
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতিতে সাম্প্রতিক একটি আইনি মোড় বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে যেভাবে বিভিন্ন দেশের ওপর পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট সেই ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করায় নীতিগত অনিশ্চয়তা কিছুটা হলেও কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে নাটকীয় পরিবর্তন না আনলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতসহ রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক খাত একটি প্রধান স্তম্ভ, আর এই খাত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি বা বাণিজ্য বিধিতে হঠাৎ পরিবর্তন হলে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে, কর্মসংস্থানে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ১৯ শতাংশ ‘পারস্পরিক’ শুল্কের আওতায় ছিল, যা আইইইপিএভিত্তিক জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে আরোপ করা হয়েছিল। এই ধরনের নির্বাহী ক্ষমতার ব্যবহার রপ্তানিকারকদের জন্য বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল, কারণ যেকোনো সময় নতুন করে শুল্ক বাড়ানোর ঝুঁকি ছিল।
সুপ্রিম কোর্টের রায় সেই ঝুঁকিকে পুরোপুরি না হলেও আংশিকভাবে কমিয়েছে। এর ফলে নীতিগত পূর্বানুমানযোগ্যতা কিছুটা বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কেবল শুল্কহারই গুরুত্বপূর্ণ নয়; নীতির স্থিতিশীলতা অনেক সময় তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মার্কিন ক্রেতারা সাধারণত কয়েক মাস আগেই অর্ডার দিয়ে থাকে এবং সরবরাহের উৎস নির্ধারণে তারা দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় কাঠামো, মাননিয়ন্ত্রণ, শ্রমমান, পরিবহন সময় এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের নির্ভরযোগ্যতা বিবেচনা করে। ফলে হঠাৎ শুল্ক পরিবর্তনের ঝুঁকি কমলে বাংলাদেশের মতো সরবরাহকারীদের প্রতি তাদের আস্থা কিছুটা বাড়তে পারে।
তবে বাস্তবতা হলো, আদালতের এই সিদ্ধান্তের ফলে রাতারাতি অর্ডারের বন্যা বইবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। বৈশ্বিক পোশাক ক্রেতারা তাদের সোর্সিং কৌশল খুব হিসাব করে নির্ধারণ করে এবং তা দ্রুত পরিবর্তন করে না। বিশেষ করে বড় খুচরা বিক্রেতারা সাধারণত একাধিক দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ করে ঝুঁকি ভাগ করে নেয়। ফলে শুল্কসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা কমলেও অর্ডার প্রবাহে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসতে সময় লাগবে।
এর মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসন ভিন্ন আইনি ধারার আওতায় সব দেশের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। এই পদক্ষেপটি প্রথম নজরে নতুন চাপ সৃষ্টি করলেও এর একটি ভিন্ন দিক আছে। আগের ‘পারস্পরিক’ শুল্ক কাঠামো ছিল দেশভিত্তিক এবং বৈষম্যমূলক; নতুন প্রস্তাবটি তুলনামূলকভাবে সমতাভিত্তিক। ফলে প্রতিযোগিতার ময়দানে বাংলাদেশের অবস্থান পুরোপুরি দুর্বল হয়ে পড়বে—এমনটা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর ওপর চাপের ধরন কেমন হয়, সেটিই নির্ধারণ করবে কে কতটা সুবিধা পাবে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চীন। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দীর্ঘদিন ধরেই চীন। যদি চীনের ওপর দেশভিত্তিক উচ্চ শুল্ক বা বাণিজ্য বাধা বহাল থাকে কিংবা আইনি চ্যালেঞ্জে সীমিত হয়, তাহলে বাংলাদেশ আপেক্ষিক সুবিধা পেতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ব্র্যান্ড ইতিমধ্যেই ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশল অনুসরণ করছে—অর্থাৎ চীনের পাশাপাশি বিকল্প উৎস খুঁজছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ তার অংশ বাড়ানোর সুযোগ পেতে পারে।
তবে কেবল শুল্ক সুবিধা দিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়—এ কথাও সমানভাবে সত্য। দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন ক্রেতাদের সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে উৎপাদনশীলতা, লিড টাইম, মাননিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ ও শ্রমমান মেনে চলা এবং অবকাঠামোগত দক্ষতার ওপর। বাংলাদেশের পোশাক খাত গত এক দশকে নিরাপত্তা ও মাননিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে, কিন্তু সরবরাহ সময় কমানো, বন্দর দক্ষতা বাড়ানো এবং উচ্চমূল্যের পণ্যে বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রে এখনো বড় কাজ বাকি।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য সম্পর্কের সাম্প্রতিক চুক্তিটিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে দ্রুত সম্পাদিত এই চুক্তি নিয়ে নীতিনির্ধারক মহলে প্রশ্ন রয়েছে—বাংলাদেশের স্বার্থ এতে কতটা প্রতিফলিত হয়েছে। এখন যখন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির আইনি ভিত্তিই পরিবর্তনের মুখে, তখন ওই চুক্তির বাস্তব কার্যকারিতা ও ভবিষ্যৎ প্রাসঙ্গিকতাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সামগ্রিক অনিশ্চয়তা। ট্রাম্প প্রশাসন অতীতে যেভাবে একতরফা বাণিজ্য পদক্ষেপ নিয়েছে, তাতে বিশ্ববাণিজ্যে অস্থিরতা বেড়েছে। আদালতের রায় নির্বাহী ক্ষমতার সীমা টেনে দিলেও প্রশাসন বিকল্প আইনি পথ ব্যবহার করে নতুন শুল্ক আরোপের চেষ্টা করতে পারে—এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফলে মার্কিন খুচরা বিক্রেতাদের একটি অংশ আপাতত ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ বা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কৌশল নিতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কাম্য পরিস্থিতি হলো একটি নিয়মভিত্তিক, স্থিতিশীল এবং পূর্বানুমানযোগ্য মার্কিন বাণিজ্য পরিবেশ। কারণ হঠাৎ নির্বাহী সিদ্ধান্তনির্ভর শুল্ক পরিবর্তন রপ্তানিকারকদের পরিকল্পনা ব্যাহত করে, বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে ঝুঁকির মুখে ফেলে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক অবস্থান সেই দিক থেকে একটি ইতিবাচক সংকেত, কারণ এটি কংগ্রেসের ভূমিকা বাড়িয়ে বাণিজ্য নীতিকে তুলনামূলক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনতে পারে।
তবে বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি সুযোগের পাশাপাশি সতর্কবার্তাও বহন করছে। বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা দ্রুত বদলাচ্ছে। ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও মেক্সিকো—এই দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। অনেক ক্রেতা এখন ‘নিয়ারশোরিং’ বা ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহের দিকেও ঝুঁকছে, বিশেষ করে দ্রুত ডেলিভারির জন্য। ফলে শুধু শুল্ক সুবিধা থাকলেই বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে বাজার ধরে রাখতে পারবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
বাংলাদেশকে তাই বহুমুখী কৌশল নিতে হবে। প্রথমত, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রযুক্তি বিনিয়োগ জরুরি। দ্বিতীয়ত, বন্দর ও লজিস্টিক দক্ষতা উন্নত করতে হবে, যাতে লিড টাইম কমে। তৃতীয়ত, উচ্চমূল্যের পোশাক, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল ও ব্র্যান্ডভিত্তিক উৎপাদনে অগ্রসর হতে হবে। চতুর্থত, শ্রমমান ও পরিবেশগত মান বজায় রাখার অগ্রগতি ধরে রাখতে হবে, কারণ পশ্চিমা বাজারে এগুলো ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এ ছাড়া বাজার বৈচিত্র্যও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক বাজার হলেও ইউরোপ, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও উদীয়মান বাজারগুলোতে রপ্তানি বাড়ানো ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হবে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের বর্তমান অনিশ্চিত পরিবেশে একক বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কৌশলগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
সবশেষে বলা যায়, ট্রাম্পের জরুরি শুল্ক ক্ষমতা সীমিত হওয়ার ঘটনাটি বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক বড় অর্থনৈতিক উল্লম্ফনের খবর নয়, কিন্তু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত স্বস্তি এনে দিয়েছে। অনিশ্চয়তা কমা মানেই সুযোগ তৈরি হওয়া—তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে দেশের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোই হবে মূল চাবিকাঠি। যদি বাংলাদেশ উৎপাদন দক্ষতা, সরবরাহ নির্ভরযোগ্যতা এবং পণ্যের বৈচিত্র্যে এগোতে পারে, তাহলে পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাণিজ্য বাস্তবতায় এই আইনি মোড় একসময় বাস্তব অর্থনৈতিক লাভে রূপ নিতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ