বাংলাদেশে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কন্যাশিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র সমাজকে নাড়া দিচ্ছে। ২০২৬ সালের মাত্র প্রথম চার মাসেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৫৬ জন ১২ বছরের কম বয়সী শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মোট ১৮০টি ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। এর মধ্যে ৮১ জন ভুক্তভোগীর বয়স ১৮ বছরের নিচে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশ এমন বয়সের, যখন তারা এখনও পৃথিবীকে বুঝতে শেখেনি, নিরাপদ ও অনিরাপদের পার্থক্য বোঝার ক্ষমতাও পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
পরিসংখ্যান বলছে, এ সংকট নতুন নয়; বরং বছর বছর তা আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ২০২৫ সালে ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী ১৪৮ জন মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬৩ এবং ২০২৩ সালে ৫৮। একইভাবে ৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের বিরুদ্ধেও যৌন সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে ৭১ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়, যেখানে ২০২৪ সালে সংখ্যা ছিল ২৪ এবং ২০২৩ সালে ৩৬। এসব সংখ্যা শুধু কাগজে লেখা কিছু পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একেকটি ভাঙা শৈশব, একেকটি আতঙ্কিত পরিবার এবং একেকটি অসহায় ভবিষ্যৎ।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বাস্তব পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। কারণ সমাজের ভয়, লজ্জা, অপমান এবং বিচারহীনতার আশঙ্কায় বহু পরিবার ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশই করে না। বিশেষ করে গ্রামের দিকে কিংবা নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোতে মেয়েশিশুরা নির্যাতনের শিকার হলেও পরিবার অনেক সময় বিষয়টি চেপে যায়। কারণ তারা মনে করে অভিযোগ করলে সামাজিকভাবে হেয় হতে হবে, মেয়ের ভবিষ্যৎ নষ্ট হবে কিংবা প্রভাবশালী অপরাধীদের হুমকির মুখে পড়তে হবে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, অধিকাংশ ঘটনায় অপরাধী কোনো অচেনা মানুষ নয়। প্রতিবেশী, আত্মীয়, শিক্ষক কিংবা পরিচিতজনের বিরুদ্ধেই অভিযোগ বেশি পাওয়া যাচ্ছে। ফলে শিশুদের জন্য নিরাপদ বলে বিবেচিত জায়গাগুলোই অনেক সময় ভয়ংকর হয়ে উঠছে। যে শিক্ষককে পরিবার বিশ্বাস করে সন্তানের শিক্ষার দায়িত্ব দেয়, সেই শিক্ষকই যখন নির্যাতক হিসেবে সামনে আসে, তখন সমাজের ভেতরের নৈতিক অবক্ষয়ের গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি নেত্রকোনার মদন উপজেলার একটি ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সেখানে ১১ বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রী সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে মেয়েটির শারীরিক পরিবর্তন ও অসুস্থতা লক্ষ্য করেন। পরে স্থানীয় একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করানোর পর জানা যায়, শিশুটি সাত মাসের গর্ভবতী। অভিযোগ ওঠে, মাদ্রাসার এক শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে তাকে ধর্ষণ করেছে। মেয়েটির মা পরে থানায় মামলা করেন। অভিযুক্ত শিক্ষক প্রথমে আত্মগোপনে চলে গেলেও পরে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। আদালত তার রিমান্ড মঞ্জুর করে এবং পরে জেলহাজতে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়; এটি গোটা দেশের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। একটি শিশু কীভাবে এত দীর্ঘ সময় নির্যাতনের শিকার হলো, কেন তার আশপাশের মানুষ বিষয়টি বুঝতে পারল না, কেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত নজরদারি ছিল না—এসব প্রশ্ন এখন সামনে আসছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিশুদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ সম্পর্কের অভাব, যৌন শিক্ষা নিয়ে সামাজিক সংকোচ এবং শিশুদের অভিযোগকে গুরুত্ব না দেওয়ার সংস্কৃতি এমন অপরাধকে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম মনে করেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এ ধরনের অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তার মতে, অনেক অপরাধী রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে সহজেই আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়। ফলে অপরাধীরা ভয় পায় না। বরং তারা জানে, কিছুদিন আলোচনা হওয়ার পর ঘটনা ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যাবে। তিনি বলেন, শিশু ও নারীর নিরাপত্তাকে শুধু বক্তৃতা বা কাগুজে পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; বাস্তবে কঠোর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।
নারী অধিকারকর্মী কামরুন নাহারও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, শিশুদের নিরাপত্তা এখন মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—তিনটি জায়গাতেই সুরক্ষার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। তিনি মনে করেন, দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির পাশাপাশি ভুক্তভোগী শিশুদের জন্য মানসিক ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ ধর্ষণের শিকার একটি শিশু শুধু শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; তার মানসিক জগতও ভয়াবহভাবে ভেঙে পড়ে। অনেক শিশু দীর্ঘ সময় ট্রমা, ভয়, দুঃস্বপ্ন এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা এখন সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, শুধু আইন করলেই হবে না; সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সমাজ এবং রাষ্ট্র—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দক্ষতা এবং বিচারিক কার্যক্রমের গতি বাড়াতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবারকেও আরও সচেতন হতে হবে। অনেক সময় পরিবার শিশুর আচরণগত পরিবর্তন বুঝতে পারে না কিংবা গুরুত্ব দেয় না। শিশুরা ভয় বা লজ্জায় নির্যাতনের কথা বলতে পারে না। তাই অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ সম্পর্ক তৈরি করা, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং নিরাপদ ও অনিরাপদ স্পর্শ সম্পর্কে বয়স উপযোগী শিক্ষা দেওয়া।
অন্যদিকে প্রযুক্তির সহজলভ্যতাও কিছু ক্ষেত্রে যৌন অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে মত দিয়েছেন সমাজবিশ্লেষকেরা। অনলাইন পর্নোগ্রাফি, সহিংস কনটেন্ট এবং সামাজিক অবক্ষয় অনেকের মধ্যে বিকৃত মানসিকতা তৈরি করছে। একই সঙ্গে মাদকাসক্তি, বেকারত্ব এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে যাওয়াও অপরাধ প্রবণতা বাড়াচ্ছে।
নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমীন পারভীন জানিয়েছেন, সরকার শিশু সুরক্ষাকে আরও কার্যকর করতে আলাদা শিশু বিষয়ক বিভাগ গঠনের পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালুর কথাও বলা হয়েছে। সরকার শিশু বিবাহ প্রতিরোধ আইন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আইনি কাঠামো আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
তবে বাস্তবতা হলো, শুধু আইন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আইনের বাস্তব প্রয়োগ, দ্রুত বিচার, সামাজিক প্রতিরোধ এবং সচেতনতা—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। শিশুদের জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা এখন শুধু মানবাধিকার ইস্যু নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রশ্ন।
কারণ আজ যে শিশুটি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, সে শুধু একটি পরিসংখ্যান হয়ে যাচ্ছে না; হারিয়ে ফেলছে তার স্বাভাবিক শৈশব, নিরাপত্তাবোধ এবং স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা। একটি সভ্য সমাজ কখনোই এমন বাস্তবতাকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিতে পারে না। তাই শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন রাষ্ট্র, সমাজ এবং প্রতিটি মানুষের সম্মিলিত দায়িত্ব।
আপনার মতামত জানানঃ