ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলার ফালাকাটায় ২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল এক নির্বাচনী জনসভায় ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষণা দেন—যদি তাঁর দল বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়, তাহলে বাংলাভাষী এই রাজ্যে আর “বাবরি ধাঁচের” কোনো মসজিদ গড়ে উঠতে দেওয়া হবে না। দক্ষিণ এশিয়ার মতো বহু ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির অঞ্চলে এমন বক্তব্য কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এগুলো মানুষের মনে ভয়, অবিশ্বাস ও ঘৃণার বিষ ঢেলে দেয়। ধর্মকে কেন্দ্র করে বিভাজন সৃষ্টি করা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়। বহু রাজনীতিকই ক্ষমতা ও ভোটের হিসাব কষে মানুষের আবেগকে ব্যবহার করেন। সাধারণ মানুষকে তাই আরও সচেতন হতে হবে, যাতে তারা ঘৃণার রাজনীতির শিকার না হয়।
এই প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে এক বিস্ময়কর অধ্যায়ের কথা মনে পড়ে যায়—লাহোরের মুসলিম “মিয়ান” পরিবার এবং এলাহাবাদের হিন্দু “নেহরু” পরিবারের গভীর সম্পর্কের ইতিহাস। আজকের ভারত-পাকিস্তানের উত্তেজনাপূর্ণ বাস্তবতায় এই ইতিহাস যেন অন্য এক যুগের গল্প। অথচ একসময় এই দুই পরিবার শুধু রাজনৈতিকভাবেই নয়, সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কেও ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ধর্ম, অঞ্চল কিংবা রাজনৈতিক মতভেদের দেয়াল তখনও ছিল, কিন্তু মানুষের সম্পর্ক সেই দেয়ালের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল।
লাহোরের বাঘবানপুরার মিয়ান পরিবার প্রায় তিন শতাব্দী ধরে ঐতিহাসিক শালিমার বাগানের তত্ত্বাবধায়ক ছিল। এই পরিবারের প্রভাব ব্রিটিশ ভারতের রাজনীতিতে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের অন্যতম সদস্য ছিলেন মিয়ান মুহাম্মদ শফি এবং তাঁর কন্যা জাহানারা শাহনওয়াজ। মুসলিম লীগের রাজনীতিতে যেমন তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, তেমনি কংগ্রেস রাজনীতিতে নেহরু পরিবারের ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়। বিশেষ করে মতিলাল নেহরু এবং তাঁর পুত্র জওহরলাল নেহরু ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রধান মুখগুলোর অন্যতম। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কখনোই ব্যক্তিগত সম্পর্ককে নষ্ট করতে পারেনি।
জাহানারা শাহনওয়াজ তাঁর আত্মজীবনী “পিতা ও কন্যা: একটি আত্মজীবনী”-তে লিখেছেন, ইংল্যান্ডে আইন পড়ার সময় মতিলাল নেহরু ও মিয়ান মুহাম্মদ শফির মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তাঁদের সম্পর্ক এতটাই আন্তরিক ছিল যে দেখা হলে তাঁরা শুধু করমর্দন করতেন না, বরং আপন ভাইয়ের মতো একে অপরকে জড়িয়ে ধরতেন। দক্ষিণ এশীয় সমাজে আত্মীয়তার বাইরেও মানুষকে “চাচা”, “মামা”, “খালা” ডাকার যে সংস্কৃতি আছে, সেটিই প্রতিফলিত হয়েছিল তাঁদের সম্পর্কেও। জাহানারা মতিলাল নেহরুকে “চাচা” বলে ডাকতেন। তিনি স্মৃতিচারণে লিখেছেন, মতিলাল নেহরু তাঁর প্রতি পিতৃতুল্য স্নেহ দেখাতেন। এমনকি তাঁর মেয়ে মুমতাজের প্রতিও ছিল নেহরু পরিবারের গভীর ভালোবাসা।
রাজনীতি তখন উত্তাল। একদিকে কংগ্রেসের অসহযোগ আন্দোলন, অন্যদিকে মুসলিম লীগের রাজনৈতিক অবস্থান। কিন্তু সেই উত্তেজনাপূর্ণ সময়েও পারিবারিক সম্পর্ক ছিল অটুট। ১৯২৭ সালে জাহানারা দিল্লিতে একটি নৈশভোজের আয়োজন করেন। সেখানে ব্রিটিশ প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও আমন্ত্রিত ছিলেন।
মতিলাল নেহরু প্রথমে যেতে অস্বীকৃতি জানান, কারণ তিনি তখন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা। কিন্তু জাহানারা অভিমান করে তাঁকে বলেন, “একজন চাচা কীভাবে তাঁর ভাতিজির অনুরোধ ফিরিয়ে দিতে পারেন?” এই এক কথাতেই মতিলাল নেহরু রাজি হয়ে যান। তিনি অনুষ্ঠানে যোগ দেন এবং সেদিন দীর্ঘ সময় ধরে মিয়ান মুহাম্মদ শফির সঙ্গে গল্প করেন। রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও মানবিক সম্পর্ক যে আরও বড় হতে পারে, এই ঘটনা তার এক অনন্য উদাহরণ।
আরও আগে, ১৯১৯ সালে কংগ্রেসের অধিবেশন উপলক্ষে নেহরু পরিবার লাহোরে এলে জাহানারা তাঁদের সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন। সেখানেই প্রথমবার তাঁর পরিচয় হয় বিজয়া লক্ষ্মী পণ্ডিতের সঙ্গে, যিনি ছিলেন জওহরলাল নেহরুর বোন এবং পরবর্তীকালে ভারতের অন্যতম কূটনীতিক।
১৯৪৭ সালের দেশভাগ দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ভারত ও পাকিস্তানের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় নজিরবিহীন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, গণহত্যা এবং ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ গণ-অভিবাসন। লাখ লাখ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছিল। রেলগাড়িভর্তি লাশ, রক্তে ভেজা বগি, উন্মত্ত জনতার হামলা—সব মিলিয়ে পুরো উপমহাদেশ যেন নরকে পরিণত হয়েছিল। জাহানারা শাহনওয়াজ লিখেছেন, করাচিতে এমন রেলগাড়ি পৌঁছাত যার বগি ভর্তি থাকত শুধু মৃতদেহ আর রক্তে।
এই ভয়াবহতার মাঝেও মানবিকতার আলো নিভে যায়নি। দেশভাগের পর পাঞ্জাবের বাটালা অঞ্চল ভারত অংশে পড়ে। সেখানে মুসলমানদের ওপর বড় ধরনের হত্যাযজ্ঞের আশঙ্কা দেখা দেয়। মিয়ান পরিবারের সদস্যরা তখন জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং মুসলমানদের রক্ষার জন্য হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানান। নেহরু তাঁদের কথা রাখেন। তাঁর হস্তক্ষেপে সম্ভাব্য গণহত্যা ঠেকানো সম্ভব হয়েছিল বলে জাহানারা উল্লেখ করেছেন। আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই ঘটনা প্রায় অবিশ্বাস্য মনে হলেও, এটি প্রমাণ করে—মানুষের সম্পর্ক ও আস্থা কখনো কখনো ইতিহাসের ভয়াবহতাকেও থামিয়ে দিতে পারে।
নেহরু পরিবারের সঙ্গে মিয়ান পরিবারের বিশ্বাস ও ঘনিষ্ঠতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় ১৯২২ সালের ঘটনায়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কারণে জওহরলাল নেহরু তখন কারাবন্দি। তাঁর বিরুদ্ধে “ভয় দেখানো” ও “চাঁদাবাজির” অভিযোগ আনা হয়েছিল। সে সময় ভাইসরয়ের নির্বাহী পরিষদে তিনজন ভারতীয় সদস্য ছিলেন—মুহাম্মদ শফি, বি. এন. শর্মা এবং তেজ বাহাদুর সপ্রু। তাঁদের মধ্যে দুজন ছিলেন হিন্দু, এবং সপ্রু ছিলেন আইনবিষয়ক সদস্য। কিন্তু নিজের ছেলের মুক্তির ব্যাপারে মতিলাল নেহরু সাহায্যের জন্য যাঁর কাছে লোক পাঠালেন, তিনি হলেন মুসলমান নেতা মুহাম্মদ শফি। এটি শুধু রাজনৈতিক যোগাযোগ ছিল না; বরং ছিল গভীর আস্থা ও ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের প্রতিফলন।
আজকের দক্ষিণ এশিয়ায় যখন ধর্মীয় বিভাজন, বিদ্বেষ ও রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ছে, তখন মিয়ান ও নেহরু পরিবারের এই ইতিহাস আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। একসময় মুসলমান ও হিন্দু পরিবার শুধু একসঙ্গে রাজনীতি করেনি, তারা একে অপরের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিয়েছে, পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে, বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই ইতিহাস প্রায় হারিয়ে যাওয়া এক ঐতিহ্য—সহাবস্থান, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ঐতিহ্য।
১৯৪৭ সালের দেশভাগে প্রায় দেড় কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। বিভিন্ন গবেষকের মতে, পাঁচ লাখ থেকে দশ লাখ পর্যন্ত নারী-পুরুষ ও শিশু সেই সহিংসতায় নিহত হয়। মানুষের পরিচয় তখন শুধু “হিন্দু” বা “মুসলমান”-এ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের সেই ভয়াবহতা আমাদের শেখায়—ঘৃণা শেষ পর্যন্ত কাউকেই রক্ষা করে না। রাজনীতি মানুষকে বিভক্ত করতে পারে, কিন্তু মানবতা মানুষকে আবার একত্রও করতে পারে।
মিয়ান ও নেহরু পরিবারের সম্পর্ক সেই মানবতারই এক জীবন্ত দলিল। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ধর্মের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও মানুষ মানুষকে ভালোবাসতে পারে, সম্মান করতে পারে, বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ যদি শান্তি, স্থিতি ও সহাবস্থানের ওপর দাঁড় করাতে হয়, তাহলে এই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই।
আপনার মতামত জানানঃ