মানুষ নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসে। ভাষা, প্রযুক্তি, সভ্যতা এবং জটিল চিন্তার ক্ষমতা মানুষকে অন্য সব প্রাণী থেকে আলাদা করেছে। তবে আধুনিক গবেষণা ও প্রাণী আচরণবিজ্ঞান বারবার দেখাচ্ছে, বুদ্ধিমত্তা শুধু মানুষের একচেটিয়া সম্পদ নয়। প্রাণিজগতের অনেক সদস্যই তাদের আচরণ, স্মৃতিশক্তি, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং যোগাযোগ দক্ষতার মাধ্যমে মানুষকে বিস্মিত করছে। ছোট্ট কবুতর থেকে শুরু করে সমুদ্রের অক্টোপাস কিংবা জঙ্গলের গরিলা—অনেক প্রাণীর মধ্যেই এমন সব বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ দেখা যায়, যা একসময় শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে মনে করা হতো।
দীর্ঘদিন ধরে কবুতরকে সাধারণ একটি পাখি হিসেবে দেখা হলেও গবেষকেরা এখন বলছেন, এই ছোট্ট প্রাণীর মস্তিষ্কে রয়েছে অসাধারণ তথ্য বিশ্লেষণ ক্ষমতা। গবেষণায় দেখা গেছে, কবুতর শুধু লেখা চিনতেই পারে না, বরং বানান ভুলও ধরতে সক্ষম। বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন শব্দ ও ভুল বানানের শব্দ দেখিয়ে পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন, কবুতর সঠিক শব্দ আলাদা করতে পারছে। আকারে ছোট হলেও তাদের মস্তিষ্কে মানুষের তুলনায় অনেক বেশি স্নায়ুকোষ রয়েছে, যা দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণে সহায়তা করে। এ কারণেই তারা পরিবেশ বুঝতে ও সিদ্ধান্ত নিতে অনেক দক্ষ।
কাকের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের আগ্রহ রয়েছে। কাক শুধু খাবার খোঁজে না, বরং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে হাতিয়ার ব্যবহার করতেও পারে। কোনো খাবার বের করতে কাঠি ব্যবহার করা, শক্ত খোলস ভাঙতে উঁচু থেকে ফেলে দেওয়া কিংবা যানবাহনের সাহায্যে বাদাম ভাঙার মতো আচরণ কাকের মধ্যেই দেখা যায়। গবেষকেরা বলছেন, কাক সংখ্যা গণনা করতে পারে এবং ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনাও করতে সক্ষম। এমনকি তারা মানুষের মুখও চিনতে পারে এবং বিপজ্জনক কাউকে মনে রাখে।
সমুদ্রের প্রাণীদের মধ্যেও রয়েছে বিস্ময়কর বুদ্ধিমত্তা। মাছকে সাধারণত স্মৃতিহীন প্রাণী হিসেবে ভাবা হলেও গবেষণা বলছে, কিছু মাছ নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে নিজেকে চিনতে পারে। এটি প্রাণিজগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক দক্ষতা হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ আয়নায় নিজেকে চিনতে পারা মানে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা থাকা, যা উচ্চ পর্যায়ের বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক।
অক্টোপাসকে বলা হয় সমুদ্রের রহস্যময় প্রতিভা। তাদের মস্তিষ্ক ও আটটি শুঁড়ে অসংখ্য নিউরন ছড়িয়ে থাকে। ফলে তারা একই সময়ে অনেক জটিল কাজ করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, অক্টোপাস বিভিন্ন মানুষকে আলাদা করে চিনতে পারে, ধাঁধার সমাধান করতে পারে এবং বিপদ থেকে বাঁচতে কৌশলও তৈরি করে। কিছু অক্টোপাসকে অ্যাকুয়ারিয়ামের ঢাকনা খুলে বেরিয়ে যেতে পর্যন্ত দেখা গেছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, তাদের শেখার ক্ষমতা এবং কৌতূহল অনেকটা মানুষের মতো।
ডলফিনকে পৃথিবীর অন্যতম বুদ্ধিমান প্রাণী বলা হয়। সামাজিক আচরণ, খেলাধুলা, যোগাযোগ এবং সহযোগিতার ক্ষেত্রে ডলফিনের দক্ষতা অত্যন্ত উন্নত। তারা একে অপরকে সাহায্য করে, দলবদ্ধভাবে শিকার করে এবং মানুষের সঙ্গেও সহজে সম্পর্ক গড়ে তোলে। গবেষণায় দেখা গেছে, ডলফিন নিজেদের জন্য আলাদা সংকেত ব্যবহার করে, যা অনেকটা নামের মতো কাজ করে। অর্থাৎ তারা একে অপরকে নির্দিষ্ট পরিচয়ে চিনতে পারে।
কুকুর বহু শতাব্দী ধরে মানুষের বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবে পরিচিত। শুধু পাহারা দেওয়া নয়, মানুষের অনুভূতি বুঝতেও কুকুর অত্যন্ত দক্ষ। বিভিন্ন ভাষার শব্দের পার্থক্য ধরতে পারে এবং মালিকের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করতে পারে। অন্ধ ব্যক্তিকে পথ দেখানো, বিপদ শনাক্ত করা কিংবা উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করে কুকুর। মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্কের ফলে কুকুর মানুষের আচরণ বুঝতে বিশেষ পারদর্শী হয়ে উঠেছে।
তবে বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে শূকরকে অনেক সময় অবমূল্যায়ন করা হয়। গবেষকেরা বলছেন, শূকর কুকুরের চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান হতে পারে। তারা একাধিক নির্দেশনা মনে রাখতে পারে, নিজের নাম চিনতে পারে এবং বিভিন্ন সমস্যার সমাধানও করতে পারে। এমনকি ভিডিও গেম খেলার মতো পরীক্ষাতেও শূকরকে সফল হতে দেখা গেছে। তাদের শেখার ক্ষমতা দ্রুত এবং স্মৃতিশক্তিও শক্তিশালী।
মানুষের সবচেয়ে কাছের প্রাণীগুলোর মধ্যে রয়েছে শিম্পাঞ্জি, বোনোবো, গরিলা এবং ওরাংওটাং। এদের একসঙ্গে গ্রেট এপস বলা হয়। এই প্রাণীরা মানুষের মতো আবেগ প্রকাশ করতে পারে, সহানুভূতি দেখাতে পারে এবং জটিল সমস্যা সমাধানেও দক্ষ। তারা বিভিন্ন হাতিয়ার ব্যবহার করে খাবার সংগ্রহ করে এবং নিজেদের গোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগের জন্য কণ্ঠস্বর, মুখভঙ্গি ও শরীরী ভাষা ব্যবহার করে।
বিশেষ করে গরিলাদের আচরণ বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে। গরিলা মানুষের আবেগ বুঝতে পারে এবং সেই অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানায়। গবেষণায় দেখা গেছে, তারা নতুন প্রতীক বা সাংকেতিক ভাষা শিখতে সক্ষম। কিছু গরিলাকে মানুষের শেখানো সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করে নিজের চাহিদা প্রকাশ করতেও দেখা গেছে। এটি প্রমাণ করে যে প্রাণীদের মধ্যেও ভাষা শেখার একটি মৌলিক ক্ষমতা রয়েছে।
প্রাণীদের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে এসব গবেষণা মানুষের ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। আগে মনে করা হতো, যুক্তি, আবেগ, যোগাযোগ কিংবা সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান দেখাচ্ছে, পৃথিবীর বহু প্রাণী তাদের নিজস্ব পরিবেশ ও প্রয়োজন অনুযায়ী অসাধারণ মানসিক দক্ষতা অর্জন করেছে। হয়তো মানুষের মতো সভ্যতা গড়তে পারেনি, কিন্তু তাদের চিন্তা, অনুভূতি এবং আচরণ প্রমাণ করে যে বুদ্ধিমত্তা প্রকৃতির এক বিস্ময়কর উপহার, যা শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
আপনার মতামত জানানঃ