মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ অস্থিরতার ইতিহাসে আবারও একটি নাটকীয় মোড়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ব। একদিকে যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ, অন্যদিকে কূটনীতির টেবিলে চলা কঠিন দর–কষাকষি—এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে এখন আলোচনায় উঠে এসেছে এক বিশাল অঙ্কের অর্থ এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সম্ভাব্য সমঝোতা শুধু দুই দেশের সম্পর্ককেই বদলে দিতে পারে না, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি, তেলের বাজার, এমনকি বিশ্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।
ওয়াশিংটনের মূল উদ্বেগ বহুদিনের—ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা। বিশেষ করে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতকে কেন্দ্র করেই এই উত্তেজনার জন্ম। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, ইরান যেন এমন কোনো পর্যায়ে না পৌঁছায়, যেখানে তারা অল্প সময়ের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। আর এই লক্ষ্য পূরণেই এখন কূটনৈতিক টেবিলে উঠেছে এক নতুন প্রস্তাব—ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বড় অংশ ত্যাগ করবে, আর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ছাড় করবে জব্দ থাকা প্রায় দুই হাজার কোটি ডলার।
প্রথম দেখায় এটি কেবল অর্থ আর পারমাণবিক উপাদানের বিনিময় মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি অনেক গভীর। এই সমঝোতা মূলত একটি রাজনৈতিক বার্তা—যুদ্ধের পরও দুই পক্ষ এখনো আলোচনায় ফিরতে প্রস্তুত। সাম্প্রতিক সংঘাতের পর মধ্যপ্রাচ্যে যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে সবাই। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও উভয় পক্ষ জানে, আলোচনা ব্যর্থ হলে আবারও সংঘাত শুরু হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ইরানের অর্থনৈতিক সংকট। বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞার চাপে দেশটির অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। তেলের রপ্তানি বাধাগ্রস্ত, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে গেছে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থায় ফিরে আসা এখন তেহরানের জন্য শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক প্রয়োজনও। যুক্তরাষ্ট্রে জব্দ থাকা বিপুল অঙ্কের অর্থ ফেরত পাওয়া ইরানের জন্য বড় স্বস্তি হতে পারে।
তবে ওয়াশিংটনের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। তারা মনে করে, কেবল অর্থ ছাড় দিলেই হবে না; এর বিনিময়ে ইরানকে এমন প্রতিশ্রুতি দিতে হবে, যা ভবিষ্যতে পারমাণবিক ঝুঁকি কমাবে। বিশেষ করে প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়াম নিয়ে মার্কিন উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। কারণ, আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মাত্রার ইউরেনিয়ামকে আরও কিছু ধাপ এগিয়ে নিলে অস্ত্র তৈরির উপযোগী পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব।
এ কারণেই আলোচনা এখন ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, ইরানের মাটির নিচে সংরক্ষিত উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যেন ব্যবহারযোগ্য না থাকে। শুরুতে ওয়াশিংটনের প্রস্তাব ছিল, সব পারমাণবিক উপাদান যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দিতে হবে। কিন্তু ইরান এটিকে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখেছে। তেহরান বরং নিজ দেশে থেকেই ইউরেনিয়ামের মান কমিয়ে ফেলার প্রস্তাব দেয়।
এই অবস্থানগত দূরত্ব থেকেই এসেছে নতুন আপস–প্রস্তাব। এর আওতায় কিছু ইউরেনিয়াম তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানো হতে পারে, আর বাকি অংশ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে মান কমিয়ে ফেলা হবে। এটি কার্যকর হলে উভয় পক্ষই আংশিকভাবে নিজেদের অবস্থান রক্ষা করতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্র বলতে পারবে তারা ঝুঁকি কমিয়েছে, আর ইরানও দাবি করতে পারবে যে তারা পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করেনি।
এই আলোচনায় পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিসরের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইসলামাবাদে বৈঠকের সম্ভাবনা শুধু কূটনৈতিক ঘটনাই নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান ভূমিকাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে পাকিস্তান এখন নিজেকে একটি মধ্যস্থতাকারী শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। তুরস্কও দীর্ঘদিন ধরেই মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুগুলোতে সক্রিয় ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছে।
তবে সমঝোতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা এখনো অবিশ্বাস। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনের অনেকেই মনে করেন, ইরান অতীতে একাধিকবার আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। অন্যদিকে ইরানের অভিযোগ, ওয়াশিংটনও বিভিন্ন সময়ে চুক্তি থেকে সরে এসেছে এবং নিষেধাজ্ঞাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। ফলে আলোচনার টেবিলে বসেও দুই পক্ষ একে অপরকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না।
এই অবিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা গেছে মার্কিন রাজনীতিতেও। রিপাবলিকান নেতাদের একটি অংশ মনে করছে, ইরানকে অর্থ ছাড় দেওয়া মানে তাদের আঞ্চলিক প্রভাব আরও বাড়তে সাহায্য করা। বিশেষ করে হামাস বা অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সমালোচকেরা বলছেন, অর্থ ছাড় দিলে তার একটি অংশ হয়তো আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর পেছনেও ব্যয় হতে পারে।
অন্যদিকে যুদ্ধবিরতির পক্ষে থাকা কূটনীতিকেরা বলছেন, কোনো সমঝোতা না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধ শুরু হলে শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র নয়, গোটা অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। জ্বালানি তেলের দাম আবারও বেড়ে যেতে পারে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে, এমনকি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি একদিকে কঠোর ভাষায় ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন, অন্যদিকে সরাসরি আলোচনাও চালিয়ে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্প চাইছেন এমন একটি চুক্তি করতে, যা তিনি নিজের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন। একই সঙ্গে তিনি এমন কোনো ছাড় দিতেও চান না, যা দেশে রাজনৈতিক সমালোচনার জন্ম দিতে পারে।
ইরানের ভেতরেও এই আলোচনা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। দেশটির কঠোরপন্থীরা মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করা যায় না। তারা চায় না যে ইরান তার পারমাণবিক সক্ষমতা সীমিত করুক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অর্থনৈতিক চাপ সাধারণ মানুষের জীবনকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে আন্তর্জাতিক সমঝোতা ছাড়া সামনে এগোনো কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পারমাণবিক গবেষণার ভবিষ্যৎ। খসড়া সমঝোতায় চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরির জন্য ইরানকে সীমিত পরিসরে গবেষণা চালানোর সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ পুরো কর্মসূচি বন্ধ নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার চিন্তা করা হচ্ছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্রও পুরোপুরি ‘শূন্য পারমাণবিক কর্মসূচি’ অবস্থান থেকে কিছুটা বাস্তববাদী পথে হাঁটছে।
বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে এই আলোচনার পরিণতির দিকে। যদি সমঝোতা হয়, তাহলে তা হতে পারে সাম্প্রতিক বছরগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্যগুলোর একটি। আর যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে যুদ্ধবিরতি ভেঙে নতুন সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হবে। সেই সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—দুই পক্ষ কি যুদ্ধের ভাষা ছেড়ে বাস্তব সমঝোতার পথে হাঁটতে পারবে? নাকি পুরোনো অবিশ্বাস আবারও সংঘাতের আগুন জ্বালাবে? এই উত্তরই হয়তো ঠিক করবে মধ্যপ্রাচ্যের আগামী অধ্যায়।
আপনার মতামত জানানঃ