মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূরাজনীতির ভেতরে দাঁড়িয়ে আজকের ইরানকে বুঝতে হলে শুধু খবরের শিরোনাম দেখলে হবে না; বুঝতে হবে হাজার বছরের ইতিহাস, সভ্যতা, সংস্কৃতি, যুদ্ধ, ধর্মীয় চেতনা এবং জাতিগত আত্মপরিচয়ের দীর্ঘ পথচলা। ইরান কেবল একটি রাষ্ট্র নয়, এটি এক গভীর সভ্যতার নাম—যে সভ্যতা বহু সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন দেখেছে, বহু আক্রমণ সহ্য করেছে, কিন্তু নিজের মূল পরিচয় হারায়নি কখনও। বর্তমান বিশ্বের বহু বিশ্লেষক যখন ইরানকে শুধুমাত্র পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা বা পশ্চিমা বিশ্বের বিরোধী অবস্থানের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন, তখন বাস্তবে তারা দেশটির গভীর ঐতিহাসিক আত্মাকে বুঝতে ব্যর্থ হন। আর সেই কারণেই আজকের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশকেও নতুন করে ভাবতে হচ্ছে—ইরান আসলে কে, কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, এবং ভবিষ্যতের বিশ্বরাজনীতিতে এই দেশটির অবস্থান কোথায়।
ইরানের ইতিহাস প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো। পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতাগুলোর একটি হিসেবে পারস্য বা ইরান সবসময়ই সাংস্কৃতিকভাবে শক্তিশালী ছিল। এই ভূখণ্ডে অসংখ্য শাসক এসেছে—গ্রিক, আরব, মঙ্গোল, তুর্কি—কিন্তু ইতিহাসের বিস্ময়কর দিক হলো, শেষ পর্যন্ত তারাই পারস্য সংস্কৃতির ভেতরে মিশে গেছে। বিজেতারা ইরানকে বদলাতে চাইলেও, শেষ পর্যন্ত ইরানই তাদের বদলে দিয়েছে। এ কারণেই বলা হয়, ইরানকে বোঝার জন্য “পার্সিয়াননেস” বা পারস্যসত্তাকে বুঝতে হবে। এই পারস্যসত্তা কেবল ভাষা বা সংস্কৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি তাদের জাতীয় অহংকার, আত্মমর্যাদা এবং ঐতিহাসিক চেতনার অংশ।
আচেমেনিড সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে সাসানীয় যুগ পর্যন্ত ইরান ছিল জ্ঞান, সাহিত্য, শিল্প ও প্রশাসনিক দক্ষতার কেন্দ্র। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট যখন পারস্য জয় করেন, তখনও শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই পারস্য সংস্কৃতির প্রভাবে বদলে যান। পরবর্তীতে আরবদের আগমনের মাধ্যমে ইসলাম ইরানে প্রবেশ করে। কিন্তু ইরান ইসলামকে শুধু গ্রহণই করেনি, বরং নিজেদের সংস্কৃতির সঙ্গে মিশিয়ে এক নতুন পরিচয় গড়ে তুলেছে। বিশেষ করে সাফাভি যুগে শিয়া ইসলামের সঙ্গে পারস্য সংস্কৃতির মেলবন্ধন আধুনিক ইরানের ভিত্তি নির্মাণ করে। আজকের ইরানে ধর্মীয় পরিচয় যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ তাদের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক গর্বও।
এই জাতিগত ও ঐতিহাসিক চেতনার কারণেই ইরানকে বাইরের চাপ দিয়ে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। ইতিহাস জুড়ে দেশটি বারবার বিদেশি আগ্রাসনের মুখোমুখি হয়েছে। কখনও ব্রিটিশ ও রুশ হস্তক্ষেপ, কখনও মার্কিন প্রভাব, কখনও আঞ্চলিক যুদ্ধ—সবকিছুর মধ্য দিয়েও ইরান টিকে থেকেছে। ইরানিদের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তারা নিজেদের সরকারের সমালোচনা করতে পারে, মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রশ্নে তারা দ্রুত একত্রিত হয়ে যায়। কারণ তাদের কাছে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় পরিচয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিয়া ইসলামও ইরানের জাতীয় মনস্তত্ত্বে গভীরভাবে প্রোথিত। কারবালার ঘটনা এবং ইমাম হুসাইনের শাহাদাত শিয়া সংস্কৃতিতে যে আত্মত্যাগ, প্রতিরোধ এবং সংগ্রামের চেতনা সৃষ্টি করেছে, তা আজও ইরানি সমাজে প্রবলভাবে উপস্থিত। অনেক ইরানির কাছে কষ্ট সহ্য করা, প্রতিরোধ গড়ে তোলা কিংবা বাহ্যিক শক্তির সামনে মাথা নত না করা—এসব কেবল রাজনৈতিক অবস্থান নয়, বরং ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক দায়িত্বের অংশ। ফলে বাইরের চাপ যত বাড়ে, জাতীয়তাবাদও তত শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, দীর্ঘদিন ধরেই ইরানকে একটি “সমস্যা রাষ্ট্র” হিসেবে দেখেছে। কিন্তু এই দ্বন্দ্বের শিকড় ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবেই সীমাবদ্ধ নয়। ইরানিদের স্মৃতিতে সবচেয়ে বড় ক্ষতগুলোর একটি হলো ১৯৫৩ সালে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনা। তিনি ইরানের তেল শিল্প জাতীয়করণ করেছিলেন, যা পশ্চিমা শক্তিগুলোর স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়েছিল। পরে সিআইএ ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৬ যৌথভাবে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তাকে সরিয়ে দেয়। ইরানিদের কাছে এটি ছিল তাদের গণতন্ত্র ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সরাসরি বিদেশি হস্তক্ষেপ। তাই যখন আমেরিকা ১৯৭৯ সালের জিম্মি সংকটকে সম্পর্কের সূচনা হিসেবে দেখে, তখন ইরানিরা মনে করে সংঘাতের শুরু আরও আগে, ১৯৫৩ সালেই।
ভূরাজনৈতিকভাবে ইরানের গুরুত্ব অসাধারণ। পারস্য উপসাগরের প্রবেশপথ হরমুজ প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোরগুলোর একটি। বৈশ্বিক তেল ও গ্যাসের বিশাল অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শিল্পনির্ভর দেশগুলো এই অঞ্চলের জ্বালানির ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। ফলে ইরানের অবস্থান কেবল মধ্যপ্রাচ্যের নয়, পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া বর্তমান বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার মধ্যকার প্রতিযোগিতা মধ্যপ্রাচ্যকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে ইরান ধীরে ধীরে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেছে। চীনের “বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ”, রাশিয়ার আঞ্চলিক কৌশল এবং পশ্চিমা আধিপত্যবিরোধী অবস্থানের কারণে এই তিন দেশের সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। ফলে ইরান এখন কেবল আঞ্চলিক শক্তি নয়, বরং বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ইসরায়েল-ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি। ইরান দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনি ইস্যুকে নিজেদের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে। ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন ইরানের কাছে কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়; এটি তাদের আদর্শিক অবস্থানের অংশ। অন্যদিকে ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে। এই দ্বন্দ্বের ফলে পুরো অঞ্চল এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, শুধুমাত্র সামরিক চাপ দিয়ে ইরানকে দমন করা সম্ভব নয়। কারণ ইতিহাস প্রমাণ করে, বাইরের আক্রমণ ইরানকে দুর্বল না করে বরং আরও ঐক্যবদ্ধ করে তোলে।
বাংলাদেশের জন্যও ইরানকে নতুনভাবে বোঝা জরুরি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি হলো জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা। দীর্ঘদিন ধরে দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। অথচ বঙ্গোপসাগরে নিজস্ব সম্পদ অনুসন্ধান কিংবা বিকল্প জ্বালানি কৌশল গঠনে যথেষ্ট দূরদর্শিতা দেখানো হয়নি। এই বাস্তবতায় ইরান বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় অংশীদার হতে পারে।
প্রায় পাঁচ দশক ধরে কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেও ইরান শিক্ষা, প্রযুক্তি, চিকিৎসা ও শিল্পক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশটির নারীশিক্ষার হার উচ্চ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নত, এবং বিজ্ঞান গবেষণায়ও তারা এগিয়ে। বাইরের বিশ্বে ইরানকে প্রায়ই একমাত্রিকভাবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে দেশটির সমাজ অনেক জটিল, শিক্ষিত এবং সক্ষম।
বাংলাদেশ যদি কৌশলগতভাবে চিন্তা করে, তবে পশ্চিমা উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে পারে। বিশেষ করে ভবিষ্যতে যদি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও উত্তেজনা কমে আসে, তাহলে ইরানের পুনর্গঠন ও উন্নয়ন প্রকল্পে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রায় ৯৩ মিলিয়ন মানুষের এই বিশাল দেশটির রয়েছে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। অতীতে যেমন বাংলাদেশি শ্রমিকরা মধ্যপ্রাচ্যে কাজের সুযোগ পেয়েছে, তেমনি ভবিষ্যতেও ইরান হতে পারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার।
আজকের বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে। পুরোনো মিত্রতা, পুরোনো শত্রুতা, পুরোনো শক্তির ভারসাম্য—সবকিছু নতুন রূপ নিচ্ছে। এই পরিবর্তনের সময় ইরানকে শুধুমাত্র একটি “সংকট” হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং ইরানকে বুঝতে হবে একটি প্রাচীন সভ্যতা, এক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং এক দীর্ঘ প্রতিরোধের ইতিহাসের আলোকে। কারণ ইরানকে বুঝতে পারা মানে শুধু মধ্যপ্রাচ্যকে বোঝা নয়; বরং বর্তমান বিশ্বের পরিবর্তিত ভূরাজনীতির গভীর বাস্তবতাকেও বোঝা।
আপনার মতামত জানানঃ