
বিশ্ব রাজনীতির আকাশে আবারও শীতল যুদ্ধের ছায়া ঘন হতে শুরু করেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র অন্যদিকে চীন। অর্থনীতি প্রযুক্তি সামরিক শক্তি এবং বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় দুই পরাশক্তির সম্পর্ক এখন জটিল এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে। এমন এক সময়ে সম্ভাব্য শি-ট্রাম্প বৈঠক ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের প্রশ্ন একটি বৈঠক কি সত্যিই দুই দেশের বাড়তে থাকা উত্তেজনা কমাতে পারবে নাকি এটি হবে সাময়িক কূটনৈতিক হাসির আড়ালে লুকানো গভীর প্রতিযোগিতার আরেক অধ্যায়।
বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অস্থির। ইউক্রেন যুদ্ধ এখনও আন্তর্জাতিক রাজনীতির বড় সংকট হয়ে আছে। মধ্যপ্রাচ্যে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়ছে। এশিয়ায় তাইওয়ান প্রসঙ্গ নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক শুধু দুই দেশের বিষয় নয় বরং পুরো বিশ্বের অর্থনীতি নিরাপত্তা এবং কূটনীতির ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য বৈঠককে তাই শুধু আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সাক্ষাৎ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং এটিকে বিশ্ব রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ গত কয়েক বছরে দুই দেশের সম্পর্ক বারবার উত্তেজনার মুখে পড়েছে। কখনও বাণিজ্য যুদ্ধ কখনও প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা আবার কখনও সামরিক উপস্থিতি নিয়ে সংঘাত তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই চীনের দ্রুত উত্থানকে কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখে আসছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি খাত উৎপাদনশিল্প এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চীনের শক্তিশালী অবস্থান ওয়াশিংটনের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ কারণেই মার্কিন প্রশাসন চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেছে এবং বিভিন্ন শিল্পখাতে বিধিনিষেধ দিয়েছে। পাশাপাশি চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টাও চলছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো আজকের বিশ্ব অর্থনীতি এমনভাবে সংযুক্ত যেখানে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়া প্রায় অসম্ভব। বিশ্বের বড় একটি অংশের শিল্প উৎপাদন চীনের ওপর নির্ভরশীল। মুঠোফোন থেকে শুরু করে গাড়ি এমনকি দৈনন্দিন জীবনের অসংখ্য পণ্য চীনা শিল্পের সঙ্গে জড়িত। ফলে রাজনৈতিক উত্তেজনা থাকলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতা দুই দেশকে পুরোপুরি আলাদা হতে দিচ্ছে না।
তাইওয়ান প্রশ্ন বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রসঙ্গগুলোর একটি। চীন তাইওয়ানকে নিজের অংশ হিসেবে দেখে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে এবং সামরিক সহায়তাও দিচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রসঙ্গ ঘিরে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরেও সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন দুই দেশের সম্পর্ক এখন এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে যেখানে ছোট কোনো ভুল সিদ্ধান্তও বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
তারপরও দুই দেশের নেতাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ পরিস্থিতিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে দেয়নি। কূটনৈতিক বৈঠক এবং সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হয়েছে। কারণ দুই দেশই জানে সরাসরি সংঘাত শুধু তাদের জন্য নয় বরং পুরো বিশ্বের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
চীন বারবার বলছে তারা আধিপত্যবাদী শক্তি হতে চায় না। তাদের দাবি তারা শান্তিপূর্ণ উন্নয়নে বিশ্বাসী। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নিজেদের নেতৃত্ব ধরে রাখা প্রয়োজন। এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিই মূলত দুই দেশের প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু।
বিশ্লেষকদের মতে বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটা পুরনো শীতল যুদ্ধের মতো হলেও পুরোপুরি একই নয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সময়কার সংঘাত ছিল মূলত সামরিক ও আদর্শিক। কিন্তু এখনকার প্রতিযোগিতা প্রযুক্তি অর্থনীতি তথ্যপ্রযুক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে। তাই একে অনেকে “নতুন ধরনের শীতল যুদ্ধ” বলছেন।
তবে এই প্রতিযোগিতার মাঝেও সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক অর্থনীতি মহামারি প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার মতো বড় বড় সমস্যাগুলো একা কোনো দেশ সমাধান করতে পারবে না। সেখানে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এজন্যই কূটনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়লে ক্ষতি হবে সবার।
বিশ্বের অনেক দেশ এখন উদ্বিগ্ন হয়ে তাকিয়ে আছে বেইজিং এবং ওয়াশিংটনের দিকে। কারণ দুই দেশের সম্পর্কের প্রভাব সরাসরি পড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে। উত্তেজনা বাড়লে শেয়ারবাজার অস্থির হয়ে ওঠে জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি হয় এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
সম্ভাব্য শি-ট্রাম্প বৈঠক তাই কেবল দুই নেতার সাক্ষাৎ নয় বরং এটি হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। হয়তো সেই বার্তা হবে প্রতিযোগিতা থাকবে কিন্তু সংঘাত নয়। মতপার্থক্য থাকবে কিন্তু সম্পর্ক পুরোপুরি ভাঙবে না। কারণ বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতায় দুই পরাশক্তির মধ্যে স্থিতিশীল সম্পর্ক শুধু তাদের নিজেদের স্বার্থের জন্য নয় বরং বৈশ্বিক শান্তি এবং স্থিতিশীলতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আপনার মতামত জানানঃ