একটি সফল উদাহরণ। গত এক দশকে দেশটি নিজস্ব প্রযুক্তিতে ড্রোন তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। তুরস্কের তৈরি বিভিন্ন ড্রোন বিশ্বের বহু দেশে রপ্তানি হচ্ছে এবং বিভিন্ন সংঘাতে তাদের কার্যকারিতা আলোচনায় এসেছে। ফলে তুরস্কের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং উৎপাদন দক্ষতা বাংলাদেশের সঙ্গে ভাগাভাগি হলে দেশীয় প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের জন্য তা হবে বড় ধরনের শেখার সুযোগ।
বাংলাদেশে ড্রোন উৎপাদনের সম্ভাবনা শুধু সামরিক ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কৃষি খাতে ড্রোন ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে বিপ্লব ঘটিয়েছে। আধুনিক ড্রোন ব্যবহার করে খুব অল্প সময়ে বিশাল কৃষিজমিতে সার ও কীটনাশক ছিটানো যায়, ফসলের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা যায় এবং কোথায় পানি বা পুষ্টির ঘাটতি রয়েছে তা নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি যখন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন স্মার্ট কৃষির জন্য ড্রোন একটি কার্যকর প্রযুক্তি হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ দেশ। প্রতি বছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও পাহাড়ধসে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। এমন পরিস্থিতিতে ড্রোন দ্রুত দুর্গত এলাকা পর্যবেক্ষণ, ক্ষয়ক্ষতির হিসাব, আটকে পড়া মানুষের অবস্থান শনাক্ত এবং উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রচলিত পদ্ধতিতে যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগে, সেখানে ড্রোন কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম।
স্বাস্থ্য খাতেও ড্রোনের সম্ভাবনা কম নয়। দুর্গম এলাকায় জরুরি ওষুধ, রক্ত, টিকা কিংবা চিকিৎসা সরঞ্জাম দ্রুত পৌঁছে দিতে বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে ড্রোন ব্যবহার করছে। বাংলাদেশের চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা কিংবা দুর্গম গ্রামে এই প্রযুক্তি চালু করা গেলে জরুরি স্বাস্থ্যসেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে।
নগর পরিকল্পনা, ভূমি জরিপ এবং অবকাঠামো উন্নয়নেও ড্রোনের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। সড়ক, সেতু, রেললাইন, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন কিংবা বড় নির্মাণ প্রকল্প নিয়মিত পর্যবেক্ষণে ড্রোন সময় ও ব্যয় উভয়ই কমাতে পারে। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং মান নিয়ন্ত্রণেও এটি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
পরিবেশ সংরক্ষণেও ড্রোন একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। বনভূমি পর্যবেক্ষণ, অবৈধ দখল শনাক্ত, নদীর গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ, উপকূলীয় পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ কিংবা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে আধুনিক ড্রোন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্যও এই প্রযুক্তি অত্যন্ত সহায়ক।
বগুড়ায় ড্রোন কারখানা স্থাপনের আরেকটি বড় সম্ভাবনা হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠলে প্রকৌশলী, সফটওয়্যার ডেভেলপার, ইলেকট্রনিক্স বিশেষজ্ঞ, মেকানিক্যাল টেকনিশিয়ান, গবেষক এবং দক্ষ কারিগরদের জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোও নতুন নতুন গবেষণার সুযোগ পাবে। এতে তরুণদের মধ্যে উদ্ভাবনী চিন্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতাও বাড়বে।
ড্রোন শিল্পের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেন্সর প্রযুক্তি, রোবোটিকস, জিপিএস, তথ্য বিশ্লেষণ এবং সফটওয়্যার উন্নয়নের মতো বিভিন্ন খাত নিবিড়ভাবে যুক্ত। ফলে একটি ড্রোন কারখানা গড়ে উঠলে শুধু একটি শিল্প নয়, বরং এর সঙ্গে সম্পর্কিত আরও বহু প্রযুক্তিভিত্তিক শিল্প বিকাশের সুযোগ তৈরি হবে। এটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের প্রযুক্তি অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি নজর দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, কেবল কারখানা নির্মাণ করলেই হবে না; প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশি প্রকৌশলীরা যেন উৎপাদনের প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন, সে ব্যবস্থা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, গবেষণা ও উন্নয়নে নিয়মিত বিনিয়োগ করতে হবে। প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হয়, তাই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে উদ্ভাবন অব্যাহত রাখতে হবে।
একই সঙ্গে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গবেষণা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ড্রোন ডিজাইন, সফটওয়্যার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইলেকট্রনিক্স ও এভিয়েশন প্রযুক্তির ওপর বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ চালু করা গেলে দেশীয় দক্ষতা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে।
ড্রোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোন এলাকায়, কী উদ্দেশ্যে এবং কী ধরনের ড্রোন পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে আধুনিক ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আকাশসীমার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং সাইবার নিরাপত্তার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
বিশ্ববাজারেও ড্রোন শিল্পের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, আগামী দশকে বৈশ্বিক ড্রোন বাজারের আকার কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ যদি এখন থেকেই মানসম্পন্ন উৎপাদন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে রপ্তানি বাজারেও উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বাণিজ্যিক ও বেসামরিক ড্রোনের চাহিদা বাড়ছে, যা বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
উত্তরাঞ্চলে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বিমানঘাঁটি এবং ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্র একসঙ্গে গড়ে উঠলে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। নতুন শিল্প, ব্যবসা, পরিবহন, আবাসন, শিক্ষা ও সেবা খাতের প্রসার ঘটবে। স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান বাড়বে এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের গতি আরও ত্বরান্বিত হবে।
সব মিলিয়ে তুরস্কের সহযোগিতায় বাংলাদেশে ড্রোন উৎপাদনের উদ্যোগ একটি দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশ শুধু আধুনিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতাই অর্জন করবে না, বরং কৃষি, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, গবেষণা, শিল্পায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির নতুন দিগন্তও উন্মোচিত হবে। তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ মানবসম্পদ, গবেষণায় বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উৎপাদন ব্যবস্থা। সঠিক নীতি, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং ধারাবাহিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে ড্রোন প্রযুক্তি বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। ভবিষ্যতের স্মার্ট, প্রযুক্তিনির্ভর ও উদ্ভাবনী বাংলাদেশ গঠনের পথে এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করবে।
আপনার মতামত জানানঃ