দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ভারত ও পাকিস্তানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে সামরিক, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে আছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই দুই দেশের অবস্থান নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং বা ‘র’-এর সাবেক প্রধান এএস দুলাতের সাম্প্রতিক মন্তব্য নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে, অন্যদিকে ভারত ধীরে ধীরে কূটনৈতিকভাবে চাপে পড়ছে। এমন মন্তব্য শুধু ভারতীয় রাজনীতিতেই নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ভারত নিজেকে দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক এবং সামরিক সক্ষমতা—সব মিলিয়ে ভারতকে একটি উদীয়মান বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছিল। অন্যদিকে পাকিস্তানকে প্রায়ই রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক প্রভাব, অর্থনৈতিক সংকট ও নিরাপত্তা ইস্যুর কারণে দুর্বল রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
এএস দুলাতের বক্তব্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো—ভারতের দীর্ঘদিনের একটি ধারণা ছিল, পাকিস্তান অভ্যন্তরীণ সংকটে একসময় ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বরং নানা সংকটের মধ্যেও পাকিস্তান টিকে আছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান নতুনভাবে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, চীন, তুরস্ক ও কিছু পশ্চিমা দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে পাকিস্তান নিজেদের কূটনৈতিক গুরুত্ব বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব আন্তর্জাতিকভাবে বেশি আলোচিত হচ্ছে। দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে ঘিরে বৈশ্বিক পর্যায়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ও কৌশলগত অংশীদার হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চলছে। আফগানিস্তান পরিস্থিতি, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা, মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতা এবং চীনের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) পাকিস্তানের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে চীন পাকিস্তানে বড় বিনিয়োগ করেছে। গওয়াদর বন্দর, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি প্রকল্প এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন পাকিস্তানকে শুধু অর্থনৈতিকভাবেই নয়, ভূরাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বও দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য রক্ষার জন্য পাকিস্তানকে পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারছে না।
অন্যদিকে ভারত বর্তমানে একাধিক কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বলে অনেক পর্যবেক্ষকের ধারণা। কাশ্মীর ইস্যু, সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং সীমান্ত উত্তেজনা ভারতের ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর আন্তর্জাতিক মহলে ভারতকে নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়। মানবাধিকার ইস্যুতে পশ্চিমা কিছু সংস্থা ও গণমাধ্যম ভারতের সমালোচনা করেছে।
এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কেও নানা জটিলতা দেখা গেছে। বাংলাদেশ, নেপাল, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা—সব দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক একসময় অত্যন্ত শক্তিশালী মনে হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা বিষয়ে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে চীনের প্রভাব বাড়ার কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একক আধিপত্য আগের মতো শক্ত অবস্থানে নেই।
তবে এটিও সত্য যে ভারত এখনো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি। প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, ওষুধ শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, সামরিক শক্তি ও বৈদেশিক বিনিয়োগের দিক থেকে ভারত পাকিস্তানের তুলনায় অনেক এগিয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন শক্তিধর দেশের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত সম্পর্কও অত্যন্ত শক্তিশালী। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ক্রমেই গভীর হচ্ছে। কোয়াড জোটে ভারতের অংশগ্রহণও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে দেশটির গুরুত্ব বাড়িয়েছে।
তাই “ভারতের গুরুত্ব কমছে” — এই বক্তব্য পুরোপুরি বাস্তবতা প্রতিফলিত করে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বরং অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এখানে মূল বিষয় হলো আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন। পাকিস্তান কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়েছে, আর ভারতকে এখন আগের তুলনায় আরও বেশি প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
কাশ্মীর ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে রয়ে গেছে। এএস দুলাতের মতে, কাশ্মীরের জনগণের মধ্যে হতাশা ও বঞ্চনার অনুভূতি বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা সামরিক উপস্থিতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ভারত কাশ্মীরকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখলেও পাকিস্তান আন্তর্জাতিক ফোরামে বিষয়টি উত্থাপন করে যাচ্ছে। ফলে এই ইস্যু দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে।
২০২৫ সালের সীমান্ত সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তোলে। দুই দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা কয়েকদিন ধরে স্থায়ী হয়েছিল বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। পাকিস্তান ভারতের যুদ্ধবিমান ও ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছিল, যদিও ভারত সে দাবি পুরোপুরি স্বীকার করেনি। পরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান নিজেদেরকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পায়।
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বর্তমানে শুধু সামরিক শক্তি নয়, মধ্যস্থতা ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা, আফগানিস্তান পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা প্রশ্নে পাকিস্তান সক্রিয় ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছে। এতে দেশটির কূটনৈতিক অবস্থান কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাও খুব স্থিতিশীল নয়। দেশটি এখনো অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক বিভাজন, মুদ্রাস্ফীতি ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সহায়তা ছাড়া অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে পাকিস্তানকে পুরোপুরি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে দেখার সুযোগও সীমিত।
ভারতের ক্ষেত্রেও একইভাবে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারত জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে সামনে এনে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে, কিন্তু সমালোচকদের মতে, সেই রাজনীতির কারণে দেশটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কিছু ক্ষেত্রে সমালোচনার মুখে পড়ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা অনেকটাই নির্ভর করছে ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের ওপর। দুই দেশের মধ্যে যদি উত্তেজনা বাড়তে থাকে, তাহলে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আবার যদি কূটনৈতিক সংলাপ ও আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ে, তাহলে দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।
এএস দুলাতের মন্তব্য হয়তো অনেকের কাছে বিতর্কিত মনে হতে পারে, কিন্তু এটি একটি বাস্তব আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে পরিবর্তনের যে ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। পাকিস্তান নিজেদের অবস্থান নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে, আর ভারতকে এখন শুধু সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তি নয়, কূটনৈতিক ভারসাম্য ও আঞ্চলিক আস্থার পরীক্ষাও দিতে হচ্ছে। আগামী কয়েক বছরই বলে দেবে দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য কোন দিকে যাচ্ছে এবং ভারত-পাকিস্তান প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন কোন রূপ নিতে চলেছে।
আপনার মতামত জানানঃ