মানব সভ্যতার ইতিহাসে সন্তান জন্মদান সবসময়ই ছিল এক গভীর, স্বাভাবিক এবং শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটিও বদলে গেছে চিকিৎসাব্যবস্থা, সামাজিক রীতি এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তের কারণে। আজ পৃথিবীর অধিকাংশ হাসপাতালেই দেখা যায়, সন্তান জন্মদানের সময় প্রসূতি নারীকে বিছানায় চিৎ হয়ে শুইয়ে রাখা হয়। অথচ গবেষকরা বলছেন, হাজার হাজার বছর ধরে নারীরা দাঁড়িয়ে, হাঁটু গেড়ে, উবু হয়ে বসে কিংবা সামনের দিকে ঝুঁকে সন্তান প্রসব করতেন। ইতিহাসের বহু চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য ও বিবরণে সেই দৃশ্য ফুটে উঠেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে বর্তমানের এই “শুয়ে সন্তান প্রসব” পদ্ধতি কোথা থেকে এলো? কেনই বা এটি বিশ্বজুড়ে আধিপত্য বিস্তার করল?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে শরীরের স্বাভাবিক গঠন এবং মাধ্যাকর্ষণ শক্তির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থান হলো দাঁড়িয়ে থাকা বা উবু হয়ে বসা। কারণ এই অবস্থায় প্রসবনালী তুলনামূলকভাবে বেশি প্রসারিত হয় এবং নবজাতক নিচের দিকে নামতে সুবিধা পায়। ফলে প্রসবের সময় কম লাগে, ব্যথাও তুলনামূলক কম হয়। বিপরীতে, বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে থাকলে জরায়ুর ওপর চাপের ধরন বদলে যায়, প্রসব ধীরগতির হতে পারে এবং অনেক সময় মায়ের পাশাপাশি শিশুর শরীরেও অক্সিজেন প্রবাহের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তবু আজ হাসপাতালভিত্তিক আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় কেন এই পদ্ধতিই প্রধান হয়ে উঠেছে? ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এর পেছনে রয়েছে ক্ষমতা, চিকিৎসকদের সুবিধা এবং রাজদরবারের প্রভাবের জটিল এক গল্প।
সপ্তদশ শতকের ফ্রান্সে বসবাস করতেন চিকিৎসক ফ্রাঁসোয়া মারিসো। তিনি প্রসূতি চিকিৎসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম হিসেবে পরিচিত। গবেষকদের মতে, তিনিই প্রথম নারীদের চিৎ হয়ে শুয়ে সন্তান প্রসবের পদ্ধতিকে জনপ্রিয় করে তোলেন। মারিসো মনে করতেন, এই ভঙ্গিতে সন্তান প্রসব করানো চিকিৎসকদের জন্য বেশি সুবিধাজনক। কারণ এতে প্রসূতি নারীর শরীরকে সহজে পর্যবেক্ষণ করা যায় এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসা হস্তক্ষেপ করাও সহজ হয়। তার যুক্তি ছিল, সন্তান জন্মের পরে প্রসূতিকে আবার অন্যত্র স্থানান্তর করার প্রয়োজন পড়ে না।
১৬৬৮ সালে প্রকাশিত তার বই The Diseases of Women with Child and in Child-Bed–এ তিনি শুয়ে সন্তান প্রসবকে “সবচেয়ে ভালো ও নিরাপদ” পদ্ধতি হিসেবে উল্লেখ করেন। যদিও আধুনিক গবেষণা আজ সেই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
তবে এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু চিকিৎসকদের সুবিধাই কাজ করেনি। ইতিহাসবিদদের কেউ কেউ মনে করেন, ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইও এই রীতিকে জনপ্রিয় করতে ভূমিকা রেখেছিলেন। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, রাজা তার স্ত্রীদের সন্তান জন্মদানের দৃশ্য দেখতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু তখন নারীরা বিশেষ প্রসবচেয়ারে বসে সন্তান প্রসব করতেন, ফলে দৃশ্যটি স্পষ্ট দেখা যেত না। তাই তিনি শুয়ে সন্তান প্রসবের প্রতি উৎসাহ দেন। যদিও এই কাহিনির পূর্ণ ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই, তবু গবেষকরা মনে করেন, রাজদরবারের আচরণ সাধারণ মানুষের সামাজিক রীতিতে প্রভাব ফেলেছিল।
এরপর ধীরে ধীরে ইউরোপজুড়ে প্রসব প্রক্রিয়ায় ধাত্রীদের পরিবর্তে পুরুষ শল্যচিকিৎসকদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। আগে সন্তান প্রসব ছিল মূলত নারীদের নিজস্ব পরিসরের বিষয়। অভিজ্ঞ ধাত্রীরা প্রসূতি নারীদের পাশে থাকতেন এবং প্রসবকে একটি স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করতেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়ার পর সন্তান জন্মদানকে ক্রমশ “মেডিক্যাল কেস” হিসেবে দেখা শুরু হয়। গর্ভাবস্থাকে অনেক সময় অসুস্থতা হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
এর ফলেই প্রসবের পরিবেশও বদলে যায়। ঘরের পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে নারীরা চলে আসেন হাসপাতালের বিছানায়। তাদের স্বাধীন চলাফেরা সীমিত হয়ে পড়ে। বিছানায় শুইয়ে প্রসব করানো চিকিৎসকদের কাজ সহজ করলেও প্রসূতি নারীর স্বাভাবিক শারীরিক প্রবৃত্তি বাধাগ্রস্ত হতে থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিৎ হয়ে শুয়ে সন্তান প্রসবের সময় প্রসবনালীর ব্যাস কিছুটা কমে যেতে পারে। জরায়ুর সংকোচনও কার্যকরভাবে নিচের দিকে চাপ প্রয়োগ করতে পারে না। এতে প্রসব দীর্ঘায়িত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যথানাশক ওষুধ বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন দেখা দেয়। আধুনিক গবেষণাগুলোতেও এই বিষয়গুলোর প্রমাণ পাওয়া গেছে।
২০১৩ সালে পাঁচ হাজারেরও বেশি নারীর ওপর পরিচালিত ২৫টি গবেষণার একটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, যারা দাঁড়িয়ে, বসে বা উবু হয়ে সন্তান প্রসব করেছেন, তাদের মধ্যে সিজারিয়ান অপারেশনের ঝুঁকি তুলনামূলক কম ছিল। একই সঙ্গে তাদের কম ব্যথানাশক ওষুধ প্রয়োজন হয়েছে এবং নবজাতকদের নিবিড় পরিচর্যায় ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনাও কম ছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাদের প্রসবের সময় তুলনামূলকভাবে কম লেগেছে।
অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ধাত্রীবিদ্যার অধ্যাপক হান্না ডাহলেন লিখেছেন, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সন্তান প্রসব করলে শিশুর শরীরে অক্সিজেন প্রবাহ ভালো থাকে এবং প্রসবজনিত জটিলতা কম হয়। তার মতে, মানবদেহের গঠনই এমনভাবে তৈরি যে, প্রসবের সময় নারী স্বাভাবিকভাবে সামনে ঝুঁকে বা উবু হয়ে বসতে চান।
এই ধারণাকে ঘিরেই পশ্চিমা বিশ্বে “অ্যাক্টিভ বার্থ” বা সক্রিয় প্রসবের ধারণা জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে। এই পদ্ধতিতে প্রসূতি নারীকে বিছানায় আটকে না রেখে স্বাধীনভাবে নড়াচড়া করার সুযোগ দেওয়া হয়। তিনি চাইলে হাঁটতে পারেন, বসতে পারেন, পিঁড়ি বা বল ব্যবহার করতে পারেন কিংবা নিজের আরামদায়ক ভঙ্গি বেছে নিতে পারেন।
যুক্তরাজ্যের অ্যাক্টিভ বার্থ সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা জ্যানেট বালাস্কাস বহু বছর ধরে এই ধারণার পক্ষে কাজ করছেন। তার মতে, বর্তমানের প্রচলিত হাসপাতালভিত্তিক প্রসব পদ্ধতি নারীদের “নিষ্ক্রিয় রোগীতে” পরিণত করেছে। অথচ সন্তান জন্মদান কোনো অসুস্থতা নয়; এটি মানবদেহের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
তিনি বলেন, পৃথিবীর অন্য কোনো প্রাণী সন্তান জন্মদানের সময় এমন অস্বাভাবিক অবস্থায় থাকে না, যেমনটা মানুষকে হাসপাতালে রাখা হয়। তার মতে, নারীদের শরীরকে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে দিলে প্রসব অনেক সহজ হতে পারে।
অ্যাক্টিভ বার্থ ধারণার বিস্তারের ফলে উন্নত অনেক দেশে এখন ধাত্রী পরিচালিত প্রসবকেন্দ্র তৈরি হয়েছে। সেখানে হাসপাতালের মতো কেবল বিছানা নয়, বরং নানা ধরনের সহায়ক সরঞ্জাম রাখা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এমন পরিবেশে নারীরা স্বাভাবিকভাবেই দাঁড়িয়ে বা বসে প্রসবের প্রবণতা বেশি দেখান।
তবে বিশেষজ্ঞরা এটাও বলছেন, সব ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি কার্যকর নাও হতে পারে। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা বিশেষ জটিলতার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনো একটি পদ্ধতিকে একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রসূতি নারী যেন নিজের শরীর, পরিস্থিতি এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পান।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন ক্রমশ এই বিষয়টি উপলব্ধি করছে যে, সন্তান প্রসব শুধু চিকিৎসা নয়, এটি একই সঙ্গে শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক অভিজ্ঞতা। তাই অনেক দেশেই এখন চিৎ হয়ে শুয়ে সন্তান প্রসবকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর Health and Care Excellence (NICE)–এর নির্দেশিকায়ও বলা হয়েছে, প্রসবের দ্বিতীয় ধাপে নারীদের চিৎ হয়ে শোয়া থেকে বিরত রাখতে হবে এবং আরামদায়ক অন্য ভঙ্গি গ্রহণে উৎসাহ দিতে হবে।
জনসচেতনতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসছে। টেলিভিশন, সিনেমা ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে সন্তান প্রসবকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে চিৎকার করাই একমাত্র বাস্তবতা। কিন্তু গবেষকরা বলছেন, বাস্তবে নারীর শরীর আরও বহুমাত্রিক এবং স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে সক্ষম।
কানাডার ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ধাত্রীবিদ্যার শিক্ষক আইলিন হাটনের মতে, প্রসবকালীন বিভিন্ন বিকল্প সম্পর্কে নারীরা যত বেশি জানবেন, তত বেশি তারা নিজেদের জন্য আরামদায়ক এবং নিরাপদ পদ্ধতি বেছে নিতে পারবেন। তার ভাষায়, “জ্ঞানই শক্তি।”
ইতিহাসের দিকে তাকালে বোঝা যায়, সন্তান জন্মদানের পদ্ধতি শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় নয়; এটি সমাজ, সংস্কৃতি, ক্ষমতা এবং দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রতিফলন। একসময় যেটিকে আধুনিকতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, আজ সেটিই নতুন করে প্রশ্নের মুখে। হয়তো ভবিষ্যতের পৃথিবীতে সন্তান প্রসব আবারও ফিরে যাবে সেই প্রাকৃতিক স্বাধীনতার দিকে, যেখানে নারী নিজের শরীরের ভাষা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার পাবেন।
আপনার মতামত জানানঃ