
শ্রীলঙ্কার দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ শুধু একটি অভ্যন্তরীণ সংঘাত ছিল না; বরং এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কৌশলগত স্বার্থ, এবং নীরব জোটের জটিল ইতিহাস। সম্প্রতি ইসরায়েল স্টেট আর্কাইভ থেকে প্রকাশিত নথিপত্র সেই ইতিহাসের একটি অন্ধকার দিক উন্মোচন করেছে—যেখানে দেখা যায়, আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও ইসরায়েল কীভাবে শ্রীলঙ্কার সামরিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গভীরভাবে যুক্ত ছিল। এই নথিগুলো শুধু অতীতের গোপন লেনদেনের প্রমাণই নয়, বরং মানবাধিকার, কূটনীতি এবং যুদ্ধনীতির নৈতিক প্রশ্নগুলোকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
১৯৭০ সালে আরব বিশ্বের চাপের মুখে শ্রীলঙ্কা ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকে যখন দেশটি তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তখন সেই পুরোনো সম্পর্ক ভিন্ন এক রূপে ফিরে আসে। ১৯৮৪ সালে কলম্বোয় মার্কিন দূতাবাসের ভেতরে একটি ইসরায়েলি ‘ইন্টারেস্টস সেকশন’ খোলা হয়—যা ছিল কার্যত একটি গোপন কূটনৈতিক চ্যানেল। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা শুরু হয়, যা ধীরে ধীরে গভীর ও বিস্তৃত হয়ে ওঠে।
নথি অনুযায়ী, ১৯৮৮ সালের মধ্যে ইসরায়েল শ্রীলঙ্কার কাছে প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করে। এর মধ্যে ছিল দ্রুতগামী ডভোরা-ক্লাস টহল নৌকা, মিনি-উজি সাবমেশিন গান, ইলেকট্রনিক ফেন্সিং সিস্টেম, যোগাযোগ প্রযুক্তি, মেশিনগান এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ। এসব সরঞ্জাম শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারই হয়নি, বরং শ্রীলঙ্কার সামরিক সক্ষমতাকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে, ইসরায়েলি বিশেষজ্ঞরা দেশটির সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয়—যা ছিল এই সহযোগিতার আরও গুরুত্বপূর্ণ দিক।
এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে আড়াল করার জন্য একটি কৌশলও ব্যবহার করা হয়। ইসরায়েলি প্রশিক্ষকদের ‘কৃষি উপদেষ্টা’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া হতো, যাতে তাদের উপস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক বা অভ্যন্তরীণ সমালোচনা এড়ানো যায়। কিন্তু বাস্তবে তারা যুদ্ধকৌশল, আক্রমণ পরিকল্পনা এবং বিশেষ অভিযানের প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন। নথিতে উল্লেখ আছে, এই প্রশিক্ষণের একটি বড় অংশ ছিল জাফনা অঞ্চল পুনর্দখলের প্রস্তুতি, যা তামিল বিদ্রোহীদের একটি শক্ত ঘাঁটি ছিল।
শুধু সেনাবাহিনী নয়, শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট জুনিয়াস রিচার্ড জয়াবর্ধনের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনীকেও ইসরায়েল প্রশিক্ষণ দেয়। এমনকি একটি বিশেষ ভিআইপি সুরক্ষা ইউনিট গঠনে সরাসরি সহায়তা করে, যেখানে স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) থেকে সদস্য নেওয়া হয়। এই এসটিএফ ইউনিটটি পরবর্তীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে কুখ্যাত হয়ে ওঠে। তবুও ইসরায়েল এই ইউনিটের প্রশিক্ষণে অংশ নেয়, যদিও মার্কিন কূটনীতিকরা এটিকে ‘স্বল্পমেয়াদে সন্দেহজনক এবং দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর ভুল’ বলে সতর্ক করেছিলেন।
এই সহযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল গোয়েন্দা কার্যক্রম। নথিতে উল্লেখ আছে, মোসাদের সদস্যরা শ্রীলঙ্কায় স্থায়ীভাবে কাজ করছিলেন এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। তাদের উপস্থিতি গোপন রাখার চেষ্টা করা হলেও, স্থানীয় পর্যায়ে অনেকেই এ বিষয়ে অবগত ছিলেন। এমনকি কখনো কখনো তাদের ‘কৃষি বিশেষজ্ঞ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হতো—যা ছিল একটি প্রচলিত ছদ্মবেশ।
এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—শ্রীলঙ্কা সরকার যেকোনো মূল্যে সামরিক সহায়তা চাইছিল। এমনকি দেশটির অর্থমন্ত্রী এক পর্যায়ে বলেন, তারা ‘শয়তানের কাছ থেকেও’ সাহায্য নিতে প্রস্তুত। এই বক্তব্য শুধু হতাশার প্রকাশই নয়, বরং যুদ্ধের চরম বাস্তবতাকে তুলে ধরে, যেখানে নৈতিকতার চেয়ে টিকে থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে এই সহযোগিতার সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো মানবাধিকার পরিস্থিতি। নথিপত্রে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে, শ্রীলঙ্কার নিরাপত্তা বাহিনী নির্বিচারে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা চালাচ্ছিল, গুম, নির্যাতন এবং গণহত্যার অভিযোগ উঠছিল। বিশেষ করে তামিল জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতা ছিল ব্যাপক। হাসপাতাল, বাজার, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও হামলার শিকার হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া, সরকারি চাকরি থেকে তামিলদের বরখাস্ত করা—এসব ঘটনাও উল্লেখ আছে।
এসব তথ্য ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের অজানা ছিল না। বরং তারা নিয়মিত এসব ঘটনার রিপোর্ট পাঠাচ্ছিলেন। তবুও সামরিক সহায়তা বন্ধ হয়নি। কারণ হিসেবে দেখা যায়, ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য ছিল শ্রীলঙ্কার সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এবং দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব বাড়ানো। অর্থাৎ, মানবাধিকার পরিস্থিতির চেয়ে কৌশলগত স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
এখানে একটি বড় প্রশ্ন উঠে আসে—যদি একটি রাষ্ট্র জানে যে তার দেওয়া সহায়তা মানবাধিকার লঙ্ঘনে ব্যবহৃত হতে পারে, তাহলে সেই সহায়তা দেওয়া কতটা নৈতিক? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়, কিন্তু শ্রীলঙ্কার এই ঘটনাটি দেখায়, বাস্তব রাজনীতিতে নৈতিকতা অনেক সময়ই দ্বিতীয় স্থানে চলে যায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ইসরায়েল নিজেই জানত যে এই সংঘাতের সামরিক সমাধান সম্ভব নয়। মার্কিন কর্মকর্তারাও একই মত দিয়েছিলেন। তবুও সহায়তা চলতে থাকে। কারণ, এই সহায়তা ছিল একটি কূটনৈতিক বিনিয়োগ—যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ আমাদের সামনে একটি জটিল বাস্তবতা তুলে ধরে। একদিকে একটি রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলায় যেকোনো সাহায্য নিতে প্রস্তুত, অন্যদিকে আরেকটি রাষ্ট্র সেই সুযোগকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করছে। এর মাঝে পড়ে সাধারণ মানুষ—যারা যুদ্ধ, সহিংসতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়।
শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ শেষ হয়েছে, কিন্তু এর স্মৃতি এখনও জীবন্ত। হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ, অসংখ্য পরিবার এখনও তাদের প্রিয়জনদের খুঁজে বেড়াচ্ছে। এই নতুন নথিপত্র সেই ইতিহাসের একটি নতুন দিক তুলে ধরেছে, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যুদ্ধ শুধু মাটিতে নয়, কূটনীতির অদৃশ্য অঙ্গনেও লড়া হয়।
এই প্রকাশিত তথ্যগুলো শুধু অতীতের হিসাব নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং মানবাধিকারকে অগ্রাধিকার না দিলে, ইতিহাস বারবার একইভাবে পুনরাবৃত্তি হতে পারে। শ্রীলঙ্কার এই অধ্যায় সেই পুনরাবৃত্তিরই একটি শক্তিশালী উদাহরণ।
আপনার মতামত জানানঃ